বিদআতের একাধিক সংজ্ঞা আছে

Photo credit: flickr[dot]com/photos/amangelo/5326186184

Photo credit: flickr[dot]com/photos/amangelo/5326186184

মালয়েশিয়ার অনেক মসজিদে প্রতি বৃহস্পতিবার মাগরিবের নামাযের পর সম্মিলিতভাবে সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করা হয়। তিলাওয়াত শেষে কিছু যিকির-আযকার ও দু’আর মাধ্যমে সাপ্তাহিক এই আনুষ্ঠানিকতাটি শেষ হয়। এই কাজটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সংস্কৃতির একটি অংশে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে যারা এখানে আসেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্থানীয়দের সাথে এই আনুষ্ঠানিকতায় শামিল হন, অনেকেই আবার এতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। যারা এতে অংশ নেন তারা বলেন যে, এটি একটি উত্তম কাজ। যারা এর থেকে বিরত থাকেন তারা বলেন যে, এটি একটি বিদআত। এটি কি আসলেই একটি উত্তম কাজ? নাকি, এটি বিদআত?

***

আপনি যদি সৌদি আরবের মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা একজন আলিমের কাছ থেকে বিদআতের সংজ্ঞা জানতে চান তাহলে তা হবে অনেকটা এরকম: “আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে যদি বিশেষ সময়ে বিশেষ পদ্ধতিতে কোনো একটি ধর্মীয় আচার পালন করা হয়, কিন্তু না রাসুলুল্ললাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে তা পালন করেছেন বা করতে বলেছেন, না খুলাফায়ে রাশিদীন তা পালন করেছেন বা করতে বলেছেন, না সালাফুস-সালিহীন তা পালন করেছেন বা করতে বলেছেন, তাহলে সেই বিশেষ ধর্মীয় আচারটি বিদআত বলে গণ্য হবে।” বিদআত একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদআতের ব্যাপারে কঠোর ভাষায় সাবধান করে গেছেন।

এবার তাহলে প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মসজিদে মসজিদে সম্মিলিতভাবে সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াতের বিষয়টিকে একটু খতিয়ে দেখা যাক। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এমনটি করতেন কি? না। তিনি এমনটি করতে বলেছেন কি? না। সাহাবীরা করেছেন কি? না। এভাবে প্রশ্ন করতে থাকলে প্রতিটি প্রশ্নেরই উত্তরই ‘না’ আসতে থাকবে। অতএব, প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মসজিদে মসজিদে সম্মিলিতভাবে সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করা একটি বিদআত।

***

চলুন, এবার আমরা চলে যাই মিসরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা একজন আলিমের কাছে। তাঁর দেওয়া বিদআতের সংজ্ঞাটি হবে অনেকটা এরকম: “আমরা চাইলে বিশেষ সময়ে বিশেষ পদ্ধতিতে কোনো একটি ধর্মীয় আচার পালন করতে পারি, চাই তার দৃষ্টান্ত রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ থেকে সরাসরি পাওয়া যাক বা না যাক, চাই তার দৃষ্টান্ত সালাফুস-সালিহীনদের আমল থেকে পাওয়া যাক বা না যাক। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো, সেই মূল কাজটি শরিয়তে অনুমোদিত থাকতে হবে। কাজটি কেবলমাত্র তখনই বিদআত বলে গণ্য হবে যখন মানুষ মনে করতে শুরু করবে যে, সেই বিশেষ কাজটি করতেই হবে এবং সেটি না করলে আমাদেরকে গুনাহগার হতে হবে। আর তেমনটি মনে না করলে কাজটি করা বৈধ। কেউ চাইলে তাতে অংশ নিতে পারে, কেউ চাইলে বিরতও থাকতে পারে।”

এবার আমরা দ্বিতীয় এই সংজ্ঞাটির আলোকে প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মসজিদে মসজিদে সম্মিলিতভাবে সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াতের বিষয়টিকে একটু খতিয়ে দেখি। সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত একটি উত্তম কাজ, কারণ এখানে আল্লাহর কালাম থেকে তিলাওয়াত করা হচ্ছে। আল্লাহর কালামের প্রতিটি আয়াতই বরকতময়। মূল কাজটি শরিয়তে অনুমোদিত। কেউ চাইলে বিশেষ সময়ে বিশেষ পদ্ধতিতে এই আমলটি করতে পারেন। কেউ চাইলে সম্মিলিতভাবে আমলটি করতে পারেন, কেউ চাইলে একাকীও তা করতে পারেন। এটি কেবলমাত্র তখনই বিদআত বলে গণ্য হবে যখন মানুষ মনে করতে শুরু করবে যে, প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মসজিদে সমবেত হয়ে সম্মিলিতভাবে সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করতেই হবে এবং সেখানে হাজির থাকতে না পারলে গুনাহ হবে। আর মানুষ তেমনটি মনে না করলে এটি একটি বৈধ ধর্মীয় আমল বলে গণ্য হবে।

