আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (৭): সালাত প্রতিষ্ঠা করবে

সূরা আল-বাক্বারাহ-এর ৮৩তম আয়াতের ওপর ধারাবাহিক আলোচনার সপ্তম কিস্তি।

আল্লাহ ﷻ এই আয়াতে আমাদেরকে এমন কিছু করতে বলবেন, যেগুলো আমরা সচরাচর শুনতে চাই না। বরং কেউ আমাদেরকে এই কথাগুলো বললে আমাদের গা জ্বালা করে, আমরা নানা টালবাহানা করে, অজুহাত দেখিয়ে এগুলো এড়িয়ে যেতে যাই। আজকে আমরা মুসলিমরা কত নীচে নেমে গেছি, সেটা এই আয়াত থেকে একেবারে পরিষ্কার হয়ে যাবে—

2_83

মনে করে দেখ, যখন আমি বনী ইসরাইলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম: “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুরই ইবাদত করবে না; বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে করবে; এবং নিকটাত্মীয়, অসহায়-এতিম আর গরিব-সামর্থ্যহীনদের সাথেও; মানুষের সাথে খুব সুন্দর ভাবে কথা বলবে; সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দিবে।” এরপরও তোমাদের কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলে। তোমরা কথা দিয়ে কথা রাখোনি। [আল-বাক্বারাহ ৮৩]

বনী ইসরাইলিরা ছিল সেই যুগের মুসলিম। তাদের কাছ থেকে আল্লাহ ﷻ কিছু অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। তারা সেগুলো মানেনি। আল্লাহ ﷻ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আজকের যুগের মুসলিমরা হচ্ছে বনী ইসরাইলের উত্তরসূরি। আমরা কতখানি সেই অঙ্গীকার মানছি দেখা যাক—  

অঙ্গীকার ১:  আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুরই ইবাদত করবে না

অঙ্গীকার ২: বাবা-মার জন্য সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে

অঙ্গীকার ৩: নিকট আত্মীয়দের সাথে ইহসান

অঙ্গীকার ৪: এতিমদের সাথে ইহসান

অঙ্গীকার ৫: গরিবদের সাথে ইহসান

অঙ্গীকার ৬: মানুষের সাথে খুব সুন্দরভাবে কথা বলবে

অঙ্গীকার ৭: সালাত প্রতিষ্ঠা করবে

Muslim Prayer Room  at Heathrow Airport
Photo credit: Kaihsu Tai, via en[dot]wikipedia[dot]org/wiki/File:Prayer_room_Heathrow_20080202.jpg

কেউ যদি নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে, তাহলে তার প্রথম কাজে-প্রমাণ হচ্ছে সালাত। আল্লাহ ﷻ এখানে বলেননি, “সালাত পড়।” বরং তিনি বলেছেন, “সালাত প্রতিষ্ঠা করো।” يُقِيمُونَ এসেছে قوم (কু’মু) থেকে যার অর্থ দাঁড়ানো, প্রতিষ্ঠা করা। প্রাচীন আরবরা যখন কোনো শক্ত পিলার স্থাপন করতো, বা শক্ত দেওয়াল তৈরি করতো, তার জন্য তারা কু’মু শব্দটি ব্যবহার করতো। এখানে কু’মু ব্যবহার করে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে বলছেন যে, আমাদের প্রতিদিনের রুটিনের মধ্যে পাঁচটি শক্ত পিলার দাঁড় করাতে হবে। সেই পিলারগুলো কোনোভাবেই নড়ানো যাবে না। আমাদের পড়ালেখা, কাজ, খাওয়া, বিনোদন, ঘুম সবকিছু এই পিলারগুলোর আশেপাশে দিয়ে যাবে। আমাদের দৈনন্দিন রুটিনে সালাত তার জায়গায় ঠিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে, কোনোভাবেই তাদেরকে নড়ানো যাবে না। 

একজন মু’মিন কখনও মেহমান আসলে ভাবে না, “আহ্‌, মাগরিবের সময় দেখি পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন মেহমান রেখে উঠে গেলে তারা আবার কী বলবে। থাক, একবারে ঈশার সাথে পড়ে নিবো।” একজন মু’মিন কাজ করতে করতে কখনও ভাবে না, “আহ্‌হা, সূর্য দেখি ডুবে যাচ্ছে। আর মাত্র দশটা মিনিট দরকার। কাজটা শেষ করে আসরের নামায পড়ে নিব। এখন কাজ ছেড়ে উঠে গেলে সব তালগোল পাকিয়ে যাবে। নামায পড়ে এসে ভুলে যাবো কী করছিলাম। আল্লাহ মাফ করেন।”

একজন মু’মিন ফজরের সালাতের জন্য রাতে উঠবে কিনা এনিয়ে চিন্তা করার সময় কখনও ভাবে না, “আমাকে সারাদিন অনেক ব্রেইনের কাজ করতে হয়। আমার রাতে টানা ৮ ঘণ্টা ঘুমানো দরকার। রাতে ফজরের নামাযের জন্য উঠলে ঠিক মতো ঘুম হয় না। সারাদিন ক্লান্ত, বিরক্ত লাগে। তারচেয়ে একবারে সকালে উঠে সবার আগে ফজরের নামায পড়ে নিলেই হবে।”

একজন মু’মিন দরকার হলে ঘড়িতে পাঁচটা এলার্ম দেয়। রাতে ফজরের সালাতে উঠার জন্য একটা নয়, তিনটা ঘড়িতে ৫ মিনিট পর পর এলার্ম দিয়ে রাখে। তার কম্পিউটারের ক্যালেন্ডারে প্রতিদিন কমপক্ষে চারটা এপয়েন্টমেন্ট দেওয়া থাকে, যেগুলোর টাইটেল হয়, “Meeting with the Lord of the Worlds”

সালাহ শব্দটির একটি অর্থ হলো ‘সংযোগ।’ সালাতের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর ﷻ সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করি, সবসময় তাঁকে মনে রাখি। আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামায একারণেই দিয়েছেন যেন আমরা কাজের চাপে পড়ে, আজেবাজে টিভি প্রোগ্রাম এবং খেলা দেখতে দেখতে এবং রাতভর ভিডিও গেম খেলতে খেলতে তাঁকে ভুলে না যাই। কারণ তাঁকে ভুলে যাওয়াটাই হচ্ছে আমাদের নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ। যখনি আমরা আল্লাহকে ﷻ একটু একটু করে ভুলে যাওয়া শুরু করি, তখনি আমরা আস্তে আস্তে কোনো অনুশোচনা অনুভব না করে খারাপ কাজ করা শুরু করি। এখান থেকেই শুরু হয় আমাদের পতন।

এই ধারাবাহিকের আগামী খন্ডের আলোচ্য বিষয় — অঙ্গীকার ৮: যাকাত দেবে   

মূল লেখা এখানে: http://quranerkotha.com/baqarah-83-2/  

Advertisements

2 thoughts on “আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার (৭): সালাত প্রতিষ্ঠা করবে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close