জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা একান্তই আল্লাহর হাতে

কামাল একটি বেসরকারী অফিসে কাজ করে। বড় কোম্পানি। নিয়ম-কানুন অনেক কড়া। সকাল আটটার মধ্যে অফিসে ঢুকতেই হবে। কোনো মাসে তিনদিন দশ মিনিটের বেশি দেরি হলে এক দিনের বেতন কাটা। কিন্তু, লাগাতার হরতালে কামাল পড়েছে বিপদে। হরতালের মধ্যে এত সকালে যাত্রাবাড়ীর বাসা থেকে বারিধারার অফিসে যাওয়া আর নিরাপদ নয়। ফাঁকা রাস্তায় কখন যে কী হয় তা তো আর বলা যায় না। তাই, রাস্তায় একটু লোক চলাচল শুরু হলে সে বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। গত মাসে প্রতিদিনই দেরি হয়েছে। দশটার আগে কোনোদিনই অফিসে ঢুকতে পারেনি। সপ্তাহে ছয়দিন হিসেবে ফেব্রুয়ারি মাসে কর্মদিবস ছিলো চব্বিশটি। তার মানে, আটটা দশে অফিসে ঢুকলেই গত মাসের আট দিনের বেতন কাটা। আর ওর তো হয়েছে দিনে দুই ঘন্টা করে দেরি। এইচ আর ম্যানেজার খুব কড়া মানুষ। ঘচাত করে বেতন কেটে নিতে তিনি মহা ওস্তাদ। কি আর করা, টাকা যা পাওয়া যায় তাই সই।

মার্চের দুই তারিখে কামাল অনলাইনে তার ব্যাংক স্টেটমেন্ট চেক করল। সে ঠিক দেখছে তো? গত মাসের বেতন পুরোটাই তার স্যালারি অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে। একটি পয়সাও কাটা হয়নি। তার খুশি মাখা চেহারা দেখে পাশের ডেস্কের সেলিম প্রশ্ন করার লোভ সামলাতে পারল না। “কামাল, কোনো সুখবর?”, সেলিম শুনল। “হ্যাঁ, গত মাসের বেতন পুরোটাই পেয়েছি। এইচ আর ম্যানেজার কত ভালো মানুষ। আমরা খামোখাই তার বদনাম করি। হরতালে দূর থেকে আসতে আমার যে সমস্যা হয় তা উনি ঠিকই খেয়াল করেছেন।” কামাল বলল।

সেলিমের বাসা বারিধারার পার্ক রোডে। হরতালের দিনে সবাই দেরি করে অফিসে আসে, তাই সেও একটু দেরি করেছে। তবে, প্রতিদিনই সাড়ে আটটার মধ্যে অফিসে ঢুকেছে। “ভালোই তো! যাই, অনলাইনে আমার ফোনের বিলটা দিয়ে আসি।” – একথা বলে সেলিম তার ডেস্কে গিয়ে বসল। ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট দেখে সে চোখ কচলাতে লাগল। “কিভাবে সম্ভব? গত মাসের আট দিনের বেতন কাটা! কিন্তু, আমি তো প্রতিদিনই সাড়ে আটটার মধ্যে অফিসে ঢুকেছি। অন্যদের আগেই তো এসেছি। দেখেন না, হিসেবে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে।” – সাহস সঞ্চয় করে সেলিম এইচ আর ম্যানেজারকে বলল। ম্যানেজার সাহেব দিলেন কড়া এক ধমক। “আমার সাথে ফাজলামো করো? হরতালে তোমার কি সমস্যা? তোমার বাসা থেকে অফিস তো হাঁটা পথ। আরও বেশি টাকা যে কাটিনি তার জন্য সন্তুষ্ট থাকো। যাও, কাজে মন দাও।”

