আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (৪): এতিমদের সাথে ইহসান

সূরা আল-বাক্বারাহ-এর ৮৩তম আয়াতের ওপর ধারাবাহিক আলোচনার চতুর্থ কিস্তি।

আল্লাহ ﷻ এই আয়াতে আমাদেরকে এমন কিছু করতে বলবেন, যেগুলো আমরা সচরাচর শুনতে চাই না। বরং কেউ আমাদেরকে এই কথাগুলো বললে আমাদের গা জ্বালা করে, আমরা নানা টালবাহানা করে, অজুহাত দেখিয়ে এগুলো এড়িয়ে যেতে যাই। আজকে আমরা মুসলিমরা কত নীচে নেমে গেছি, সেটা এই আয়াত থেকে একেবারে পরিষ্কার হয়ে যাবে—

2_83

মনে করে দেখ, যখন আমি বনী ইসরাইলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম: “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুরই ইবাদত করবে না; বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে করবে; এবং নিকটাত্মীয়, অসহায়-এতিম আর গরিব-সামর্থ্যহীনদের সাথেও; মানুষের সাথে খুব সুন্দর ভাবে কথা বলবে; সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দিবে।” এরপরও তোমাদের কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলে। তোমরা কথা দিয়ে কথা রাখোনি। [আল-বাক্বারাহ ৮৩]

বনী ইসরাইলিরা ছিল সেই যুগের মুসলিম। তাদের কাছ থেকে আল্লাহ ﷻ কিছু অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। তারা সেগুলো মানেনি। আল্লাহ ﷻ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আজকের যুগের মুসলিমরা হচ্ছে বনী ইসরাইলের উত্তরসূরি। আমরা কতখানি সেই অঙ্গীকার মানছি দেখা যাক— 

অঙ্গীকার ১:  আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুরই ইবাদত করবে না

অঙ্গীকার ২: বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে

অঙ্গীকার ৩: নিকট আত্মীয়দের সাথে ইহসান

অঙ্গীকার ৪: এতিমদের সাথে ইহসান

Photo credit: pexels[dot]com/photo/little-boy-playing-in-the-sand-6459/
Photo credit: pexels[dot]com/photo/little-boy-playing-in-the-sand-6459/

ইসলামে ٱلْيَتَٰمَىٰ (এতিম) শুধু বাবা-মা হারা ছোট বাচ্চারাই নয়, এমনকি যারা বয়স্ক, যাদের কেউ নেই, যাদের অবস্থার উন্নতি করার কোনো সুযোগ তাদের নেই, তারাও এতিম। 

সমাজে যত মানুষ রয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যাদের দেখাশোনা করা দরকার, একটু আদর, একটু ভালবাসা দরকার, তারা হলো এতিম বাচ্চারা। একজন বাচ্চার কাছে তার বাবা-মার থেকে বেশি জরুরি আর কে হতে পারে? ছোট বাচ্চারা অসহায়, দুর্বল। তারা নিস্পাপ, তারা অবুঝ। আজকের নিষ্ঠুর সমাজে বাবা-মা ছাড়া একটি শিশুর একা একা জীবন কী ভয়ংকর কঠিন, এটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। সমাজের অন্য যে কারো থেকে তাদের সাহায্য দরকার সবচেয়ে বেশি। আমরা যদি তাদের সাহায্যে এগিয়ে না আসি, তাহলে তারা কোথায় যাবে?

একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের সকল এতিমদের অভিভাবক হয়ে যাওয়া। এটি একটি ফরযে কিফায়া, যার অর্থ: সমাজের কেউ যদি এই দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে সমাজের সবাই একটি ফরয ভাঙার গুনাহ অর্জন করবে। জানাযার নামায পড়া যেমন ফরযে কিফায়া, তেমনি সমাজের দুস্থ, এতিমদের সবার দেখাশোনার দায়িত্ব হচ্ছে সেই সমাজের মুসলিমদের উপর ফরযে কিফায়া। অথচ আমরা জানাযার নামায যতটা না আগ্রহ নিয়ে পড়ি, এতিম, গরিবদের দেখাশোনার ব্যবস্থা করতে সেরকম চেষ্টা করি না।

