রাস্তায় চলাফেরার সময় এই দশটি সতর্কতামূলক পয়েন্ট মেনে চলুন

Photo credit: flickr[dot]com/photos/dwrose/3659485835

Photo credit: flickr[dot]com/photos/dwrose/3659485835

এই প্রবন্ধের শিরোনামটি আমাদের সবার কাছে হয়ত বেশ পরিচিত। যদি তাই হয় তাহলে আপনি একজন সচেতন মানুষ, কারণ মিডিয়াতে বিজ্ঞাপন অথবা রাস্তায় সচেতনতামূলক বিলবোর্ডে আমরা এ ব্যপারটি নিয়ে অনেক প্রচারনা লক্ষ্য করে থাকি। তা সত্ত্বেও ইদানিং মাঝে মাঝেই আমরা শুনে থাকি অনাকাঙ্খিত কিছু দুর্ঘটনার খবর, বিশেষ করে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম স্থানে। বাংলাদেশে ঢাকার শাহবাগ এলাকা, চট্টগ্রামের জিইসি মোড়, খুলনার নিউমার্কেট এরকম দেশের বিভিন্ন ব্যস্ত জায়গা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য উল্লেখ্য। তবে শহরের ফাঁকা বা ভিআইপি রাস্তাগুলোও কিন্তু পথচারীদের জন্য দুর্ঘটনা থেকে নিরাপদ নয়, বরং যে কোনো রাস্তাতেই যখন-তখন সড়ক দুর্ঘটনার মতো ঘটনা ঘটে যেতে পারে; Discovery Channel-এর গবেষণা অনুযায়ী প্রতিবছর বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনায় সারা বিশ্বে ১২ লাখ মানুষ মারা যান এবং ৫ কোটি মানুষ আহত হন, তাই আমাদের সব সময় সতর্ক থাকাটা ভাল।

বস্তুত, আমি নিজে একবার ঠিকঠাকভাবে রাস্তা পার হতে গিয়েও আর একটুর জন্য রংসাইড দিয়ে আসা মোটরবাইকের ধাক্কা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পাই, আলহামদুলিল্লাহ। সড়ক নিরাপত্তার ব্যাপারে আমি কোনো বিশেষজ্ঞ নই, তবে অল্প কিছু স্টাডি আর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের সতর্কতার জন্য দশটি ব্যাপার এখানে মনে করিয়ে দিলাম, যা আমাদের সবার জন্য সহায়ক হবে, ইনশাআল্লাহ।

১. (Prayer) দুআ করুন: প্রত্যেকটি বৈধ কাজ করার আগে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নাম নিয়ে শুরু করুন। হিসনুল মুসলিম থেকে কিছু দুআ শেয়ার করলাম। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) থেকে এক হাদীসে এসেছে “বাসা থেকে বের হওয়ার সময় যদি কেউ এই দুআটি পড়ে বের হয়; তাহলে আল্লাহ সারাদিন ওই বান্দাকে তাঁর হেফাজতের মধ্যে রাখেন” —

بِسْمِ اللَّهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ

অর্থ: “আল্লাহর নামে শুরু, আমি আল্লাহর উপর ভরসা করলাম, এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া আর কোনো ক্ষমতা এবং শক্তি নেই” (আবু দাউদ)

গাড়ীতে উঠে এই মাসনুন দুয়াটি পড়ুন:

بِسْمِ اللّهِ ، الْحَمْد’ للّهِ ، سُبْحانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ

অর্থ: “আল্লাহর নামে শুরু। যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই। পবিত্রতা ঘোষণা করছি সেই সত্ত্বার, যিনি এইসব কিছুকে আমাদের নিয়ন্ত্রণে এনে দিয়েছেন। অন্যথায় আমরা এসব আয়ত্বে আনতে পারতাম না। আর নিশ্চয়ই আমরা সকলে মহান প্রভুর দিকে প্রত্যার্বনকারী।”

২. (Foot Over Bridge) ফুট-ওভার ব্রীজ ব্যবহার করুন: প্রথমেই বলে নেওয়া উচিৎ যে, ঢাকাতে প্রচুর ফুটওভার ব্রীজ আছে, সুতরাং রাস্তা পার হওয়ার জন্য অবশ্যই আমারা এগুলো ব্যবহার করব। এতে সবরকম দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে; তবে অনেকে এসব ফুটওভার ব্রীজ ব্যবহার করতে ভয় পান, বিশেষ করে রাতে ছিনতাইকারীর উৎপাত এড়ানোর জন্য। এক্ষেত্রে আমরা “মার্শাল আর্ট” শিখে ফেলতে পারি; তা আমাদের আত্মরক্ষার জন্য মোটামুটি ভালই কাজে দেবে, ইনশা আল্লাহ।

