মাজহাবী-সালাফী দ্বন্দ্ব: উভয় পক্ষের পক্ষে ও বিপক্ষে যত কথা

২০১৪ সালের কথা। প্রায় দুই বছর পর কানাডা থেকে বাংলাদেশ গিয়েছি। মসজিদে জুম’আর নামাজ পড়তে যেয়ে অবাক হয়ে গেলাম। ইমাম সাহেব তাঁর খুতবার একটা বিশেষ অংশ জুড়ে অত্যন্ত অপ্রাসংগিকভাবে বলতে লাগলেন – “মাজহাব কেন মানতেই হবে?” যারা মাজহাব মানে না তাদের সম্পর্কে তিনি আপত্তিকর ও আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলা শুরু করলেন। আর বক্তব্য শেষ করলেন এই বলে যে – নামাজ শেষে বাসায় যাওয়ার আগে মসজিদের গেটের সামনে থেকে (ইমাম সাহেব বা তাঁর কোনো উস্তাদের লেখা) “মাজহাব কেন মানতেই হবে ?” বইটা অবশ্যই কিনে নিয়ে যাবেন।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। এই জুম’আয় “মাজহাবী” ইমামের বক্তব্যে বিরক্ত হয়ে পরের জুম’আয় “সালাফী” মসজিদে গেলাম নামাজ পড়তে। এই ইমাম সাহেব খুব সুন্দর কথা বলে খুতবা শুরু করলেন। কিন্তু, একটু পরে যখন অজুর নিয়মাবলী বর্ণনা শুরু করলেন তখন বলে উঠলেন – “আরে হানাফীদের নবী তো মুহাম্মাদ(ﷺ) না, ওদের নবী হচ্ছে আবু হানিফা!” তারপর মাজহাবী আলেমদের খুব করে ঝাড়লেন! “মাজহাবী” ইমামের মতো “সালাফী” ইমাম সাহেবও আমাকে ব্যথিত করলেন।

আমি প্রায় পাঁচ বছর ধরে কানাডায় আছি। এখানে আমরা যখন নামাজ পড়ি তখন হানাফী, মালিকি, শাফেঈ, হাম্বালী, সালাফী এমনকি শিয়ারা পর্যন্ত একসাথে নামাজ পড়ি – কোনোদিন ঝগড়াঝাঁটি করি না। ইসলাম তো ঐক্যের কথা বলে, ভ্রাতৃত্বের কথা বলে, মধ্যপন্থী হওয়ার কথা বলে। আমার মনে প্রশ্ন এলো – এই তথাকথিত মাজহাবী/সালাফী বিতর্কের মধ্যম পথটা কোথায়? হাজার বছরের ঐতিহ্য “মাজহাব” বাদ দিয়ে সহীহ হাদিস অনুসরণের পক্ষে সালাফীদের যুক্তি কী? আর মাজহাবীরাই বা কেন সহীহ হাদিসের “বিরোধী” হওয়া সত্ত্বেও তাদের ইমামের মত অনুসারে আমল করে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হলো এই লেখা।

এই লেখায় আমি দুই পক্ষেরই যুক্তিগুলো তুলে ধরব, অন্য পক্ষের হয়ে সেই যুক্তিকে খন্ডন করব, এবং একটা ঐক্যে আসার চেষ্টা করব। লেখাটি আমি শুরু করব এমন কিছু শর্ত দিয়ে (Common Conditions) যাতে মাজহাবী-সালাফী দুই পক্ষই একমত। এরপর সালাফীদের বিভিন্ন যুক্তি ও সেগুলোর প্রতি-যুক্তি তুলে ধরব। তারপর, মাজহাবীদের বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরব এবং সেগুলিরও প্রতি-যুক্তি দিব। মাজহাবী-সালাফীর এই বিতর্কে একজন মুসলিম হিসাবে আমাদের কী করণীয় – সেই দিকনির্দেশনা দিয়ে লেখাটি শেষ করব।

Village path 

সালাফী-মাজহাবী যেখানে একমত

“মাজহাব” শব্দের অর্থ হলো পথ বা মত। ইসলামী আইনের পরিভাষায়, মাজহাব (School of Thought) হলো এমন কিছু “উসুল” (Set of Principles) যা অনুসরণ করে কোনও কাজের শারঈ’ বিধান (অর্থাৎ হালাল, হারাম, ফরজ, নফল ইত্যাদি) নির্ধারণ করা হয় [৭]।  ইসলামের ইতিহাসে বিশটিরও বেশী মাজহাবের সন্ধান পাওয়া যার। তার মধ্যে চারটি মাজহাব প্রসিদ্ধ। এগুলো হলো – ইমাম আবু হানিফার (মৃত্যু  ১৪৮ হিজরী) দেয়া উসুল অনুসারে হানাফী মাজহাব, ইমাম মালিকের (মৃত্যু ১৭৯ হিজরী) দেয়া উসুল অনুসারে মালিকি মাজহাব, ইমাম শাফেঈর (মৃত্যু ২০৪ হিজরী) দেয়া উসুল অনুসারে শাফেঈ’ মাজহাব ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (মৃত্যু ২৪১ হিজরী)-এর উসুল অনুসারে হাম্বালী মাজহাব। যারা এই মাজহাবগুলোর অনুসরণ করেন তাদেরকে “মাজহাবী” বলা হয়।

অন্যদিকে, “সালাফ” শব্দের অর্থ হলো পূর্বসূরী। ইসলামী পরিভাষায় “সালাফ” বলতে ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্মের মানুষকে বুঝানো হয়। অর্থাৎ, সাহাবারা, তাঁদের পরের প্রজন্ম (তাবিঈ’ন) ও তাঁদের পরের প্রজন্মের (তাবা’ আত-তাবিঈ’ন) সবাই হলেন সালাফ [১৩,১৪]। বর্তমান সময়ে যে সব ইমাম প্রচলিত চার মাজহাবের একটিকে নির্দিষ্টভাবে অনুসরণ না করে, চার মাজহাবের মতামত ও অন্যান্য প্রখ্যাত ইমামের মতামতগুলোকে তুলনা করে যে মতামতটিকে কুরআন  ও সহীহ হাদিসের সাথে সবচেয়ে বেশী সংগতীপূর্ণ মনে করে থাকেন – সেটাকে অনুসরণ করেন তাঁরা নিজেদেরকে “সালাফী” হিসাবে পরিচয় দেন। কারণ, তাঁরা মনে করেন তাঁরা সালাফদের পদ্ধতিতে ইসলাম পালন করেন।

এক মাজহাব থেকে অন্য মাজহাব স্বকীয় হয় তার উসুল (“Set of Principles”)-এর কারণে। আবার, “মাজহাব” থেকে “সালাফী তত্ত্ব” স্বকীয়ও হয় তার উসুল (“Set of Principles”)-এর কারণে।  মাজহাবী/সালাফীদের মধ্যে আজকে আমরা যতই বিরোধীতা দেখি না কেন, উসুল (“Set of Principles”) সংক্রান্ত নিচের বিষয়গুলোতে দুই পক্ষই কিন্তু একমত:

  1. সর্বোচ্চ মর্যাদা পাবে কুরআন ও সহীহ হাদিস (এদেরকে একত্রে আন-নাস বলে)
  2. এর পর মর্যাদা পাবে ইজমা’ (সাহাবা বা কোনও যুগের সকল আলেমের ঐক্যমত)
  3. উপরের তথ্যগুলির সাহায্যে কোনো বিষয়ের ফিকহ (Islamic Ruling / Understanding) নির্ধারণ না করা গেলে কিয়াস (Analogy) ব্যবহার করা যাবে।
  4. কুরআন ও হাদিসকে সেভাবে বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবী ও সালাফরা বুঝেছিলেন। কারণ, তাঁরা যেহেতু রাসূলুল্লাহ(সা)-এর সরাসরি ছাত্র ছিলেন তাই তাঁদের চাইতে ভালো আর কেউ এই বিষয়গুলো বুঝতে পারবে না।  (এই চতুর্থ পয়েন্টটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এটা মনের মধ্যে গেঁথে ফেলুন, এই ব্যাপারটা বারে বারে আসবে।)

