মাযহাবের ইমামদের কাছে হাদিসটি পৌঁছেনি!

রাজীব ও সজীব দুই বন্ধু। মালয়েশিয়াতে বেড়াতে এসেছে। কুয়ালালুমপুরের হোটেলে আসরের নামায আদায় করে ওরা দু’জন পুত্রজায়ার বাসে উঠল। পুত্রজায়া হলো মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী। ছুটির দিন বলে রাস্তা ফাঁকা ছিলো, তাই অল্প সময়েই ওদের বাস পুত্রজায়াতে পৌঁছে গেল।

মসজিদ পুত্রা-তে ওদের যাত্রা বিরতি চলছে। প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে লাগোয়া, কৃত্রিম লেকের পাড়ে অবস্থিত সুন্দর স্থাপত্যশৈলীর বিশাল মসজিদটি দেখলে নয়ন জুড়িয়ে যায়। দুই বন্ধু মসজিদের ভেতরে চলে গেল। সেখানে গিয়ে রাজীব প্রথমে দুই রাকাত নফল নামায আদায় করল, এরপর মসজিদটি ঘুরেফিরে দেখল। সজীব সেখানে কোনো নামায আদায় করল না, এমনিই মসজিদটি ঘুরে দেখতে লাগল।

দুই বন্ধু মসজিদ থেকে বের হলো। রাজীব জিজ্ঞেস করল, “দোস্ত, তুই মসজিদে গেলি, কিন্তু দুই রাকাত নামায পড়লি না কেন? জানিস না, মসজিদে ঢুকে প্রথমে দুই রাকাত নফল নামায আদায় করতে হয়?” জবাবে সজীব বলল, “কিন্তু আমরা তো আসরের নামায পড়েই হোটেল থেকে বের হলাম! তুই কি জানিস না যে আসরের ফরয নামাযের পর থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোনো নামায আদায় করতে মানা আছে?” দুই বন্ধুই তাদের নিজ নিজ দাবীর পক্ষে হাদিস থেকে রেফারেন্স দিলো। কিন্তু কোনো মীমাংসা হলো না।

***

দেশে ফিরে গিয়ে তারা তাদের নিজ নিজ মসজিদের ইমাম সাহেবের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলল। রাজীবদের মসজিদের ইমাম সাহেব বললেন, “আসরের ফরয নামাযের পর থেকে নিয়ে মাগরিবের ওয়াক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত অন্য কোনো নফল নামায আদায় করতে মানা, এটি হলো একটি সাধারণ নিয়ম। আর মসজিদে প্রবেশ করে বসার আগে যে দুই রাকাত নামায আদায় করতে হয় সেটি হলো মসজিদের হক। এটি আগের সাধারণ নিয়মের একটি ব্যতিক্রম। তাই চাইলে এই সময়েও তুমি মসজিদের ওই হকটি আদায় করতে পার। বাস্তবে তুমি করেছও তাই। তুমি যা করেছ তা ঠিকই আছে।”

অন্যদিকে সজীবদের মসজিদের ইমাম সাহেব বললেন, “তোমাদের দুইজনের দলিলই ঠিক আছে। তবে শোন। যদি কুরআন ও সুন্নাহ-র দু’টি সহিহ দলিল আপাতদৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়, তবে সেক্ষেত্রে নিষেধসূচক হুকুমটি আদেশসূচক হুকুমের ওপর প্রাধান্য পাবে। তোমাদের ক্ষেত্রে কী হয়েছে? একটি দলিল বলছে যে মসজিদে প্রবেশ করে বসার আগে দুই রাকাত নফল নামায আদায় করতে হবে। আরেকটি দলিল বলছে যে আসরের ফরয নামাযের পর ওই দিনে দিনের বেলায় আর কোনো নামায নেই। এখন তাহলে কী করতে হবে? নিষেধসূচক দলিলটি, অর্থাৎ আসরের ফরয নামাযের পর নফল নামায আদায় না করার দলিলটি হুকুম হিসেবে প্রাধান্য পাবে। অতএব, তুমি যা করেছ তা ঠিকই করেছ।”

***

উপরের ঘটনাটি থেকে সাব্যস্ত হলো যে, কুরআনের একটি আয়াত বা একটি হাদিস থেকে রেফারেন্স দিয়ে দিলেই তা কোনো বিষয়ে শরিয়তের অকাট্য দলিল বলে সাব্যস্ত হয় না। এই বিষয়ের ওপর কুরআনে যতগুলো আয়াত আছে তার সবই বিবেচনায় নিতে হয়। এই বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সবগুলো হাদিসকে সামনে আনতে হয়। এরপর এগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হয়। এগুলোর ওপর কিছু মূলনীতি প্রয়োগ করতে হয়। এরপরই সেখান থেকে কিছু হুকুম বের হয়। যেহেতু এই পুরো বিষয়টি মানুষের গবেষণার ফল, তাই একাধিক আলেম একই বিষয়ের ওপর একাধিক উপসংহারে পৌঁছতে পারেন। গবেষণার ক্ষেত্রে এটিই স্বাভাবিক। ফলে, আলেমদের মধ্যকার এই মতপার্থক্য নিয়ে বাড়াবাড়ি করা, বা একে অপরকে দোষারোপ করা একেবারেই উচিৎ হবে না।