৩. (Checking) রাস্তার দুইপাশে খেয়াল করুন: সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে পুরনো সেই ফর্মুলা – One way অথবা Two Way যে ধরনের রাস্তাই হোক না কেন রাস্তার উভয় পাশে দুই থেকে তিন বার ভাল করে দেখে নেওয়া। আর আপনি যখন দেখবেন রাস্তা ফাঁকা এবং যানবাহন কম তখন স্বাচ্ছন্দ্যে রাস্তা পার হয়ে যান জেব্রা ক্রসিং অথবা নির্দিষ্ট পারাপারের জায়গা দিয়ে।

চার রাস্তা অথবা সাত রাস্তার মোড় – এসব জায়গা পারাপারের সময় নিজেকে আরও বেশী সচেতন রাখুন। সিগনাল ও গাড়ীর হর্ন-এর দিকে ভাল করে খেয়াল করুন।

৪. (Signals) ট্রাফিক সিগনাল মেনে চলুন: লাল, হলুদ দেখলেই কেন জানি গাড়িচালকদের তা মানতে মানা, আর সবুজ দেখলেতো কথাই নেই, গাড়ি যত স্পীডে চালানো যায় পরের সিগনাল এড়ানোর জন্য! পথচারী এবং গাড়িচালক উভয়েরই এই সিগনালগুলো মেনে চলা উচিৎ। শুধু তাই নয়, রাস্তায় এছাড়াও বিভিন্ন দিকনির্দেশনা/চিহ্ন থাকে যেমন – দাঁড়ানোর চিহ্ন (stop signs), এক-মুখো চিহ্ন (one-way signs), গতিসীমা চিহ্ন (speed limit signs) – এগুলো সম্মন্ধে আমাদের ধারণা রাখা উচিৎ। এরজন্য আপনি প্রোঅ্যাকটিভলি কোনো ড্রাইভিং স্কুলে দশ মিনিট অবস্থান করলেই একটা সুন্দর ধারণা পেয়ে যাবেন। তবে এক্ষেত্রে গাড়ি চালকদের উদ্দেশ্যে আমি বলব, রাস্তার পথচারীদের উপর একটু সদয় হন, কারণ ওদের গায়ে তো আর ইঞ্জিন লাগানো নেই!

৫. (Distractions) প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে চলুন: পপুলার “হেডফোন কালচার” থেকে আমাদের দূরে থাকা উচিত অন্ততপক্ষে রাস্তা পার হওয়ার সময়। তবে হেডফোন দিয়ে অন্য সময়গুলোতে কুরআন তেলাওয়াত (Quran Audio Website) বা বিভিন্ন ইসলামিক লেকচার শুনতে পারি। তাছাড়া রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা, অন্যমনস্ক হওয়া, বিলবোর্ডের দিকে এবং সুন্দরী মেয়েদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকা, খাওয়া-দাওয়া করা, সাইডটক করা ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে চলা উচিৎ।

৬. (Eye Contact) চোখাচোখির চেষ্টা করুন: পথচারী এবং গাড়ীর চালকের মধ্যে আই কন্টাক্ট খুব জরুরী। অনেক সময় আমরা এই কাজটি না করেই রাস্তা পার হতে গিয়ে ঝামেলা করে ফেলি। এক্ষেত্রে সবসময় নিজের কাজের উপরই নির্ভর করুন, চালকের ব্যবহারের উপর ভরসা করবেন না, মানে “চালক আপনাকে নিশ্চয়ই দেখেছে” এমনটি ভাববেন না। তবে চালক যদি আপনার দিকে তাকিয়ে হাসেন অথবা মাথা নেড়ে সম্মতি দেন তাহলে তা গ্রহণ করে রাস্তা পার হয়ে যান, অন্যথায় রিস্কে না গিয়ে কয়েক সেকেন্ড পরেই রাস্তা পার হোন, আর বাকবিতণ্ডা এড়িয়ে চলুন।

