আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (৩): নিকট আত্মীয়দের সাথে ইহসান

সূরা আল-বাক্বারাহ-এর ৮৩তম আয়াতের ওপর ধারাবাহিক আলোচনার তৃতীয় কিস্তি।

আল্লাহ ﷻ এই আয়াতে আমাদেরকে এমন কিছু করতে বলবেন, যেগুলো আমরা সচরাচর শুনতে চাই না। বরং কেউ আমাদেরকে এই কথাগুলো বললে আমাদের গা জ্বালা করে, আমরা নানা টালবাহানা করে, অজুহাত দেখিয়ে এগুলো এড়িয়ে যেতে যাই। আজকে আমরা মুসলিমরা কত নীচে নেমে গেছি, সেটা এই আয়াত থেকে একেবারে পরিষ্কার হয়ে যাবে—

2_83

মনে করে দেখ, যখন আমি বনী ইসরাইলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম: “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুরই ইবাদত করবে না; বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে করবে; এবং নিকটাত্মীয়, অসহায়-এতিম আর গরিব-সামর্থ্যহীনদের সাথেও; মানুষের সাথে খুব সুন্দর ভাবে কথা বলবে; সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দিবে।” এরপরও তোমাদের কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলে। তোমরা কথা দিয়ে কথা রাখোনি। [আল-বাক্বারাহ ৮৩]

বনী ইসরাইলিরা ছিল সেই যুগের মুসলিম। তাদের কাছ থেকে আল্লাহ ﷻ কিছু অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। তারা সেগুলো মানেনি। আল্লাহ ﷻ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আজকের যুগের মুসলিমরা হচ্ছে বনী ইসরাইলের উত্তরসূরি। আমরা কতখানি সেই অঙ্গীকার মানছি দেখা যাক— 

অঙ্গীকার ১:  আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুরই ইবাদত করবে না

অঙ্গীকার ২: বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে

অঙ্গীকার ৩: নিকট আত্মীয়দের সাথে ইহসান

Photo credit: Heather Paul, via flickr[dot]com/photos/warriorwoman531/5442609769/
Photo credit: Heather Paul, via flickr[dot]com/photos/warriorwoman531/5442609769/

আমাদের অনেকেরই অফিসের কলিগ, বন্ধু-বান্ধবের সাথে অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক আছে। আমরা তাদেরকে প্রতিনিয়ত ফোন করে খোঁজ খবর নিই। তাদের বার্থ-ডে, ম্যারেজ-ডে, গ্রাজুয়েশন-ডে, ফাদার-ডে, মাদার-ডে, সারভেন্ট-ডে —সব ধরনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হই। তাদের পরিবারের কেউ হাসপাতালে ভর্তি হলে সাথে সাথে ছুটে যাই। কিন্তু নিকটাত্মীয়ের সাথে থাকে চুলাচুলি সম্পর্ক। কেন ওরা আমার ছেলের জন্মদিনে কেক নিয়ে আসলো না? কেন ওরা আমাকে আগে দাওয়াত না দিয়ে অমুককে আগে দাওয়াত দিলো? কেন বিয়ের দিন ওরা আমার সাথে খেতে বসলো না? কেন ওরা ঈদের দিন আমাকে গরুর রান পাঠাল না? —এইসব ব্যাপার নিয়ে প্রতিনিয়ত আত্মীয়দের সাথে চলে ঝগড়াঝাটি। আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে বলেছেন আত্মীয়দের সাথে অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক রাখতে। অথচ আমাদের অনেকেরই আত্মীয়দের সাথে থাকে চরম শত্রুতার সম্পর্ক।

অনেক সময় আমাদের আত্মীয়দের মধ্যে অনেকে থাকেন যারা ধর্মের ব্যাপারে বেশ কঠিন। তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, মেয়েরা হিজাব করেন, কোনো গানবাজনার অনুষ্ঠানে যান না। অন্যদিকে কিছু আত্মীয় থাকেন, যারা ঠিক মুসলিম কিনা এই ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত নন। তারা হয়ত বছরে দুইবার ঈদের নামাজে আল্লাহর ﷻ সাথে দেখা করেন। কিন্তু তাদের আল্লাহর ﷻ সাথে সম্পর্ক এই পর্যন্তই।  ওদিকে তারা সপ্তাহে কয়েকদিন বেশিরভাগ সময় শপিং সেন্টারে, রেস্টুরেন্টে, পার্টি সেন্টারে পার করেন। সিঙ্গাপুরে যান ঈদের শপিং করতে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেন হিন্দুদের রীতি অনুসারে গায়ে-হলুদ, বউভাত, পান-চিনি ইত্যাদি সাত-দিন ধরে নারী-পুরুষ সব একসাথে মাখামাখি করে অনুষ্ঠান করে।

