সাগরে ভাসমান মানবতা ও একটি হাদিস কুদসি

1 - Migrants rescued at Aceh, Indonesia

সদ্য রিলিজ পাওয়া হলিউড মুভি “The Slave Story”-এর একটি পোস্টার।

উপরের ছবিটি দেখে আপনি এমনটি ভেবেছিলেন কি? না, ছবিটি কোনো মুভির পোস্টার নয়। এটি গত ১৫ই মে তারিখে তোলা একটি ছবি। এদের মধ্যে কেউ হয়ত রোহিঙ্গা, কেউ হয়ত বাংলাদেশী। মাসখানেক ধরে সাগরে ভাসার পর এরা ডাঙার দেখাটুকু অন্তত পেয়েছেন। ভবিষ্যৎ অজানা হলেও ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে এদের সাময়িক আশ্রয় মিলেছে। বাংলাদেশী হলে না হয় বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু, যারা রোহিঙ্গা তাদের অবস্থা কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা আপাতত জানি না।

সাগরে এরা যে খুব মাস্তির ভিতরে ছিলেন তা নয়। তাদের এই দীর্ঘ যাত্রাটি ছিলো খুবই কষ্টকর। যাত্রাপথে এদের সহযাত্রী কাউকে হয়ত খুন করে ফেলা হয়েছে। কেউ হয়ত জখম হয়েছেন। অথবা, অনাহারে কারও হয়ত এমন সঙ্গিন দশা হয়েছে: 

2 - A sick refugee rescued

তবে, সাগরপথে যারা এই পথে পাড়ি জমিয়েছেন তাদের মধ্যে এদের চাইতে হতভাগা মানুষও আছেন। একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, আনুমানিক ছয় হাজার মানুষ এখনও সাগরে ভাসছেন। ডাঙায় উঠে আসার জন্য তারা হয়ত এভাবে আকুতি জানাচ্ছেন:

3 - Migrants on boat

থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এই অসহায় মানুষদের নিয়ে পিংপং খেলছে। এদেরকে বহনকারী ট্রলার এই তিনটি দেশের কোনো একটি দেশের জলসীমায় ঢুকলে সেই দেশের নৌবাহিনী তাদেরকে কিছু মানবিক সহায়তা দিয়ে অন্য দেশের রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছে। কোনো দেশই এদের দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না। অভিবাসী বা শরণার্থী যাই বলি না কেন – সাগরে ভাসমান এই মানুষগুলো প্রায় সবাই মুসলিম। এদের গন্তব্য মুসলিম অধ্যুষিত মালয়েশিয়া। মানবিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় নিয়ে মালয়েশিয়ার উচিৎ ছিলো এদেরকে তীরে ভিড়তে দেওয়া। অভিবাসন আইনের প্রয়োগ এর পরেও করা যেত। হাজার হাজার মানুষ যেখানে খাবার, পানি ও চিকিৎসার অভাবে ধুকছে সেখানে তাদেরকে ‘হাইকোর্ট দেখানো’ চরম অমানবিকতা। মুসলিম উম্মাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মালয়েশিয়ার সরকারকে আরও লজ্জায় নাই বা ফেললাম। মুসলিম অধ্যুষিত ইন্দোনেশিয়ার আচরণও একই রকম। এই দুই দেশ সাগরে ভাসমান কোনো শরণার্থীকে নতুন করে নিতে রাজি হচ্ছে না। মুসলিম উম্মাহ হিসেবে এ এক চরম লজ্জার সময়।

ট্রলারে করে রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশীরা যে মালয়েশিয়াতে যাচ্ছেন এটি কোনো নতুন খবর নয়। গত অনেক বছর ধরে হাজার হাজার মানুষ এভাবে মালয়েশিয়ায় গেছেন। এদেরকে মালয়েশিয়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য থাইল্যান্ডকে একটি ট্র্যানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যাই হোক, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই বিষয়ে থাই সরকারের ‘ঘুম ভেঙেছে’, তাও আবার জঙ্গলের মধ্যে প্রায় জনা তিরিশেক মানুষের এরকম একটি গণকবর আবিষ্কারের পর:

4. Mass graves of migrants at Songkhla, Thailand

নিচের চিত্রটি থেকে মানুষ পাচারের এই রুটটি সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যাবে:

