মাযহাবি-সালাফি বিবাদ

Muslim man praying

Photo credit: Hendrik Terbeck, via flickr[dot]com/photos/terbeck/7405008776

মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় এক সালাফি ভাইকে দেখিয়ে একজন বেশ কটু একটি কথা বললেন। তাও যে প্রসঙ্গে কথাটি বলেছেন তা তাঁর ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নয়, বরং নামাযে রাফে ইয়াদাইন করা নিয়ে। যে ভাষা তিনি ব্যবহার করলেন, তা এখানে লিখা আমার পক্ষে সম্ভব না।

অবশ্য, একই আচরণ অনেক সালাফি ভাইদের থেকেও দেখেছি। মাযহাবের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে ইমাম আবু হানিফা (র) সম্পর্কে এত অশ্লীল কথা কোনো বিধর্মীও সম্ভবত বলার আগে দুইবার চিন্তা করবে।

ভেবে দেখার বিষয় হলো, এই যে একদল অপর দলের প্রতি এত আক্রোশ, এত ঘৃণা প্রকাশ কেন করে? যদি আপনি এ ধরণের মানসিকতাসম্পন্ন কাউকে জিজ্ঞেস করেন, ভাই! সালাফিদের বা মাযহাবিদের এভাবে তিরস্কার করা কি ঠিক? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জবাব আসবে – হক কথা তো বলতেই হবে। কারো খারাপ লাগলে কিছু করার নেই।

কথা সত্য। হক কথা বলতে হবে। কিন্তু সেই হক কথা বলার পেছনে আমার উদ্দেশ্য কী? আমার উদ্দেশ্য তো এটাই, যাতে করে সে সংশোধন হয়। ভ্রান্ত মত ত্যাগ করে। তো কী মনে হয়? বছরের পর বছর যে মতবাদে আমি বিশ্বাসী, সেই মতবাদকে গালি দিয়ে তিরস্কার করে ভুল ধরার যদি চেষ্টা করা হয়, তাহলে কি সাথে সাথে আমি মেনে নিব? ভুল বুঝে আপনার পায়ে পড়ে যাব? নাকি উল্টো আরও দ্বিগুণ আক্রোশ নিয়ে এর প্রতিবাদ করব?

আল্লাহ তাআলা তাঁর কালামে বিধর্মীদের কল্পিত উপাস্যদের গালি দিতে নিষেধ করেছেন। ভেবে দেখুন, ভিত্তিহীন মনগড়া ধর্ম, কিন্তু তারপরও এর বিরুদ্ধে খারাপ ভাষা প্রয়োগ করা যাবে না। কেননা এর ফলে সে ধর্মের অনুসারীরা ভুল স্বীকার না করে উল্টো প্রতিশোধ নিবে। আল্লাহকে, আমাদের ধর্মকে গালি দিতে শুরু করবে। লাভের পরিবর্তে উল্টো ক্ষতি হয়ে যাবে।

কোরআনের এই একটি আয়াতই নসিহত গ্রহণের জন্য যথেষ্ট। আপনি সালাফি হন বা মাযহাবি, আপনার কাছে যেটা হক মনে হয়েছে, আপনি তা পালন করুন। তা হক হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করুন। আমাকে আমার বিশ্বাসের উপর আমল করতে দিন, এর যথার্থতা প্রমাণের সুযোগ দিন। জ্ঞান ও শিক্ষার মাধ্যমে আমার কাছে যেটা ভুল মনে হয়েছে, আমি তা আপনাকে ও অন্যান্যদের বোঝানোর চেষ্টা করব। আপনার কাছে আমার আকিদা ভ্রান্ত মনে হলে আপনিও তাই করুন। কিন্তু এরপরও আমরা দ্বীনি ভাই। পরস্পরকে ভালবাসা শ্রদ্ধা করা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। আপনাকে অন্যায়ভাবে সামান্য আঘাতের জন্য আমি যেমন জিজ্ঞাসিত হব, আমাকে আঘাত করলে আপনিও ছাড়া পাবেন না।

তাই ভাই আসুন! এই মাযহাবি-সালাফি বিবাদ কে শুরু করেছে তা না দেখে, দু’পক্ষই চেষ্টা করি এই বিবাদকে কিভাবে শেষ করা যায়। দ্বীনি বিষয়ে মতবিরোধ সাহাবীদের যুগ থেকে এখন পর্যন্ত আছে, কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। কিন্তু মতানৈক্য করেও আমি আপনার বন্ধু থাকতে কি পারি না? ইন’শা’আল্লাহ আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারবে একটি সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ উপহার দিতে।

আসুন না! আরেকবার একটু চেষ্টা করি।

সূত্র: https://www.facebook.com/rksaninbd/posts/174062079618441 

***

সম্পাদকের পাদটীকা:

১ নামাযের শুরুতে হাতের তালুকে কিবলামুখী রেখে কাঁধ বা কান পর্যন্ত দুই হাত উত্তোলন করাকে রাফে ইয়াদাইন বলে। হানাফি মাযহাবের অনুসারীরা কেবলমাত্র নামাযের শুরুতে এবং বিতরের নামাযে দু’আ কুনুত পড়ার আগে রাফে ইয়াদাইন করেন। অন্যদিকে, সালাফিরা নামাযের শুরুতে, রুকুতে যাওয়ার আগে এবং রুকু থেকে ওঠার পর রাফে ইয়াদাইন করেন। সালাফিরা বিতরের নামাযে রাফে ইয়াদাইন করেন না।

২ ইমাম আবু হানিফা (৮৫-১৫০ হিজরী) এবং তাঁর প্রধান ছাত্রদের প্রতিষ্ঠিত উসুল বা মূলনীতির ভিত্তিতে চালু হওয়া ফিকহি মাযহাব। ভারতীয় উপমহাদেশ, চীন, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, তুরস্ক এবং পূর্ব ইউরোপের অধিকাংশ মুসলিম হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন।

৩ সালাফিরা সুন্নি ইসলামের প্রধান চারটি মাযহাবের কোনোটিই এককভাবে অনুসরণ করেন না। তাঁরা দাবী করেন যে, তাঁরা সাহাবী, তাবেয়ী এবং তাবা-তাবেয়ীদের সম্মিলিত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অনুসরণ করছেন। তবে, বাস্তবে তাঁরা ইমাম ইবনে তায়মিয়ার (৬৬১-৭২৮ হিজরী) মতকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

Advertisements

2 thoughts on “মাযহাবি-সালাফি বিবাদ

  1. পিংব্যাকঃ মাজহাবী-সালাফী দ্বন্দ্ব: উভয় পক্ষের পক্ষে ও বিপক্ষে যত কথা | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ কেন আমি সালাফি হয়েছিলাম, কেনইবা আবার হানাফি হলাম | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s