সালাফী-মাজহাবী যেখানে দ্বিমত

মাজহাবের সাথে সালাফি তত্ত্বের একটা অন্যতম পার্থক্য হলো মাজহাবীদের কাছে তাদের ইমামের মতামতও একটি দলীল [৪]। এর যুক্তি হলো – যেহেতু ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানিফারা তাবেঈ’দের সরাসরি ছাত্র ছিলেন, কাজেই তাঁরা যদি কোনো মতামত দিয়ে থাকেন সেটা অবশ্যই তাবেঈ’ ও সাহাবাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। কাজেই তাঁদের মতের সমর্থনে শুদ্ধ হাদিস না পাওয়া গেলেও খুব সহজেই তাদের মতামত বাদ দেয়া যাবে না (এ বিষয়ে পরে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে)। বরং, তাঁদের মতামতকে বাদ দেয়ার জন্য সেই মত-বিরোধী শক্ত কোনো হাদিস বা অন্য প্রমাণ থাকতে হবে। অন্যদিকে, সালাফীরা সাধারণত শুদ্ধ সনদ (বর্ণনাকারীর ধারা) ছাড়া কোনো হাদিস গ্রহণ করে না।

মাজহাবের সাথে সালাফি তত্ত্বের আরেকটা পার্থক্য হলো – প্রত্যেক মাজহাবের পক্ষেই গত ১১০০ বছরের হাজার হাজার ইমাম আছেন। শরীয়তের কোনও আদেশ পালনের ক্ষেত্রে কোনও মাজহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের ঐক্যমতকে ওই মাজহাবের ফিকহ (Understanding) বলা হয়। অন্যদিকে সালাফী মতবাদ শুরু হয়েছে মাত্র দুই-আড়াইশ’ বছর আগে। ফলে, সালাফী মতবাদের ইমামদের মধ্যে সেরকমভাবে কোনো ঐক্যমত এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি [৭]। যেমন – শাইখুল হাদিস নাসিরুদ্দীন আলবানী মনে করেন একজন মুসলিম নিজেকে “সালাফী” পরিচয় দিতে পারবে, কিন্তু শেইখ উছায়মিন মনে করেন একজন মুসলিম নিজেকে “মুসলিম” হিসাবেই পরিচয় দিবে [২১]। কাজেই, একজন সালাফী ঐতিহাসিক ইমাম-গোষ্ঠির ফিকহ (Understanding) অনুসরণ করে না, সে আধুনিক সময়ের একজন ব্যক্তি-ইমামের ফিকহ অনুসরণ করে। তাই আপনি একজন সালাফীকে বলতে শুনবেন – “আমি নাসিরুদ্দীন আলবানির বই/ফিকহ অনুসারে নামাজ পড়ি”। অন্যদিকে একজন মাজহাবী হয়তো বলবে – “আমি মালিকি মাজহাব অনুসারে নামাজ পড়ি”।

সালাফীদের যুক্তি ও প্রতি-উত্তর

লেখার এই অংশে আমরা সালাফীদের বিভিন্ন যুক্তি [১,২,৩] সম্পর্কে জানবো – কেন তাঁরা মনে করেন মাজহাব বাদ দিয়ে কুরআন আর সহীহ হাদিসের অনুসরণ করতে হবে? একই সাথে আমি সালাফীদের যুক্তিগুলোকে খন্ডন করারও চেষ্টা করব। যুক্তি-খন্ডন করতে যেয়ে আমি বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মালিকি মাজহাবের উসুল (“Set of Principles”)-কে উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করব। কারণ, যুক্তি-খন্ডনের কথাগুলো আমি মূলত: শেইখ হামযা ইউসুফের লেকচার [৪] থেকে নিয়েছি যিনি একজন মালিকি ইমাম।

সালাফী যুক্তি ১: সকল বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে আমাদের কুরআন ও সহীহ হাদিস মানতে হবে। কিন্তু, প্রচলিত মাজহাবগুলোতে আমরা এমন অনেক বিধান দেখি, যেগুলো সহীহ হাদিস বিরোধী। কাজেই মাজহাবের অনুসরণ করা যাবে না।

যুক্তি-খন্ডন: একথা অনস্বীকার্য যে, আমাদের সব ব্যাপারে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ মানতে হবে। কিন্তু এমন অনেক সুন্নাহ আছে, যা হাদিস আকারে লিপিবদ্ধ হয়নি কিন্তু মদীনার সাহাবাদের মধ্যে সেই সুন্নাহগুলোর প্রচলন ছিল। ইমাম মালিক এক্ষেত্রে সহীহ হাদিসের বিপরীতে সাহাবাদের আমলকে প্রাধান্য দিয়েছেন।  যেমন – শুক্রবারে নফল রোযা রাখা যাবে না, এটা সহীহ হাদিস। কিন্তু, ইমাম মালিক মদীনায় তাবেঈ’নদের মধ্যে শুক্রবারে নফল রোযা রাখার প্রচলন দেখেছেন। এই তাবেঈ’নরা সরাসরি সাহাবাদের থেকেই এই আমল শিখেছেন। ইমাম মালিকের মতে, হয়তো পরবর্তীতে “শুক্রবারে নফল রোজা রাখা যাবে না” হাদিসের বিপরীতে “শুক্রবারে নফল রোজা রাখা উচিত”-এর হুকুম রাসূলুল্লাহ(সা) দিয়েছিলেন, ফলে আগের হুকুমটি বাতিল (Abrogate) হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ওই হুকুমটি হাদিস আকারে আমাদের কাছে পৌঁছায়নি, পৌঁছেছে সাহাবাদের আমলের (Practise) মাধ্যমে।  কাজেই, মালিকি মাজহাব অনুসারে শুক্রবারে নফল রোযা রাখা সুন্নাত, যদিও এর বিপরীতে সহিহ হাদিস আছে [৪]! সুতরাং,  চতুর্থ পয়েন্টের  “কুরআন ও হাদিসকে সেভাবে বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবী ও সালাফরা বুঝেছিলেন” – মাজহাবীরা মনে করে এই মূলনীতি সালাফীরা যতটা অনুসরণ করে, তারা তার চেয়েও বেশী অনুসরণ করে।

সালাফী যুক্তি ২: মাজহাবগুলো যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন ইমাম বুখারী (মৃত্যু ২৫৬ হিজরী) ও ইমাম মুসলিমের (মৃত্যু ২৬১ হিজরী) মতো সহীহ হাদিস গ্রন্থগুলো লেখা হয়নি। ফলে, মাজহাবের ইমামরা অনেক সহীহ হাদিস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। অথবা, কোনো হাদিসকে উনারা হয়তো দুর্বল বলে বাদ দিয়েছিলেন, কিন্তু ওই হাদিসটি অন্য কোনো সনদে সহীহ ছিল, যা জানা গিয়েছিলো পরবর্তী সময়ে। এই কারণে মাজহাবগুলোতে এমন অনেক মতামত দেখা যায়, যা সহীহ হাদিস বিরোধী।

যুক্তি-খন্ডন: এই যুক্তিটা বিভিন্ন কারণে [৪] দুর্বল। যেমন –

প্রথমত:  হাদিস সংকলন শুরু হয়েছিলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবিতকালেই। একথা সুপ্রসিদ্ধ যে, আবু হুরাইরা(রা), ইবনে আব্বাস(রা), আমর ইবনুল আস(রা) সহ প্রচুর সাহাবী লিখিত আকারে হাদিস সংরক্ষণ করেছিলেন [১৫]। এসব কিতাবের হাদিসগুলি পরবর্তী যুগের হাদিসগ্রন্থগুলোর (যেমন – বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী ইত্যাদি) মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। তাই, মদীনার সাহাবারা-তাবেঈনরা বুখারী-মুসলিমের হাদিসগুলো জানতেন না, এ কথা অমূলক।

দ্বিতীয়ত: বেশীরভাগ হাদিসের উৎস মূলত মদীনা শহর, আর ইমাম মালিক তাঁর সারাটা জীবন মদীনায় কাটিয়েছেন তাবেঈনদের কাছে পড়াশুনা করে। ইমাম মালিক সরাসরি ৬০০ তাবেঈনের কাছ থেকে হাদিস ও ফিকহ শিখেছেন, আর এই ৬০০ তাবেঈন শিখেছেন সরাসরি সাহাবীদের কাছ থেকে এমন একটি সময়ে যখন মদীনায় প্রায় দশ হাজার সাহাবী ছিলেন। ইমাম মালিক হাদিস শিখেছেন ওই যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হিশাম ইবনে ‘উরওয়া, ইবনে শিহাব আল-যুহরীর মতো বাঘা মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, আহকাম (হালাল-হারাম) সংক্রান্ত হাদিসের সংখ্যা কিন্তু খুব বেশী নয়। কাজেই, ইমাম মালিক কোনো বিষয়ের আহকাম সংক্রান্ত সহীহ হাদিসগুলো জানতেন না এই সম্ভাবনা খুবই কম।

