ইসলাম কি তলোয়ারের মাধ্যমে প্রসার লাভ করেছে? (অনুবাদ)

উস্তাদ জামাল দিওয়ান-এর একটি লেখা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে অনুদিত।   

Photo credit: tr[dot]wikipedia[dot]org/wiki/Kelime-i_%C5%9Fehadet#/media/File:Kuffi_Quran.jpg
Photo credit: tr[dot]wikipedia[dot]org/wiki/Kelime-i_%C5%9Fehadet#/media/File:Kuffi_Quran.jpg
ইসলাম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে, বা ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে আমরা অনেকেই এই প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়েছি: “ইসলাম কি তলোয়ারের মাধ্যমে প্রসার লাভ করেছে?”

এটি ইসলাম সম্পর্কে বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটি। কোনো বদ মতলব নিয়ে নয়, জানতে চাওয়ার আগ্রহ থেকেই অনেকে এই প্রশ্নটি করে থাকেন। কেউ আবার ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়েই এই প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেন।

একাধিক উপায়ে মানুষের করা এই প্রশ্নটির উত্তর আমরা দিতে পারি। যেমন, আমরা বলতে পারি যে, “না, ইসলাম তলোয়ারের মাধ্যমে প্রসার লাভ করেনি”। বেশিরভাগ সময়ে আমরা এই উত্তরটিই দিয়ে থাকি। এক্ষেত্রে আমরা দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায় (অর্থাৎ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সংলগ্ন এলাকায়) ইসলাম প্রসারের ইতিহাসকে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকি। কোনো যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, বরং আরব থেকে সেখানে ব্যবসা করতে যাওয়া বণিকদের সততা ও চারিত্রিক উৎকর্ষতায় মুগ্ধ হয়ে সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেন। অতএব, কেবলমাত্র ব্যক্তির ঈমান আনার দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে উত্তরটি তো ঠিকই আছে।

অন্যদিকে, কোনো ইসলামবিদ্বেষীকে যদি এই প্রশ্নটি করা হয় তাহলে তিনি খুব সম্ভবত এভাবেই এর উত্তর দেবেন, “হ্যাঁ, তলোয়ারের মাধ্যমেই তো ইসলামের প্রসার ঘটেছে। জোরজবরদস্তি করে মানুষকে ধর্মান্তরিত করার কথা তো ওদের ধর্মের মধ্যেই আছে। যুগের পর যুগ ধরে ওরা তো এভাবেই ওদের ধর্মের অনুসারীদের সংখ্যা বাড়িয়েছে।” একটু খেয়াল করলে বুঝবেন যে, ব্যক্তির ঈমান আনা নয়, বরং ইসলামের দ্বারা অনুপ্রাণিত সাম্রাজ্যের আচরণের দিকেই এখানে আক্রমণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

তাহলে, “ইসলাম কি তলোয়ারের মাধ্যমে প্রসার লাভ করেছে?” — এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর কোনটি? আসুন, সেটিই জানার চেষ্টা করি।

ইতিহাসের ছাত্র মাত্রই জানেন যে, আমাদের প্রিয় নবীর (ﷺ) মৃত্যুর পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলামের অনুশাসন দ্বারা শাসিত রাষ্ট্রের সীমানা বিস্তীর্ন এলাকা জুড়ে বিস্তৃতি লাভ করছিল। মাত্র এক শতাব্দীর মধ্যেই আরবের সীমানা ছাড়িয়ে উত্তর আফ্রিকার একাংশ, ভূমধ্য সাগর, মধ্য এশিয়া, এমনকি স্পেন পর্যন্ত এই রাষ্ট্রের শাসনাধীনে চলে আসে। নিচের মানচিত্রটিতে ইসলামের প্রথম শতাব্দীর শেষে ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমারেখা চিত্রিত করা হয়েছে। এখানে গাঢ় লাল রঙে চিত্রিত এলাকাগুলো আমাদের প্রিয় নবীর (ﷺ) জীবদ্দশাতেই ইসলামী সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। লাল রঙে চিত্রিত এলাকাগুলো খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে ইসলামী সাম্রাজ্যের অধীনে আসে, আর হলুদ রঙে চিত্রিত এলাকাগুলো আসে উমাইয়া শাসনামলে।

Expansion of the Islamic Empire in the first century of Islam

এদিক দিয়ে চিন্তা করলে বলা যেতে পারে যে, ইসলাম তলোয়ারের মাধ্যমে প্রসার লাভ করেছিল। তবে, এর মানে এই নয় যে, একটি ধর্ম হিসেবে ইসলাম তলোয়ারের মাধ্যমে প্রসার লাভ করেছে। বরং, এর মানে হলো, ইসলামের দ্বারা অনুপ্রাণিত বিশাল সাম্রাজ্যটি তলোয়ারের মাধ্যমে নতুন নতুন ভূখন্ডকে তার শাসনাধীনে এনেছে। সেই সাম্রাজ্যে বসবাসরত প্রতিটি নাগরিক ইসলাম ধর্মের ওপর ঈমান আনেনি। তলোয়ারের মাধ্যমে মানুষকে ঈমান আনতে বাধ্য করা হয়নি।

এরই একটি উদাহরণ হিসেবে তৎকালীন ইরাকের কথাই ধরা যাক। প্রিয় নবীর (ﷺ) মৃত্যুর প্রায় ২৫ বছর পর থেকে নিয়ে পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত ইরাক ও এর সংলগ্ন এলাকাতেই ছিলো ইসলামী সাম্রাজ্যের রাজধানী। প্রফেসর শার্মান জ্যাকসন তাঁর রচিত একটি প্রবন্ধে লিখেছেন:

“১৫০ হিজরিতে (৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ) ইরাক ও এর সংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত মুসলিমদের সংখ্যা ছিলো সেখানকার মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ১৫%-২০%। ২৫০ হিজরিতে (৮৬৪ খ্রিস্টাব্দ) সেখানকার মোট জনসংখ্যার ৩৫%-৪০% ছিলো মুসলিম। প্রথমবারের মতো সেখানকার জনসংখ্যার ৫০%-এর অধিক মুসলিম ছিলো ৩০০ হিজরির কাছাকাছি সময়ে। আর ৩৫০ হিজরির দিকে (৯৬১ খ্রিস্টাব্দ) স্থানীয় মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ৭৫% ছিলো মুসলিম।”

আজকালকার বেশিরভাগ মুসলিমই সেই সময়ের এই চমকপ্রদ পরিসংখ্যানের সাথে পরিচিত নন। এই পরিসংখ্যানই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দিচ্ছে যে, তলোয়ারের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটেনি। ইসলামী সাম্রাজ্যের রাজধানী ও এর সংলগ্ন এলাকার অবস্থাই যদি এমন হয়ে থাকে তাহলে গোটা সাম্রাজ্যের বাদবাকী অঞ্চলের অবস্থা কেমন ছিলো তা অনুমান করতে আমাদের খুব বেশি কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

অতএব, এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে, তখনকার যুগের স্বাভাবিক ও স্বীকৃত প্রথা অনুযায়ী ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রসার তলোয়ারের মাধ্যমেই হয়েছে, তবে ইসলাম ধর্মের প্রসার কখনোই তলোয়ারের মাধ্যমে হয়নি।

ইংরেজিতে মূল লেখাটি পড়ুন এখানে: http://www.safacenter.org/home/did-islam-spread-by-the-sword/

Advertisements

1 thought on “ইসলাম কি তলোয়ারের মাধ্যমে প্রসার লাভ করেছে? (অনুবাদ)

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে।

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close