শুধু সমস্যা নিয়ে যেন বন্দি না-থাকি

ইয়ামামাহ্‌র যুদ্ধে প্রায় সত্তরজন কুর’আনের হাফিয শহিদ হন। যুদ্ধটি হয়েছিল মিথ্যাবাদী মুসাইলামাহ্‌র সঙ্গে। সে নিজেকে নাবি বলে দাবি করেছিল। নাবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর এমন অনেকেই ভণ্ড নাবি হওয়ার দাবি করেছিল। অনেকে আবার নাবির জীবদ্দশায় উপর দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেও ভেতরে ভেতরে ছিল প্রচণ্ড ইসলামবিদ্বেষী। এবং নাবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর তাদের এই বিদ্বেষ মূর্ত হয়ে ওঠে। মুসলিম উম্মাহ্‌র প্রথম খালীফাহ আবু বাক্‌র (আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হন) এদেরকে কঠোরভাবে দমন করেন। এবং তা করতে গিয়ে তাঁকে বিভিন্ন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়। এমনই একটি লড়াই ছিল ইয়ামামাহ্‌র যুদ্ধ।

এই যুদ্ধে এত বিপুল সংখ্যক কুর’আনের হাফিয শহিদ হওয়ার ঘটনাটা উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর মধ্যে এক সতর্কবার্তা জাগিয়ে তোলে। তিনি তাঁর দূরদৃষ্টি বলে বুঝতে পারেন যে, ভবিষ্যতে ইসলামের প্রসার ও প্রচারে, কিংবা ইসলামবিদ্বেষীদের অপচেষ্টা রুখতে যেয়ে এরকম আরও অনেক লড়াইয়ের আশঙ্কা আছে। এবং তাতে ভবিষ্যতে আরও অনেক কুর’আনের হাফিয শহিদ হতে পারেন। এভাবে করে কুর’আনের হাফিযগণ শহিদ হতে থাকলে কুর’আন সংরক্ষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সেই বিপদ আঁচ করতে পেরে তিনি খালীফাহ আবু বাক্‌রকে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব জানান। আর সেটা হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় এবং বিভিন্ন হাফিযদের অন্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গোটা কুর’আনকে এক মলাটে বন্দি করা।

সাহাবি উমারের (আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হন) পরামর্শটিকে আমরা যদি একটু ভিন্ন চোখে দেখি তাহলে দেখব যে, তিনি শুধু সমস্যাটাই চোখের সামনে নিয়ে আসেননি, বরং সমস্যা সমাধানের জন্য একটি অনুপম উপায়ও প্রস্তাব করেছেন। চাইলে এখান থেকে বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকুরিরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একটা বিজনেসের মূলনীতি আহরণ করতে পারেন: শুধু সমস্যা খুঁজে বের না করে সমাধানেরও রাস্তা বের করা।

Image credit: Chris Potter, via flickr[dot]com/photos/86530412@N02/8231156853

Image credit: Chris Potter, via flickr[dot]com/photos/86530412@N02/8231156853

বর্তমানে অনলাইনে আমরা যারা ইসলাম নিয়ে লেখালেখি করি, আমরা প্রায়ই আমাদের লেখালেখিতে বেশ কিছু সমস্যা সামনে নিয়ে আসি। আমাদের লেখনীতে সমস্যাগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। কিন্তু এসব লেখার অধিকাংশগুলোতেই যেটা খুঁজে পাওয়া যায় না তা হচ্ছে, বাস্তবধর্মী কোনো সমাধানের প্রস্তাব।

আমরা সবাই হয়তো অতটা অভিজ্ঞ নই, তাই আমাদের দূরদর্শীতা কম। কিন্তু কেবল সমস্যাগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া কাজের অর্ধেক। এমন অর্ধেক কাজে উম্মাহ কোনোভাবে উপকৃত হয় না; কেবল সমস্যাটা জানা ছাড়া। আমরা যদি বাস্তবধর্মী কোনো সমাধান প্রস্তাব করতে না পারি, তাহলে কেবল সমস্যাটা দেখিয়ে আমাদের দায়িত্ব শেষ করতে পারি না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বাংলাদেশের একটি বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকের কথা। অনেকেই তাদের লেখনীতে এই পত্রিকার মুখোশ উন্মোচন করেন। পত্রিকাটির ইসলামবিদ্বেষিতা দেখিয়ে দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এর কোনো বিকল্প সমাধান জাতিকে দিতে পারছি না। পত্রিকাটির লেখার সাহিত্যমান ও গুণগতমানের সমান কিংবা কাছাকাছি মানের কোনো বিকল্প পত্রিকা আমরা জাতিকে উপহার দিতে পারছি না। ফলে একবার যারা ঐ পত্রিকার স্বাদ পেয়েছেন, তারা অন্য আর কোনো পত্রিকায় সেই স্বাদ না পেয়ে পুনরায় সেখানেই ফিরে যান। আমরা এই দুষ্টফাঁদ থেকে বের হওয়ার কোনো পন্থা উদ্ভাবন করতে পারছি না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বহুঈশ্বরের গোলামি থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করে প্রকৃত স্রষ্টার সন্ধান পাইয়ে দিয়েছিলেন। মানুষকে প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে স্বাধীন করে এক মহান আল্লাহর কাছে নিজের ইচ্ছেকে সঁপে দেওয়ার পন্থা দেখিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু আমরা যারা অনলাইনে সক্রিয় তাদের কেউ কেউ শুধু সমস্যার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি। গ্রহণযোগ্য, বাস্তবধর্মী কোনো সমাধান বাতলে দিতে পারছি না, বা নিজ উদ্যোগে কিছু করতেও পারছি না।

এক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ হচ্ছে: শুধু সমস্যাটা নিয়ে পড়ে না থেকে, কীভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়েও যেন আমরা ভাবি। এবং শুধু ভাবার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পৃথিবীতে কীভাবে এর সমাধান করা যায় সে জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করি।

অনেকে সমস্যার দুষ্টুফাঁদ থেকে বের হয়ে কাজ করছেন, আল-হামদু লিল্লাহ। ম্যাগাজিন বের করছেন, অনলাইনে ভিডিও তৈরি করছেন, ক্যাবল টিভি চালু করেছেন, সামাজিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। আমরা তাদের থেকে প্রেরণা নিতে পারি। আমাদের আবেগকে কেবল উগরে দেওয়ার জন্য ব্যবহার না করে, একে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সাহসের সঙ্গে উদ্যোগ গ্রহণে নিয়োগ করতে পারি। যেমনটা করেছিলেন ইসলামের প্রথম খালীফাহ আবু বাক্‌র (আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট থাকুন), কুর’আন সংকলনের মতো সাহসী এক পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে। যার বাস্তব ফল আজ শোভা পাচ্ছে প্রতিটি মুসলিমের ঘরে ঘরে।

সূত্র: https://www.facebook.com/masud.shorif/posts/10152859269786332

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s