তৃতীয়ত: যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই যে, ইমাম মালিক ১০%-১৫% সহীহ হাদিস জানতেন না, তবুও আপনি বলতে পারবেন না যে মালিকি মাজহাব সহীহ হাদিসের উপর আমল করে না। এর কারণ হলো, আমরা আগেই বলেছি “মাজহাব” বলতে বুঝায় “উসুল” বা Set of Principles, মাজহাব বলতে কোনো নির্দিষ্ট শারঈ’ বিধানকে বুঝায় না। ইমাম মালিকের মৃত্যুর পর থেকে যখনই নতুন কোনো হাদিস পাওয়া গেছে তখনই মালিকি মাজহাবের আলেমরা সেই নতুন হাদিসের আলোকে তাঁদের বিধানে পরিবর্তন এনেছেন, কিন্তু ইমাম মালিকের দেয়া “উসুল” অনুসরণ করেছেন। একই ব্যাপার অন্য মাজহাবগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেমন – ইমাম আবু হানিফার ছাত্র আশ-শাইবানী (মৃত্যু ১৮৯ হিজরী) বহু ক্ষেত্রে নতুন হাদিসের আলোকে ইমাম আবু হানিফার মতের বিরোধী মতামত দিয়েছেন। কিন্তু, তারপরেও ইমাম আশ-শাইবানী হানাফী মাজহাবের অনুসারী, কারণ তিনি ইমাম আবু হানিফার “উসুল” অনুসরণ করেছেন। গত ১১০০ বছর ধরে বিভিন্ন মাজহাবের আলেমরা এভাবে করেই নতুন পাওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে তাঁদের মতামতে পরিবর্তন এনেছেন।

উল্লেখ্য যে, হানাফী মাজহাবের উসুল অনেক অংশেই নেয়া হয়েছে কুফার সাহাবাদের কাছ থেকে [২৮]। আলী(রা) তাঁর খিলাফত মদীনা থেকে কুফায় সরিয়ে নেয়ার পর, বহু সংখ্যক সাহাবী কুফায় চলে আসেন। আলী (রা) সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদকে কুফার কাজী নিযুক্ত করেন। আর কুফার সাহাবীদের উসুলই হানাফী মাজহাবের উসুল।

সালাফী যুক্তি ৩: মাজহাবগুলি তাদের ইমামের মতামতের বিপরীতে সহীহ হাদিস পাওয়া যাওয়ার পরেও সহীহ হাদিসের অনুসরণ না করে তাদের ইমামের মতামতকে অনুসরণ করে। কিন্তু, সকল মাজহাবের ইমামই কি বলেননি “সহীহ হাদিসই আমার মাজহাব”?

উত্তর: প্রত্যেক ইমামই যথাসাধ্য সহীহ হাদিস অনুসরণ করেছেন এবং সেই মাজহাবের আলেমরাও সবসময় সহীহ হাদিসের ভিত্তিতেই বিধান দিয়েছেন। কিন্তু, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সহীহ হাদিসকে সেভাবেই বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবারা বুঝেছিলেন (৪ নং পয়েন্ট)। এমন বহু সহীহ হাদিস আছে যেগুলো অন্য সহীহ হাদিস বা কুরআনের আয়াত দ্বারা অবলুপ্ত (Abrogate) হয়ে গেছে, আবার এমনও সহীহ হাদিস আছে যেগুলো ১০০% সত্য হওয়ার পরেও সাহাবারা সেগুলির উপর আমল করতেন না; কেন করতেন না সেটা আমাদের অনেক ক্ষেত্রে জানা আছে, অনেক ক্ষেত্রে জানা নেই।

আসুন মালিকি মাজহাব থেকে একটা উদাহরণ দেখা যাক। ইমাম মালিক তার মুওয়াত্তায় নামাজে দাড়িয়ে হাত বুকে রাখতে হবে এই সংক্রান্ত হাদিস বর্ণনা করেছেন। কিন্তু, ইমাম মালিকই তাঁর মাজহাবে হাত ছেড়ে নামাজ পড়তে বলেছেন। কেন? কারণ, ওই যে – “হাদিস বুঝতে হবে সেভাবে যেভাবে সাহাবারা তা বুঝেছিলেন”। ইমাম মালিক মদীনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ তাবেঈ’নদের হাত ছেড়ে নামাজ পড়তে দেখেছেন, তাবেঈনরা এটা দেখেছেন মদীনার সাহাবাদের কাছ থেকে। ইমাম মালিকের এই মতের পক্ষের হাদিসও কিন্তু বুখারী শরীফেই আছে [২৩,২৪,২৫]। বর্ণিত হাদিসটিতে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) একজন সাহাবীকে শিখিয়েছেন কিভাবে নামাজ পড়তে হবে, কিন্তু তিনি তাকে হাত বাঁধার কথা বলেননি।  মালিকি মাজহাবের মতে, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কখনো কখনো হাত বেঁধে নামাজ পড়েছেন এটা দেখানোর জন্য যে, ইচ্ছা করলে এভাবেও নামাজ পড়া যায়। উল্লেখ্য, অনেকে বলে থাকে যে, ইমাম মালিক মৃত্যুর আগের শেষ কয়দিন “হাতে ব্যথা থাকার কারণে” হাত না বেঁধে নামাজ পড়তেন – এই কথার কোনও ভিত্তি নেই [৪]।

আবার অনেক ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে যে, অনেক সুন্নাহ/হাদিস আছে যা সালাফদের জানা ছিল, কিন্তু সেই সুন্নাহটি সহীহ হাদিস আকারে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেনি। কারণ, ইমাম বুখারী (মৃত্যু ২৫৬ হিজরী) বা ইমাম মুসলিম (মৃত্যু ২৬১ হিজরী) যেহেতু মাজহাবের ইমামদের প্রায় ৫০/৬০ বছর পর হাদিস সংগ্রহ শুরু করেছেন, এমন হতেই পারে – যে হাদিসটি ইমাম মালিক বা ইমাম আবু হানিফার কাছে সহীহ ছিল, তা বুখারী-মুসলিমের যুগে আসতে আসতে যইফ (দুর্বল) হয়ে গেছে। কিন্তু, মাজহাবের ইমামরা সেই সুন্নাহ সম্পর্কে সহীহ সনদে অবগত ছিলেন এবং সেই অনুসারে তাদের মাস’আলা দিয়েছেন।

“হাদিসের এ সকল গ্রন্থ সংকলিত হওয়ার পূর্বে যেসব ইমাম অতিক্রান্ত হয়ে গেছেন তাঁরা পরবর্তীদের চেয়ে অনেক বেশী হাদিসের জ্ঞান রাখতেন। কারণ, তাঁদের নিকটে এমন বহু হাদিস ছিল যা আমাদের পর্যন্ত মাজহুল (অজ্ঞাত) বা মুনকাতি’ (বিচ্ছিন) সনদে পৌঁছেছে কিংবা আদৌ পৌঁছেনি”।  (রাফউল মালাম আনিল আয়িম্মাতিল আ’লাম – ইবনে তাইমিয়াহ – পৃষ্ঠা ১৮। [১৯]

সালাফী যুক্তি ৪: সাহাবাদের তো কোনো মাজহাব ছিল না, আপনারা মাজহাব পেলেন কোত্থেকে?

যুক্তি-খন্ডন: আমরা আগেই বলেছি কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে বিধান দেয়ার “উসুল” (Set of Principles) কেই মাজহাব বলে। সাহাবীরাও কিছু “উসুল” অনুসরণ করেই বিধান দিতেন। একথা সুবিদিত যে মদীনার সাহাবাদের “উসুল” (Set of Principles) , কুফার সাহাবাদের “উসুল” (Set of Principles)  থেকে আলাদা ছিল [৪,৭]।

আর আপনি যদি সাহাবাদের পদ্ধতিই অনুসরণ করতে চান তাহলে আমি বলব সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে ইমাম মালিকের মাজহাব অনুসরণ করা। কারণ, ইমাম মালিকের জীবদ্দশায় এই মাজহাবের নাম কিন্তু মালিকি মাজহাব ছিল না, এর নাম ছিল “মাদানী মাজহাব”, কারণ মদীনার সাহাবী ও তাবেঈনরা এই “উসুল” অনুসরণ করতেন। ইমাম মালিক শুধু সেই “উসুল” কে একটা সিস্টেমের মধ্যে এনে লিপিবদ্ধ করে একে মাজহাবের রূপ দিয়েছেন।

সালাফী যুক্তি ৫: সব মাজহাব যদি একই কুরআন আর সুন্নাহ-এর অনুসরণ করে থাকে, তাহলে এদের বিধানগুলো এত আলাদা কেন?

