শত ব্যস্ততার ভিড়ে রমযান মাসটি যেভাবে কাটাতে পারি

Image credit: Ahmad Nawawi, via flickr[dot]com/photos/ahmadnawawi/5999431029/

Image credit: Ahmad Nawawi, via flickr[dot]com/photos/ahmadnawawi/5999431029/

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। রমযান মাস চলছে। দুপুরবেলায় অফিসের এক সহকর্মীর সাথে কথা হচ্ছিল। বরকতময় এই মাসে ইবাদত-বন্দেগি কেমন চলছে তা জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, “তেমন কিছু তো আর করতে পারছি না!” তাকে একজন ভালো ধার্মিক মানুষ বলেই আমি জানি। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের ব্যাপারে সারা বছরই অনেক সচেতন, পারতপক্ষে জামাতে ছাড়া ফরয নামায আদায় করেন না। রমযানের ফরয রোযা তিনি নিষ্ঠার সাথে পালন করছেন। তারাবীর নামাযও তার বাদ পড়ার কথা নয়। জীবিকা অর্জনের জন্য তিনি পূর্ণকালীন চাকরি করছেন। রমযান মাসের দোহাই দিয়ে অফিসের কাজে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার ঘরসংসার আছে, বাচ্চাকাচ্চা আছে। তাকে বাজার করতে হয়। সংসারের কাজে সময় দিতে হয়। বিশ্রাম নিতে হয়। ঘুমাতে হয়। সামাজিকতা রক্ষা করতে হয়। ঈদের কেনাকাটা করতে হয়। রমযান মাস বলে তো আর এসব দায়িত্ব থেকে ছুটি মেলে না। এতকিছু সামলেও যে তিনি রমযানের ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নত আমলসমূহ পালন করছেন সেটিকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ আছে কি?

“[রমযান মাসে] তেমন কিছু তো আর করতে পারছি না” – এই ভাবনাটি বেশ কয়েকটি কারণে আমাদের মধ্যে আসতে পারে। প্রথমত, অতীতের সৎকর্মশীলদের আমলের সাথে নিজেকে তুলনা করলে। দ্বিতীয়ত, অতীতের রমযানসমূহে নিজের করা অপেক্ষাকৃত বেশি আমলের সাথে নিজেকে তুলনা করলে। তৃতীয়ত, আমি জানি যে, “আমি চাইলেই এর চাইতে বেশি পারি” – এই ভাবনা থেকে। চতুর্থত, হাল আমলের ‘প্রোডাক্টিভ রমাদান’ নামে অভিহিত লেখা ও লেকচারসমূহকে মাত্রারিতিরিক্ত বেশি গুরুত্ব দিলে। এখানে উল্লেখিত প্রথম তিনটি কারণে “এই রমযানে তেমন কিছু করতে পারছি না” ভাবনাটি মাথায় এলে তা দোষণীয় নয়, বরং প্রশংসিত। আমাদের সবারই উন্নতির অনেক অবকাশ রয়ে গেছে। তবে, এখানে উল্লেখিত চতুর্থ কারণে ভাবনাটি মাথায় এলে বুঝতে হবে যে, রমযানের মূল যে ফোকাস তা থেকে খুব সম্ভবত আমরা কিছুটা বিচ্যুত হয়ে পড়েছি।

