“সবকিছুই যদি আল্লাহ্‌ তৈরী করে থাকেন তো আল্লাহ্‌কে কে তৈরী করলো?”

Photo credit: pixabay[dot]com/en/milky-way-universe-perseids-cosmos-451599/

Photo credit: pixabay[dot]com/en/milky-way-universe-perseids-cosmos-451599/

[Note: এই লেখায় আল্লাহ্‌ / ঈশ্বর / সৃষ্টিকর্তা / God সমার্থকরূপে ব্যবহার করা হয়েছে ]

প্রশ্ন ১। বিভিন্ন সময় নাস্তিকদের বলতে শুনেছি যে, আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করা অন্ধবিশ্বাস মাত্র।  ঈশ্বরবিশ্বাস কি আসলেই একটা আবেগীয় ব্যাপার,  নাকি ঈশ্বরের অস্তিত্বের যৌক্তিক প্রমান আছে?

উত্তর: নাস্তিকেরা বলে থাকে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস একটি অন্ধবিশ্বাস। তারা বলে, যেহেতু আল্লাহকে দেখা যায় না, ধরা যায় না, শোনা যায় না, লজিক দিয়ে প্রমাণ করে যায় না – কাজেই আল্লাহ্‌ বলে কিছু নেই। কিন্তু, বাস্তব হলো সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস এবং সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করা মানুষের জন্মগত স্বভাব। আর যদিও নাস্তিকেরা নিজেদেরকে যুক্তিবাদী বলে দাবী করে, কিন্তু সত্য হলো সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব  যুক্তি বা লজিক দিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই প্রমাণিত হয়ে এসেছে।

বর্তমানে আমরা যে লজিক বা যুক্তিবিদ্যা পড়ি, তার আবিষ্কারক হলো প্রাচীন গ্রীসের পন্ডিতগণ। গ্রীসের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত লজিশিয়ান বা যুক্তিবিজ্ঞানী ছিলেন প্লেটো এবং তার ছাত্র এরিস্টোটল, যারা লজিককে formal discipline হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। আপনি জানেন কি এরা দুজনেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব (তাদের ভাষায় ‘unmoved mover’) বিশ্বাস করতেন? এরা দু’জনেই যুক্তি দিয়েই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে গেছেন। এর মাধ্যমে এটুকু বোঝা গেল, যুক্তিবাদী(?) নাস্তিকেরা যুক্তিবিদ্যার পিতা / পিতাতুল্যদেরকে নিজেরাই বিশ্বাস করে না।

এবার আসুন দেখি প্লেটোর যুক্তি কী ছিল। প্লেটো যে যুক্তিটি ব্যবহার করেছিলেন সেটা হলো, Design Indicates Designer, অর্থাৎ – প্রতিটি নকশারই নকশাকারী আছে। মহাগ্রন্থ কোরআনে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই একই যুক্তি দিয়ে বার বার অবিশ্বাসীদের নিকট স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন (যেমন: সূরা আন’আম ৬:৯৯, সূরা রুম ৩০:২০-২৭)। উদাহরণ দিয়ে বুঝানো যাক। আপনি যদি সমুদ্র পারে একটা বালির ঘর দেখেন, আপনি কি চিন্তা করবেন – বাহ কি সুন্দর একটা ঢেউ এসেছিল যেটা একটা বালির ঘর তৈরি করে চলে গেছে? নাকি এটি চিন্তা করবেন, নিশ্চয়ই এখানে কোনো মানুষ এসে এটা বানিয়েছিল? কাকে আপনার যুক্তিবাদী মনে হয়? এটা সম্পূর্ণই অযৌক্তিক হবে যদি কেউ বলে, যে ওই বালির ঘর ভাগ্যক্রমে বা হাজার হাজার ঢেউয়ের মিশ্রণে হয়েছে। বরং সাধারণ বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন যেকোনো মানুষই বলবে যে, ওই বালির ঘরটি নিশ্চয়ই কেউ না কেউ তৈরী করেছে। কারণ, প্রতিটা সৃষ্টির পেছনেই স্রষ্টা থাকে। ঠিক একইভাবে, এই মহাবিশ্ব এবং এর ভিতরের সবকিছুর অবশ্যই একজন স্রষ্টা আছে।