***

এই সংক্ষিপ্ত আলোচনাটুকু থেকে আমাদের বুঝতে পারা উচিৎ যে:

১। বিদআতের একাধিক সংজ্ঞা আছে;

২। উসুলের ভিন্নতার কারণে একজন আলিমের মতে একটি কাজ বিদআত বলে গণ্য হলেও আরেকজন আলিমের কাছে সেটি পুরোপুরি বৈধ বলে গণ্য হতে পারে;

৩। উভয় আলিমই তাঁদের নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সঠিক অবস্থানে আছেন, তাই এঁদের কাউকেই অসম্মান করা আমাদের জন্য উচিৎ হবে না।

অতএব, অন্য মানুষকে বিদআতি বলে সমালোচনা করার আগে আমাদের মনে রাখা উচিৎ যে, তাদের আমলের পিছনেও প্রাজ্ঞ আলিমদের সমর্থন থাকতে পারে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর দীনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং সেই সাথে আমাদের সবাইকে পরস্পরের প্রতি আরও বেশি সহিষ্ণু হওয়ার তৌফিক দিন।

Advertisements

7 thoughts on “বিদআতের একাধিক সংজ্ঞা আছে

  1. পিংব্যাকঃ কেন আমি সালাফি হয়েছিলাম, কেনইবা আবার হানাফি হলাম | আমার স্পন্দন

  2. ভাই তাহলে তো অনেক কিছুকেই যেমন মিলাদ, চল্লিশা, কুর’আনখানি ইত্যাদিকে জায়েজ বানানো যাবে। নবী(সাঃ) এর উপর দরূদ তো খারাপ কিছু না আবার কুর’আন তিলাওয়াত তো খারাপ কিছু না।এভাবে বলতে গেলে বিদ’আত খুজে পাওয়া খুব কঠিন হবে।

    • আমি নিজে থেকে কিছুই বলিনি। আলিমদের কথাকে খুবই সহজ ভাষায় উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি মাত্র।

      মোটা দাগে বললে, উম্মাহর বড় বড় আলিমদের মধ্যে বিদআতের সংজ্ঞা নিয়ে তিনটি ভিন্ন স্কুল অফ থট আছে:
      ১। সুন্নাহ ও সালাফদের আমল থেকে যেসব ইবাদাত প্রমাণিত নয় সবই বিদআত;
      ২। বিদআত দুই প্রকার: বিদআহ হাসানাহ (উত্তম বিদআত) ও বিদআহ সাইয়্যিয়াহ (মন্দ বিদআত); এবং
      ৩। প্রয়োগ ভেদে বিদআত পাঁচ প্রকার: ওয়াজিব (অবশ্য করণীয় বিদআত), মুস্তাহাব (উত্তম বিদআত), মুবাহ (বৈধ বিদআত), মাকরুহ (অপছন্দনীয় বিদআত) এবং হারাম (নিষিদ্ধ বিদআত)।

      এই তিনটি মতের প্রতিটির পক্ষেই উম্মাহর রথীমহারথী আলিমরা আছেন।

      এখন, আমাদের করণীয় কী? এই তিনটি সংজ্ঞার মধ্যে যে কোনো একটিকে আমি অনুসরণ করব, কিন্তু একই সাথে বাকী দু’টি সংজ্ঞার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকব। এই মনোভাব আমাদের মধ্যে আনতে না পারলে মুসলিমদের পারস্পরিক ঐক্য অর্জন করা সম্ভব নয়।

      এবার আপনার দেওয়া উদাহরণগুলির প্রসঙ্গে আসি। আপনি যদি প্রথম সংজ্ঞার অনুসারী হয়ে থাকেন তাহলে আপনি এগুলো পালন করবেন না। এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু আপনি যদি মনে করে থাকেন যে, পরবর্তী দু’টি সংজ্ঞা ভুল তাহলে আপনি পরোক্ষভাবে বোঝাতে চাচ্ছেন যে, আপনি ইবনে হাজার আল-আসকালানি বা ইযযুদ্দিন বিন আব্দুস সালামের মতো আলিমদের চাইতে ইসলাম বেশি বোঝেন। নিজেকে এত বড় জ্ঞানী ও বুযুর্গ মনে করাটা অনেক বেশি বেয়াদবি হয়ে যায় না কি?