‘প্রোডাক্টিভ রমাদান’ ধারণাটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। ইউটিউব ও ব্লগের ব্যাপক প্রসারের আগে আমি কখনোই এই শব্দগুচ্ছটি শুনিনি। কিন্তু, এই বিষয়ের ওপর প্রথম লেকচারটি শোনার পর আমার মনে হয়েছিল যে, আরে, এভাবে তো কখনও ভাবিনি! রমযান মাস শুরুর আগেই গোটা মাস জুড়ে আমি কী কী করতে যাচ্ছি তার একটি পরিকল্পনা আগে থেকেই করে রাখতে হবে। প্রতিদিন কতটুকু কুরআন তিলাওয়াত করব, কতটুকু কুরআন অধ্যয়ন করব, কত রাকাত নামায আদায় করব, ইসলামি বইপত্র পড়ার পিছনে কেমন সময় দেব, ইবাদাতের সংখ্যার চাইতে গুণগত মান কিভাবে বাড়াব, কোন কোন ভালো অভ্যাস কিভাবে গড়ে তুলব, কোন কোন মন্দ অভ্যাস কিভাবে ছাড়ব – এগুলো তো আগে থেকেই ঠিক করে রাখতে হবে। রমযান মাসে ঈদের কেনাকাটা করলে সময় নষ্ট হবে, তাই রমযান শুরু হওয়ার আগেই ঈদের কেনাকাটা শেষ করে ফেলতে হবে। মেপে মেপে অতটুকু ইফতার করতে হবে। সেহরিও হাল্কা হতে হবে। আবার, খাবারগুলো পুষ্টিকরও হতে হবে। পানিশূন্যতা যেন না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। শরীর ঠিক রাখতে হবে। ক্লাসের পড়াশোনা বা পেশাগত কাজে কোনো ফাঁকি দেওয়া যাবে না। সামাজিকতা যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে। … এভাবে যদি আমি আমার রমযানকে সাজাতে ও কাটাতে পারি তাহলে বুঝতে হবে যে আমার রমযান মাসটি বেশ ‘প্রোডাক্টিভ’ হয়েছে।

শুধু লেকচার শুনলে বা লেখা পড়লেই চলবে না, এই কথাগুলো তো কাজেও বাস্তবায়ন করতে হবে। রমযান মাস এলো। আমিও ‘প্রোডাক্টিভ’ মুডে আছি। কাজের চাপে গত কয়েকদিনে একটু ঘাটতি হয়ে গেছে, আজকে এত পারা কুরআন তিলাওয়াত করতেই হবে। পুরো ঘড়ির কাঁটায় চলতে হবে। আমার তিলাওয়াত চলছে। বাসায় মেহমান এসেছেন। খুবই কাছের আত্মীয়। আমার সাথেও একটু দেখা করতে চান। কিন্তু, দেখা করতে গেলে যে কুরআনের নির্দিষ্ট অংশটুকু পড়া হবে না। আমি আমার ঘরে বসে তিলাওয়াত চালিয়ে গেলাম। ঘন্টাখানেক বাদে তার সাথে দেখা করতে আমি ঘর থেকে বের হলাম। আজ এত বছর পরে এসে বুঝি যে, সেদিনের সেই কাজটি ঠিক হয়নি। আমার উচিৎ ছিলো তার সাথে দেখা করে তাকে কিছু সময় দেওয়া। আবার কবে দেখা হয় তা তো আর বলা যায় না! আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে পরিকল্পনার বাইরে অনেক কিছুই ঘটে। যে ‘ধার্মিকতা’ মানুষের সাথে মানুষের দূরত্ব সৃষ্টি করে তাকে প্রকৃত ধার্মিকতা বলা যায় কি?

প্রতিদিন ‘প্রোডাক্টিভ’ মুডে থাকা একটি রোবটের পক্ষেই হয়ত সম্ভব। আমি মানুষই রয়ে গেলাম। আমার রমযানটি যতটা ‘প্রোডাক্টিভ’ হবে বলে ভেবেছিলাম ততটা ‘প্রোডাক্টিভ’ হয়নি। ফলাফল, রমযান শেষে একরাশ হতাশা। “আমি তো কিছুই করতে পারলাম না!” পরের বছর আবারও রমযান এলো, আবারও হতাশা। অফিসে কাজের ব্যস্ততা বাড়ল, বাড়ল আরও  হতাশা। বিয়ে করলাম। ঘরসংসার করতে হলো। সময় আরও সঙ্কুচিত হলো, ফলাফল সেই হতাশা।