5. Rohingya & Bangladeshi trafficking routes

এখানে দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বার্মার রাখাইন প্রদেশ থেকে পাচারের জন্য অপেক্ষমান মানুষকে প্রথমে ছোট নৌকা বা ট্রলারে তোলা হয়, এরপর নিয়ে যাওয়া হয় সাগরে অপেক্ষমান জাহাজে বা বড় ট্রলারে। বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের মধ্য দিয়ে নিয়ে তাদেরকে পৌঁছে দেওয়া হয় দক্ষিণ থাইল্যান্ডের রানোং এবং সংলগ্ন এলাকায়। সেখান থেকে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ক্লান্তিকর পথ অতিক্রম করিয়ে তাদেরকে পৌঁছে দেওয়া হয় উত্তর মালয়েশিয়াতে। কিন্তু, সম্প্রতি থাইল্যান্ডে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হওয়ায় এদেরকে সেখানে নামানো যাচ্ছে না। বিক্ষিপ্তভাবে কোনো ট্রলার যাচ্ছে থাইল্যান্ডের দিকে, কোনোটি যাচ্ছে মালয়েশিয়ার লঙ্কায়ি-র দিকে, আবার কোনোটি যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ-এর দিকে। সাগরে ভাসতে থাকা প্রায় আট হাজার মানুষের মধ্যে হাজার দুয়েক মানুষের আশ্রয় মিলেছে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ডিটেনশন সেন্টারে। কিন্তু, সমুদ্র পথে যখন হাজারে হাজারে লোক আসতে শুরু করল তখনই এই দুই দেশ এদের জন্য সব রাস্তা বন্ধ করে দিলো। থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক এই ধরপাকড় শুরু না হলে এরা হয়ত স্বাভাবিক রুট ধরে দক্ষিণ থাইল্যান্ডের জঙ্গলের রাস্তা ধরে মালয়েশিয়ায় ঢোকার চেষ্টা করত। পথিমধ্যে কেউ হয়ত মারা যেত, আর অনেকেই পৌঁছে যেত তাদের স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়াতে। তবে, যাত্রাটি যে অমানবিক রকম কষ্টকর হতো তাতে কোনো সন্দেহ ছিলো না

সাগরে চলমান এই মানবিক সঙ্কট নিয়ে আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।    

সাগর পাড়ি দেওয়া এই মানুষদের মধ্যে যারা বাংলাদেশী তারা হলেন অভিবাসী। ‘উন্নত ভবিষ্যতের আশায়’ এরা এই ভয়ঙ্কর যাত্রায় শামিল হয়েছেন। কিন্তু, রোহিঙ্গাদের এই ‘ভবিষ্যৎ বিলাসিতার’ সুযোগটুকুও নেই। বার্মায় তাদের কোনো ভোটাধিকার নেই। বার্মিজ সরকার এদেরকে সেই দেশের বৈধ নাগরিক বলে স্বীকার করে না। এমনকি, রোহিঙ্গা বলে যে একটি জাতিগোষ্ঠী আছে সেটিও বার্মিজ সরকার স্বীকার করতে চাইছে না। কেবল সরকার নয়, রাখাইন প্রদেশের সাধারণ মানুষও রোহিঙ্গাদের প্রতি বিরূপভাবাপন্ন। ধর্মের নামে অধর্ম হলে এমনটিই হয়। বৌদ্ধ ধর্মকে এতদিন ধরে আমরা একটি অহিংস ধর্ম বলে জেনে এসেছি। কিন্তু, বার্মাতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরাই সাধারণ মানুষকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য উষ্কানি দিচ্ছেন। সেখানকার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের এরকমই একটি মিছিলের ছবি দেখুন:

6. Buddhist monks at anti-Rohingya protest

তবে, মনে রাখতে হবে যে, সব বৌদ্ধ ভিক্ষু এরকম অসহিষ্ণু নন। তাছাড়া, অন্যের ধর্ম সম্পর্কে কটুক্তি করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে আরও জানতে চাইলে ক্লিক করুন এখানে এবং এখানে। সেই সাথে, মাত্র ১১ মিনিট দীর্ঘ এই প্রামাণ্যচিত্রটি দেখতে ভুলবেন না:

           