যুক্তি-খন্ডন: একই কুরআন – সুন্নাহ অনুসরণ করার পরেও বিধান আলাদা হয় আলাদা “উসুল” [৪,৬,১৯] এর কারণে। “উসুল”-এর এই পার্থক্যের কিছু উদাহরণ দেখুন –

  • ইমাম মালিক মুরসাল হাদিস (যে হাদিস সাহাবা নয় বরং তাবেঈ’ থেকে বর্ণিত হয়েছে) গ্রহণ করেছেন, আর ইমাম শাফেঈ’ শুধু নির্দিষ্ট কিছু তাবেঈ’র মুরসাল হাদিস নিয়েছেন।
  • ইমাম মালিক মদীনার তাবেঈ’দের আমলকে সহীহ হাদিসের বিপরীতে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি হলো – যে মদীনার মাটিতে দশ হাজার সাহাবা শুয়ে আছেন, সেই মদীনার সাহাবা ও তাবেঈ’দের আমল সহীহ হাদিসের চাইতেও শক্ত দলীল (আবার সেই ৪ নং পয়েন্ট)। কারণ, হাদিস বুঝার ক্ষেত্রে আমাদের চাইতে তাঁদের জ্ঞান নি:সন্দেহে বেশী ছিল।
  • কিছু মুতাওয়াতির হাদিস (যে হাদিস তার সনদের প্রত্যেক স্তরে বহু মানুষ দ্বারা বর্ণিত হয়েছে) আছে যেগুলি কুরআনের আয়াতের সাথে আপাত: দৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক (Apparently Conflicting)। এক্ষেত্রে কি কুরআনের আয়াত নেয়া হবে নাকি হাদিসকে নেয়া হবে – তা নিয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একেক মাজহাব এক্ষেত্রে একেকটাকে প্রাধান্য দিয়েছে।
  • যদি কোনও আহাদ হাদিস (যে হাদিসের সনদের  প্রতিটা স্তরে তিনজনের বেশী বর্ণনাকারী পাওয়া যায় না) কুরআনের কোনো প্রতিষ্ঠিত নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে হানাফী মাজহাব হাদিস সহীহ হওয়া সত্ত্বেও, সেটা না নিয়ে কিয়াস ব্যবহার করে। এটা একটা কারণ যার ফলে আমরা হানাফী মাজহাবে সহীহ হাদিস বিরোধী এত আহকাম (Islamic Ruling) দেখতে পাই।
  • কোন্‌ হাদিসগুলো ‘আম (General), আর কোন্‌ হাদিসগুলো খাস (Specific/Exception) – এই বিষয়ে ইমামদের মতপার্থক্যের কারণেও ফিকহী পার্থক্য হয়।
  • অন্যদিকে হাম্বালী ও সালাফীরা হাদিসকে আক্ষরিক ভাবে মেনে চলেন, ফলে আমরা হাদিসের কিতাবগুলিতে যে হাদিসগুলি পাই, সেগুলোর সাথে এই মাজহাবগুলোর সরাসরি মিল সবচেয়ে বেশী।

আবু-বকর(রা) ও উমার(রা)-এর মতপার্থক্য [২৯]: “উসুল”-এর এই ধরণের পার্থক্য সাহাবাদের সময় থেকেই ছিল, আর তাবেঈনদের মধ্যে তো ছিলই। দু’জন সম্পূর্ন ভিন্ন বিধানের অনুসারী হয়েও উভয়েই সঠিক হতে পারে, যদি তাদের নিয়ত হয় আল্লাহর ﷻ হুকুমকে মনে চলা। শ্রেষ্ঠ দুই সাহাবী আবু বকর(রা) ও উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) অসংখ্য বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করতেন, তারপরেও তারা দুইজনেই রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-কে নিঁখুতভাবে অনুসরণ করেছেন [২৭]। যেমন – আবু বকর(রা)-এর খিলাফতকালে সাহাবীদের যে ভাতা দেয়া হতো, তা সকল সাহাবার জন্য সমান অংকের ছিল। আবু বকর(রা)-এর যুক্তি ছিল – মহান আল্লাহ ﷻ কুরআনে বলেছেন যে তিনি সকল সাহাবার উপরই সন্তুষ্ট, তাই তাঁরা সবাই সমান ভাতা পাবেন।

অন্যদিকে, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) খলীফা হওয়ার পরেই এই নিয়মের পরিবর্তন করলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যারা ইসলাম প্রচারের প্রথম দিকে তা গ্রহন করেছেন, তাঁরা যে কষ্ট সহ্য করেছেন সেই তুলনায় যারা পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন তারা অনেক কম কষ্ট সহ্য করেছেন, ফলে তাঁদের মর্যাদাও কম। কে কত আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তার ভিত্তিতে তিনি ভাতার স্কেল নির্ধারণ করেন। এখানে আবু বকর(রা) ও উমার(রা)-এর মতামত সম্পূর্ন বিপরীত – কিন্তু তাঁদের দু’জনেরই নিয়ত ছিল রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-কে  নিঁখুতভাবে অনুসরণ করা। সাহাবাদের জীবন ঘাঁটলে এরকম অগুনতি পরষ্পর-বিরোধী মতামত পাওয়া যায় [২৭]। কিন্তু, যেহেতু তাঁদের প্রত্যেকেরই নিয়ত শুদ্ধ ছিল, কাজেই যিনি যে বিধান অনুসরণ করেছেন, তাঁর জন্য সেটাই শুদ্ধ ছিল।

সালাফী যুক্তি ৬: শাফেঈ’ মাজহাব বলে অজু করে স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অজু থাকে না, হানাফী মাজহাব বলে অজু থাকে। কিন্তু, দুইটা তো একই সাথে সঠিক হতে পারে না। তার চাইতে যে মতামতটা অধিকতর সঠিক সেটা অনুসরণ করাই কি উচিত নয়?

যুক্তি-খন্ডন: প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক মাজহাব তাদের “উসুল” (Set of Principles) অনুসারে যেটা সবচেয়ে সঠিক সেটাই বেছে নিয়েছে। “স্ত্রীকে স্পর্শ করলেও অজু থাকে” – হানাফী মাজহাবে এটাই সঠিক। কারণ, আবু দাউদের সহীহ হাদিসে আছে – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) অজু করার পর আয়েশা(রা)-কে স্পর্শ করা সত্ত্বেও আবার অজু না করেই নামাজ পড়েছেন। অন্যদিকে, শাফেঈ’ মাজহাবের মতে  “স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অজু থাকে না ” –  এটাই সঠিক (এই বিষয়ে শাফেঈ মাজহাবের বিস্তারিত প্রমাণের জন্য এই লেখাটি পড়ুন)। কারণ, তাদের মতে সূরা মায়িদার ষষ্ঠ আয়াতে আল্লাহ ﷻ বলেছেন – “স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অজু থাকবে না” এবং এই আয়াতটি আবু দাউদের হাদিসের উপর প্রাধান্য পাবে, ফলে আবু দাউদের হাদিসের বিধানটি অবলুপ্ত (Abrogate) হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। কাজেই, আপনি যদি বলে থাকেন ইমাম আবু হানিফার মতামত এক্ষেত্রে ইমাম শাফেঈ’র মতামতের চেয়ে বেশী সঠিক, তাহলে আপনি আসলে বলছেন যে সেটা আপনার “উসুল” অনুসারে বেশী সঠিক।

সালাফী যুক্তি ৭: আব্বাসীয় শাসন আমলে এরকম ফতোয়া ছিল যে, হানাফীরা শাফেঈদের বিয়ে করতে পারবে না। শুধু তাই না, দামেস্ক ও মক্কায় চার মাজহাবের জন্য চারটি পৃথক মিহরাব ছিল এবং তারা ভিন্ন ভিন্ন জামাতে নামাজ পড়ত। কাজেই, এভাবে করে মাজহাব কি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেনি?