Photo credit: pixabay[dot]com/en/window-raindrops-rain-clouds-dark-407206/
Photo credit: pixabay[dot]com/en/window-raindrops-rain-clouds-dark-407206/
কল্পিত এই কাহিনীটি থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, পারপার্শিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে একই বিষয়ে একেক জনের জন্য একেক রকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। আমাদের চারপাশে এরকম ঘটনা অহরহই ঘটছে। এই অফিসের কথাই ধরা যাক। দেরি করে আসলে বেতন কাটা হবে, এটিই হলো লিখিত নিয়ম। সাধারণ পরিস্থিতিতে এই নিয়মেই কাজ চলে। কিন্তু, এখানে বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এইচ আর ম্যানেজার কামালের বেতন কাটেননি। লিখিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলেও নৈতিক দিক বিবেচনায় নিয়েই এইচ আর ম্যানেজার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এ তো গেল এই দুনিয়ার নিয়মের কথা। ইসলামে বিশ্বাসী মাত্রই পরকালীন জীবন বলে যে একটি বিষয় আছে তা মানেন। সেই জগতে বৈষয়িক জীবনের মতো আর্থিক সুবিধা বা দন্ড নেই, আছে জান্নাত বা জাহান্নাম। কী কী কাজ করলে জান্নাতে যাওয়া সহজ হবে, আর কী কী কাজ করলে জাহান্নামে যেতে হতে পারে তা আমাদের নবীর ﷺ মাধ্যমে আমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো স্বাভাবিক নিয়ম।

মুশকিল হলো, আমরা কাজ আর ব্যক্তিকে গুলিয়ে ফেলি। কাজটি জান্নাতে যাওয়ার জন্য সহায়ক হতে পারে, তাই বলে যিনি সেটি করছেন তিনি কি জান্নাতের টিকেট হাতে পেয়ে গেছেন? আবার, আরেকটি কাজ জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হতে পারে, তাই বলে যিনি সেটি করছেন তার নরকবাস কি নিশ্চিত হয়ে গেছে? হাশরের ময়দানে আল্লাহ যখন আমাদের বিচার করবেন তখন তিনি কেবলমাত্র আমাদের কাজটুকুই দেখবেন না, সেইসাথে আমাদের অন্তরের প্রকৃত অবস্থা এবং পারিপার্শিক অবস্থাও বিবেচনায় নেবেন। তিনি কারও প্রতি কোনো অবিচার করবেন না। হতে পারে, আমরা যাকে জান্নাতি ভেবে বসে আছি তিনি অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। আবার এও হতে পারে যে, আমরা যাকে জাহান্নামি ভেবে ভর্তসনা করছি তিনি জান্নাতে উঁচু মর্যাদা লাভ করেছেন। আল্লাহ জানেন। আমরা জানি না।

জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা একান্তই আল্লাহর হাতে। কোনো কোনো মুসলিমের কিছু কিছু কাজ আমাদের দৃষ্টিতে অনৈসলামিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু, তাই বলে আমরা যেন এদের ব্যাপারে জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা দিয়ে না বসি। আল্লাহর ফয়সালা নিজে থেকে অনুমান করার স্পর্ধা না দেখানোই ভালো। এদের কিছু কাজ আপনার দৃষ্টিতে অনৈসলামিক বলে মনে হলে আপনি তাদের সমালোচনা করুন। কুরআন ও হাদিসের রেফারেন্স এবং যুক্তি দিয়ে তাদের ভুলটুকু ধরিয়ে দিন। কিন্তু, “ওরা জাহান্নামের ইন্ধন” – দয়া করে এই কথাটি বলবেন না। আর কেউ এমনটি বললে তার ব্যাপারেও সাবধান থাকবেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে এই বিষয়টি অনুধাবন করার তৌফিক দিন।

Advertisements

2 thoughts on “জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা একান্তই আল্লাহর হাতে

  1. জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা একান্তই আল্লাহর হাতে। কোনো কোনো মুসলিমের কিছু কিছু কাজ আমাদের দৃষ্টিতে অনৈসলামিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু, তাই বলে আমরা যেন এদের ব্যাপারে জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা দিয়ে না বসি। আল্লাহর ফয়সালা নিজে থেকে অনুমান করার স্পর্ধা না দেখানোই ভালো। এদের কিছু কাজ আপনার দৃষ্টিতে অনৈসলামিক বলে মনে হলে আপনি তাদের সমালোচনা করুন। কুরআন ও হাদিসের রেফারেন্স এবং যুক্তি দিয়ে তাদের ভুলটুকু ধরিয়ে দিন। কিন্তু, “ওরা জাহান্নামের ইন্ধন” – দয়া করে এই কথাটি বলবেন না। আর কেউ এমনটি বললে তার ব্যাপারেও সাবধান থাকবেন।
    valo laglo ai kotha gulo khub Shaon vai…Tothakothito kichu loker aishob pora uchit.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close