একজন মুসলিমের ভূমিকম্প ভাবনা

Photo credit: flickr[dot]com/photos/waiferx/2658307394/
Photo credit: flickr[dot]com/photos/waiferx/2658307394/
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমি তখন বাংলাদেশের একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। তো, একদিন অফিসে বসে আছি। হঠাৎ করে চেয়ার-টেবিল কেঁপে উঠতে শুরু করল। ভূমিকম্প হচ্ছে। কেউ চুপচাপ বসে আছে। কেউ আল্লাহকে ডাকছে। এরই মধ্যে একটি কথা কানে এল, “Shake it, baby!” ভূমিকম্পের মতো আকস্মিক বিপদের সময়ে আমাদের মনের প্রকৃত অবস্থাটি বেরিয়ে পড়ে। এরকম সঙ্কটাপন্ন সময়েও যদি আল্লাহর নাম স্মরণে না আসে তাহলে বুঝতে হবে যে আমাদের অন্তর মরে গেছে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁকে ভুলে যাওয়ার মতো মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করুন।

***

ভূমিকম্প কেন হয়? উন্মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, “ভূ-অভ্যন্তরে শিলায় পীড়নের জন্য যে শক্তির সঞ্চয় ঘটে, সেই শক্তির হঠাৎ মুক্তি ঘটলে ভূ-পৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূ-ত্বকের কিছু অংশ আন্দোলিত হয়। এরূপ আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প (Earthquake) বলে। কম্পন-তরঙ্গ থেকে যে শক্তির সৃষ্টি হয়, তা ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই তরঙ্গ ভূ-গর্ভের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে উৎপন্ন হয় এবং উৎসস্থল থেকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ভূমিকম্প সাধারণত কয়েক সেকেণ্ড থেকে এক/দুই মিনিট স্থায়ী হয়। মাঝে মাঝে কম্পন এত দূর্বল হয়, তা অনুভব করা যায় না। কিন্তু শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং অসংখ্য প্রাণহানি ঘটে।”

এ তো গেল ভূমিকম্পের বাহ্যিক কারণ। বিজ্ঞান একথাই বলে। বিজ্ঞানের এই ব্যাখ্যাটি ভৌত কার্যকারণের দিক দিয়ে ইসলামের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তবে, বিজ্ঞানের গন্ডি যেখানে শেষ, ধর্মের পদচারণা সেখান থেকেই শুরু। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, ‘শক্তির হঠাৎ মুক্তি’ বা ‘আকস্মিক’ বলে প্রকৃতপক্ষে কিছু নেই, কেননা “পৃথিবীতে অথবা তোমাদের প্রাণের উপর যে মুসিবত দেখা দেয়, তার মধ্যে এমন কোনোটিই নেই, যা সেই সময় থেকে এক কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই, যখন আমি সেই প্রাণসমূহ সৃষ্টিও করিনি। নিশ্চয়ই আল্লাহর পক্ষে এটা অতি সহজ।” [কুরআন, ৫৭:২২]

অতীতে ঘটে যাওয়া কিছু ভূমিকম্পের কারণ আমরা কুরআন থেকে জানতে পারি। যেমন:

“পরিণাম এই হলো যে, তারা ভূমিকম্পে আক্রান্ত হলো এবং তারা নিজ-নিজ বাড়িতে অধঃমুখে পড়ে থাকল। অতঃপর (নবী) সালিহ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল এবং বলতে লাগল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের কাছে আমার প্রতিপালকের বাণী পৌঁছিয়েছিলাম এবং তোমাদের কল্যাণ কামনা করেছিলাম, কিন্তু (আফসোস!) তোমরা কল্যাণকামীদেরকে পছন্দ করো না।” [কুরআন, ৭:৭৮-৭৯]

“অতঃপর তারা ভূমিকম্পে আক্রান্ত হলো এবং তারা নিজেদের বাড়িতে অধঃমুখে পড়ে থাকল। যারা (নবী) শুআইবকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তারা এমন হয়ে গেল, যেন তারা সেখানে কখনোই বসবাস করেনি। যারা শুআইবকে প্রত্যাখ্যান করেছিল শেষ পর্যন্ত তারা ক্ষতিগ্রস্তই হলো। সুতরাং সে (অর্থাৎ নবী শুআইব) তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল এবং বলতে লাগল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের কাছে আমার রব্বের বাণীসমূহ পৌঁছে দিয়েছিলাম এবং তোমাদের কল্যাণ কামনা করেছিলাম। (কিন্তু) যে সম্প্রদায় ছিলো অকৃতজ্ঞ আমি তাদের জন্য কিভাবে আক্ষেপ করি!” [কুরআন, ৭:৯১-৯৩]

