আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (৬): মানুষের সাথে খুব সুন্দরভাবে কথা বলবে

সূরা আল-বাক্বারাহ-এর ৮৩তম আয়াতের ওপর ধারাবাহিক আলোচনার ষষ্ঠ কিস্তি।

আল্লাহ ﷻ এই আয়াতে আমাদেরকে এমন কিছু করতে বলবেন, যেগুলো আমরা সচরাচর শুনতে চাই না। বরং কেউ আমাদেরকে এই কথাগুলো বললে আমাদের গা জ্বালা করে, আমরা নানা টালবাহানা করে, অজুহাত দেখিয়ে এগুলো এড়িয়ে যেতে যাই। আজকে আমরা মুসলিমরা কত নীচে নেমে গেছি, সেটা এই আয়াত থেকে একেবারে পরিষ্কার হয়ে যাবে—

2_83

মনে করে দেখ, যখন আমি বনী ইসরাইলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম: “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুরই ইবাদত করবে না; বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে করবে; এবং নিকটাত্মীয়, অসহায়-এতিম আর গরিব-সামর্থ্যহীনদের সাথেও; মানুষের সাথে খুব সুন্দর ভাবে কথা বলবে; সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দিবে।” এরপরও তোমাদের কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলে। তোমরা কথা দিয়ে কথা রাখোনি। [আল-বাক্বারাহ ৮৩]

বনী ইসরাইলিরা ছিল সেই যুগের মুসলিম। তাদের কাছ থেকে আল্লাহ ﷻ কিছু অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। তারা সেগুলো মানেনি। আল্লাহ ﷻ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আজকের যুগের মুসলিমরা হচ্ছে বনী ইসরাইলের উত্তরসূরি। আমরা কতখানি সেই অঙ্গীকার মানছি দেখা যাক— 

অঙ্গীকার ১:  আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুরই ইবাদত করবে না

অঙ্গীকার ২: বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে

অঙ্গীকার ৩: নিকট আত্মীয়দের সাথে ইহসান

অঙ্গীকার ৪: এতিমদের সাথে ইহসান

অঙ্গীকার ৫: গরিবদের সাথে ইহসান

অঙ্গীকার ৬: মানুষের সাথে খুব সুন্দরভাবে কথা বলবে

Photo credit: Jill Wellington, via pixabay[dot]com/en/summer-still-life-garden-outdoors-783347/
Photo credit: Jill Wellington, via pixabay[dot]com/en/summer-still-life-garden-outdoors-783347/

কু’রআনে বেশ কয়েকটি আয়াতে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে মানুষের সাথে সুন্দর করে কথা বলতে বলেছেন। কথা বলার সময় নরম স্বরে, খোলা মন নিয়ে মানুষের সাথে কথা বলতে হবে, সে যেই হোক না কেন — হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, সুন্নি, শিয়া, আহমেদিয়া-কাদিয়ানী, গোঁড়া মুসলিম, নামে-মুসলিম, ঘোরতর কাফির-মুশরিক, আমাদের সালাফি, হানাফি, শাফেয়ি, সূফী ভাই-বোন — সবার সাথে আমাদেরকে সুন্দরভাবে কথা বলার নির্দেশ আল্লাহ ﷻ দিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ ﷻ বলেননি সবসময় ‘সুন্দর কথা’ বলতে। বরং সত্য কথা সবসময় বলতে হবে, সেটা যতই অপ্রিয়, অনাকাঙ্খিত হোক না কেন। শুধু খুব সাবধানে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন বলার ধরণটা সবসময় হুসনা حُسْنًا অর্থাৎ সুন্দর, নম্র হয়। 

আল্লাহ ﷻ যখন নবী মুসাকে ﷺ ফিরাউনের কাছে পাঠালেন, তখন তিনি ﷻ বলে দিয়েছিলেন মুসা ﷺ যেন ফিরাউনের সাথে নম্র ভাবে কথা বলেন—

তোমরা তার সাথে নম্রভাবে কথা বলবে। হতে পারে সে চিন্তা-ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে। [ত্বাহা ২০:৪৪]

ফিরাউনের মতো একজন সাইকোপ্যাথ, সিরিয়াল কিলার, যে কিনা হাজারে হাজারে শিশু জবাই করে হত্যা করত, মেয়েদেরকে বাঁচিয়ে রাখত তাদের সম্ভ্রম কেড়ে নেওয়ার জন্য — তার সাথে আল্লাহ ﷻ যদি এভাবে কথা বলতে বলেন, তাহলে আমরা কীভাবে মানুষের সাথে খারাপভাবে কথা বলতে পারি? আমরা যাদের সাথে কথা বলি, তারা কেউ কি ফিরাউনের চেয়েও খারাপ? 

কোনো কারণে উপমহাদেশের মানুষদের, বিশেষ করে মুসলিমদের মুখ বড়ই খারাপ। আমরা কথায় কথায় মানুষকে খোঁটা দেই, অপমান করি, গালি দেই। পশ্চিমা দেশগুলোতে একজন বাস ড্রাইভার অন্যজনকে দেখলে হাত উঁচিয়ে সম্ভাষণ জানায়, আর আমাদের দেশের বেশিরভাগ বাস ড্রাইভাররা একে অন্যকে দেখলে বিশুদ্ধ বাংলায় গালি দেয়। পশ্চিমা দেশগুলোতে ব্যাংক, হাসপাতাল, সরকারি অফিসে গেলে সেখানকার কর্মচারীরা হাঁসিমুখে সম্ভাষণ দিয়ে কীভাবে সাহায্য করতে পারে জিজ্ঞেস করে, যেখানে আমাদের দেশের বেশিরভাগ সরকারি কর্মচারী এমন চেহারা নিয়ে তাকায়, যেন সেবা নিতে এসে অন্যায় করে ফেলেছি। পশ্চিমা দেশের সরকারি স্কুল, কলেজের শিক্ষকদের ছাত্রছাত্রীদের গায়ে হাত তোলা তো দূরের করা, গালি পর্যন্ত দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর আমাদের দেশের অনেক সরকারি স্কুল, কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ফার্মের গরু-ছাগলের মতো পেটানো হয়, না হয় জেলখানার কয়েদীদের মতো বিকৃত সব শাস্তি দেওয়া হয়।