একটা কলম নিজে নিজে তৈরি হতে পারে না, ফেইসবুক নিজে নিজে তৈরী হতে পারে না, আইফেল টাওয়ার থেকে মোনালিসা কোন কিছুই নিজে নিজে তৈরী হতে পারে না, তাহলে এত নিয়মতান্ত্রিক, নিঁখুত মহাবিশ্ব ও মানবজাতি কিভাবে নিজে নিজে তৈরী হতে পারে? একটা অণুর ভিতর তাকান, আপনি ডিজাইন দেখতে পাবেন, মহাকাশের দিকে তাকান আপনি ডিজাইন দেখতে পাবেন। সূর্য যদি পৃথিবীর আরো কাছে থাকতো তাহলে পৃথিবী অনেক বেশী গরম হয়ে যেতো, পৃথিবী থেকে সূর্য আরো দূরে থাকলে পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যেতো, সূর্য পৃথিবী থেকে ঠিক ততটুকুই দূরে আছে যতটুকু দূরে থাকলে পৃথিবীটা প্রাণের টিকে থাকার উপযুক্ত হবে, সৃষ্টিজগতের এই নিঁখুত স্থাপত্য এটা প্রমান করে যে এই সৃষ্টি জগত র‍্যান্ডমলি সৃষ্টি হতে পারে না, এর পেছনে অবশ্যই একজন প্রবল পরাক্রমশালী, অসীম ক্ষমতাধর, প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা আছেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোরআন মাজিদে প্রশ্ন করেন:

তারা কি স্রষ্টাহীন সৃষ্টি? না তারা নিজেরা নিজেদের সৃষ্টি করেছে? না তারা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? বরং তারা নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে না । – সূরা তুর (৫২:৩৫-৩৬)

প্রত্যেকটি মানুষই এক আল্লাহ্‌র অস্তিত্বের স্বাভাবিক অনুভূতি নিয়ে জন্মায়। জন্ম থেকেই মানুষ জানে যে, আল্লাহ্‌ এক এবং আল্লাহ্‌ চান আমি তার ইবাদত করি –  ইসলামের ভাষায় এই অনুভূতিকে ‘ফিতরাহ’ বলে।

কি, ‘ফিতরাহ’ এর ব্যাপারটা বিশ্বাস হচ্ছে না? বৈজ্ঞানিক প্রমাণ লাগবে? তাহলে শুনুন। University of Oxford এর Centre for Anthropology and Mind বিভাগের সিনিয়র রিসার্চার Dr. Justin Berrett দীর্ঘ ১০ বছর শিশুদের উপর বৈজ্ঞানিক গবেষনা করে বলেছেন:

“Young people have a predisposition to believe in a supreme being because they assume that everything in the world was created with a purpose.”

 “If we threw a handful (of babies) on an island and they raised themselves I think they would believe in God.”

প্রশ্ন ২। আচ্ছা বুঝলাম এই সৃষ্টিজগত একজন স্রষ্টা তৈরী করেছেন, কিন্তু তাহলে সেই স্রষ্টার স্রষ্টা কে?

উত্তর:  স্রষ্টাকে কেউ সৃষ্টি করতে পারে কি না – আসুন ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখি।

কখনো ডমিনোর খেলা দেখেছেন? ডমিনোগুলোকে একটার পর একটা সাজিয়ে বাইরে থেকে ধাক্কা দেয়া হয় আর তার effect শুরু হয়, একটার পর একটা ডমিনো পড়তে থাকে। সৃষ্টির ব্যাপারটাও একইরকম। একটা সৃষ্টি আরেকটা সৃষ্টির কারণ ঘটায়। এখন, আমি যদি আপনাকে বলি, কোনো বাতাস ছিল না, কেউ ধাক্কা দেয়নি, অনেকগুলো ডমিনো সাজানো ছিল এবং কোনো বাহ্যিক বল ছাড়া এমনি এমনি ডমিনো একটার উপর আরেকটা পড়তে শুরু করল, আপনি কি বিশ্বাস করবেন? করবেন না (নিউটনের ১ম সূত্র) । এবং যে এই বাহ্যিক বল প্রয়োগ করবে সে অবশ্যই ডমিনো হতে পারে না। কারণ সে ডমিনো হলে, অর্থাৎ সে process of creation এর অন্তর্ভুক্ত হলে তাকে push করার জন্য, অন্য কথায় তাকে সৃষ্টি করার জন্য অন্য কাউকে লাগবে। অর্থাৎ, এই বাহ্যিক বল প্রয়োগকারী স্রষ্টাকে সৃষ্টি থেকে ভিন্ন প্রকৃতির হতে হবে। সৃষ্টি যদি সসীম হয়, স্রষ্টা হবেন অসীম; সৃষ্টি যদি অন্য সৃষ্টির প্রয়োজন অনুভব করে, স্রষ্টা হবেন চাহিদার উর্দ্ধে; সৃষ্টি যদি ভুল প্রবণ হয়, স্রষ্টা হবেন ভুলের উর্দ্ধে; সৃষ্টি যদি ক্ষণস্থায়ী হয়, স্রষ্টা হবেন চিরস্থায়ী। আর এই স্রষ্টা যেহেতু অসীম ক্ষমতাশীল, অনাদি, অনন্ত, কাজেই এরকম স্রষ্টা মাত্র একজনই থাকবেন। কারণ, একাধিক অসীম ক্ষমতাশীল, অনাদি, অনন্ত স্রষ্টার সহাবস্থান অসম্ভব।