***

Niagara Falls Colors

Photo credit: James Wheeler, via flickr[dot]com/photos/james_wheeler/9612761622

ইদানিং কিছু দীনি ভাইকে দেখা যাচ্ছে যারা বুখারি ও মুসলিম থেকে সরাসরি রেফারেন্স দিয়ে তাদের নিজেদের মতকে বাকী সবার ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন। এক্ষেত্রে তারা প্রধানত তিনটি কাজ করছেন। প্রথমত, বুখারি ও মুসলিমের বাইরে যে হাদিস সংকলনগুলো আছে তার গুরুত্বকে তারা কমিয়ে দিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, বুখারি ও মুসলিমের হাদিসগুলোকে তারা মূলত আক্ষরিকভাবে বুঝছেন। তৃতীয়ত, তারা বলছেন যে, মাযহাবের ইমামদের কাছে অনেক হাদিস পৌঁছেনি; যদি পৌঁছত তাহলে তাঁদের অনেক উপসংহার ভিন্ন রকম হতো। আমি বুঝি যে তারা ভালো নিয়তেই এমনটি বলছেন, কিন্তু এতে করে সমাজে অনেক সমস্যাও হচ্ছে।

তাদের এই তৃতীয় পয়েন্টটি নিয়ে আমার কিছু বক্তব্য আছে। সহিহ বুখারি-র সংকলক ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি’র জন্ম ১৯৪ হিজরিতে মধ্য এশিয়াতে। হাদিস শাস্ত্রের আরেক দিকপাল ইমাম মালিক বিন আনাসের জন্ম ৯৩ হিজরিতে মদিনাতে। ইমাম মালিকের একটি বিখ্যাত হাদিস সংকলন আছে, যার নাম মুওয়াত্তা। ইমাম মালিক শুধুমাত্র একজন হাদিসশাস্ত্রবিদ ছিলেন না, তিনি মস্ত বড় ফিকাহ শাস্ত্রবিদও ছিলেন। তাঁর প্রদত্ত মূলনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মালিকি মাযহাব এখনও টিকে আছে। দেশে দেশে কোটি কোটি মানুষ সেই মাযহাব আজও মেনে চলছেন।

মজার বিষয় হলো, ইমাম মালিক সংকলিত এই মুওয়াত্তা-তে এমন কিছু হাদিস আছে যার ওপর মালিকি মাযহাবে আমল করা হয় না। মালিকি মাযহাবে কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদিসের ঠিক পরেই তৎকালীন মদিনায় প্রচলিত আমলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফলে, যদি এমনটি হয় যে মুতাওয়াতির নয় এমন হাদিসে একটি নির্দিষ্ট কাজ করতে বলা হয়েছে, কিন্তু মদিনাবাসীর তৎকালীন আমল ছিলো তার বিপরীত, তবে সেক্ষেত্রে মদিনাবাসীর ওই আমলটিকে হাদিসটির ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

অন্যদিকে, হানাফি মাযহাবে কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদিসকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যদি এমনটি হয় যে মুতাওয়াতির নয় এমন একটি হাদিসে একটি নির্দিষ্ট কাজ করতে বলা হয়েছে, কিন্তু সেটি কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদিস থেকে আহরিত কোনো মূলনীতির সাথে আপাতদৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক, তবে সেক্ষেত্রে কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদিস থেকে আহরিত সেই মূলনীতিটিকে হাদিসটির ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ইমাম আবু হানিফা-র অন্যতম প্রধান ছাত্র ইমাম মুহাম্মাদ আশ-শায়বানি-র মুওয়াত্তা নামে আরেকটি পৃথক হাদিস সংকলন আছে, যা এখনও বাজারে পাওয়া যায়। অতএব, ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর ছাত্ররা হাদিস জানতেন না – এটি একটি অপবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়।

ইমাম শাফেয়ি এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটান। কোনো হাদিসের সনদ সহিহ হলেই তিনি তার ওপর আমল করতেন, চাই সেটি মুতাওয়াতির হোক বা না হোক। “কোনো হাদিস সহিহ হলে সেটিই আমার মাযহাব”, কথাটি এখান থেকেই এসেছে। আর ইমাম আহমাদ তো দুর্বল সনদের হাদিসের ওপরও আমল করতেন।

