অমুসলিম অধ্যুষিত দেশে অভিবাসী হওয়ার আগে যে পাঁচটি বিষয় বিবেচনায় রাখা উচিৎ

Suitcase

আমার চেনাজানা অনেকেই কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াতে অভিবাসী হিসেবে জীবনযাপন করছেন। আরও অনেকেই অপেক্ষা করছেন সঠিক সুযোগের। একটু স্বাচ্ছন্দময় জীবন কাটানোর স্বপ্নে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুখের দিকে তাকিয়ে। ২০১৩ সালের প্রায় পুরোটা জুড়ে এবং ২০১৫ সালের প্রথমদিকে বাংলাদেশে যে অরাজক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের এই চাওয়াটা দোষের কিছু নয়।

অনেকের দেখাদেখি আমি নিজেও যে চেষ্টা করিনি তা নয়। একাধিক বার, একাধিক দেশে যাওয়ার ব্যাপারে একটা পর্যায় পর্যন্ত কথাবার্তা আমারও হয়েছিল। কিন্তু, আল্লাহর যা ইচ্ছা, তাই শেষ পর্যন্ত হলো।

***

বিয়ে না করা পর্যন্ত বেশিরভাগ মানুষের বুদ্ধি পরিপক্ক হয় না। বিয়ের পর আমরা অনেকেই অনেক অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখী হতে বাধ্য হই। কাছের মানুষ পর হয়ে যায়, আবার দূরের মানুষ হয়ে ওঠে আপন। চিন্তাধারা অনেক বদলে যায়। বাচ্চাকাচ্চা হলে আমাদের চিন্তাধারা আরও পরিপক্ক হয়ে উঠতে শুরু করে। আমি যখন ওসব দেশে যাওয়ার ব্যাপারে এখানে ওখানে টুকটাক কথাবার্তা চালাচ্ছিলাম তখন বাচ্চার বিষয়টি আমার মাথায় আসেইনি। সেই দিন এখন অতীত। বাচ্চার ভবিষ্যতের বিষয়টিও বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন মাথায় রাখতে হয়। সেই সাথে, নিজেদের চাওয়া বা না চাওয়ার বিষয়টি তো আছেই।

***

উত্তর আমেরিকা, ইওরোপ এবং অস্ট্রেলিয়াতে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থেকেছেন এরকম একাধিক মানুষের সাথে তাদের সেখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার কথাবার্তা বলার সুযোগ হয়েছে। সেখানকার ভালো দিকগুলো সম্পর্কে আমরা প্রায় সবাই জানি, তাই সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করার কোনো দরকার এখানে দেখছি না। কিন্তু, একজন মুসলিম হিসেবে আমার সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন ছিল। কিছু প্রশ্নের উত্তর সহজেই পেয়েছি। কিছু প্রশ্নের উত্তর পেতে সময় লেগেছে। এগুলোরই একটি সারাংশ করছি এখানে। আশা করি, আমাদের অনেকেরই কাজে লাগবে।

১। পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায:
বাংলাদেশের দাপুটে কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ ওখানে গিয়ে হয়ে যান ক্যাশিয়ার, মার্চেন্ডাইজার, হাউজ কিপার বা কেয়ার গিভার। বেশিরভাগই ব্লু কলার জব। ঘন্টা চুক্তির কাজ। কাজের সময়ে নামায আদায় করাকে ওখানকার অনেক নিয়োগদাতা ভালো চোখে দেখে না। ফলে, প্রতি ওয়াক্ত ফরয নামায সঠিক ওয়াক্তে আদায় করাটা অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।
ওরা যে ইসলামকে ঘৃণা করে এমন মানসিকতা পোষণ করে তা নয়। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো কাজের সময়ে কাজ, তোমার অবসর সময়ে তুমি যত খুশি তোমার ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা কর। কাজের সময়ে হোক বা অবসর সময়ে হোক, পাঁচ ওয়াক্ত নামায পাঁচটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদায় করতে হয় — এই বিষয়টির সাথে তারা অনেকেই পরিচিত নয়। অনেকে বিষয়টি নিয়ে স্বাচ্ছন্দবোধও করে না।