রোহিঙ্গারা শখ করে দেশান্তরী হচ্ছেন না। দেশ ত্যাগ করা ছাড়া তাদের সামনে উপায় আর কীই বা আছে? যতদিন পর্যন্ত এই সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধান হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত তাদের এই দেশান্তরের কাফেলা চলতে থাকবে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তাই, রোহিঙ্গা সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দেশান্তরী রোহিঙ্গাদেরকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিৎ। নিকট প্রতিবেশী বাংলাদেশ প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গাকে জায়গা দিয়েছে। কিন্তু, অনেক বছর ধরে নতুন করে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। বৌদ্ধ অধ্যুষিত থাইল্যান্ড এত সংখ্যক মুসলিমকে তাদের দেশে জায়গা দিতে ইচ্ছুক নয়। আর, অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধশালী মুসলিম অধ্যুষিত মালয়েশিয়াও এদের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নয়। মুসলিম অধ্যুষিত ইন্দোনেশিয়া ঘটনাচক্রে এই সংকটের মধ্যে পড়ে গেছে। কিন্তু, তারাও যে এদেরকে নিতে বিব্রতবোধ করছে তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। তাহলে, বার্মার নির্যাতিত ও নিপীড়িত দশ থেকে পনের লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমরা যাবে কোথায়? তারা কি বার্মাতে অপমানের ঘানি টেনে হলেও থাকতে বাধ্য হবে? নাকি, তারা মানুষ পাচারকারী দালালদের মুনাফার মাধ্যম হবে? নাকি, সাগরের বুকে তারা দিশাহীনভাবে ভাসতে থাকবে? মুসলিম উম্মাহ আজ কোথায়? শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উম্মত বলে পরিচয় দিতে সামষ্টিকভাবে আমাদের কি একটুও লজ্জা করে না?

***

আমরা নিজেদেরকে যে নবীর উম্মত বলে পরিচয় দিই সেই নবীর (ﷺ) একটি হাদিস বর্ণনা করে আজকের মতো শেষ করছি।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন: হে বনি আদম আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, তুমি আমাকে দেখনি, সে বলবে: হে আল্লাহ আপনাকে কিভাবে দেখব, অথচ আপনি দু’জাহানের রব? তিনি বলবেন: তুমি জান না আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল তুমি তাকে দেখনি, তুমি জান না যদি তাকে দেখতে আমাকে তার নিকট পেতে? হে বনি আদম আমি তোমার নিকট খাদ্য চেয়েছিলাম তুমি আমাকে খাদ্য দাওনি, সে বলবে: হে আমার রব, আমি কিভাবে আপনাকে খাদ্য দিব অথচ আপনি দু’জাহানের রব? তিনি বলবেন: তুমি জান না আমার অমুক বান্দা তোমার নিকট খাদ্য চেয়েছিল তুমি তাকে খাদ্য দাওনি, তুমি জান না যদি তাকে খাদ্য দিতে তা আমার নিকট অবশ্যই পেতে। হে বনি আদম, আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম তুমি আমাকে পানি দাওনি, সে বলবে: হে আমার রব কিভাবে আমি আপনাকে পানি দেব অথচ আপনি দু’জাহানের রব? তিনি বলবেন: আমার অমুক বান্দা তোমার নিকট পানি চেয়েছিল তুমি তাকে পানি দাওনি, মনে রেখ যদি তাকে পানি দিতে তা আমার নিকট অবশ্যই পেতে”। [মুসলিম]

হাশরের ময়দানে আল্লাহ যদি আমাদেরকে প্রশ্ন করেন, “হে আদম সন্তান, আমার কিছু অসহায় বান্দা অসুখের তীব্র যন্ত্রণায় সাগরের মধ্যে ছটফট করছিলো। তুমি তাদেরকে কেন দেখনি?” তখন আমরা কী জবাব দেব? আল্লাহ যদি আমাদেরকে প্রশ্ন করেন, “হে আদম সন্তান, আমার কিছু বান্দা না খেতে পেরে, খাবারের অভাবে, সাগরের মধ্যে ধুকে ধুকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। তুমি তাদেরকে কেন দেখনি?” আমরা কী জবাব দেব? আল্লাহ যদি আমাদেরকে প্রশ্ন করেন, “হে আদম সন্তান, আমার কিছু বান্দা পানির অভাবে সাগরের বুকে তীব্র যন্ত্রণা ভোগ করেছে, ছটফট করেছে। তুমি তাদেরকে কেন দেখনি?” আমরা কী জবাব দেব? হে মুসলিম অধ্যুষিত দেশের নেতারা, আপনারা কী জবাব দেবেন? কোনো জবাব আছে কি?

————————————————–

সংযোজন [২০ মে ২০১৫, রাত ১১টা ৫৭ মিনিট (মালয়েশিয়া সময়)]:  

মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় আজ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একটি বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। বৈঠক শেষে জানানো হয়েছে যে, সমুদ্রে নৌকায় করে ভাসছে এরকম প্রায় সাত হাজার অভিবাসন প্রত্যাশীকে সাময়িক আশ্রয় দিতে রাজি হয়েছে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া। তিনটি দেশই অভিবাসীদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক সহায়তায় আগামী এক বছরের মধ্যে তারা অন্য কোনো দেশে তাদের আবাস খুঁজে নিতে পারে। [সূত্র: বিবিসি বাংলা]  

Advertisements
%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close