আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (৫): গরিবদের সাথে ইহসান

সূরা আল-বাক্বারাহ-এর ৮৩তম আয়াতের ওপর ধারাবাহিক আলোচনার পঞ্চম কিস্তি।

আল্লাহ ﷻ এই আয়াতে আমাদেরকে এমন কিছু করতে বলবেন, যেগুলো আমরা সচরাচর শুনতে চাই না। বরং কেউ আমাদেরকে এই কথাগুলো বললে আমাদের গা জ্বালা করে, আমরা নানা টালবাহানা করে, অজুহাত দেখিয়ে এগুলো এড়িয়ে যেতে যাই। আজকে আমরা মুসলিমরা কত নীচে নেমে গেছি, সেটা এই আয়াত থেকে একেবারে পরিষ্কার হয়ে যাবে—

2_83

মনে করে দেখ, যখন আমি বনী ইসরাইলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম: “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুরই ইবাদত করবে না; বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে করবে; এবং নিকটাত্মীয়, অসহায়-এতিম আর গরিব-সামর্থ্যহীনদের সাথেও; মানুষের সাথে খুব সুন্দর ভাবে কথা বলবে; সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দিবে।” এরপরও তোমাদের কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলে। তোমরা কথা দিয়ে কথা রাখোনি। [আল-বাক্বারাহ ৮৩]

বনী ইসরাইলিরা ছিল সেই যুগের মুসলিম। তাদের কাছ থেকে আল্লাহ ﷻ কিছু অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। তারা সেগুলো মানেনি। আল্লাহ ﷻ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আজকের যুগের মুসলিমরা হচ্ছে বনী ইসরাইলের উত্তরসূরি। আমরা কতখানি সেই অঙ্গীকার মানছি দেখা যাক— 

অঙ্গীকার ১:  আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুরই ইবাদত করবে না

অঙ্গীকার ২: বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে

অঙ্গীকার ৩: নিকট আত্মীয়দের সাথে ইহসান

অঙ্গীকার ৪: এতিমদের সাথে ইহসান

অঙ্গীকার ৫: গরিবদের সাথে ইহসান

Photo credit: Md. Tanvirul Islam, via en[dot]wikipedia[dot]org/wiki/File:Street_Child,_Srimangal_Railway_Station.jpg
Photo credit: Md. Tanvirul Islam, via en[dot]wikipedia[dot]org/wiki/File:Street_Child,_Srimangal_Railway_Station.jpg

মিসকিন (ٱلْمَسَٰكِين) হচ্ছে খুবই গরিব মানুষরা, যাদের জন্য খাদ্য, বাসস্থান, কাপড় যোগাড় করা খুবই কঠিন। এরা সবসময় অভাবী। একজন এতিমের হয়ত উত্তরাধিকার সুত্রে সম্পত্তি থাকতে পারে। কিন্তু এদের কোনো সম্পত্তি থাকা তো দুরের কথা, মৌলিক চাহিদা পূরণ করার মতো সামান্য অবস্থাও নেই। এরা হচ্ছে সমাজের ভুলে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা।

আজকে আপনার-আমার পরিবার নিয়ে থাকার জন্য বাসা আছে। রাতে খাওয়ার মতো খাবার ফ্রিজে রাখা আছে। কালকে বাইরে পরার মতো কাপড় আছে। কিন্তু মিসকিনদের এসব কিছুই নেই। তারা প্রতিটা দিন কষ্টে, ভয়ে থাকে: কীভাবে তারা আগামীকাল কিছু খাবার, পরার মতো পরিষ্কার কাপড়, থাকার মতো জায়গা জোগাড় করবে। বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করা ছাড়া আর কিছু নিয়ে চিন্তা করার মতো অবস্থা তাদের নেই। 

আজকে এমন কোনো অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেই, যা বাধ্যতামূলকভাবে দেশের সকল মিসকিনদের অভাব দূর করে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে বাধ্য। একমাত্র একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়ে, জনগণের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত সংগ্রহ করে, একটি তহবিল গঠন করে, দেশের সকল মিসকিনদের অভাব দূর করার ব্যবস্থা করা।