কুরআনের এই আয়াতসমূহ থেকে আমরা জানতে পারছি যে, নবী সালিহ ও শুআইব (আলাইহিমাস সালাম)-এর কওমের বিরুদ্ধে আল্লাহর আযাব এসেছিল ভূমিকম্পের মাধ্যমে। অতএব, ভূমিকম্প আল্লাহর আযাবের একটি মাধ্যম হতে পারে।

তবে, প্রতিটি ভূমিকম্পই যে আল্লাহর আযাব তা বলাটা ঠিক হবে না। নবী সালিহ ও শুআইব (আলাইহিমাস সালাম) মানুষের কল্যাণকামী হিসেবে তাঁদের নিজ নিজ কওমের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। সেই দাওয়াত মানুষের মাঝে পৌঁছেছে। এরপর মানুষ জেনে-বুঝে স্বেচ্ছায় ঘৃণাভরে সেই দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছে। তারপরেই কেবল আল্লাহর আযাব ভূমিকম্পের রূপে এসেছে। আমরা মুসলিমরা কি দরদের সাথে ইসলামের প্রতি মানুষকে আহ্বানের এই কাজটি করেছি? সেই দাওয়াতকে মানুষের গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা এবং তারই পরিণতিতে আল্লাহর আযাব নাযিল হওয়া বা না হওয়া তো অনেক পরের কথা। আল্লাহই সবচেয়ে উত্তম জানেন।

আবার, এমনটিও হতে পারে যে, পরকালীন জীবনের প্রতি গাফেল মানুষকে ভূমিকম্পের মাধ্যমে আল্লাহ আবারও তাঁর দিকে ডাকছেন; তাঁর কথা তিনি আমাদেরকে আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সাথে পৃথিবী ধ্বংসের বর্ণনাসমূহের অনেক মিল পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, কুরআনের এই বর্ণনাটির কথাই ধরা যাক:

“হে মানুষ! নিজ প্রতিপালকের ক্রোধকে ভয় করো। জেনে রেখ, কিয়ামতের প্রকম্পন এক সাংঘাতিক জিনিস। যেদিন তোমরা তা দেখতে পাবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী সেই শিশুকে (পর্যন্ত) ভুলে যাবে, যাকে সে দুধ পান করিয়েছে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত ঘটিয়ে ফেলবে। আর মানুষকে তুমি এমন দেখবে, যেন তারা নেশাগ্রস্ত, অথচ তারা নেশাগ্রস্ত নয়; বরং (সেদিন) আল্লাহর শাস্তি হবে অতি কঠোর।” [কুরআন ২২:১-২]

হতে পারে যে, ভূমিকম্পের মাধ্যমে সেই দিনটির কথাই আল্লাহ আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আল্লাহই সবচেয়ে উত্তম জানেন।

***

“আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে কত নিদর্শন রয়েছে, যার উপর দিয়ে তাদের বিচরণ হয়, কিন্তু তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই এমন যে, তারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখলেও তা এভাবে যে, তাঁর সঙ্গে শরীক করে। তবে কি তারা এ বিষয়ের একটুও ভয় রাখে না যে, তাদের উপর আল্লাহর আযাবের কোনো মুসিবত এসে পড়বে অথবা সহসা তাদের উপর তাদের অজ্ঞাতসারে কিয়ামত আপতিত হবে?” [কুরআন, ১২:১০৫-১০৭]

অতএব, “Shake it, baby!” বলার মতো মানুষ সবসময়ই থাকবে। আমরা তাদের কল্যাণ কামনা করব; তাদের হিদায়াতের জন্য দু’আ করব; কিন্তু, তাদের এই অবস্থার জন্য হাহুতাস করে বেড়াব না। তারা তাদের কাজের জন্য দায়ী, আমরা আমাদের কাজের জন্য দায়ী।

তবে, এই ধরণের মানুষরাই আমাদের চারপাশের সবার প্রতিনিধিত্ব করে না। বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী নির্বিশেষে আমাদের চারপাশে অনেক চিন্তাশীল মানুষ আছেন। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের সময়ে মানুষের ক্ষুদ্রতা ও ক্ষমতাহীনতা নিয়ে তারা চিন্তা করেন। গতকাল নেপালে রিখটার স্কেলে ৭.৮ মাত্রার যে তীব্র ভূমিকম্পটি আঘাত হানল, যার প্রভাবে প্রায় গোটা বাংলাদেশও কেঁপে উঠল, তার কিছু পরেই এর কিছু প্রমাণ আমি পেয়েছি। এক্ষেত্রে তিনজন মানুষের তিনটি ফেসবুক স্ট্যাটাস আপডেটকে আমি উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করছি।

নিজেকে আস্তিক বা নাস্তিক নয়, বরং অজ্ঞেয়বাদী (agnostic) বলে পরিচয় দিতেন এরকম একজন ব্যক্তি গতকালকের ভূমিকম্পের পর লিখেছেন:

“Good reminder on the fragility of life!”