উত্তর: মাজহাব নিয়ে এধরণের বাড়াবাড়ি অতীতে হয়েছে একথা সত্য এবং মাজহাবের নামে মুসলিম উম্মাহর এরকম বিভক্তি মোটেও কাম্য নয় [৪]। কিন্তু, আপনি যখন জানবেন কেন এরকম করা হয়েছিল, তখন পুরো বিষয়টাকে ভিন্ন দৃষ্টিভংগীতে দেখতে পারবেন।

হানাফী আর শাফেঈ’রা একে অপরকে বিয়ে করতে পারবে না —এই ফতোয়া এজন্য দেয়া হয়েছিল যে, দু’টি ভিন্ন মাজহাবের বিয়ে সংক্রান্ত বিধি-বিধানগুলো ভিন্ন হওয়ায়, একজন মুফতীর পক্ষে কিছু কিছু ব্যাপারে মতামত (Islamic Ruling) দেয়া কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেমন – এক মাজহাব মনে করে ডিভোর্সের জন্য একবার তালাক বলতে হবে, আর আরেক মাজহাব মনে করে ডিভোর্সের জন্য তিনবার তালাক বলতে হবে।  স্বামী-স্ত্রী দুইজন যদি দুই ভিন্ন মাজহাবের মানুষ হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, কোন্ মাজহাব অনুসারে তাদের মামলা পরিচালনা করা হবে? এই ধরণের ঝামেলা এড়ানোর জন্য তখনকার মুফতিরা “এক মাজহাবের মানুষ অন্য মাজহাবের মানুষকে বিয়ে করতে পারবে না” – জাতীয় উদ্ভট ফতোয়া দিয়েছিলেন, যেটা ছিল সম্পূর্ণ ভুল। তাদের উচিত ছিল কিভাবে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বজায় রাখা যায় তা নিয়ে চিন্তা করা [৪]।

মক্কায় আর দামেস্কে চার মাজহাবের জন্য চার মিহরাব স্থাপন ছিল মাজহাব-সন্ত্রাসের এক চরম উদাহরণ, যা অস্বীকার করার উপায় নেই [৪]। কিন্তু এর দোষ আপনি মাজহাবকে দিতে পারেন না, এর জন্য দোষ দিতে হবে মানুষের চরমপন্থী চিন্তাভাবনাকে। চরমপন্থী চিন্তাভাবনা সবসময়ই খারাপ, তা সে মাজহাব নিয়েই হোক, সালাফীবাদ নিয়েই হোক আর নাস্তিকতা নিয়েই হোক। মাজহাবী চরমপন্থার যে উদাহরণ আপনি দিচ্ছেন, সেই একইরকম উদাহরণ নাস্তিকেরা ব্যবহার করে এটা প্রমাণ করার জন্য যে “ধর্ম খারাপ”। কারণ, ধর্মের কারণে আগের শতাব্দীগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে। কিন্তু, ভেবে দেখুন আগের শতাব্দীর সেই গণহত্যাগুলোর জন্য কি ধর্ম দায়ী, নাকি মানুষের চরমপন্থী চিন্তা-ভাবনা আর অন্য মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা দায়ী?

সালাফী যুক্তি ৮: রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে নামাজ পড়তে দেখ, তারপরেও মাজহাবীরা সহীহ হাদিসের বিপরীতে নামাজ পড়ে কেন?

উত্তর: লক্ষ্য করুন – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন – “সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে নামাজ পড়তে দেখ” (বুখারী)। মাজহাবীদের মতে – রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-এর মতো করে নামাজ পড়ার দাবী যতটা ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানিফা করতে পারেন, শাইখুল হাদিস আলবানী ততটুকু করতে পারেন না [৪]। কারণ, ইমাম আবু হানিফা নামাজের মাস’আলা নিয়েছেন মূলত আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ-এর ছাত্রদের থেকে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ মক্কার প্রথম দশ জন ইসলাম গ্রহণকারীদের, একজন যিনি দীর্ঘ বিশ বছর রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-এর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়েছেন। সাহাবারা রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-কে নামাজ পড়তে “দেখেছেন”, আবার তাবেঈ’রা সাহাবাদের নামাজ পড়তে “দেখেছেন”। আপনাকে স্বীকার করতে হবে – কোনো কিছু “পড়ে শেখার” চেয়ে উস্তাদের কাছ থেকে সরাসরি “দেখে শিখলে” ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

অন্যদিকে, ইমাম মালিক তাঁর নামাজের মাস’আলাগুলো নিয়েছেন [৪] প্রধানত: আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার(রা)-এর ছাত্র ও মুক্তিকৃত দাস নাফি’ (মৃত্যু ১১৭ হিজরী) থেকে, আর নাফি’ নিয়েছেন আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার(রা) থেকে, যিনি সব সাহাবীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-কে সবচেয়ে বেশী অনুকরণ করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রা) সেই ধরণের জুতা পরতেন যা রাসূলুল্লাহ(ﷺ) পরতেন, ঠিক একই কাপড় পরতেন যা রাসূলুল্লাহ(ﷺ) পরতেন। তাহলে এটা কিভাবে সম্ভব যে, উনি নামাজ পড়তেন যেভাবে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) পড়তেন না? ইমাম বুখারী নিজে “ইমাম মালিক -> নাফি’ -> আব্দুল্লাহ ইবনে উমার -> রাসূলুল্লাহ(ﷺ)” এর সনদ কে “স্বর্ণালী সনদ” (সিলসিলাতুল যাহাব / The Golden Chain of Narrators) বলে আখ্যায়িত করেছেন। এখন আপনিই বলেন – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কিভাবে নামাজ পড়েছেন, সেই নামাজ কি ইমাম মালিক বেশী বলতে পারবেন, না ১৪০০ বছর পরের কোনও আলেম সঠিকভাবে বলতে পারবেন?

আমাদের মনে রাখতে হবে, কিছু কিছু সুন্নাহ আছে যেগুলো লিখিত আকারে সংরক্ষিত হয়নি। সাহাবারা, তাবেঈ’রা  অনেক সুন্নাহই সংরক্ষণ করেছেন তাদের কাজের (Practice) মাধ্যমে। আর মাজহাবের ইমামরা অনেক ক্ষেত্রেই সহীহ হাদিসকে বাদ দিয়ে সালাফদের কাজকে (Practice) প্রাধান্য দিয়েছেন। এর কারণ হলো সেই ৪ নং পয়েন্ট – “হাদিস বুঝতে হবে সেভাবে যেভাবে সাহাবারা বুঝেছিলেন”। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় – মালিকি মাজহাবে “রাফ’উল ইয়াদাইন” করা হয় না। যদিও ইমাম মালিক রাফ’উল ইয়াদাইনের হাদিস সম্পর্কে জানতেন। ইমাম মালিকের মতামত হচ্ছে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) মাঝে মধ্যে রাফ’উল ইয়াদাইন করে দেখিয়েছেন যে, নামাজের যে কোনো আল্লাহু আকবারের সাথে চাইলে হাত তোলা যায়, এটা মাকরুহ নয়। এই মতামতের পিছনে যুক্তি কী? এর যুক্তি হলো – রাফ’উল ইয়াদাইনের হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রা) নিজেই নামাজে রাফ’উল ইয়াদাইন করতেন না, কাজেই এর থেকে বুঝা যায় রাসূলুল্লাহ(ﷺ)ও সাধারণত রাফ’উল ইয়াদাইন করতেন না। তাই, ইমাম মালিক রাফ’উল ইয়াদাইনের হাদিস জানা সত্ত্বেও তার পক্ষে মত দেননি।

আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্যনীয় যে – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কিন্তু বলেছেন – “সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে পড়তে দেখ” (বুখারী), তিনি বলেননি – “সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে নিয়ে লেখা হয়েছে”।  উপরে বর্ণিত কারণে – এই “দেখার” ব্যাপারটা কেউ যদি দাবী করতে পারেন তবে সেটা ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানিফারা যতটুকু করতে পারেন, ১৪০০ বছর পরের কেউ ততটুকু করতে পারবে না। 

মাজহাবীদের যুক্তি ও প্রতি-উত্তর

মাজহাবী যুক্তি ১: কেউ যদি নির্দিষ্ট কোনো মাজহাব অনুসরণ না করে, তাহলে সে বিভিন্ন মতামত থেকে তার যেটা পছন্দ হবে শুধু সেটা বেছে নিবে। ফলে ধর্মীয় বিধানগুলি সে তার খেয়ালখুশীমতো পালন করবে। কাজেই, একজন মুসলিমকে সবসময় নির্দিষ্ট একটি মাজহাবই অনুসরণ করতে হবে।

যুক্তি-খন্ডন: কেউ যদি তার ইচ্ছামতো চলার জন্য সব ক্ষেত্রে প্রত্যেক মাজহাবের সবচাইতে সহজ বিধানটা নেয়া শুরু করে, তাহলে সে অবশ্যই ভুল করবে কারণ, “মুসলিম” সে-ই যে আল্লাহর ﷻ ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু এই ব্যক্তি চাচ্ছে ইমামদের মতপার্থক্যকে নিজের বাসনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার মাধ্যমে কার্যত নিজের দ্বীনকে ধ্বংস করতে।