২। জুমু’আ নামায:
শুক্রবার ওসব দেশে কাজের দিন, ফলে কাজ ফেলে অনেকের পক্ষেই প্রতি সপ্তাহে জুমু’আর নামায আদায় করতে মসজিদে যাওয়া সম্ভব হয় না। কেউ মাসে এক-দু’বার যেতে পারে। কেউ বছরে কয়েকবার।

৩। হালাল খাবার:
ওখানকার অধিকাংশ খাবারের আইটেমে প্রাণীজ চর্বি ব্যবহার করা হয়। সেটি শুয়োরের চর্বি হওয়ার সম্ভাবনা যে বেশি তা বোঝার জন্য আশা করি কোনো পন্ডিত হওয়া লাগবে না। এমনকি ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মতো ভেজিটেরিয়ান আইটেমে পর্যন্ত এসব প্রাণীজ চর্বি ব্যবহৃত হতে পারে। এছাড়া, রান্নার উপকরণ হিসেবে ওয়াইন ব্যবহারেরও বেশ চল ওসব দেশে আছে। নিজে রান্না করে না খেলে এবং বাইরের বেশিরভাগ খাবার বর্জন না করলে হারাম থেকে বেঁচে থাকা ওসব দেশে অনেক কঠিন।

সইতে সইতে সয়ে যাওয়া:
ওখানে থাকতে থাকতে একটা পর্যায়ে অনেক কিছুই সয়ে যায়। কোনো জিনিস বারবার দেখতে থাকলে সেই বিষয়ে খারাপ লাগার বোধটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আস্তে আস্তে কমতে থাকে। চিন্তাভাবনায় এবং জীবনযাত্রায় আমাদের অজান্তেই তার বেশ প্রভাব পড়ে।

ভবিষ্যপ্রজন্মের ভবিষ্যৎ:
অভিবাসীদের বাচ্চাকাচ্চারা প্রায় সবাই সেখানকার সরকারী স্কুলে ভর্তি হয়। বেসরকারী স্কুলের টিউশন ফি জোগাড় করার সামর্থ বেশিরভাগ মানুষেরই হয় না। স্কুলের বন্ধুরা তো ওই দেশী। বাচ্চারাও তাই ধীরে ধীরে ওদের মতো হয়ে যায়। দশ জনে নয় জনের ক্ষেত্রেই এমনটি হয়। বাচ্চা একটু বড় হলে মেয়েবন্ধু বা ছেলেবন্ধু নিয়ে আপনারই বাসায় একান্তে ‘ফুর্তি’ করবে। আপনি কিছুই করতে পারবেন না। শাসন করতে গেলে উল্টো আপনাকেই জেল খাটতে হবে। দশ জনে নয় জন বাচ্চা তো ওয়েস্টার্নাইজড হবেই, সেই সাথে অনেকেই নাস্তিক বা অ্যাগনস্টিক হয়ে যাবে। বাচ্চারা একেবারে ছোটবেলা থেকে যে সমাজে বেড়ে ওঠে সেখানকার রীতিনীতি ও চিন্তাধারার দ্বারা তারা প্রভাবিত হবেই। আমরা নিজেরাও কি আমাদের শৈশব ও কৈশোরের সমাজ ব্যবস্থার দ্বারা প্রভাবিত হইনি? পাশ্চাত্যের বৃহত্তর সমাজের প্রতি তাদের তীব্র আকর্ষণের এই হাতছানিকে ঠেকিয়ে রাখা বেশিরভাগ অভিভাবকের পক্ষেই অসম্ভবের কাছাকাছি।

***

আপনার যেসব আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব ওসব দেশে অভিবাসী হয়েছেন তারা সচরাচর এই কথাগুলো আপনাকে বলবেন না। যারা হোয়াইট কলার জব বা জ্ঞানভিত্তিক কোনো কাজ করছেন তারা এখানে বর্ণিত কয়েকটি বিষয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে থাকলেও বেশিরভাগ অভিবাসীর ক্ষেত্রে এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশ প্রবল। বাংলাদেশ এবং অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত দেশেও এসব সমস্যা কমবেশি আছে। কিন্তু, ওখানকার সাথে তুলনা করলে আমাদের দেশসমূহের অবস্থা এখনও বেশ ভালো।