যারা এখনও পেশাগত বা সাংসারিক জীবনে ভালোভাবে প্রবেশ করেননি তাদের পক্ষে হয়ত এই ‘প্রোডাক্টিভ রমাদান’ ধারণাটিকে পুরোপুরি লালন করা সম্ভব। কিন্তু, আমার মতো বেশিরভাগ মানুষই জীবনযুদ্ধের যাঁতাকলে পিষ্ট। তাদের মাথায় ‘প্রোডাক্টিভ রমাদান’ ধারণাটিকে এভাবে ঢুকিয়ে দিয়ে শেষমেশ হতাশ করে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত হচ্ছে কি? কুরআনে যা করতে বলা হয়নি, প্রিয় নবী (ﷺ) যা করতে তাকীদ দেননি, তাকেই রমযানের মূল লক্ষ্য বানিয়ে ফেলতে মানুষকে উৎসাহ দেওয়া কতটা উচিৎ হচ্ছে? ‘প্রোডাক্টিভ রমাদান’ ধারণাটি ভালো, তবে একে উপস্থাপন করা দরকার ছিলো নিতান্তই একটি ‘ঐচ্ছিক বিষয়’ হিসেবে। দুঃখজনকভাবে, যারা এই ধারণাটিকে বক্তৃতা বা লেখনির মাধ্যমে প্রচার করছেন তারা একে অনেকটা ‘আবশ্যিক একটি বিষয়ের’ মতো করেই উপস্থাপন করছেন। কোনো বিষয় যতটুকু গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য তার চাইতে বেশি গুরুত্ব পেলে একসময় না একসময় ‘বদ হজম’ হবেই। এখানে সেই ‘বদ হজমটি’ হলো রমযান শেষে একরাশ হতাশা। রমযান মাসে আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিলেন কি না সেজন্য আমার মধ্যে যতটা আকুলতা থাকা উচিৎ তার চাইতে রমযানটি ‘প্রোডাক্টিভ’ না হওয়ার কষ্টই হয়ত আমাদের কারও কারও মধ্যে বেশি দেখা যায়।

***

রমযান মাসটি সেভাবেই কাটানো উচিৎ যেভাবে কুরআন ও সুন্নাহ-তে বলা হয়েছে। আল্লাহ এমন কিছু নাযিল করেননি যা পালন করতে আমরা অপারগ। এখন আমরা দেখব যে, রমযান মাসে আল্লাহ আমাদের কাছে আসলে কী চান এবং আমাদের প্রিয় নবী (ﷺ) এই বিষয়ে আমাদের জন্য কী নির্দেশনা রেখে গেছেন।

একবার রমযান মাস শুরুর প্রাক্কালে প্রিয় নবী (ﷺ) তাঁর সাহাবীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “তোমাদের নিকট বরকতময় মাস রমযান এসেছে। আল্লাহ এর রোযা ফরয করেছেন। এতে জান্নাতের দ্বারসমূহ খোলা হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ করা ‎হয়, শিকলে বেঁধে রাখা হয় শয়তানগুলো। এতে একটি রজনী ‎রয়েছে যা সহস্র মাস থেকে উত্তম। যে তার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সেই প্রকৃত অর্থে বঞ্চিত হলো।” [নাসায়ি, আহমাদ]

প্রিয় নবী (ﷺ)-এর এই কথাটুকুকে আমরা যদি পয়েন্ট আকারে সাজাই তাহলে তা অনেকটা এরকম দাঁড়াবে:

  • রমযান অত্যন্ত বরকতময় একটি মাস। বছরের বাকী এগার মাসের চাইতে এই মাসটি অনেক বেশি মর্যাদাসম্পন্ন।
  • এই মাসে রোযা রাখাকে আল্লাহ ফরয করে দিয়েছেন।
  • এই বরকতময় মাসে আল্লাহর ইবাদাতের জন্য পরিবেশকে বিশেষভাবে অনুকূল করে দেওয়া হয় এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাকে অপেক্ষাকৃত সহজ করে দেওয়া হয়। জান্নাতের দরজাসমূহ খোলা, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করা, শয়তানদের শিকলবদ্ধ করা – এগুলো সেদিকেই ইঙ্গিত করছে।
  • এই মাসে ‘লাইলাতুল কদর’ নামে একটি রাত আছে যা মর্যাদার দিক দিয়ে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। যে এই বিশেষ রাতের বিশেষ মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হলো সে আসলেই হতভাগা।