তবে এর মানে এটাও নয় যে, তাকে চার মাজহাবের একটিকে বেছে নিতেই হবে এবং সবসময় সেটাকেই মানতে হবে। কোনও বিষয়ে বিভিন্ন মতামত সম্পর্কে জানার পর কোনো ব্যক্তির কাছে যদি নির্দিষ্ট একটি মতামতকে অন্য মতামতের চাইতে বেশী সঠিক মনে হয়, তাহলে তার জন্য ওই নির্দিষ্ট মতামতকে মানার মধ্যে দোষের কিছু নেই। মালিকি মাজহাবের ইমাম শাতিবী বহু ক্ষেত্রে শাফেঈ’ মাজহাবের মতামতকে অনুসরণ করতেন এবং শিক্ষা দিতেন [৪]। হানাফী মাজহাবের  উসুলের একটি পয়েন্টই হলো যে, যদি কোনো বিষয়ে তাদের মাজহাবের ভিতর কোনো গ্রহণযোগ্য মতামত না পাওয়া যায়, তাহলে মালিকি মাজহাবের মতামত অনুসরণ করা।

এমনকি অনেক ক্ষেত্রে যদি এমন হয় যে, কোনো বিষয়ে আপনার দু’টি মতামত জানা আছে যার উভয়টিই কুরআন- সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত,  কিন্তু একটি মতামত সহজ আর আরেকটি কঠিন, এবং পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে আপনার পক্ষে কঠিন মতামতটি পালন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে, এই ক্ষেত্রেও আপনি সহজ মতামতটি অনুসরণ করতে পারেন (একে “তালফিক” বলে) [১১] । কারণ – আয়েশা(রা) বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ(ﷺ)কে দু’টো হালাল কাজের মধ্যে বেছে নিতে হলে তিনি সহজটাকে বেছে নিতেন”।  একথা সুবিদিত যে – তাবেঈ’রা কঠিন ফতোয়ার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রা)-এর কাছে যেতেন আর সহজ ফতোয়ার জন্য যেতেন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর কাছে [৪,৭]।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কঠিন মতামতের বিপরীতে সহজ মতামত গ্রহণ করার প্রচলন সাহাবা ও তাবেঈ’দের মধ্য থেকেই প্রচলিত। কাজেই কোনও বিষয়ে কোনও ব্যক্তি নিতান্ত অপরাগ হয়ে থাকলে, সহজ মতামত অনুসরণ করা যেতে পারে।

মাজহাবী যুক্তি ২: আমরা যদি ইসলামের গত ১১০০ বছরের ইতিহাস দেখি তাহলে এমন কোনো আলেম পাবো না, যিনি মাজহাব অনুসরণ করেননি। কাজেই, আমাদেরকেও চার মাজহাবের এক মাজহাব অনুসরণ করতেই হবে।

যুক্তি-খন্ডন: একথা সত্য যে, গত ১১০০ বছরের যত বিখ্যাত আলেম ছিলেন তাদের সবাই কোনো না কোনো মাজহাবের অনুসারী ছিলেন।  যেমন –

হানাফী মাজহাব – শায়বানী, আবু ইউসুফ, তাহাউই, মোল্লা আলি কারি

মালিকি মাজহাব – ইবন রুশদ, কাদি ইবনুল ‘আরাবী, ইবনে আব্দুল বার, কুরতুবী, শাতিবি

শাফেঈ মাজহাব – ইবনে সালাহ, ইমাম নাওয়াউই, ইবনে হাজার আসকালানী, ইবনে কাছির, আস-সুয়ূতি, গাজ্জালি

হাম্বালী মাজহাব – ইবনে তাইমিয়াহ, ইবনে কুদামা, ইবনে রজব, ইবনুল কাইয়িম, ইবনে জাউযি

কিন্তু, লক্ষণীয় যে, এই ইমামরা প্রত্যেকেই বহু ক্ষেত্রে তাঁদের মাজহাব যে মতামত বলে সেই মতামতের সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।  শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ, ইমাম শাতিবি সহ অনেক ইমাম অনেক ক্ষেত্রে নিজের মাজহাবের “উসুল”-এর বিপরীতে এমনকি অন্য মাজহাবের উসুল পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন [৪,৭]। কাজেই, একজন মানুষকে সবসময় সব বিষয়ে একটা মাজহাবেরই সব বিধান মেনে চলতে হবে তা ঠিক নয়।

তবে আলেমরা বলেন – কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে (Domain) একই মাজহাবের/ইমামের বিধি-বিধান মেনে চলা উচিত [৪,৭,১১,২৬]। যেমন – আপনি যদি সিদ্ধান্ত নেন: আপনি শাইখুল হাদিস নাসিরুদ্দীন আলবানীর ফিকহ অনুসারে নামাজ পড়বেন, তাহলে পুরো নামাজ উনার ফিকহ অনুসারেই পড়ুন। কিছু অংশ আলবানীর ফিকহ অনুসারে আর কিছু অংশ হানাফী মাজহাব অনুসারে পড়বেন এটা ঠিক নয়। আবার যদি সিদ্ধান্ত নেন, আপনি রোজা রাখার ক্ষেত্রে হানাফী মাজহাব অনুসরণ করবেন, তাহলে রোজার সব বিধি-বিধান হানাফী মাজহাব অনুসারেই পালন করুন, এর সাথে অন্য কোনো মাজহাবকে মেলাবেন না।  কেন? কারণ, একই বিষয়ে বিভিন্ন মাজহাবের সংমিশ্রণ ঘটলে দ্বীন নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

উদারহরণস্বরূপ [৪,১১] বলা যায় – হানাফী মাজহাবে বিয়ের জন্য ওয়ালী লাগে না, মালিকি মাজহাবে সাক্ষী লাগে না, আর কোনো কোনো ইমামের মতে মোহরের পরিবর্তে ‘ইলম শিক্ষা দিলেও চলে। কাজেই, কেউ যদি তার বিয়েতে সব মাজহাবের সবচেয়ে সহজ বিধানটি বেছে নেয়, তাহলে কার্যত সে কোনো শর্ত ছাড়াই, অর্থাৎ কোনো ওয়ালী, সাক্ষী, সম্পদের মোহর ছাড়াই বিয়ের নাম করে ব্যভিচার করতে পারবে। এজন্য আলেমরা এই বিষয়ে একমত যে, একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন মাজহাবের সংমিশ্রন করা যাবে না।

মাজহাবী যুক্তি ৩: কেউ যখন মাজহাব অনুসরণ করে, তখন সে ওই মাজহাবের হাজার হাজার ইমাম যে ব্যাপারে ঐক্যমত প্রকাশ করেছে তা অনুসরণ করে। অন্যদিকে, কেউ যখন ওই মাজহাবগুলোর বাইরে যেয়ে কোনো সালাফী ইমামের মতামত (Islamic Ruling) গ্রহণ করে তখন সে হাজার ইমামের বিপরীতে একজন ব্যক্তি ইমামকে অনুসরণ করে। হাজার হাজার ইমামের মতামতের বিপরীতে একজন ইমামের মতামত গ্রহণ করা সঠিক হতে পারে না। একারণে, চার মাজহাবের অনুসরণ না করে কোনো সালাফী ইমামের অনুসরণ করা ঠিক নয়।

যুক্তি-খন্ডন:  এই চিন্তাটা আসলে নতুন কিছু নয়। শুনতে আশ্চর্য মনে হলেও ইসলামের ইতিহাসের বেশ কিছু বাঘা-বাঘা আলেম এই মত দিয়েছেন যে, চার মাজহাবের বাইরে অন্য কোনো মাজহাব অনুসরণ করা যাবে না [৭,২৬]। তাদের যুক্তি হলো – এই চার মাজহাবের মতামতগুলি যেভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই মাজহাবগুলোর হাজার-হাজার আলেম মিলে বিশ্লেষণ (Analysis) করেছেন, এই চার মাজহাবের বাইরের মতামতগুলো নিয়ে সেভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। যেহেতু এগুলোকে নিয়েই সবচেয়ে বেশী সংখ্যক বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং প্রত্যেক মাজহাবের হাজার হাজার ইমাম সেই মাজহাবের ফিকহ (Islamic Ruling) গুলোকে সমর্থন করেছেন, কাজেই এই মাজহাবগুলোর বাইরে অন্য মত অনুসরণ করা ঠিক হবে না। ইমাম নাওয়াউই ও ইবনে সালাহ এরকম মনে করতেন। আর ইবনে রজব তো এই বিষয়ে একটি পুস্তিকা পর্যন্ত লিখেছেন। কিন্তু, ইবনে তাইমিয়াহ সহ বহু আলেম এই মতের বিরোধীতা করেছেন। তাদের মতে, বহু সংখ্যক আলেমের বিপরীতে কম সংখ্যক আলেমের মতামত কখনো কখনো শুদ্ধ হতে পারে [৭]।

