শিশু সন্তানকে মারধোর করার দীর্ঘমেয়াদী কুফল

আমরা যারা বড় হয়ে গেছি তারা অনেক সময় বলি: “মা-বাবা মাইরের উপর রাখতো, সেটাই ভালো করতো। আজ কালকার মা-বাবাদের মধ্যে কি যেন হইছে। বাচ্চারে নাকি মারা ঠিক না। আরে, মাইরের উপর ওষুধ নাই। আজ যদি আমার বাপ আমারে না মারতো তবে আজ আমি এমন থাকতাম না।”

আমি অসহমত করবো না কথাগুলির সাথে। সেই সময়ের জন্য, সেই সময়ের জ্ঞানে হয়তো সেটাই উপযুক্ত মাধ্যম ছিলো। সেই কালের মা-বাবারা যারা তাদের সন্তানদের মাইরের উপর রাখতেন তারা শিশুদের নিয়ে তেমন চিন্তা করতেন না। ছিলো না শিশু লালন-পালনের জ্ঞান। আমার বাবার জন্ম হয়েছে অস্বাস্থ্যকর গোসলখানায়! তবে চিন্তা করে দেখুন, আমার দাদা-দাদীর জন্ম কেমন যত্নে হয়ে থাকতে পারে! শিশুর জন্ম আনন্দের হলেও, শিশুর জন্মের প্রস্তুতি, স্বাস্থ্যগত জ্ঞান ইত্যাদির অভাব ছিলো (এখনও আছে)। তারা পৃথিবীর কোনো শিশুর ভেতরই ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাতে পারতেন না। লেখাপড়া করে ভালো রেজাল্ট না করা পর্যন্ত তারা তাদের কোনো সন্তানকেই তেমন দাম দিতেন না। অথচ, তাদের প্রতিটি সন্তানের মাঝেই ছিলো অনেক সম্ভাবনা। কিন্তু, যে সন্তান প্রকৃতিগতভাবে নিজ থেকে ভালো কিছু দেখাতে পেরেছে হয়তো সেই সন্তান বেশি আদর-কদর পেয়েছে, আর যে সন্তান পারেনি সে মা-বাবার মাইরতো খেয়েছেই, সাথে বড় ভাইবোনেরও। শাসন আর মাইর খেতে খেতে বড় হয়ে এখন সেই সন্তানটাই বলছে, “মা-বাবা মাইরের উপর রাখতো, সেটাই ভালো করতো। আজ কালকার মা-বাবাদের মধ্যে কি যেন হইছে। বাচ্চারে নাকি মারা ঠিক না। আরে, মাইরের উপর ওষুধ নাই। আজ যদি আমার বাপ আমারে না মারতো তবে আজ আমি এমন থাকতাম না।”

আপনারা যারা দাবী করছেন যে, ছোটবেলায় অনেক মাইর আর শাসনের উপর ছিলেন বলেই আজ এমন ভালো আছেন, তাদের বলি, হয়তো আপনি আজো জানেন না আপনার ভেতর আসল সম্ভাবনাটা কী ছিলো! আপনি হয়তো কোনো এক পেশায় আছেন, কিন্তু আপনি হয়তো আপনার অধিক সম্ভাবনাটা জীবনে আর খুঁজেই পাবেন না। আমি কিন্তু এটা বলছি না যে শিশু সন্তানদের শাসন করাই যাবে না। আমার আপত্তি শাসনের পদ্ধতিতে। শিশুদের সাথে শিশু উপযোগী সময় কাটাতে হবে। আপনার শিশুকে নির্মম শাসন করবেন না