তিনি যে দৃষ্টিকোণ থেকেই কথাটুকু বলে থাকুন না কেন, আমি আন্তরিকভাবে দু’আ করি যেন আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন।

অথবা, আমার সাবেক এক সহকর্মীর এই কথাগুলোও ধরা যাক:

“যারা ভূমিকম্পে ভয় পেয়েছেন, Please make best use of this fear! 2012 Movie tar কথা ভাবেন একবার! পরিক্ষার হলে সময় শেষ হবার আগে ঘণ্টা বাজে! আজ আপনি যদি মারা যেতেন কাল থাকতেন কবরে! আপনার BMW আর AC সাথে যাবেনা! এই ঘটনাটা অনুধাবন করে অন্তত নামাজ পরাটা শুরু করে দেন আজ থেকে! বাকি পাপ পরে দূর করেন! শুরু করেন নামাজ দিয়ে! আল্লাহ চাইলে কবর হতে পাড়ে জান্নাতের বাগান! সাভাবিক ধারনায় অনুমান করা যায়, আপনার পরবর্তী জীবন যদি ১০০ বছরও পৃথিবীতে জীবিত অবস্থায় কাটে, কেয়ামতের আগে লক্ষ কোটি বছর কাটার কথা মৃত অবস্থায় কবরে! আপনার দুনিয়ার পরীক্ষার নম্বরে AC থাকবেত? নিজেকে প্রশ্ন করুন & Act accordingly! (Personal Opinion)”

একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তিনি তার উপলব্ধিটুকু যেভাবে তুলে ধরেছেন তাতে আমি অনেক আশাবাদী হয়েছি।

আর শিবলী মেহেদী ভাইয়ের এই কথাগুলো তো উল্লেখ করতেই হচ্ছে:

“সামান্য একটু ভূমিকম্প, তাতেই সকলে যার যার ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে বের হয়ে গেলাম দরজা খোলা রেখেই। আলমারি তালা মারা কিনা? স্বর্ণের গহনাগুলি কোথায়? ক্যাশ টাকাগুলি কোথায়? জমির দলিলগুলি ঠিক আছে তো? জরুরী কাগজপত্র, একাডেমিক সার্টিফিকেট এইসব কিছুর বিন্দু মাত্র মায়া না করে সকলে রাস্তায়। একবার ভেবে দেখুন তো, নি:স্ব অবস্থায় খালি হাতে রাস্তায় কারা থাকে? কিছুক্ষণের জন্য আমরা সকলেই তেমন অবস্থায় রাস্তায় ছিলাম।

রাস্তায় থাকলেও, হয়তো আপনজন সাথেই ছিলো। সামান্য এই ভূমিকম্পেই সম্পদের মায়া ছেড়ে আমরা রাস্তায় ছিলাম। এটা যখন আরো বাড়বে, তখন সম্পর্কের মায়াও ছেড়ে দেবো আমরা। যখন তারচাইতেও আরো বাড়বে তখন যেই মা দুধ খাওয়াচ্ছেন তিনিও তার বাচ্চাকে ছুড়ে ফেলে দেবেন, গর্ভের শিশুকেও বের করে দেবেন।

ভূমিকম্প নিয়ে মজা করার কিছু নাই ভাই। ভূমিকম্পের সময় কে কি আবস্থায় ছিলাম, কে টের পেয়েছে, কে টের পায়নি, চেয়ার টেবিল নড়ছিলো কিনা, ফ্যান দুলছিলো কিনা- এই সব গবেষণা পরে করলেও হবে। আগে করা দরকার তওবা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।”

একজন সংশয়বাদী, ‘সাধারণ মুসলিম’ ও ‘প্র্যাক্টিসিং মুসলিমের’ কথার ধরণে পার্থক্য থাকবে এটিই স্বাভাবিক। তবে, এই তিনজনের মধ্যে একটি বিষয়ে মিল আছে। আর তা হলো, তারা প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াসলি চিন্তা করেছেন। হতে পারে, গতকালকের এই ভূমিকম্পের মাধ্যমেই অনেকে তাদের দয়াময় প্রভু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে চেনার মতো করে চিনতে শুরু করেছেন। কে কখন কিভাবে হিদায়াত পাবেন তা আমরা জানি না। আল্লাহ জানেন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close