বহু সাহাবার মতের বিপরীতে একজন সাহাবীর মত: রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-এর সিরাহ থেকে আমরা এরকম উদাহরণ পাই যেখানে অনেক সাহাবার ঐক্যমতের বিপরীতে একজন সাহাবীর মতামত শুদ্ধ ছিল। মক্কা বিজয়ের ঠিক আগে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) “যাতুস সালাসিল” [২৯] অভিযানে সবাই কে অবাক করে দিয়ে ‘আমর বিন ‘আসকে নেতৃত্বে দেন, যিনি মাত্র দুই মাস আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। অভিযানের কোনো এক রাতে ঘুমের মধ্যে ‘আমর ইবনে ‘আস এমন স্বপ্ন দেখেন যার ফলে তাঁর ফরজ গোসল করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু, তিনি ফজরের নামাজের সময় তিনি প্রচন্ড ঠান্ডার কারণে গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম করেন। তাঁর যুক্তি ছিল – এত ঠান্ডার মধ্যে গোসল করলে তিনি ভয়াবহ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন, এমনকি মারাও যেতে পারেন। আর আল্লাহ কোরআনে মানুষকে বলেছেন – নিজেকে হত্যা কোরো না

এই খবর ছড়িয়ে পড়লে বাকী সাহাবারা ‘আমর-এর ইমামতিতে নামাজ পড়তে অস্বীকৃতি জানাতে শুরু করেন (পরে অবশ্য ঐক্যের কথা বিবেচনা করে তাঁরা ‘আমর-এর পিছনেই নামাজ পড়েন)। কারণ তাদের কথা হলো – ঠান্ডার অজুহাতে তায়াম্মুম করা যাবে না, তায়াম্মুম শুধু তখনই করা যায় যখন পানি পাওয়া যায় না। নতুন সাহাবী ‘আমর-এর বিপরীত ক্যাম্পে কারা ছিলেন জানেন? ছিলেন – আবু বকর(রা), উমার (রা) এবং আবু উবাইদাহ বিন জাররাহ-এর মতো সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবারা।  কিন্তু, অভিযান শেষে যখন সাহাবারা ফিরলেন তখন রাসূলুল্লাহ(ﷺ) জানালেন – কেউ যদি এমন ভয় করে যে পানি স্পর্শ করলে তার মৃত্যু হবে বা ভয়াবহ অসুখ হবে তাহলে সে ফরজ গোসল না করে তায়াম্মুম করতে পারে! সুতরাং, দেখা যাচ্ছে শত শত সর্বোচ্চ মর্যাদার সাহাবার বিপরীতে একজন মাত্র সাহাবীর মতামতও সঠিক হতে পারে।

মাজহাবী যুক্তি ৪: সালাফী মতবাদ শুরু হয়েছে মাত্র ২০০-২৫০ বছর আগে। এর আগের হাজার বছর ধরে মাজহাবীরাই ইসলামকে সংরক্ষণ করে এসেছে। কাজেই, নতুন করে আর সালাফী মতবাদ প্রচারের দরকার কি? তার চেয়ে তো আগের চার মাজহাবই ভালো ছিল।

যুক্তি-খন্ডন: বর্তমানে আমরা যে সালাফী মুভমেন্ট দেখি, যেখানে মাজহাব অনুসরণ না করে সরাসরি কুরআন-সুন্নাহকে অনুসরণ করতে বলা হয়, আমরা যদি এর ইতিহাসের দিকে তাকেই তাহলেই এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারব [৯]। বর্তমানে আমরা যদিও সালাফী বলতে মূলত সৌদি-আরব/মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেমদের বুঝি, কিন্তু যে তিনজন ব্যক্তির হাত ধরে “সালাফী” শব্দটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তারা কিন্তু মিশরী/আফগানী ছিলেন। এরা হলেন –

  • জামালউদ্দীন আফগানী (মৃত্যু ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দ)
  • মুহাম্মাদ আব্দুহ (মৃত্যু ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ)
  • রশীদ রিদা (মৃত্যু ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দ)

উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন বিশ্বজুড়ে পাশ্চাত্যের আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করে তখন আফগানী, আব্দুহ, রিদারা চিন্তা করা শুরু করেন – কেন আমরা মুসলিমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে এত পিছিয়ে আছি? আমাদের মুসলিমদের উচিত ছিল দুনিয়ার নেতৃত্বে থাকা, কিন্তু কেন আজ ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এর নেতৃত্বে আছে? আব্দুহ চিন্তা-ভাবনা করে বের করলন – এর পেছনে আছে মুসলিমদের গোঁড়া মন-মানসিকতা। মাজহাবগুলো  প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো যখন মুসলিমদের খিলাফত ছিল, জীবনযাত্রা ভিন্ন মাত্রার ছিল। পরিবর্তিত এই বিশ্বের সাথে মাজহাবি বিধানগুলো তাল মেলাতে পারছে না, কারণ মাজহাব তো আল্লাহর ﷻ দেয়া না, মাজহাব মানুষের তৈরী। কাজেই, আব্দুহ বললেন, আমাদের ফিরে যেতে হবে কুরআন – সুন্নাহর কাছে। যেহেতু ওগুলো আল্লাহর ﷻ কাছ থেকে এসেছে, তাই শুধু আগের যুগেরই নয়, আধুনিক যুগের সব সমস্যার সমাধানও কুরআন-হাদিসের মধ্যেই পাওয়া যাবে।  বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব যেখানে মুসলিমদের খিলাফত নেই (বা থাকলেও নামে মাত্র আছে), যেখানে নারীরা ঘরের বাইরে কাজ করতে চায়,  যেখানে নিত্য-নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়ে চলেছে – এগুলোর আলোকে কুরআন–সুন্নাহকে আমাদের নতুন করে পড়তে হবে। আব্দুহ-ই সর্বপ্রথম এই চিন্তা-ভাবনাকে “সালাফী” নাম দেন। কারণ, সালাফদের সময় প্রচলিত চার মাজহাবের কোনোটিই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি, সালাফরা কুরআন–সুন্নাহ থেকে সরাসরি বিধান নিতেন। কিন্তু, বর্তমান সময়ে আব্দুহ-এর আন্দোলনকে সালাফী বলা হয় না, এটা হয়ে গেছে “মডার্নিষ্ট ইসলাম” বা “প্রগেসিভ ইসলাম”।

আব্দুহ ব্যবহৃত “সালাফী” শব্দটা নাসিরুদ্দীন নামক এক তরুণ আলবেনীয় জিনিয়াস খুব পছন্দ করে ফেলেন।  এই তরুণ পরবর্তীকালে হয়ে উঠেন শাইখুল হাদিস নাসিরুদ্দীন আলবানী, যার সারা জীবনের গবেষণা ছিল সহীহ হাদিসের ভিত্তিতে ফিকহী সিদ্ধান্ত দেয়া। নাসিরুদ্দীন আলবানী তাঁর কর্মপন্থাকে “সালাফী” নামে প্রচার করেন, যা আগে “নাজদি দাওয়া” নামে পরিচিত ছিল। “নাজদি দাওয়া” শুরু হয়েছিল শেইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (মৃত্যু ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দ)-এর মাধ্যমে । কিন্তু, বর্তমান সময়ে “সালাফী” বলতে আব্দুহ-কে বুঝানো হয় না, বুঝানো হয় নাসিরুদ্দীন আলবানি, মুহাম্মাদ ‘ইবনুল উছায়মিন, ‘আব্দুল ‘আযীয বিন বাজ  ও তাঁদের সমমনাদেরকে। উল্লেখ্য, সালাফী ইমামদের প্রায় প্রত্যেকেই ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (মৃত্যু ১৩২৮ খ্রীষ্টাব্দ)-এর মতামতকে বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

সুতরাং ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই যে, আধুনিক যুগের সাথে মাজহাবগুলো তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত সংকীর্ণমনতার কারণে যুগের সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছিল। কবর পূজার বিরুদ্ধে নমনীয় অবস্থান, যইফ (দুর্বল) হাদিসের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান না নেয়া, ইউরোপিয়ানদের ভাষা-খাদ্য-কাপড়-প্রযুক্তি ইত্যাদি ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি – এই জাতীয় উদ্ভট সব ফতোয়া মুসলিম জাতিকে ক্রমেই পেছনের দিকে টেনে ধরছিল। এই ধরনের ব্যর্থতাগুলোই সালাফী আন্দোলনকে বেগবান করে, যা ছিল সময়ের দাবী। সাথে সাথে, একথাও স্বীকার করতেই হবে যে সালাফী আন্দোলন মানুষকে সরাসরি কুরআন – সুন্নাহ পড়তে, তাদের অর্থ বুঝতে উৎসাহী করেছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মুসলিম তরুণদের মধ্যে ইসলামী জ্ঞান চর্চার যে জোয়ার আমরা দেখতে পাই, তার পেছনে সালাফী আন্দোলনের অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

