সাওয়াদের কাহিনী

Photo credit: Emilia Tjernström, via flickr[dot]com/photos/modern_nomad/363477569/

Photo credit: Emilia Tjernström, via flickr[dot]com/photos/modern_nomad/363477569/

সময়: ১৭ই রমজান শুক্রবার ভোর, ২য় হিজরী।

স্থান: বদর প্রান্তর।

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন এটি। এটি সত্য থেকে মিথ্যাকে পৃথক করার দিন (ইয়াওমুল ফুরকান)। মক্কা থেকে জীবন নিয়ে মদীনায় পালিয়ে আসা মুসলিমরা, আর তাদের সহযোগী মদীনার আনসারেরা – লড়াই করবে আজ মক্কার নেতৃত্বে থাকা প্রবল প্রতাপশালী মুশরিক কুরাইশ বাহিনীর সাথে। টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে দুই দলের যোদ্ধাদের মধ্যে। এই যুদ্ধের প্রত্যেকটা মানুষ তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে আজ। মাত্র ৩১৩ জনের মুসলিম বাহিনী লড়াই করবে ৯৫০ জনের মুশরিক বাহিনীর সাথে। মুশরিক বাহিনীর ১৭০টি উটের বিপরীতে মুসলিমদের উট ৭০টি, মুশরিকদের ১০০টি ঘোড়ার বিরুদ্ধে মুসলিমদের ঘোড়া মাত্র ২টি। মুশরিকরা তো অবশ্যই, এমনকি সাহাবাদের অনেকেও মনে মনে ভাবছেন যে, এই যুদ্ধে মুসলিমরা চরমভাবে পরাজিত হতে যাচ্ছে।

মুসলিম বাহিনীর সেনাপ্রধান প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ সব সাহাবাদের সারিবদ্ধ হয়ে দাড়ানোর নির্দেশ আগেই দিয়েছিলেন, সবাই দাড়িয়েও গিয়েছেন সেভাবে। এবার উনি ﷺ এসে চেক করছেন সবাই ঠিকমত দাড়িয়েছেন কিনা। রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর  চোখে পড়ল সাওয়াদ (রা) সোজা হয়ে লাইনে দাড়াননি। তাই উনি ﷺ হাতের লাঠিটা দিয়ে সাওয়াদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তার পেটে সামান্য একটা গুতা দিলেন, যুদ্ধের প্রাঙ্গনে যেকোনো সেনাপ্রধানই যা করতে পারেন। ব্যাপারটা পছন্দ হলো না সাওয়াদের । তিনি বলে উঠলেন – “হে রাসূলুল্লাহ ﷺ! আপনি আমাকে ব্যথা দিয়েছেন। আল্লাহ্ তো আপনাকে সত্য ও ন্যায়বিচারসহ পাঠিয়েছেন, কাজেই আপনি আমার সাথে যা করেছেন তার বিনিময়ে আমাকে কিছু করার সুযোগ দিন। ” সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের পেটের দিকের কাপড় একটু উঠিয়ে সাওয়াদ(রা)কে বললেন – “সমান করে নাও।” ইশারা করলেন সাওয়াদ(রা) যেন তাকে পাল্টা গুতো দিয়ে পুষিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর পক্ষ থেকে এরকম অনাকাংক্ষিত সরল আচরণে বিমোহিত, আবেগ্লাপুত হয়ে গেলেন সাওয়াদ(রা)। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর খোলা পেটে আঘাত তো করলেনই না, বরং পেটটাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে সম্মানের সাথে চুমু খেলেন। সাওয়াদের এই আচরণে রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন – “এরকম করলে কেন সাওয়াদ?” সাওয়াদ(রা) বললেন – “আপনি তো দেখছেনই আমাদের সামনে কি আছে (অর্থাৎ মৃত্যু তো আমাদের নিশ্চিতই)। আপনার সাথে জীবনের শেষ সাক্ষাতে চাচ্ছিলাম একটিবার আপনাকে ছুঁয়ে দেখতে!” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ দু’আ করলেন সাওয়াদের কল্যাণের জন্য। ব্যস্ত যুদ্ধের ময়দানের এক মুহুর্তের এই ঘটনা তাঁদের দু’জনের একে অপরের প্রতি মমতা যেন বহুগুণে বাড়িয়ে দিল।

ছোট এই ঘটনা থেকে আমরা একজন আদর্শ নেতার অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য জানতে পারি:

১) পারফেকশন: রাসূলুল্লাহ ﷺ চাইলে সাওয়াদের অল্প একটু এগিয়ে দাড়ানোকে অগ্রাহ্য করতে পারতেন। কিন্তু, তিনি তা করেননি। মহান আল্লাহ ﷻ পারফেকশন পছন্দ করেন, আমার প্রিয়নবীও পারফেকশনিষ্ট ছিলেন।

২) অন্যের অনুভূতিকে সম্মান করা: একজন সেনাপ্রধান তার সৈন্যকে লাঠি দিয়ে লাইন ঠিক করার জন্য নির্দেশ দিতেই পারেন। কিন্তু, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখনই বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর এই আচরণে অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও সাওয়াদ আঘাত পেয়েছিলেন, সাথে সাথে তিনি সাওয়াদের অনুভূতিকে সম্মান করলেন। সাওয়াদকে যুক্তি-তর্ক দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করলেন না – আমি ঠিক তুমি ভুল, বরং সাওয়াদের আচরণকে সমর্থন করে এমন কিছু করলেন যাতে সাওয়াদের মন শান্ত হয়।

