আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (২): বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে

সূরা আল-বাক্বারাহ-এর ৮৩তম আয়াতের ওপর ধারাবাহিক আলোচনার দ্বিতীয় কিস্তি।

আল্লাহ ﷻ এই আয়াতে আমাদেরকে এমন কিছু করতে বলবেন, যেগুলো আমরা সচরাচর শুনতে চাই না। বরং কেউ আমাদেরকে এই কথাগুলো বললে আমাদের গা জ্বালা করে, আমরা নানা টালবাহানা করে, অজুহাত দেখিয়ে এগুলো এড়িয়ে যেতে যাই। আজকে আমরা মুসলিমরা কত নীচে নেমে গেছি, সেটা এই আয়াত থেকে একেবারে পরিষ্কার হয়ে যাবে—

2_83

মনে করে দেখ, যখন আমি বনী ইসরাইলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম: “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুরই ইবাদত করবে না; বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে করবে; এবং নিকটাত্মীয়, অসহায়-এতিম আর গরিব-সামর্থ্যহীনদের সাথেও; মানুষের সাথে খুব সুন্দর ভাবে কথা বলবে; সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দিবে।” এরপরও তোমাদের কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলে। তোমরা কথা দিয়ে কথা রাখোনি। [আল-বাক্বারাহ ৮৩]

বনী ইসরাইলিরা ছিল সেই যুগের মুসলিম। তাদের কাছ থেকে আল্লাহ ﷻ কিছু অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। তারা সেগুলো মানেনি। আল্লাহ ﷻ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আজকের যুগের মুসলিমরা হচ্ছে বনী ইসরাইলের উত্তরসূরি। আমরা কতখানি সেই অঙ্গীকার মানছি দেখা যাক— 

অঙ্গীকার ১:  আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুরই ইবাদত করবে না

অঙ্গীকার ২: বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে

Photo credit: flickr[dot]com/photos/anthropogeo/13935958873

Photo credit: flickr[dot]com/photos/anthropogeo/13935958873

এই আয়াতে আল্লাহ ﷻ বলেননি, “বাবা-মার সাথে সবচেয়ে ভালো ব্যবহার করবে” বা “বাবা-মাকে সবচেয়ে বেশি টাকা দেবে”, বা “বাবা-মার সবচেয়ে বেশি দেখাশোনা করবে”, বরং তিনি ﷻ বলেছেন, “বাবা-মার জন্য ইহসান।” তিনি কোনো কিছু নির্দিষ্ট করে না দিয়ে এর অর্থকে ব্যাপক করে দিয়েছেন। যার মানে হলো: বাবা-মার জন্য সবকিছুতে আমাদেরকে ইহসান করতে হবে।

সাধারণত ইহসান-এর অনুবাদ করা হয়: ভালো কাজ। কিন্তু ইহসান অর্থ শুধুই ভালো কাজ নয়, বরং ভালো কাজটি সঠিক আদাবের সাথে সুন্দরভাবে করা। যেমন: আপনি একটা ফকিরকে দেখে মানিব্যাগ থেকে সবচেয়ে ছোট ছেড়া নোটটা বের করে তাকে দিতে পারেন। অথবা, আপনি এটিএম মেশিন থেকে তোলা একটা ঝকঝকে নোট তাকে দিতে পারেন এবং দেওয়ার পর তার দিকে তাকিয়ে একটা সুন্দর হাঁসি দিতে পারেন – এটা হবে ইহসান। আপনি আপনার কাজের-মেয়েকে এই ঈদে ফার্মগেটের খোলা বাজার থেকে সস্তায় একটা নতুন জামা কিনে দিতে পারেন। অথবা আপনি তাকে আপনার মেয়ের সাথে শপিং মলে নিয়ে গিয়ে, একই দোকান থেকে দুজনকে একই জামা কিনে দিতে পারেন – এটা হবে ইহসান। যারা ইহসান করে তাদেরকে আল্লাহ ﷻ কু’রআনে বহু জায়গায় এত সুন্দর সব পুরস্কারের কথা বলেছেন, যা বুঝলে মুসলিমদের মধ্যে হাতাহাতি লেগে যেত ইহসান করার প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে।