Photo credit: pixabay[dot]com/en/bucket-scoop-baby-child-toy-sand-82991/

Photo credit: pixabay[dot]com/en/bucket-scoop-baby-child-toy-sand-82991/

অধিক শাসন আর মাইরের ভয়ে আমাদের শিশুর বিকাশ ঘটে না। সে অনেক কথাই লুকিয়ে রাখে। প্রাণ খুলে নিজের মনের কথা বলতে ভয় পায়। নিজ ঘরে থেকেও নিজের মা-বাবা বা পরিবারের বড়দের বলতে পারে না নিজের সমস্যার কথা। হয়তো সে কোনো বিষয়ে ভীত, সেটাও বলতে পারে না অনেক সময়। মাইরের ভয়ে পড়া ঠিক মতো করতে পারে না। মাইরের ভয়ে স্কুলে যেতে চায় না। মাইরের ভয়ে জানা কিছুও ভুলে যায়। ক্রমে আত্নবিশ্বাস কমতে থাকে।

হয়তো সে কোনো বিষয়ে বিরক্ত/বিভ্রান্ত, যেটা বড় কারো সাথে শেয়ার করলে সমস্যার সমাধান হতে পারতো। কিন্তু, সেই বিষয়ে কথা বলার লোক নেই তার চারপাশে। অবশেষে তারই সমবয়সী কারো সাথে শেয়ার করে। বন্ধুর সাথে শেয়ার করে। আর তার মতো তার বন্ধুরও নেই সেই বিষয়ে জ্ঞান। বিভ্রান্ত হয় তার বন্ধুও। নিজের মতো করে সমাধান বের করে। বিপথগামী হয়েও যেতে পারে এই সব ঘটনায়।

ভুলে যাবেন না, একজন শিশু একটা জীবন, একজন মানুষের বাচ্চা। আমরা অধিক শাসন বা নিষ্ঠুর শাসন করেই যাবো আর সে নিশ্চুপ হয়েই থাকবে তা কিন্তু নয়। কেউ কেউ চুপসে যায়, আর কেউ কেউ হয়তো আপনার আমার জন্যই বিপদের কারণ হয়ে যায় ভবিষ্যতে।

***

কিছু সত্য ঘটনা:

আমার খুবই কাছের একজন তার সন্তানকে প্রচন্ড শাসন করতেন, একদম সেই ছোট্টবেলা থেকেই। যখন সেই সন্তান প্রায় বড়, একটা পর্যায়ে সেই সন্তান দাবি করে বসে যে, তার মা-বাবা তার আসল মা-বাবা নয়। কি ভয়ংকর কথা চিন্তা করে দেখুন। পরবর্তিতে অনেক সময় নিতে হয়েছে তাকে এটা বিশ্বাস করাতে যে, তারা আসলেই তার নিজের মা-বাবা।

আরেক আত্নীয় তার সন্তানকে খুবই মারাত্নক শাসন করতেন। তখন থেকেই সেই ছেলে জেদি হতে থাকে। আর এখন সেই সন্তান বড়, বিবাহিত; তার ভয়ে মা-বাবা ভীত থাকেন। ভীত থাকেন তার জিদ, চিল্লাচিল্লি ইত্যাদিতে।

আমার আরেকজন খুব ঘনিষ্ট। আজ হতে প্রায় ২০-২৫ বছর আগে তার জীবনের কোনো এক ভুলে তাকে এমন নির্মম শাসন করা হয় যে, আজো সে কোমরের ব্যাথা আর সমস্যায় ভুগছে।

***

শিশুর প্রতি নির্যাতন নয়, বরং আমরা যারা বড় তাদের উচিত কিভাবে শিশুর সাথে মিশতে হয় সেই যোগ্যতা অর্জন করা। কিভাবে শিশুর সাথে আচরন করতে হয় সেই জ্ঞান নেওয়া। নির্মম শাসন কখনই সুফল বয়ে আনতে পারে না।

লেখাটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে।   

Advertisements

3 thoughts on “শিশু সন্তানকে মারধোর করার দীর্ঘমেয়াদী কুফল

  1. পিংব্যাকঃ শিশু সন্তানের নৈতিক শিক্ষা নিয়ে প্রস্তাবনা: প্রথমে মনুষ্যত্বের মৌলিক পাঠের গাঁথুনি, এর উপর ধর্ম

  2. পিংব্যাকঃ শিশু আক্রমণাত্মক আচরণ করলে যেভাবে তাকে সামলাতে হবে | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ শিশুকে সদাচার ও শিষ্টাচার শেখানো | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s