অতএব, রমযান মাসে আমাদের প্রধান করণীয় হলো:

১) কোনো বৈধ ওজর না থাকলে এই মাসে প্রতিদিন রোযা রাখা;

২) দীনি ও দুনিয়াবী – জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর অনুগত বান্দা হয়ে চলার জন্য সর্বাত্নক চেষ্টা করা ও এই মাসের বিশেষ অনুকূল পরিবেশকে কাজে লাগানো; এবং

৩) রমযানের রাতসমূহে, বিশেষত ‘লাইলাতুল কদরে’ তারাবী, তাহাজ্জুদ, যিকির, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদাতে বেশি করে মনোনিবেশ করা।

রমযান মাসে আমাদের প্রধান করণীয় এতটুকুই। এই কাজগুলো আমাদের কারও জন্যই সাধ্যের অতিরিক্ত নয়। কৃষক, শ্রমজীবি, ছাত্র, চাকরিজীবি, ব্যবসায়ী, গৃহিণী, বেকার প্রায় সবার পক্ষেই এই কাজগুলো করা সম্ভব।

আমাদেরকে কষ্টে ফেলার জন্য আল্লাহ রমযানের রোযাকে ফরয করেননি, বরং আমাদের আত্মিক উন্নতির জন্যই তিনি এই বিধান নাযিল করেছেন। আল্লাহ বলেন: “হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি হয়।” [কুরআন, ২:১৮৩] তাকওয়া মানে হলো ভালোবাসা, ভয়, আশা ও ভরসা সহকারে আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে চলার জন্য আমাদের সাধ্যের মধ্যে সর্বাত্নক চেষ্টা করা।

তাকওয়ার এই গুণটি যেন আমরা অর্জন করতে পারি সেজন্যে রমযান মাসে কিছু শিষ্টাচার পালনের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রিয় নবী (ﷺ) বলেছেন, “রোযা ঢাল, ‎সুতরাং তোমাদের কেউ রোযা অবস্থায় হলে সে যেন অশ্লীলতা ও মুর্খতা পরিহার করে; যদি কেউ তাকে গালি দেয়, সে যেন বলে: আমি রোযাদার, ‎আমি রোযাদার।” [বুখারি, মুসলিম] আরেকটি বর্ণনা অনুযায়ী, প্রিয় নবী (ﷺ) বলেছেন, “তোমাদের কারো যখন রোযার দিন হয়, সে যেন অশ্লীলতা ও শোরগোল পরিহার করে; কেউ যদি ‎তাকে গালি দেয় বা তার সাথে মারামারি করে, সে যেন বলে: আমি ‎‎রোযাদার।‎” [বুখারি, মুসলিম] প্রিয় নবী (ﷺ) আরও বলেছেন, “যে ‎মিথ্যা কথা ও তদনুরূপ কাজ এবং মূর্খতা পরিত্যাগ করল না, তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোনো ‎প্রয়োজন নেই।” [বুখারি, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি]