বলুন – তিনিই আল্লাহ্‌, এক ও অদ্বিতীয়। সবাই তার মুখাপেক্ষী, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। এবং কেউই তার সমকক্ষ নয়। – সূরা ইখলাস (১১২:১-৪)

সুতরাং, মহাবিশ্বের অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে, স্রষ্টাকে কেউ সৃষ্টি করেনি। কারণ, মহাবিশ্বকে যে স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন সেই স্রষ্টাকে সৃষ্টি করতে যদি স্রষ্টা লাগে, তাকে সৃষ্টি করতে যদি স্রষ্টা লাগে, তাকে সৃষ্টি করতে যদি স্রষ্টা লাগে – এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে এবং কোনোদিনই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হতো না। এই ধাঁধার একমাত্র সমাধান হলো: স্রষ্টাকে কেউ সৃষ্টি করেনি, এবং তিনি সবসময়ই ছিলেন। এই কথাই বলে মহাগ্রন্থ কোরআন:

আল্লাহ্‌ – তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, অনাদি। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সবই তাঁর। কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের (মানুষের) সামনে ও পেছনে যা-কিছু আছে তিনি তা জানেন। তিনি যা ইচ্ছা করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। আকাশ ও পৃথিবীব্যাপী তাঁর আসন, আর তাদের রক্ষণাবেক্ষণে তিনি ক্লান্ত হন না। তিনি অত্যুচ্চ মহামহিম। – সূরা বাক্বারাহ্‌ (২:২৫৫ – আয়াতুল কুরসী)

প্রশ্ন ৩। আমার কাছে মহাবিশ্ব নিজেই স্রষ্টা। এতে কোনো সমস্যা আছে?

উত্তর: আপনি নিশ্চয়ই বিগ ব্যাং থিওরীতে বিশ্বাস করেন। বিগ ব্যাং থিওরী মতে, এই মহাবিশ্বের একটা শুরু আছে। পৃথিবীর অন্যতম বড় পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং নিজেও তার ওয়েবসাইটে এই সম্পর্কে লিখেছেন:

The conclusion of this lecture is that the universe has not existed forever. Rather, the universe, and time itself, had a beginning in the Big Bang, about 15 billion years ago.  The Beginning of Time, Stephen Hawking

যার শুরু থাকে তার সৃষ্টি হওয়ারও একটা কাল থাকে, আর যে সৃষ্টি হয় – তার অবশ্যই একজন স্রষ্টা থাকে। কাজেই মহাবিশ্ব নিজে কখনই স্রষ্টা হতে পারে না। মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করার জন্য একজন অনন্ত-অসীম, পরম ক্ষমতাশীল স্রষ্টা লাগবে – আর সেই পরম ক্ষমতাশীল স্রষ্টাই হলেন আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা।

অবিশ্বাসীরা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশ ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল? তারপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি ওরা বিশ্বাস করবে না? – সূরা আম্বিয়া (২১:৩০)

References:

1. Does God exist? – Abdur Raheem Green

2. Who is your Lord? – Dr. Bilal Philips

3. Fundamentals of Faith – Dr. Yasir Qadhi

লেখাটি নেওয়া হয়েছে এখান থেকে: https://adnanfaisal.wordpress.com/2013/08/06/who-created-god/ 

Advertisements

6 thoughts on ““সবকিছুই যদি আল্লাহ্‌ তৈরী করে থাকেন তো আল্লাহ্‌কে কে তৈরী করলো?”

  1. এই বিষয়ের উপর কিছুদিন আগে পিউরলি ফিলোসফিকাল একটা বই বের হয়েছে। ”হু ডিজাইনড দ্যা ডিজাইনার”। বইটা পড়ার ইচ্ছা আছে।

  2. পিংব্যাকঃ বায়োমেট্রিকস পদ্ধতিতে আত্মা (সিম) নিবন্ধন | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ নাস্তিকীয় সন্দেহের প্রকৃতি (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

  4. পিংব্যাকঃ একজন মুসলিম ও একজন সংশয়বাদীর মধ্যে ইসলামের সত্যতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা | আমার স্পন্দন

  5. পিংব্যাকঃ পরকালীন জীবনে বিশ্বাসের যৌক্তিকতা (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s