মসজিদে ঢুকলে দেখা যায় বেশিরভাগ মানুষ বেজার মুখ করে বসে থাকে। ব্যাপারটা এমন যে, যার মুখে যত দুঃখ ভাব বেশি, তার তাকওয়া তত বেশি। আপনি অপরিচিত কাউকে গিয়ে সালাম দিলে, সে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলবে, “ওয়ালাইকুম,… কী ব্যাপার?”

শুধু তাই না — “খাঁটি ঈমানদাররা কখনো আল্লাহর ভয়ে দুনিয়ায় হাসতে পারে না” — এই ধরনের ধারণা অনেক মুরব্বিদের এবং উঠতি মুসলিমদের এখনও ছড়াতে দেখা যায়। রাসুলের ﷺ সুন্নাহ ছিল সবসময় মানুষের সামনে হাঁসি মুখে থাকা, আর আজকে অনেক মুসলিমরা তাঁর থেকেও বেশি তাকওয়া দেখাতে গিয়ে সবসময় কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা মানুষের মতো চেহারা নিয়ে বসে থাকে।

আমরা উপমহাদেশের মুসলিম জাতিগুলো পড়ালেখা শিখলেও ঠিক শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারিনি। সৌজন্যতা, ভদ্রতা, নম্রতাকে আমাদের সংস্কৃতিতে একধরনের দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। আল্লাহ ﷻ কু’রআনে মুসলিমদেরকে যা করতে বলেছেন, সেটা পশ্চিমা দেশের অমুসলিমরা নিষ্ঠার সাথে করে এমন চমৎকার কাজের, থাকার এবং বেড়াবার পরিবেশ গড়ে তুলেছে, যা ছেড়ে সেখানকার মুসলিম অভিবাসিরা তাদের জন্মভূমির ‘মুসলিম’ ভাইবোনদেরদের কাছে তাদের কথা এবং ব্যবহারের ভয়ে সচরাচর ফিরে আসতে চায় না।

মানুষের সাথে ভালোভাবে কথা বলার, সুন্দর ব্যবহার করার, সঠিক কথা বলার অনেকগুলো নির্দেশ কু’রআনে আছে—

  • কোনো ভণিতা না করে, ধোঁকা না দিয়ে, যা বলতে চাও পরিস্কার করে বলবে – ৩৩:৭০।
  • চিৎকার করবে না, কর্কশভাবে কথা বলবে না, নম্রভাবে কথা বলবে – ৩১:১৯।
  • মনের মধ্যে যা আছে সেটাই মুখে বলবে– ৩:১৬৭।
  • ফালতু কথা বলবে না এবং অন্যের ফালতু কথা শুনবে না। যারা ফালতু কথা বলে, অপ্রয়োজনীয় কাজ করে সময় নষ্ট করে তাদের কাছ থেকে সরে যাবে – ২৩:৩, ২৮:৫৫।
  • কাউকে নিয়ে উপহাস করবে না, টিটকারি দিবে না, ব্যঙ্গ করবে না – ৪৯:১১।
  • অন্যকে নিয়ে খারাপ কথা বলবে না, কারো মানহানি করবে না – ৪৯:১১।
  • কাউকে কোনো বাজে নামে ডাকবে না। – ৪৯:১১।
  • কারো পিছনে বাজে কথা বলবে না – ৪৯:১২।
  • যাদেরকে আল্লাহ বেশি দিয়েছেন, তাদেরকে হিংসা করবে না, সে যদি তোমার নিজের ভাই-বোনও হয় – ৪:৫৪।
  • অন্যকে কিছু সংশোধন করতে বলার আগে অবশ্যই তা নিজে মানবে। কথার চেয়ে কাজের প্রভাব বেশি – ২:৪৪।
  • কখনও মিথ্যা কথা বলবে না – ২২:৩০।
  • সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঘোলা করবে না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করবে না – ২:৪২।
  • যদি কোনো ব্যাপারে তোমার সঠিক জ্ঞান না থাকে, তাহলে সে ব্যাপারে মুখ বন্ধ রাখো। তোমার মনে হতে পারে এসব সামান্য ব্যাপারে সঠিকভাবে না জেনে কথা বললে অত সমস্যা নেই। কিন্তু তুমি জানো না সেটা হয়ত আল্লাহর কাছে কোন ভয়ঙ্কর ব্যপার – ২৪:১৪, ২৪:১৬।
  • মানুষকে প্রজ্ঞার সাথে বিচক্ষণভাবে, মার্জিত কথা বলে আল্লাহর পথে ডাকবে। তাদের সাথে অত্যন্ত ভদ্রভাবে যুক্তি তর্ক করবে – ১৬:১২৫।

এই ধারাবাহিকের আগামী খন্ডের আলোচ্য বিষয় — অঙ্গীকার ৭: সালাত প্রতিষ্ঠা করবে 

মূল লেখা এখানে: http://quranerkotha.com/baqarah-83-2/  

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close