স্রষ্টার ইবাদাতে অতিরিক্ত মনোনিবেশ করার পাশাপাশি এই মাসে তাঁর সৃষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখতেও বিশেষভাবে তাকীদ দেওয়া হয়েছে। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন: “রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন মানুষের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। তাঁর দানশীলতা [অন্য সময় হতে] অধিকতর বৃদ্ধি পেত রমযান মাসে, যখন [ফেরেশতা] জিব্রীল তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন। জিব্রীল রমযানের প্রতি রাতে আগমণ করতেন এবং তাঁরা পরস্পর  কুরআন শুনাতেন। তো আল্লাহর রাসূল ﷺ তখন [যেন] কল্যাণবাহী বায়ুর চেয়েও অধিক দানশীল [হয়ে যেতেন]।” [বুখারি, মুসলিম] অতএব, এই মাসে আমাদের সাধ্য অনুযায়ী মানুষের কল্যাণে বেশি করে টাকা খরচ করতে হবে এবং অন্য মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য উদগ্রীব থাকতে হবে। এরকমই একটি কল্যাণকর কাজ হলো অন্য রোযাদারদেরকে ইফতার করানো। প্রিয় নবী (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে ইফতার করাবে, সে তার (অর্থাৎ, সেই রোযাদারের) অনুরূপ প্রতিদান লাভ করবে। তবে, [সেই] রোযাদারের প্রতিদান হতে বিন্দুমাত্রও হ্রাস করা হবে না।” [তিরমিযি, ইবনে মাজাহ ও অন্যান্য] ঘরে বা বাইরে যারা আমাদের অধীনে কাজ করছেন তাদের জন্য এই মাসে কাজের বোঝা কিছুটা হাল্কা করে দেওয়াও একটি উত্তম কাজ। প্রিয় নবী (ﷺ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, “যে ব্যক্তি এই মাসে আপন গোলাম-শ্রমিকের কাজের বোঝা হালকা করে দেয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং দোযখের আগুন থেকে নাজাত দান করবেন।” [বায়হাকি]

***

রমযান মাসটির এত বেশি গুরুত্ব মূলত কুরআনের কারণে। আল্লাহ বলেন, “রমযান মাস – যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা আদ্যোপান্ত হিদায়াত এবং এমন সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী সম্বলিত, যা সঠিক পথ দেখায় এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে চুড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়।” [কুরআন ২:১৮৫] প্রিয় নবী (ﷺ)-এর বয়স যখন চল্লিশ বছর তখন রমযান মাসের কোনো একটি রাতে মক্কার উপকন্ঠে নূর পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত হিরা গুহায় তিনি প্রথম ওয়াহি (ওহি) লাভ করেন। এরপর দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ধাপে ধাপে নাযিল হতে থাকে। আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতা জিবরাইল (আলাইহিস সালাম)-এর মাধ্যমে নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ওপর নাযিল হওয়া সেই কিতাব কুরআন আজও আমাদের ঘরে ঘরে বিদ্যমান। যেহেতু এই কিতাব “সঠিক পথ দেখায় এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে চুড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়”, তাই একে না পড়ে কেবলই যত্ন করে তাকে সাজিয়ে রাখা চুড়ান্ত পর্যায়ের বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়।

একটি ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে বলছি। ধরা যাক, আপনার বাসার ঠিকানায় পুলিশ বিভাগ থেকে একটি চিঠি এসেছে। ট্র্যাফিক সিগন্যাল অমান্য করার দায়ে আপনাকে দশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গোপন ক্যামেরায় তোলা ছবি দিয়ে আপনাকে সনাক্ত করা হয়েছে। আপনি ভেবে পাচ্ছেন না যে, এই নিয়ম আবার কবে জারি হলো। অথচ এই নিয়ম আগে থেকেই ছিলো। আপনার ড্রাইভিং স্কুল আপনাকে একটি পুস্তিকা দিয়েছিল যেখানে ট্র্যাফিক সিগন্যাল অমান্য করার শাস্তি পরিষ্কার ভাষায় বলা আছে। আপনি সেটিকে বুক শেলফে সাজিয়ে রেখেছিলেন, কখনও তা খুলেও দেখেননি। পুস্তিকাটি আগে থেকে পড়া থাকলে আপনি হয়ত এভাবে ধরা খেতেন না, বরং সতর্ক থাকতেন। কুরআনে আল্লাহ জাহান্নামের কঠিন শাস্তি সম্পর্কে আমাদেরকে সতর্ক করেছেন এবং কিভাবে সেই শাস্তি থেকে বাঁচা যাবে সেই পথও তিনি বাতলে দিয়েছেন। আপনি কখনও কুরআন খুলেও দেখেননি, তাই আপনার কাছে সেই সাবধানবাণী পৌঁছেনি। অতএব, মৃত্যুর পর যদি জাহান্নামের চিঠি পৌঁছেই যায়, এমন পরিণতি যেন আমাদের কারও না হয়, তাহলে “আমি জানতাম না” বলেই কি পার পাওয়া যাবে? আপনার ঘরে কুরআন ছিলো। আপনি কেন তা খুলে দেখেননি?

আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। রেজিস্ট্রি ডাকে আপনার কাছে একটি চিঠি এসেছে। আজ খুলি কাল খুলি করে খামটি আপনার আর খোলা হয়ে ওঠেনি। চিঠিটি আজও আপনার পড়ার টেবিলের ‘শোভা বর্ধন করছে’। অথচ, এটি ছিলো আপনার চাকরির নিয়োগপত্র। আপনি যদি চিঠিটি না পড়েন তাহলে কর্তৃপক্ষ কি আপনাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে চাকরিতে যোগদান করিয়ে দেবে? আল্লাহ আমাদেরকে জান্নাতের দিকে আহ্বান করছেন। কিভাবে তাঁর সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে তার সবই তিনি কুরআনে বলে দিয়েছেন। আমরা যদি কুরআন না পড়ার কারণে স্বেচ্ছায় অজ্ঞ থেকে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হই তাহলে তার দায় কি আমাদের নিজেদেরই নয়?

রমযান হলো এই কুরআনের মাস। কুরআন চর্চার মাস। দিনের বেলায় রোযা রাখা এবং রাতে অতিরিক্ত নামায আদায় তো আমরা করবই, ইনশা আল্লাহ, সেই সাথে এই মাসে আর মাত্র একটি বিশেষ আমল যোগ করারও সুযোগ যদি আমাদের হয় তাহলে সেটি হতে হবে কুরআন।

সত্যি বলতে কি, কুরআনের ব্যাপারে আমাদের প্রায় সবারই গাফিলতি আছে। আমরা অনেকেই আরবিতে শুদ্ধ করে কুরআন পড়তে পারি না। আবার, অনেকেই ছোটবেলায় আরবিতে কুরআন পড়া শিখেছিলাম, কিন্তু এখন তা প্রায় ভুলেই গিয়েছি। আসুন, এই রমযানে আমরা প্রতিজ্ঞা করি যে, আরবিতে শুদ্ধ করে কুরআন পড়া আমরা শিখবই। এক মাসের মধ্যে হয়ত সবকিছু আয়ত্তে আনা যাবে না, তবে শুরুটা অন্তত এই মাসে হতেই হবে।

অন্যদিকে, আমরা যারা শুদ্ধ করে কুরআন পড়তে পারছি তাদের কর্তব্য হলো এই মাসে বেশি বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত করা। প্রতিদিন অন্তত এক পারা করে তিলাওয়াত করতে পারলে রমযানের তিরিশ দিনেই পুরো কুরআন একবার পড়ে শেষ করা যাবে। আর, ব্যস্ততার কারণে আমাদের হাতে যদি সময় কম থাকে তাহলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। প্রতিদিন কুরআন থেকে অন্তত কয়েক পাতা তো আমরা তিলাওয়াত করতেই পারি। প্রতিদিন মাত্র দশ পাতা করে তিলাওয়াত করতে পারলেও তিরিশ দিনে কুরআনের অর্ধেকটা মূল আরবিতে পড়া হয়ে যাবে। সারা বছর ধরে কুরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস থাকলে এই লক্ষ্যমাত্রাটি আমাদের জন্য খুব একটা কঠিন বা ব্যাপক সময়সাপেক্ষ হওয়ার কথা নয়। আর তাও সম্ভব না হলে যতটুকু পারা যায় ততটুকুই তিলাওয়াত করার চেষ্টা করে দেখি। দিনে মাত্র পাঁচ মিনিট করে সময় বের করতে পারলে সেটিই করি।