ওখানে যাদের জন্ম হয়েছে তাদের কথা আলাদা। পরিস্থিতির কারণে তাদের অনেক ভুলত্রুটি বা বিচ্যুতি আল্লাহ মাফ করে দিতে পারেন। বিশেষ কোনো পরিস্থিতির কারণে যাদের দেশত্যাগ করতে হচ্ছে বা ভবিষ্যতে যারা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হবেন তাদের ব্যাপারটাও আলাদা। কিন্তু, আমরা যারা যেচে এই বোঝা কাঁধে নিতে চাচ্ছি তাদের ক্ষেত্রে এই অজুহাত খাটে কি? আমার একটি সিদ্ধান্তের কারণে আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি বিপথে চলে যায় তবে তার জন্য কি আমিই দায়ী নই? হাশরের ময়দানে এই বিষয়ে আমি কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারব কি?

পাদটীকা:

ক। এখানে একেবারেই সাধারণভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে। স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে এর ব্যতিক্রম থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।

খ। যারা অমুসলিম অধ্যুষিত কোনো দেশে অভিবাসী হওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছেন কেবলমাত্র তাদেরকে উদ্দেশ্য করেই এই লেখাটি লেখা হয়েছে।

গ। যারা এরই মধ্যে অভিবাসী হিসেবে ওখানে চলে গিয়েছেন এবং সেখানে বসবাস করতে শুরু করেছেন তারা নিচের এই লেখাটি থেকে উপকৃত হবেন বলে আশা রাখি:

Advertisements

2 thoughts on “অমুসলিম অধ্যুষিত দেশে অভিবাসী হওয়ার আগে যে পাঁচটি বিষয় বিবেচনায় রাখা উচিৎ

  1. Assalamu Alaikum bhai. Ei omuslim der desh e boshei dekhchi kids are becoming Hajiz and Hafiza. Mosques are increasing in number and also expanding in size. It depends how you as a parent are raising your child and how you are asking help from Allah swt to make thing easy for you. Ingredients er bapar e era onek conscious. everything is declared in the food packet. So no chance to take wrong food. Islam practice er bapar e encouraging onek kichui ache ekhane jeta BD te avail kora kothin. i.e. Arabic speaking, Quran lessons for adult and kid, Hadith darse and many other topics. Most of them are free or can be done by a minimal cost. I know in BD it is also possible but how available and convenient to attend those classes.

    • ওয়াআলাইকুমুসসালাম।

      আপনার কথাটাও এক অর্থে ঠিক। একেক জনের কাছে বাস্তবতা একেক রকম। এজন্যই লেখার শেষে “এখানে একেবারেই সাধারণভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে; স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে এর ব্যতিক্রম থাকাটা অস্বাভাবিক নয়” — কথাটি উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে।

      তবে, প্যারেন্টিং ব্যাপারটা অত সহজ নয়। ১৩-১৪ বছর বয়স থেকে বাচ্চারা তাদের স্বতন্ত্র সত্ত্বা নিয়ে বেড়ে উঠতে থাকে। পরিবার ও পরিবেশ উভয়েরই প্রভাব সেখানে থাকে। আমরা যত বড় হতে থাকি পরিবেশের দ্বারা আমরা ততটাই প্রভাবিত হয়ে পড়ি এবং সেইসাথে পরিবারের বাঁধন আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে আসতে থাকে। আমার নিজের কথাই বলি। আমার বেড়ে ওঠার বয়সে পরিবার থেকে যেসব মূল্যবোধ আমি পেয়েছিলাম তার অনেক কিছুর সাথেই আমি একমত নই। আমাদের বাচ্চারাও তাদের পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত হবেই।

      আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s