      প্রশ্ন উঠতে পারে যে, শেষ দু’টি সংজ্ঞা অনুযায়ী তাহলে বিদআত বলে আদৌ কিছু আছে কি? আছে। এই দু’টি সংজ্ঞা অনুযায়ীই কোনো কাজ যদি ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ না হয়ে থাকে তাহলে তাকে ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করা অবশ্যই মন্দ এবং নিষিদ্ধ শ্রেণীর বিদআত। যেমন, মানুষ যদি মনে করতে শুরু করে যে, চল্লিশা পালন করা ওয়াজিব, সেটি করতেই হবে, এবং না করলে অবশ্যই গুনাহ হবে — তাহলে আলিমদের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী সেটি বর্জনীয় পর্যায়ের বিদআত বলে গণ্য হবে।

      আশা করি, বিষয়টি কিছুটা হলেও বোঝাতে পেরেছি। আল্লাহ সবচেয়ে উত্তম জানেন।

  3. আলিমের কথা দিয়া কি করবেন ভাই আল্লাহর রাসূল (স:) কি বলছেন তা দেখেন, তিনি বলেছেন সকল বেদাতই পথভ্রষ্টতা। এই ব্যাপারে মাওলানা আব্দুর রহীম (র) এর সুন্নাত ও বিদায়াত বইটা পড়তে পারেন যা কিন্ আপনার জ্ঞানের দুয়ার খুলে দেবে।
    আরও দেখতে পাড়েন: https://www.youtube.com/watch?v=NcjyTAP9SpM ,
    https://www.facebook.com/Islamicalo/?ref=notif&notif_t=notify_me_page&notif_id=1464095836280228 ,
    আরও জানতে চাইলে বইলেন।

    • আপনার বক্তব্যটি স্ববিরোধী। আপনি শুরুতে বলেছেন যে, “আলিমের কথা দিয়া কি করবেন ভাই”, এরপর আবার মাওলানা আব্দুর রহীম (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)-এর একটি বই পড়তে বললেন, যিনি কিনা একজন আলিম ছিলেন! আশা করি, ভবিষ্যতে এরকম স্ববিরোধী কথা বলবেন না।

      দ্বিতীয়ত, আপনি ধারণা করে নিয়েছেন যে, আপনি যে বইয়ের কথা বলেছেন এবং অন্য যে দু’টি রিসোর্স শেয়ার করেছেন তার বিষয়বস্তুর সাথে আমি পরিচিত নই। এভাবে ধারণা করে কথা বলা উচিৎ নয়। আপনি জানেন না আমি কী জানি না। আপনি এও জানেন না আমি কী জানি। সুতরাং, স্রেফ অনুমানের ভিত্তিতে “আরও জানতে চাইলে বইলেন” — এধরণের কথা বলা সমীচীন নয়।

      তৃতীয়ত, আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোনো কথা বলেছেন কি বলেননি তা গায়েবি উপায়ে নয়, বরং আলিমদের মাধ্যমেই সংরক্ষিত হয়েছে। কোনো বর্ণনা সহিহ, হাসান, দ্বয়িফ নাকি মাউদ্বু — তা আলিমরাই নির্ধারণ করেছেন। মতনে কোনো ত্রুটি আছে কি না তা আলিমরাই বিশ্লেষণ করেছেন। একাধিক হাদিসের মধ্যে সমন্বয় সাধণের দুরুহ কাজটি আলিমরাই করেছেন। আমরা যদি আলিমদের না মানি তাহলে হাদিস বা ফিকাহশাস্ত্রের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। যে যার মত অনুযায়ী চলবে। ফলে, সমাজে মারাত্নক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।

      চতুর্থত, সাহাবীদের সময় থেকেই দীনের শাখাগত বিষয়ে মতপার্থক্য চলে আসছে। বর্তমানে আমরা আলিমদের মধ্যে যেসব মতপার্থক্য দেখতে পাচ্ছি তার উৎপত্তি সেখান থেকেই। সালাফরা সবাই এক মতের ওপর ছিলেন — এই ধারণাটিও সঠিক নয়।

      আশা করি, ভবিষ্যতে কোনো কমেন্ট করার আগে এই বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন।

    • WASN’T MR. ABDUR RAHIM AN ALEEM?
      I SUPPOSE NO! OKEY! YOU FOLLOW SOMEONE WHO DOESN’T HAVE ISLAMIK KNOWLEDGE!

      PLEASE COME TOWARDS LIGHT, COME TOWARDS UNITY.

      PEOPLE LIKE MR. RAHIM, THEY SPREAD RIOT AND CHAOS.

      ALLAH SAID “DON’T CREAT FESAD, ITS EVEN MORE DANGEROUS THAN KILLING”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s