বাবা-মার সাথে আল্লাহ ﷻ সব ব্যাপারে ইহসান করতে বলেছেন। সেটা তাদের সাথে কথা বলা, ব্যবহার, পরিচর্যা, ঘরের কাজ, সপ্তাহের বাজার, ঈদের উপহার ইত্যাদি সবকিছুই ইহসান হতে হবে। অথচ আজকে আমরা অনেকেই তার উল্টোটা করি। মা-র সাথে দশ মিনিট বসে কথা বলার ধৈর্য হয় না, অথচ ওদিকে বন্ধু-বান্ধব, অফিসের কলিগের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে খোশ গল্প করতে পারি। বাবা-র সাথে দশ মিনিট কথা বলতে গেলেই শুরু হয়ে যায় তর্ক। ওদিকে অফিসের বসের অন্যায় আবদার, পিত্তি জ্বালানো অপমানকর কথা ঠিকই আমরা ফ্যাকাসে হাঁসি দিয়ে আধা ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে থেকে দিনের পর দিন হজম করি। মা ওষুধ আনতে বললে ধীরে সুস্থে হাতের সব কাজ শেষ করে, তিন দিন ভুলে যাওয়ার পর চারদিনের দিন গিয়ে নিয়ে আসি। ওদিকে গার্লফ্রেন্ড এসএমএস করল: “টিএসসি চত্বর, এক ঘণ্টার মধ্যে”, সাথে সাথে হাতের বই, খাবার সব ফেলে, লাফ দিয়ে উঠে ছুটে যাই। ঈদের দিনে বাবা-মার জন্য হাজার টাকা দামের কাপড় কিনি। ওদিকে বউয়ের জন্য বিশেষ ফ্যাশন হাউজ থেকে লক্ষ টাকার শাড়ি কিনি। আমরা বেশিরভাগ মুসলিমরা হচ্ছি ‘মুসলিম’ নামের কলঙ্ক। অমুসলিমরা একসাথে মিলে ইসলামের যা বদনাম করছে, আমরা নামে-মুসলিমরা তার থেকে বহুগুণ বেশি ইসলামের বদনাম করছি।

আপনি যখন জন্ম নিয়েছিলেন, বাথরুম করে গা মাখামাখি করে ফেলতেন, তখন আল্লাহ ﷻ আপনাকে দুজন মানুষ আপনার সেবায় ২৪ ঘণ্টা নিবেদিত করে দিয়েছিলেন, যাতে আপনার মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে আপনাকে কিছুই করতে না হয়। তারা কোনো এক অদ্ভুত কারণে নিজেদের খাওয়া, ঘুম, আরাম — সব ত্যাগ করে, চরম মানসিক এবং শারীরিক কষ্ট সহ্য করে, নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, আপনার জন্য যখন যা করা দরকার তাই করেছিলেন। তারপর আপনি একটু বড় হলেন। আপনার খাবার, জামাকাপড়, পড়ালেখা সব কিছুই তারা আপনার জন্য দিনরাত খেটে জোগাড় করে আনলেন। তাদের জীবনের কত স্বপ্ন ছেড়ে দিয়ে, কীভাবে আপনাকে একটি সুন্দর জীবন দেওয়া যায়, তার জন্য কত ত্যাগ করলেন। এই দুজন মানুষের জন্য আমরা যদি ইহসান না করি, তাহলে কার জন্য করব?

বাবা-মার সাথে ইহসান করাটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আল্লাহ ﷻ একে তাঁর ইবাদত করতে বলার ঠিক পরেই স্থান দিয়েছেন। এমনকি নামায এবং যাকাতের অঙ্গীকারের আগে। একজন মুসলিমের জন্য তাওহিদের পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে বাবা-মা। আমরা যতই ইসলামের দাওয়াতের কাজ করি, দাঁড়ি রাখি, হিজাব করি, জিহাদ করি, যদি আমাদের বাবা-মা কিয়ামতের দিন আল্লাহর ﷻ কাছে আমাদের বিরুদ্ধে কষ্ট নিয়ে অভিযোগ করেন, তাহলে আমরা শেষ!

এই ধারাবাহিকের আগামী খন্ডের আলোচ্য বিষয় — অঙ্গীকার ৩: নিকট আত্মীয়দের সাথে ইহসান

মূল লেখা এখানে: http://quranerkotha.com/baqarah-83-part1/   

Advertisements

6 thoughts on “আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (২): বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে

  1. পিংব্যাকঃ আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (৩): নিকট আত্মীয়দের সাথে ইহসান | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (৪): এতিমদের সাথে ইহসান | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (৫): গরিবদের সাথে ইহসান | আমার স্পন্দন

  4. পিংব্যাকঃ আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (৬): মানুষের সাথে খুব সুন্দরভাবে কথা বলবে | আমার স্পন্দন

  5. পিংব্যাকঃ আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (৭): সালাত প্রতিষ্ঠা করবে | আমার স্পন্দন

  6. পিংব্যাকঃ আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (৮): যাকাত দেবে | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s