এই দুই প্রজাতির আত্মীয়রা যখন একসাথে হন, তখন ঘটে ভয়ংকর ঘটনা। ইসলামী মানসিকতার আত্মীয়রা ঈদের দিন যখন এদের বাসায় যান, তখন এই প্রগতিবাদী-আত্মীয়রা বলে উঠেন, “আরে! মাওলানা সাব এসেছেন! আসেন, আসেন, বসেন। কী সৌভাগ্য আমাদের!” মহিলারা যারা হিজাব করেন, তারা সবাই জড়সড় হয়ে বসেন এক সোফায়, আর হিজাব ছাড়া যারা, তারা যতটুকু সম্ভব দূরে ঘোরাঘুরি করেন, আর কিছুক্ষণ পরপর হিন্দি সিরিয়ালের শাশুড়ির দৃষ্টিতে হিজাব পরিহিতাদের দিকে তাকান। তারপর সারাদিন ধরে ইসলামী-আত্মীয়দের উপর চলে প্রগতিবাদীদের নানা ধরনের বিব্রতকর প্রশ্ন:

“আচ্ছা ভাই, সত্যি যদি আল্লাহ থাকে, তাহলে পৃথিবীতে এত গরিব মানুষ কেন? এত দুঃখ-কষ্ট  কেন?”
“ভাই, ইসলাম না সত্যি ধর্ম? তাহলে মুসলিমদের অবস্থা আজকে সবচেয়ে খারাপ কেন? আল্লাহ আপনাদের এই রকম বেহাল অবস্থা করে রেখেছেন কেন?”
“ভাই, আমি তো আল্লাহকে বলিনি আমাকে বানাতে? কেন সে আমাকে বানাল? তারপর আবার আমাকে এত নিয়ম কানুন দিয়ে দিলো, যা না মানলে আমাকে আবার ভয়ংকর শাস্তিও দেবে?”
“ভাই, এই যে দিন রাত নামায-রোযা করছেন। ধরেন মরার পরে গিয়ে দেখলেন ধর্মটর্ম সব মিথ্যা। তখন কী করবেন? জীবনটা তো কিছুই উপভোগ করলেন না?”

যখন প্রগতিবাদী আত্মীয়রা কোনো অনুষ্ঠানে কাকে দাওয়াত দেবেন পরিকল্পনা করেন, তখন তাদের মধ্যে আলাপ চলে, “না না, ওই মাওলানা-সাবদের দাওয়াত দেওয়া যাবে না। ওরা এই পার্টিতে আসলে আমার সব প্রেস্টিজ শেষ। এবার আমার অফিসের কলিগরা আসবে। ওদের সামনে বোরকা পরা কয়েকটা ভয়ংকর মহিলা বসে থাকবে। আমি বন্ধুদেরকে মুখ দেখাতে পারব না। থার্টি ফার্স্টের পার্টিতে আমাকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করবে।”

এর উল্টোটাও ঘটে। ইসলামী-আত্মীয়রা নিজেদের মধ্যে আলাপ করেন, “না ভাই। আমাদের এই খাস মোলাকাতে ওই জাহিলদের কোনোভাবেই দাওয়াত দেওয়া যাবে না, মা’আয আল্লাহ। ঈদের দিন একটা মুবারাক দিন। এই দিনে ওদের নাপাকি কথা-বার্তা, বেগানা আওরাতের ঘোরাফেরা, এই সব কোনোভাবেই মঞ্জুর করা যায় না। মাসজিদের ইমাম, খাতিবরা এসে ওই জাহিলদেরকে দেখলে আমার ইজ্জাত খাতাম হয়ে যাবে। নিকাহের দাওয়াতে দেখা করব, আমার দায়িত্ব শেষ, ইন শাআ আল্লাহ।”

শুধু তাই না, বছরে একবার যখন তারা যাকাত দেন, তখন তাদের যেই গরিব আত্মীয়রা নামায, রোযা করে এবং তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখে, তাদেরকে যাকাত দেন। বাকি আত্মীয়রা আরও বেশি গরিব হলেও, তারা আর যাকাত পায় না।

এই ধারাবাহিকের আগামী খন্ডের আলোচ্য বিষয় — অঙ্গীকার ৪: এতিমদের সাথে ইহসান

মূল লেখা এখানে: http://quranerkotha.com/baqarah-83-part1/ 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close