***

আজকের এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আমাদের বুঝতে পারা উচিৎ যে:

১। “মাযহাবের ইমামদের কাছে হাদিসটি পৌঁছেনি”, আমাদের এই ধারণাটি খুব সম্ভবত সঠিক নয়।

২। প্রতিটি মাযহাবই শরিয়তের হুকুম আহরণের কিছু মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রত্যেক মাযহাবের মূলনীতিই আলাদা, আর মূলত এই কারণেই দীনের শাখাগত বিষয়ে মাযহাবসমূহের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।

৩। সরাসরি বুখারি ও মুসলিম থেকে হাদিস পড়ে আমল করতে গেলে আমাদের দ্বারা কিছু ভুল-ত্রুটি হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। নিজেরা শরিয়তের হুকুম-আহকাম বের না করে এক্ষেত্রে যোগ্য আলেমদের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে উত্তম।

৪। তাই বলে কি আমরা হাদিস পড়ব না? অবশ্যই পড়ব। আরবি ভাষা এবং উসুল ও ফিকাহশাস্ত্রে অনভিজ্ঞ আমাদের মতো আম জনতার জন্য ইমাম নববী সংকলিত চল্লিশ হাদিস বা রিয়াদ্বুস সালিহীন, মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভী সংকলিত মুন্তাখাব হাদিস — অথবা এই ধরণের হাদিস সংকলন বিশেষভাবে সহায়ক। অন্যদিকে, বুখারি বা মুসলিমের মতো হাদিসের মৌলিক সংকলনগুলো পড়তে চাইলে নিজে নিজে পড়ার চেষ্টা না করে অভিজ্ঞ কোনো আলেমের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পড়া উচিৎ।

৫। সর্বোপরি, “আমার মতই একমাত্র সঠিক মত” – এই মানসিকতা থেকে যত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসা যায় ততই উত্তম।

আল্লাহই সবচেয়ে উত্তম জানেন।

——————————————————————————————-

মুতাওয়াতির হাদিস: এটি এমন ধরণের হাদিস যেটি সাহাবী থেকে নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মসমূহে প্রতিটি প্রজন্মে অনেক সংখ্যক বর্ণনাকারী দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। হাদিস শাস্ত্রবিদদের মতে, প্রতিটি প্রজন্মে এত অধিক সংখ্যক মানুষের পক্ষে একটি মিথ্যার ওপর একমত হওয়া প্রায় অসম্ভব। বিশুদ্ধতার নিরিখে কুরআনের পরেই মুতাওয়াতির হাদিসের স্থান।

সহিহ হাদিস: এটি এমন ধরণের হাদিস যার বর্ণনাসূত্র কোনো রকম বিচ্ছিন্নতা ছাড়া সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত পৌঁছেছে, যার প্রতিটি বর্ণনাকারী নিখুঁত স্মরণশক্তির অধিকারী, ধার্মিক এবং বিশ্বস্ত। একটি সহিহ হাদিস মুতাওয়াতির হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।

Advertisements

6 thoughts on “মাযহাবের ইমামদের কাছে হাদিসটি পৌঁছেনি!

  1. পিংব্যাকঃ মাজহাবী-সালাফী দ্বন্দ্ব: উভয় পক্ষের পক্ষে ও বিপক্ষে যত কথা | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ কেন আমি সালাফি হয়েছিলাম, কেনইবা আবার হানাফি হলাম | আমার স্পন্দন

  3. আহলে হাদিস বা সালাফি ভাইরা যেটা করছে সেটাও তাহলে ঠিক, যেহেতু তাদের আমল আকিদা ৪ মাজহাবের যেকোনো একমাজহাবের সাথে ও কুরান হাদিসের সাথে মিল আছে,,, #এডমিন

  4. পিংব্যাকঃ আহলে হাদিস ও হানাফিদের মধ্যেকার মনোমালিন্য: আমি যা দেখেছি এবং যেমনটি দেখে যেতে চাই | আমার স্পন্দন

  5. “মাযহাবের ইমামদের কাছে হাদিসটি পৌঁছেনি”, এই কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয় আবার পুরোপুরি বেঠিক ও নয় । এই কথাটা শাইখ উথাইমিন (রাঃ) এর একটি বইয়ে পেয়েছিলাম । সেখানে তিনি উলামাদের মতপার্থক্যের কারণ বলতে গিয়ে এই পয়েন্ট উল্লেখ করেন । আবার তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে হাদিসের বিশুদ্ধতা নিয়ে উলামাদের মাঝে মতপার্থক্যের কারণেও মতামতে ভিন্নতা আসতে পারে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s