কুরআন থেকে নতুন করে কিছু অংশ মুখস্ত করার জন্যও রমযান মাসটি একটি উত্তম সময়। পাশাপাশি, ইতিমধ্যেই কুরআনের যে অংশটুকু আমাদের মুখস্ত আছে তা ঝালাই করে নেওয়ারও সময় এই বরকতময় মাসটি।

আমরা কুরআনের যে অংশটুকু দেখে দেখে মূল আরবিতে পড়লাম, বা যে অংশটুকু স্মৃতি থেকে তিলাওয়াত করলাম তার অর্থটুকু জানলে পারলেও মন্দ কি? অর্থ না জানলেও শুধুমাত্র তিলাওয়াতের জন্যই সওয়াব মিলবে, ইনশা আল্লাহ, তবে সেক্ষেত্রে আল্লাহ আমাদের উদ্দেশ্যে কী কী বলেছেন তা তো আর আমরা জানতে পারলাম না। কুরআনের আরেক নাম হলো ‘আল্লাহর কালাম’ (অর্থাৎ, আল্লাহর কথা)। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আপনাকে ও আমাকে উদ্দেশ্য করে আমাদের কল্যাণের জন্যই কিছু অতীব গুরুত্বপূর্ণ কথা এখানে বলেছেন, আর আমরা তা বুঝতে চাইছি না তা কি হয়? আরবি আমাদের ভাষা নয়। মূল আরবির কাছাকাছি না হলেও ভালো কোনো অনুবাদের মাধ্যমে কুরআনের মর্মবাণী আমরা অনেকটাই অনুধাবন করতে সক্ষম হবো, ইনশা আল্লাহ। কুরআনের ভালো কোনো অনুবাদ আপনার কাছে না থেকে থাকলে আজই সংগ্রহ করতে চেষ্টা করুন। ‘আল্লাহর কথা’ কুরআন বুঝতে আলসেমি থাকা কোনো কাজের কথা নয়। তবে, অনুবাদ পড়ে কুরআনের প্রতিটি আয়াতই যে স্পষ্ট করে বোঝা যাবে তা নয়, কেননা অনুবাদে তো আর আয়াতসমূহ নাযিলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, হাদিস ও অন্যান্য সূত্রের সহায়তায় সেখান থেকে আহরিত পরিপূর্ণ বিধিবিধান ইত্যাদি দেওয়া থাকে না। এই বিষয়গুলো বুঝতে চাইলে আমাদেরকে তাফসির গ্রন্থের সহায়তা নিতে হয়।

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে ব্যস্ততা যেমন বেড়েছে তেমনই কুরআনের সাথে সময় কাটানোর সুযোগও বেড়েছে। ক্লাসে বা কাজে যাওয়া-আসার পথে, অথবা ঘরের কাজ করতে করতে বিখ্যাত কারীদের কুরআন তিলাওয়াত শোনার আইডিয়াটা একেবারে মন্দ নয়। কেবলমাত্র কুরআনের তিলাওয়াত কেন, এসব সময়ে কুরআনের তাফসির বা কুরআনের ওপর আলোচনাও আমরা শুনতে পারি।

***

ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (৪৫০-৫০৫ হিজরি/ ১০৫৮-১১১১ খ্রিস্টাব্দ)-র মতে রোযার তিনটি স্তর আছে। এগুলো হলো (আমার নিজের ভাষায় বলছি):

১) সাধারণ রোযা: সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ে পানাহার ও শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন থেকে বিরত থাকা হলো সাধারণ রোযা। এটি হলো রোযার ন্যুনতম স্তর।

২) বিশেষ রোযা: রোযাদার অবস্থায় চোখ, কান, জিহ্বা, হাত বা পা দ্বারা যেন কোনো প্রকার গুনাহ হয়ে না যায় সেদিকে সদা সতর্ক থাকার নাম হলো বিশেষ রোযা। “মন্দ কথা শুনব না, মন্দ জিনিস দেখব না, মন্দ কথা বলব না, মন্দ কাজ করব না” – হলো বিশেষ রোযার বৈশিষ্ট্য।