যতদিন ইসলামিক আইন প্রতিষ্ঠা না হচ্ছে, ক্যাপিটালিস্ট অর্থনীতি ধনীদেরকে আরও ধনী বানিয়ে যাবে, এবং গরিবদেরকে আরও গরিব বানাতে থাকবে। আজকে পৃথিবীতে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই, যা সম্পত্তিকে সুষমভাবে বণ্টন করে ধনী-গরিবের মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য, তা দূর করতে পারে। যার ফলে সবসময় এমন কিছু মানুষ থেকে যায়, যারা তাদের প্রয়োজনের চেয়ে হাজার গুণ বেশি সম্পত্তি নিয়ে থাকে, যা তারা আমোদ ফুর্তিতে নষ্ট করে। অন্যদিকে এমন কিছু মানুষ সবসময় থেকে যায়, যারা দুই বেলা খাবারও জোগাড় করতে পারে না। সম্পদ সুষমভাবে বণ্টনের এমন কোনো পদ্ধতি কোনো সরকার যদি তৈরি করার চেষ্টাও করে, তখন দেশের বড় বড় ধনকুবেররা ব্যবস্থা করে দিবে যেন সেই সরকার বেশিদিন টিকে থাকতে না পারে।

আল্লাহর ﷻ বিরুদ্ধে মানুষের একটি সাধারণ অভিযোগ হলো: আল্লাহ ﷻ কেন পৃথিবীতে এত মানুষ পাঠালেন, কিন্তু তাদের জন্য যথেষ্ট খাবার, প্রাকৃতিক সম্পদ, থাকার জায়গা দিয়ে পাঠালেন না। এটি একটি বিরাট ভুল ধারণা যে, পৃথিবীতে এত যে গরিব মানুষ, তার মূল কারণ পৃথিবীতে সম্পদের অভাব। পৃথিবীত মাত্র ১% মানুষ পুরো পৃথিবীর ৪৮% সম্পদ দখল করে রেখেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ১০% মানুষ পুরো পৃথিবীর ৮৫% সম্পদের অধিকারী! মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, যা কিনা প্রায় ৩৫০ কোটি মানুষ, আজকে পৃথিবীর মোট সম্পদের মাত্র ১%-এর উপর বেঁচে আছে!

শুধু তাই না, মাত্র ২% সবচেয়ে ধনী মানুষগুলো পুরো পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি বাড়ি এবং জমির মালিক। বাকি অর্ধেক জমি এবং বাড়ির মধ্যে বাকি ৯৮% জনসংখ্যা বসবাস করছে। মানুষের মধ্যে আজকে যে এই চরম বৈষম্য, তার প্রধান কারণ মানুষের সীমাহীন লোভ, দুর্নীতি এবং ক্যাপিটালিস্ট অর্থনীতি। সুদ একটি বড় কারণ যা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে করে বড়লোকরা বসে বসে আরও বড়লোক হয়, আর মধ্যবিত্ত এবং গরিবরা অমানুষিক খাটার পরেও দিনে দিনে আরও গরিব হতে থাকে।

পুরো পৃথিবীর সব মানুষকে, পুরো ৬০০ কোটি মানুষের প্রত্যেককে, একটি বাসা এবং সামনে একটি ছোট বাগান দিলেও পৃথিবীর সব মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রের এক টেক্সাস অঙ্গরাজ্যেই জায়গা দেওয়া যাবে। আল্লাহ আমাদেরকে এক বিরাট পৃথিবী দিয়েছেন, কিন্তু মাত্র ২% লোভী মানুষের কারণে আজকে ১৬০ কোটি মানুষ দিনে একবেলাও খেতে পারে না।

বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলার খরচ করলে, সারা পৃথিবী থেকে ক্ষুধা দূর করে ফেলা সম্ভব। একটি লোকও তখন না খেয়ে থাকবে না। অথচ বছরে ১,২০০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয় অস্ত্রের পেছনে। একটি দেশের খাবার অপচয়ের পেছনে নষ্ট হয় ১০০ বিলিয়ন ডলার। ‘অবিস’ বা অতিরিক্ত মোটারা বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত খাবার খায়। একদিকে মানুষ না খেয়ে মারা যায়, আর অন্যদিকে মানুষরা অতিরিক্ত খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়।

আল্লাহ কখনই মানব জাতির কোনো ক্ষতি করেন না, বরং মানুষরাই মানুষের ক্ষতি করে। [সূরা ইউনুস, ১০:৪৪]

এই ধারাবাহিকের আগামী খন্ডের আলোচ্য বিষয় — অঙ্গীকার ৬: মানুষের সাথে খুব সুন্দরভাবে কথা বলবে 

মূল লেখা এখানে: http://quranerkotha.com/baqarah-83-2/ 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close