[রামাদান স্পেশাল] আজকের আয়াত #৫: সবচেয়ে বড় অপরাধ (অনুবাদ)

“আল্লাহর সাথে শরিক করা হলে তিনি তা ক্ষমা করেন না। এছাড়া আর সব (পাপ) তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক করে সে সুদূর বিভ্রান্তিতে পতিত হয়।” (সূরাহ আন-নিসা ৪:১১৬)

পঞ্চম তাফসীর হিসেবে এই আয়াত বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে অধিকাংশ সময়েই এই আয়াতটিকে ভুলভাবে বোঝা হয়। কিংবা এড়িয়ে যাওয়া হয়। যেহেতু এই আয়াতটি নিয়ে অনেক ভুলধারণা আছে তাই এর তাফসীরটা অন্য আয়াতগুলো থেকে একটু বড় হবে। এই আয়াত থেকে এটুকু পরিষ্কার যে আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় পাপ হচ্ছে শির্ক। এর কম যেকোনো অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন।

আয়াতটি নিয়ে প্রথম যে ভুলধারণা কাজ করে সেটা হচ্ছে আয়াতটির প্রসঙ্গ না-বোঝা। প্রসঙ্গ অনুসারে এই আয়াতের মানে হচ্ছে, অনুশোচনা না-করে কেউ যদি শির্ক করা অবস্থায় মারা যায় তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না। কিন্তু অন্যান্য অপরাধের অনুশোচনা না-করে মারা গেলেও আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করে দিতে পারেন।

এই আয়াতে মূলত অনুশোচনাবিহীন অপরাধের ব্যাপারে বলা হয়েছে। এবং এ জায়গাতেই অনেকে ভুল বোঝে। ইসলামে ফিরে আসা অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন, তারা তো আগে শির্কে লিপ্ত ছিলেন। তার মানে কি এই যে, তাদের সেই অপরাধ ক্ষমা করা হবে না? না, আয়াতে এটা উদ্দেশ্য নয়। কারণ, ইসলামে ফিরে আসাটাই একটা অনুশোচনা। আর এর মাধ্যমেই অতীতের সব অপরাধ মাফ হয়ে যায়। এই আয়াতটি শুধু সেইসব শির্কের জন্য যেগুলোর জন্য তাওবাহ বা অনুশোচনা করা হয়নি।

Photo credit: Steve Evans, via commons[dot]wikimedia[dot]org/wiki/File:Nepali_puja.jpg

Photo credit: Steve Evans, via commons[dot]wikimedia[dot]org/wiki/File:Nepali_puja.jpg

দ্বিতীয় ভুলধারণাটি হচ্ছে, অনেক লোক শুধু মূর্তিপূজাকেই শির্ক বলে বিবেচনা করেন। কিন্তু আসলে শির্ক শুধু মূর্তিপূজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অবশ্য তাওহীদপন্থী কোনো লোক যদি না-জেনে কোনো শির্কি কাজ করে বসেন, তাহলে অজ্ঞতার কারণে তিনি হয়তো মাফ পেয়ে যাবেন। কিন্তু যারা জানার পরও শির্কে লিপ্ত থাকবে তাদের জন্য শাস্তি প্রযোজ্য হবে। আর তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত তাওহীদ শেখার জন্য সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করা। কোন কোন বিশ্বাস ও কাজ শির্কের মধ্যে পড়ে সেগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জানা। [অনুবাদকের সংযোজন: তাওহীদ ও শির্ক সম্পর্কে সংক্ষেপে মূল ধারণা রাখার জন্য সিয়ান পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত ড. বিলাল ফিলিপস রচিত “এক” বইটি পড়া যেতে পারে।]

তৃতীয় ভুলধারণাটি হচ্ছে, অনেকে মনে করেন আয়াতটি শুধু অমুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য। ইসলামের বার্তা পাওয়ার পর, জেনেবুঝে যে-ই শির্ক করবে এরকম সবার জন্যই এই আয়াতটি প্রযোজ্য। নিজেকে মুসলিম দাবি করার পরও কেউ যদি শির্কি বিশ্বাস ও কাজে লিপ্ত থাকেন তিনিও এর অন্তর্ভুক্ত। যেসব অমুসলিম ইসলামের বার্তা না-পেয়েই মারা গেছেন তারা এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত নন। অসংখ্য তাফসীর বইতে উল্লেখ আছে যে, এ ধরনের লোকেরা বিচার দিনে পরীক্ষার সম্মুখীন হবেন এবং সে অনুযায়ী তাদের ফায়সালা হবে। এটা আল্লাহর ন্যায়বিচারের একটা দৃষ্টান্ত: মানুষের অজ্ঞতার কারণে তিনি কাউকে শাস্তি দেন না।