৩) অত্যন্ত বিশেষ রোযা: আল্লাহর নৈকট্য অর্জন থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এমন সমস্ত চিন্তা থেকে অন্তরকে বিরত রাখা হলো এই সর্বোচ্চ স্তরের রোযা। এটি হলো তাওহীদের সর্বোচ্চ প্রকাশ। আল্লাহর খুব অল্প সংখ্যক বান্দা পরহেযগারির এই সমুচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হন।

এত বছর ধরে আমরা সাধারণ রোযা রেখে এসেছি। এতে আমাদের রোযার ফরযটুকু আদায় হয়ে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাকওয়ার দাবী হলো আমাদের রোযাকে অন্তত বিশেষ রোযায় উন্নীত করার জন্য চেষ্টা করা। রমযান মাসে দিনের বেলায় এত দীর্ঘ সময় ধরে পিপাসা, ক্ষুধা ও জৈবিক বাসনাকে যদি আমরা দমন করে রাখতে পারি তাহলে আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা আল্লাহর অবাধ্যতা হবে না এমনটি আমরা কেন পারব না? আর, আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যখন আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি পূর্ণ অনুগত হয়ে যাবে তখন আমাদের অন্তরও তাতে সায় দিতে শুরু করবে।

জীবনযুদ্ধের ব্যস্ততার কারণে হোক, শয়তানের প্ররোচণায় পড়ে হোক, আজেবাজে বন্ধুর খপ্পরে পড়ে হোক, প্রবৃত্তির তাড়নায় পড়ে হোক – যে কারণেই হোক না কেন – আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কটা অনেক সময়ই শিথিল হয়ে পড়ে। মহান প্রভুর সাথে আমাদের সেই সম্পর্ককে মেরামত করার একটি চমৎকার সুযোগ নিয়ে আসে বরকতময় রমযান মাস। আল্লাহর কত পাপী বান্দা বিগত প্রতিটি রমযানে তাঁর পানে ফিরে এসেছেন, এই রমযানেও কত পাপী বান্দা আবারও তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দেবেন। সারা বছর ধরে আমাদের অন্তরে যত মরিচা পড়েছে তা পরিষ্কার করার জন্যই তো এসেছে রমযান।

“(হে নবী!) আমার বান্দাগণ যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন (আপনি তাদেরকে বলুন যে,) আমি এত নিকটবর্তী যে, কেউ যখন আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি। সুতরাং তারাও আমার কথা অন্তর দিয়ে গ্রহণ করুক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে এসে যায়।” [কুরআন, ২:১৮৬]

রমযানের মূল প্রতিপাদ্য এটিই – আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে অগ্রগামী হওয়া। পবিত্র এই মাসটি আমাদের জন্য তথাকথিত ‘প্রোডাক্টিভ’ হোক বা না হোক, এই মাসে আমরা অনেক লক্ষ্য নির্ধারণ করে তা অর্জন করতে পারি বা না পারি, কোনো সমস্যা নেই। আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ককে আরেকটু মজবুত করতে পারলেই এই রমযান মাসটি আমাদের জন্য প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে। সেই সাথে, এই মাসে ভালো কিছু অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে এবং মন্দ কিছু অভ্যাস ছাড়তে পারলে সেটিই হবে রমযান পরবর্তী জীবনে আমাদের জন্য পরম পাথেয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাহায্য করুন।

————————————————–

সহায়ক ভিডিও:        

Fasting and Ramadan: Guidance of the Qur’an and Prophetic Sunna Explained – Shaykh Faraz Rabbani:

Advertisements

One thought on “শত ব্যস্ততার ভিড়ে রমযান মাসটি যেভাবে কাটাতে পারি

  1. পিংব্যাকঃ রমাদান: আত্মশুদ্ধি অর্জন ও কুরআনের মাস | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s