এতিমদেরকে দান করে, তাদের দেখাশোনার ব্যবস্থা করে, আমরা তাদের উপর কোনো মহান অনুগ্রহ করি না। বরং এটা তাদের প্রাপ্য, আমাদের উপর তাদের হক। আমরা বসে বসে যতই ইসলামের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে বাণী কপচাই, রাজনীতির অবস্থা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি, ইসলামিক লেকচারের আয়োজন করি, কিরাত প্রতিযোগিতা করি,  জিহাদের স্লোগান দেই —যতদিন পর্যন্ত সমাজে এতিম শিশু, বৃদ্ধরা না খেয়ে রাস্তায় শুয়ে থাকে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের ফরযে কিফায়া ভাঙার গুনাহ থেকে আমাদের মুক্তি নেই। ততদিন পর্যন্ত আমরা এই কঠিন অঙ্গীকার ভাঙার ফলাফল থেকে রেহাই পাবো না, যদি না আল্লাহ ﷻ অন্য কিছু ইচ্ছা না করেন।

আল্লাহ ﷻ যখন কোনো শিশুর কদরে লিখে দিয়েছেন যে, সে তার বাবা-মাকে হারিয়ে ফেলবে, তখন ইসলামিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার অভিভাবক হয়ে যাওয়া। আজকে আমরা ব্যক্তিগতভাবে, এনজিও এবং দাতা সংগঠনগুলোর মাধ্যমে যতগুলো এতিমদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করি না কেন, আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে আরও অনেক এতিম থেকেই যাবে। এদেরকে একদল পশু হাত-পা ভেঙ্গে, গরম সীসা ঢেলে চোখ গালিয়ে দিয়ে ভিক্ষা করতে নামাবে, আর তাদের ভিক্ষার আয় কেড়ে নেবে। একারণেই আমাদের দরকার একটি ইসলামিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। একমাত্র একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব দেশের সকল এতিমদের সঠিকভাবে পালন করার জন্য যে বিপুল পরিমাণের সম্পদ, কাঠামো, লোকবল দরকার, তা দেশের মানুষের কাছ থেকে আদায় করে এতিমদের কাছে ঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া। একমাত্র একটি ইসলামিক রাষ্ট্রই এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটিকে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হিসেবে নিয়ে, রাষ্ট্রের সকল জনগণের উপর বাধ্যতামূলক করে দেবে। অন্য কোনো ধরনের সরকার এর আগে কখনো এমন করেনি, করবেও না। করতে গেলে সেই সরকারের রাজনৈতিক দলের ভোট পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। 

আমরা কয়জন জানি আমাদের এলাকায় এতিম কারা? আমরা প্রতিদিন মসজিদে নামায পড়তে ঢুকি এবং নামায শেষে বের হয়ে যে যার কাজে চলে যাই। নামাযের সময় পাশে বসা ছেড়া কাপড় পরা মলিন মুখের অসহায় দেখতে মানুষটার খবর নেওয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত অনুভব করি না। এতিমদের সাথে ইহসান করতে হলে প্রথমে আমাদেরকে তো আগে জানতে হবে আমাদের এলাকায় এতিম কারা!

আমাদেরকে মসজিদ দেওয়া হয়েছে যেন আমরা এলাকার মুসলিম ভাইদের খোঁজ খবর রাখি, একে অন্যের সাথে পরিচিত হই, বিপদে আপদে এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু আজকে মসজিদ শুধুমাত্র একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার জায়গায় পরিণত হয়েছে। কোনোমতে নামাজ শেষ করে ডানে বামে না তাকিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হয়ে যেতে পারলেই যেন বাঁচি। 

এই ধারাবাহিকের আগামী খন্ডের আলোচ্য বিষয় — অঙ্গীকার ৫: গরিবদের সাথে ইহসান

মূল লেখা এখানে: http://quranerkotha.com/baqarah-83-2/

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close