৭. (Stay Right & Use Foot Path) রাস্তার ডানপাশ অথবা ফুটপাথ দিয়ে হাটুন: রাস্তার ডান পাশ দিয়ে অথবা যানবাহনের বিপরীতে হাঁটুন, এতে অপর পাশ থেকে আসা গাড়িগুলোকে আপনি দেখতে পারবেন এবং আপনার পেছেন দিকে কোনো গাড়ি থাকবে না; ‘তাও সতর্ক থাকুন’। রাস্তা পার হওয়ার পর হাঁটার জন্য সবচেয়ে ভাল হয় রাস্তার দুই ধারের ফুটপাথ ব্যবহার করা। শিশুদের নিয়ে রাস্তা পারাপার হওয়ার সময় এই ব্যাপারগুলো বিশেষভাবে খেয়াল রাখুন। রাস্তা পারাপারে অন্ধ, শিশু, বৃদ্ধ ও মহিলাদের সাহায্য করুন, মনে রাখবেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন – প্রতিটি ভাল কাজই হচ্ছে সাদাকাহ” – [আবু দাউদ, ৪৯৪৭]

৮. (Reflective Clothing After Dark) প্রতিফলিত এবং দৃশ্যমান জামা পরুন: গাড়িচালকেরা কিন্তু রাতে পথচারীদের এবং ভোরের প্রাতঃভ্রমনকারীদের ঠিকভাবে খেয়াল করেন না। তাই রাতের সময়গুলোতে আমরা হালকা রঙের জামা এবং সকালে গাঁড় রঙের জামা পড়তে পারি, এর ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক কমে যাবে। পাশাপাশি, রাস্তায় চলাচলের সময় আমাদেরকে সচেতনভাবে দৃশ্যমান থাকতে হবে, আর এর জন্য যেখানে আলো কম আছে সেখান দিয়ে হাঁটা যাবে না।

বেঁকে যাওয়া রাস্তা পার হওয়ার সময় বিশেষ করে লক্ষ্য রাখুন গাড়ীর হেডলাইট জ্বলছে কিনা অথবা হর্ন দিচ্ছে কিনা, কারণ এক্ষেত্রে চালক আপানাকে দেখতে পাচ্ছেন না, তাই আপনাকেই ব্যাপারটা খেয়াল করতে হবে। এবং যখন বাস বা ট্রাক-এর সামনে রাস্তা পার হবেন তখন ১০ থেকে ১৫ ফুট দূরে দিয়ে রাস্তা পার হোন যাতে চালক আপনাকে দেখতে পারে।

৯. (Track Vehicles) জরুরী এবং দ্রুত চলা গাড়ী থেকে সাবধান থাকুন: Speedy Car অথবা Ambulance যখন রাস্তা দিয়ে যায় তখন তার সামনে দিয়ে দৌড় দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা না করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে যায়। অবশ্য দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের গাড়ীবহর যাওয়ার সময়ও এই ব্যপারটা খেয়াল রাখা উচিত। আজকাল আবার অনেকে “Fast & The Furious” হওয়ার চেষ্টায় রাস্তায় যখন গাড়ি চালান তখন সবকিছু ভুলে যান। অতএব, অপেক্ষা করুন যতক্ষণ পর্যন্ত সবগুলো গাড়ী চলে না যায়, তারপর রাস্তা পার হওয়া শুরু করুন।

১০. (Rail Road) সড়কের মাঝের রেলপথগুলো সাবধানে পার হোন: শহরের মধ্যে অবস্থিত রেলপথগুলো পারাপার হওয়ার সময় রেলক্রসিং-এ গেইট বন্ধ করে দিলে আর রাস্তা পার হওয়া যাবে না। তাছাড়াও রেলক্রসিং-এ গেইট না পড়লেও রেলপথ দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় খেয়াল রাখা দরকার, কারণ অনেক সময় গেইটম্যানদের ট্রেন আসার খবর পাওয়ার ব্যাপারটা উপেক্ষা করে ওই সময় ঘুমিয়ে থাকতে দেখা যায়; অবশ্য যথাযথ কতৃপক্ষের কার্যক্রম ইদানিং বেশ লক্ষ্যণীয়।

ব্যাপারগুলো আপনাদের কাজে লাগবে ইনশা আল্লাহ, সুতরাং লেখাটি পড়া হলে প্রিন্ট কপি অথবা সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনার পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের সাথে রিমাইন্ডার হিসেবে অবশ্যই শেয়ার করুন।

ধন্যবাদ লেখাটি পড়ার জন্য।

কৃতজ্ঞতা: 
Street Safety Rules: http://www.ehow.com/list_6543393_street-safety-rules.html
Road Safety Rules for Pedestrians: http://www.ehow.com/way_5167627_road-safety-rules-pedestrians.html

Advertisements

3 thoughts on “রাস্তায় চলাফেরার সময় এই দশটি সতর্কতামূলক পয়েন্ট মেনে চলুন

  1. Alignment of this Ayat is not correct. Please correct this.
    بِسْمِ اللّهِ ، الْحَمْد’ للّهِ ، سُبْحانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s