৩) সাহাবারা তাঁকে ﷺ ভয় পেতেন না: ভেবে দেখুন, আজকের দিনের কোনো সৈনিক কি তার জেনারেলের সাথে এভাবে মুখের উপর কথা বলার সাহস পায়? পায় না, কারণ তারা জানে যে জেনারেল রেগে গিয়ে ন্যায়বিচার নাও করতে পারে। কিন্তু, রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর ন্যায়বিচারের উপর সাহাবাদের এমনই আস্থা ছিল যে তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর মুখের উপর তাদের মনের অনুভূতি বলে দিতে পারতেন। জেনারেল তো দূরে থাক, আজকের সন্তানরা বাবার কাছে মনের কথা খুলে বলতে পারে না, স্ত্রী বলতে পারে না স্বামীর কাছে – যদি রাগ করে বসে! অথচ, রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে তাঁর পরিবারের সদস্যরা ও সাহাবারা – ভালোবাসতেন ও সম্মান করতেন, কিন্তু তাঁকে মনের কথা খুলে বলতে ভয় পেতেন না।

৪) ন্যায়বিচার সাথে সাথে: আর পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যে যেখানে যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে, সেখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতেই পারতেন যে – “সাওয়াদ, তোমার অভিযোগটা পরে বিবেচনা করে দেখব, এখন সময় নেই”। না, রাসূলুল্লাহ ﷺ এরকম করলেন না। অভিযোগ পাওয়ার সেকেন্ডের মধ্যে সৈনিককে বদলা নেয়ার সুযোগ করে দিলেন তিনি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এক মুহুর্ত সময় নিলেন না। অথচ, আমরা যখন অনুধাবন করতে পারি যে কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি, কাউকে কষ্ট দিয়েছি, তখন নিজেকে বুঝাই আচ্ছা এখন না কালকে, না থাক কালকে না পরশু, পরশু না তার পরেরদিন … এই ব্যাপারে ওর সাথে কথা বলবো।

৫) রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর প্রতি ভালবাসা: রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর জন্য সাহাবাদের ভালোবাসা ছিল অকল্পনীয় রকমের। নিজের মা-বাবা-স্ত্রী-সন্তান, এমনকি নিজের জীবনের চাইতেও তারা রাসূলুল্লাহকে ﷺ বেশী ভালোবাসতেন। কিভাবে এরকম ভালোবাসা করা অর্জন সম্ভব হলো? রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের বলেছেন – “যে ব্যক্তি মানুষকে সন্তুষ্ট করার জন্য আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে কিছু করবে, সে মানুষকেও সন্তুষ্ট করতে পারবে না, আল্লাহকেও ﷻ না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ﷻ সন্তুষ্ট করার জন্য এমন কিছু করবে যাতে মানুষ অসন্তুষ্ট হয়, সে আল্লাহকে ﷻ সন্তুষ্ট তো করবেই, বরং পরবর্তীতে ওই মানুষদেরও সন্তুষ্ট করবে যারা প্রথমে তার উপর অসন্তুষ্ট ছিল” (তাবারানী) । রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতি মুহুর্তে আল্লাহকে ﷻ সন্তুষ্ট করার জন্য কাজ করতেন, তাই তিনি আল্লাহকে ﷻ তো সন্তুষ্ট করেছেনই, একই সাথে করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যদের, সাহাবাদের; এমনকি হাজার বছর ধরে লক্ষ-কোটি মানুষের জীবনের সবচাইতে ভালোবাসার পাত্র হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।

৬) মনের মধ্যে নেগেটিভ ফিলিং চেপে ধরে না রাখা: সাওয়াদ(রা) রাসূলুল্লাহকে ﷺ জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়ার পর তিনি ﷺ চুপ করে থাকতে পারতেন বা অন্য কাজে চলে যেতে পারতেন, কিন্তু তিনি ﷺ তা করেননি। তিনি ﷺ গেস ওয়ার্ক (guess work) না করে সাওয়াদ(রা)কে আন্তরিকভাবে বুঝতে চাইলেন। তাই তিনি ﷺ জিজ্ঞেস করলেন – কেন সে তার আচরণ পরিবর্তন করলো। শুধু তাই না, আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর সাথে তর্ক করার জন্য আল্লাহ্ ﷻ যাতে সাওয়াদকে (রা) কোনো গুনাহ না দেন সে জন্য তিনি ﷺ প্রাণ ভরে দু’আ করলেন। অন্যদিকে, আমাদের সাথে কেউ খারাপ ব্যবহার করলে তার জন্য দু’আ করা তো অনেক পরের ব্যাপার, আমরা মনে মনে তাকে অভিশাপ দেই, সুযোগ পেলেই তার গীবত করি; ক্ষমা তো দূরের কথা কিভাবে উলটো তাকে বিপদে ফেলা যায় সেই চেষ্টা করি।

মহান আল্লাহ ﷻ সত্যই বলেছেন যে – “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ রয়েছে আল্লাহর রাসূল-এর মধ্যে” (সূরা আহযাব ৩৩:২১)

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় এখানে: https://www.facebook.com/adnan.faisal/posts/10155833487980361

Advertisements

2 thoughts on “সাওয়াদের কাহিনী

  1. পিংব্যাকঃ রাসুল (ﷺ)-এর ধৈর্য ও সহনশীলতা | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ রাসুল (ﷺ)-এর তিনটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট যা খুব কম মানুষের মাঝেই পাওয়া যায় | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s