চতুর্থ ভুল ধারণাটি হচ্ছে, যেহেতু শির্ক সবচেয়ে বড় অপরাধ সেহেতু অমুসলিমদের সঙ্গে অনেক মুসলিম খুব বাজে আচরণ করেন। এটা ইসলামি আদর্শের একেবারেই বিপরীত। নাবি (তাঁর উপর বর্ষিত হোক আল্লাহর শান্তি ও আশীর্বাদ) ভদ্রতা ও দয়ার সঙ্গে মানুষকে ইসলামের দিকে ডেকেছেন। ধর্ম যা-ই হোক না কেন সবার প্রতি তাঁর মনোভাব এমনই ছিল। কেউ অপরাধ করেছে বলেই তার সাথে ন্যায্য ও সুহৃদ আচরণ করা যাবে না—এমনটা ইসলামে নেই।

সর্বশেষ ভুলধারণাটি হচ্ছে সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ সমাজে বড় হওয়া অনেক তরুণ-যুবক মুসলিমরা এটা বুঝে উঠতে পারেন না যে, ধর্ষণ, হত্যা কিংবা চুরি-ডাকাতির চেয়ে শির্ক কেন নিকৃষ্ট অপরাধ। কথিত মানবতাবাদী ধ্যানধারণা শির্কের প্রতি মুসলিমদের সংবেদনহীন করে তুলেছে। এটা কোনো বড় বিষয় নয় এমন একটা ধারণা তাদের মধ্যে গেঁথে দিয়েছে। আসলে সমস্যাটা হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, যা কিছুর অস্তিত্ব আছে তার মধ্যে মানুষই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই, মানবাধিকার লঙ্ঘন করা সবচেয়ে বড় অপরাধ।

আল্লাহর যেকোনো সৃষ্টির অধিকার লঙ্ঘন করা নিঃসন্দেহে অপরাধ এবং ইসলামে তা নিষিদ্ধ। কিন্তু তারপরও সবকিছুর চেয়ে শির্ক অনেক বড় অপরাধ। কেননা, এখানে মহান স্রষ্টা আল্লাহর অধিকারকে লঙ্ঘন করা হচ্ছে। কাজেই মুসলিম হিসেবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। মানুষের চেয়ে আল্লাহ অনেক মহান এই বিশ্বাস গ্রহণ করতে হবে। এজন্যই কোনো মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করার চেয়ে আল্লাহর অধিকার লঙ্ঘন করা অনেক বেশি গুরুতর; যদিও দুটোই অপরাধ। আধুনিক বিশ্বে রাজনৈতিকভাবে এই বিশ্বাসকে মানুষ হয়তো ভুল বলবে। কেননা, এখানে সব ধর্মই সমান এমন ধ্যানধারণা চাপানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু সত্য তো এটাই যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর মাধ্যমে মানুষ এই সাক্ষ্যই দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয়। [কাজেই আল্লাহর অধিকার লঙ্ঘন করা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় অপরাধ।] প্রতিটি মুসলিমকে তাই সবকিছুর ঊর্ধ্বে এই বিশ্বাসই লালন করতে হবে।

তাওহীদকে অবমূল্যায়ন করে এবং শির্কের পরোয়া না-করে কখনোই প্রকৃত ধার্মিকতা অর্জন করা যায় না। ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে তাওহীদ। ধার্মিকতার শুরুই হয় আল্লাহর অধিকার পূরণ করার মাধ্যমে এবং অন্যদেরকে সেই একই বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করে। মানুষের অধিকার পূরণ করাও ধার্মিকতার অংশ; কিন্তু আল্লাহর অধিকার পূরণ করা, তথা তাওহীদ ও সালাতকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হচ্ছে প্রতিটি মুসলিমের এক নম্বর দায়িত্ব।

মূল লেখক: Ismail Kamdar, Head Tututorial Assistant, Islamic Online University

ইংরেজিতে মূল লেখাটি পড়ুন এখানে: http://abumuawiyah.com/verse-of-the-day-5-04116-the-greatest-sin/  

বাংলা অনুবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় এখানে: https://www.facebook.com/masud.shorif/posts/10152883184336332   

Advertisements

One thought on “[রামাদান স্পেশাল] আজকের আয়াত #৫: সবচেয়ে বড় অপরাধ (অনুবাদ)

  1. পিংব্যাকঃ অমুসলিম মাত্রই কি কাফির? | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s