নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদীদের সীমালঙ্ঘন এবং আমাদের প্রতিক্রিয়া

আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন ক্লাসে পড়ার বইয়ের বাইরে অন্যান্য বইপত্র পড়ার সুযোগ ছিল বেশ সীমিত। ঢাকা থেকে প্রকাশিত বিচিত্রা বা পূর্ণীমার ঈদ সংখ্যা অথবা কলকাতা থেকে প্রকাশিত দেশ বা সানন্দার পুজো সংখ্যাই ছিল সাহিত্যের সাথে পরিচিত হওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের স্কুলভিত্তিক কর্মকান্ডের সুবাদেও বেশ কিছু বই পড়া হয়েছে। টুকটাক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িত থাকার কারণে স্কুলের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার হিসেবে অনেক বই ফি বছর আমার হাতে আসত। সেগুলোও মজা করে পড়তাম। এর বাইরে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ বা শরৎ রচনাবলী অনেক বাড়ির আলমারিতে শোভা পেত। যারা বেশি পড়ুয়া তাদের আলমারিতে থাকত সুনীল, সমরেশ বা শীর্ষেন্দুর বই। আর হুমায়ূন আহমেদের বই ছিল আম জনতার খোরাক।

মস্কোর প্রগতি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত কিছু বইপত্রও কারও কারও হাতে দেখা যেত। আরজ আলী মাতুব্বর বা হুমায়ুন আজাদের লেখাও যে কেউ কেউ পড়ত না তা নয়। তবে, এসব লেখার সাথে একজন কিশোরের পরিচয় হতো কোনো ‘বড় ভাইয়ের’ হাত ধরে। ‘বড় ভাইয়ের’ সাথে পরিচয় না থাকলে এরকম লেখা যে আসলেই আছে তা আমাদের প্রজন্মের কিশোরদের জানাশোনার অগোচরে থেকে যেত।

ইন্টারনেটের ব্যাপক প্রসারের সাথে সাথে অন্য মানুষের লেখালেখির সাথে আমাদের পরিচয়ের ধারণাটি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। রিচার্ড ডকিন্স বা আমাদের দেশের কথিত মুক্তমনা সম্প্রদায় – এরা এখন আর ‘বড় ভাইয়ের’ হাত ধরে আমাদের হাতে পৌঁছে না। সার্চ ইঞ্জিনের একটি রেজাল্ট অথবা ফেসবুক বা টুইটারে শেয়ার হওয়া কোনো লিঙ্কই এজন্য যথেষ্ট। শুধু তাই নয়, ফেসবুক এবং একাধিক ফ্রি ব্লগিং প্ল্যাটফর্মের সৌজন্যে এখন যে কেউই যে কোনো বিষয়ে লিখতে পারছেন। সমমনা লেখকরা মিলে তৈরি করছেন তাদের নিজস্ব কমিউনিটি ব্লগ এবং গ্রুপ। এসব লেখার পাঠকও নেহায়েত মন্দ নয়। কেবলমাত্র স্বঘোষিত মুক্তমনারা নন, ধার্মিক মানুষরাও প্রযুক্তির এই ব্যবহার থেকে পিছিয়ে নেই। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই আজ ফেসবুক ও ব্লগে ইসলাম ও মুসলিমদের পক্ষে লিখছেন।

***

প্রযুক্তি মানুষকে ভালোর দিকে ডাকে না, মন্দের দিকেও ডাকে না। প্রযুক্তির ভালো বা মন্দ নির্ভর করে তার ব্যবহারকারীদের ওপর। ইন্টারনেটের ব্যাপক প্রসারের কল্যাণে যারা আজ লেখক বনে গেছেন তাদের অনেকেই গঠণমূলক লেখা লিখলেও এমন অনেকেও আছেন যাদের লেখায় সুস্থ্য রুচির ছাপ তো নেইই, বরং আছে ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষ। দুঃখজনকভাবে, স্বঘোষিত মুক্তমনা ও স্বঘোষিত ধর্মযোদ্ধা – এই উভয় দলের মধ্যেই এই দ্বিতীয় প্রকারের মানুষ আছেন।

Photo credit: commons[dot]wikimedia[dot]org/wiki/File:2010-03-08_Shattered_side_mirror_on_BMW.jpg
Photo credit: commons[dot]wikimedia[dot]org/wiki/File:2010-03-08_Shattered_side_mirror_on_BMW.jpg
আমার পর্যবেক্ষণ হলো, বাংলাদেশে অনলাইনে ঘৃণার এই চর্চাটি তথাকথিত মুক্তমনাদের হাত ধরে শুরু হয়েছে। বাংলা ভাষায় ব্লগিঙের প্রাথমিক দিনগুলোতে এরাই ব্লগগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করত। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম এবং সেই ধর্মের নবী ও ধর্মগ্রন্থকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল ভাষায় অনেক কথা বলা হয়েছে। স্বঘোষিত ধর্মযোদ্ধারাও পাল্টা লড়াইয়ে শামিল হয়েছে, তবে বেশ পরে। এদের অনেকের মধ্যেও শালীনতাবোধ ও পরিমিতিবোধের যথেষ্ট অভাব লক্ষ্য করা গেছে।

***

কেউ যদি নাস্তিক বা অজ্ঞেয়বাদী হতে চায় তবে তাকে সর্বোচ্চ বোঝানো যেতে পারে। জবরদস্তির কোনো সুযোগ এখানে নেই। আমার ধর্ম আমাকে সেই শিক্ষাই দিয়েছে। আমার ধর্মগ্রন্থ কুরআন বলছে, “বলে দাও, তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তো সত্য এসে গেছে। এখন যার ইচ্ছা ঈমান আনুক এবং যার ইচ্ছা কুফর অবলম্বন করুক।” [১৮:২৯]

আস্তিক, নাস্তিক বা অজ্ঞেয়বাদী হওয়ার স্বাধীনতা আমাদের স্রষ্টা আমাদেরকে দিয়েছেন। ঈমান আনার বা না আনার স্বাধীনতা তিনি আমাদেরকে দিয়েছেন। এই দুনিয়াতে এজন্য জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই। জবরদস্তি না থাকার অর্থ জবাবদিহিতা না থাকা নয়। জবাবদিহিতা অবশ্যই আছে। মৃত্যুর পরে আমাদের সবাইকে আমাদের স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতেই হবে।

অন্যরা যে যাই করুক না কেন, ভিন্নমতাবলম্বীদের গালমন্দ করা কোনো ভালো মুসলিমের কাজ নয়। আমার ধর্মগ্রন্থ কুরআন আমাকে শিখিয়েছে, “(হে মুসলিমগণ!) তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকে, তোমরা তাদের গালমন্দ করো না। কেননা পরিণামে তারা অজ্ঞতাবশত সীমালঙ্ঘন করে আল্লাহকেও গালমন্দ করবে।” [৬:১০৮] কোনো নাস্তিক বা অজ্ঞেয়বাদীর অশ্লীল কথার প্রতিউত্তরে আমিও যদি সীমালঙ্ঘন করে বসি তাহলে প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাদের সীমালঙ্ঘন আরও বেড়ে যেতে পারে এবং তারা তাদের ইসলামবিদ্বেষের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তেমনটি হলে তাদের পরবর্তী এসব কটু কথার দায় আমার উপরেও বর্তায়। কুরআন তেমনটিই বলছে।

মাথা ঠান্ডা রাখাই এক্ষেত্রে সর্বোত্তম সমাধান। “সুতরাং (হে রাসুল!) তারা যা-কিছু বলছে, তুমি তাতে সবর করো।” [কুরআন, ৫০:৩৯] আল্লাহ, ইসলাম, কুরআন এবং ইসলামের নবীকে নিয়ে অতীতেও অনেকে অনেক কটু কথা বলেছে, এখনও বলছে, ভবিষ্যতেও বলবে। সবার সব কথার জবাব দেওয়ার জন্য আমাদেরকে এই দুনিয়াতে পাঠানো হয়নি। আমাদের কর্তব্য হলো ঈমান আনা ও ঈমানদারের মতো আচরণ করা এবং ঈমানের এই মাধুর্যকে অন্য মানুষের মাঝে প্রচার করা। যে সৌভাগ্যবান সে ঈমান আনবে। যে হতভাগা সে ঈমান আনতে পারবে না। আমাদেরকে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।

***

আদর্শকে আদর্শ দিয়ে মোকাবেলা করতে হয়। বল প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো আদর্শকে দীর্ঘমেয়াদে দমিয়ে রাখা যায় না। মক্কার কুরাইশরা শক্তি প্রয়োগ করে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল। পারেনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন দীর্ঘ সাত দশক ধরে সেখানকার মানুষকে ধর্মবিমুখ করতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি। তারা ব্যর্থ হয়েছে। রাশিয়ায় মানুষ আবার ধর্মের দিকে ফিরে আসছে।

ধর্মে বিশ্বাসের মতো ধর্মবিদ্বেষও একটি আদর্শ। ধর্মের অনুসারীদের যেমন বল প্রয়োগ করে দমিয়ে রাখা যায়নি, তেমনি ধর্মবিদ্বেষীদেরকেও ভয়ভীতি দেখিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে না। তারা তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। আসল নামে লিখতে না পারলে পরিচয় গোপন করে ছদ্মনামে লিখবে। দেশে বসে লিখতে না পারলে বিদেশে বসে লিখবে। ঢাকা থেকে বই প্রকাশ করতে না পারলে কলকাতা বা বার্লিন থেকে বই ছাপাবে।

তারা যদি তাদের কাজ চালিয়েই যায় তাহলে কেন তাদেরকে উদ্দেশ্য করে সহিংস হওয়া হচ্ছে? এর মাধ্যমে তাদেরকে ও তাদের লেখাকে কি আরও জনপ্রিয় হতে সাহায্য করা হচ্ছে না? এর মাধ্যমে কুরআনের অনুসারীদেরকেও কি বিপদের মুখে ফেলে দেওয়া হচ্ছে না?

আমাদের সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক। কুরআনের পথনির্দেশনা হোক আমাদের পাথেয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাহায্য করুন।

Advertisements

1 thought on “নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদীদের সীমালঙ্ঘন এবং আমাদের প্রতিক্রিয়া

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে।

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close