আমাদের করণীয় [৭,৮,৯,১০,১১]:

১। মাজহাব অথবা কোনো সালাফী ইমাম – যাকে আপনার কাছে কুরআন-সুন্নাহর বেশী কাছাকাছি মনে হয় তাকেই অনুসরণ করুন [৪,৭,৮,২৬]। এমন মাজহাব/ইমামকে অনুসরণ করুন যার থেকে ভাঙা ভাঙা নয়, একটি ইবাদতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো জ্ঞান নিতে পারবেন। ইসলামের মৌলিক ইবাদত ও দৈনন্দিন লেনদেন, চলাফেরার জন্য প্রয়োজনীয় সকল বিধান আপনার পছন্দের মাজহাব/ইমাম থেকে ভালোভাবে জানুন এবং পালন করুন।

২। কোনো একটি নির্দিষ্ট ইবাদতের ক্ষেত্রে (যেমন – নামাজ) একটি নির্দিষ্ট মাজহাব বা একজন নির্দিষ্ট ইমামকে অনুসরণ করুন [৪,১১,২৬]। একই ইবাদতের মধ্যে একাধিক মাজহাব বা একাধিক ইমামের ফিকহ (Understanding)-কে মেলাবেন না।

৩। যদি পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে আপনি যে মাজহাব বা ইমামের অনুসরণ করেন তার কোনও নির্দিষ্ট হুকুম পালন করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে যে মাজহাব/ইমামের ফিকহ আপনার কাছে সহজ মনে হয় সেটাকে অনুসরণ করতে পারবেন [৪,১১]। এর উদাহরণ হিসেবে আলেমরা বলে থাকেন – যারা আমেরিকা/ইউরোপে অফিসে চাকরী করে, তারা যদি অজুর সময় জুতা খুলে পা ধুতে অসুবিধা বোধ করে, তাহলে তারা হাম্বালী মাজহাবের ফিকহ অনুসারে কেবল মোজা নয়, জুতার উপর দিয়েও মাসাহ করতে পারবে (শর্ত হলো – যখন শেষবার জুতা পরা হয়েছিলো তখন তার অজু ছিল ও পায়ের টাখনু সহ ঢাকা থাকতে হবে) [বিস্তারিত এখানে]।

সহজ মতামত গ্রহণের আরেকটা উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো – জুম’আর নামাজের ওয়াক্ত নির্ধারণ। হাম্বালী মাজহাবের মতে জুম’আর নামাজের ওয়াক্ত যুহরের নামাজের ওয়াক্তের চেয়ে ব্যাপক। তারা মনে করে- জুম’আর নামাজের ওয়াক্ত যুহরের নামাজের আরো আগেই শুরু হয়ে যায় (এক্ষেত্রে তাদের দলীল হলো  – উহুদের যুদ্ধের প্রস্তুতির দিনের হাদিস, যা থেকে বুঝা যায় রাসূলুল্লাহ(সা) সেদিন যুহরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই জুম’আর নামাজ পড়িয়েছিলেন )। অন্য মাজহাবগুলো হাম্বালী মাজহাবের এই মতের সাথে একমত পোষণ না করলেও উত্তর আমেরিকার মসজিদগুলোতে (এমনকি যে মসজিদের ইমাম হাম্বালী নন) দেখা যায় তারা সবসময় দুপুর ১টার সময় জুম’আর নামাজ শুরু করে, যদিও দেখা যাচ্ছে সেদিন যুহরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু দেড়টার সময়। উত্তর আমেরিকার মসজিদের ইমামরা এমন করেন কারণ – দেড়টার সময় নামাজ শুরু করলে অধিকাংশ মুসলিমের পক্ষে লাঞ্চ-ব্রেকে বের হয়ে নামাজ আদায় করা সম্ভব  হবে না।  কাজেই, এক্ষেত্রে সহজ মতামতটি অনুসরণ করা হচ্ছে সমস্ত মুসলিম উম্মাহর মঙ্গলের কথা চিন্তা করে।

৪। আপনার এলাকার ভালো আলেমের সাথে যোগাযোগ রাখুন। যেসব বিষয়ের শারঈ’ বিধান আপনি যেখানে বাস করেন তার পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত সেগুলো ব্যাপারে আপনার এলাকার ইমামই সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন [৯]। যেমন – দেশে কোনও ব্যাপারে আন্দোলন চলতে থাকলে আপনার তাতে অংশগ্রহণ করা উচিত হবে কিনা তা সৌদি আরব বা আমেরিকার আলেমের চেয়ে বাংলাদেশের আলেমই ভালো বলতে পারবেন।

৫। অন্য মাজহাব/ইমামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন। আপনি আপনার মাজহাব/ইমাম সম্পর্কে যতটা নিশ্চিত, অন্য ব্যক্তিও তার মাজহাব/ইমাম সম্পর্কে ততটাই নিশ্চিত। জেনে রাখুন যে, শরীয়তের মাত্র ২০% বিষয়ে ইমামদের মধ্যে ইজমা’ (ঐক্যমত) রয়েছে, আর বাকী ৮০% বিষয়েই তাদের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত মতপার্থক্য রয়েছে [১০]।  এই ধরনের মতপার্থক্য আবু বকর (রা), উমার (রা)-এর সময় থেকেই চলে আসছে। কাজেই মতপার্থক্যের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিন। অন্য কাউকে ফিকহি বিষয়ে জ্ঞান দেয়া থেকে বিরত থাকুন, যদি না বিষয়টি সেই অবশিষ্ট ২০%-এর মধ্যে পড়ে যে ব্যাপারে ইমামদের ইজমা’ (ঐক্যমত) রয়েছে।

শেষ কথা:

আসুন, কিছুক্ষণের জন্য উল্টোভাবে ভেবে দেখি – ফিকহ নিয়ে ইমামদের মধ্যে যদি মতপার্থক্য না থাকতো তো কী হতো? আল্লাহ ﷻ কি চাইলে তাঁর দ্বীনকে এমন করতে পারতেন না যে কোনও বিধান নিয়েই কোনও মতপার্থক্য হতো না? সত্যিই যদি এমন হতো – তাহলে নাজিলের ১৪০০ বছর পরেও এসে মানুষ এখনও কুরআন-হাদিস নিয়ে যত আগ্রহ সহকারে গবেষনা করছে, সেই আগ্রহে ভাটা পড়তো। আবার, যে ব্যক্তি কঠিন নিয়ম পালন করতে পারছেন না তিনি দ্বীনের কঠোরতার কারণে হয়ত ধর্মই ত্যাগ করে ফেলতেন। মতপার্থক্য থাকার কারণে বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়ে অপেক্ষাকৃত সহজ মতামতটি অনুসরণ করে অন্তত তিনি তার দ্বীন তো রক্ষা করতে পারছেন।

ইসলামের বিভিন্ন হুকুম নিয়ে মতপার্থক্য করার সুযোগ থাকার কারণেই কিন্তু এই দ্বীনের ফিকহগুলো মৃত নয়, জীবিত। আর ইসলাম জীবিত ধর্ম বলেই – সভ্যতা যতই এগিয়ে যাক, মানব সমাজ যতই বদলে যাক – সকল পরিস্থিতিতেই ইসলাম সমানভাবে কার্যকর।

আসুন, আমরা মাজহাবী-সালাফী পার্থক্য ভুলে যেয়ে একে অপরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখি, একে অপরের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে চেষ্টা করি। আমরা মুসলিমরা যেদিন অন্য মাজহাব ও অন্য মতের ইমামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারবো, শুধু সেই দিনই সত্যিকারের ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবো।

3:103

তোমরা আল্লাহর দড়িকে (কুরআন) শক্ত করে আঁকড়ে ধরো, আর দলে দলে ভাগ হয়ে যেয়ো না … (সূরা আলে-ইমরান:১০৩)     

শেইখ উছায়মিন, সালিহ আল ফাউযান-এর মতো যুগশ্রেষ্ঠ সালাফী ইমামরা সর্বদাই মাজহাবী ইমামদের শ্রদ্ধা করেছেন। তাঁরা বলেছেন – “আমি সালাফী তাই আমিই সহীহ, আর বাকী সবাই জাহান্নামী” জাতীয় ধারণা পোষন না করতে [২০,২১,২২]। আবার, আমাদের সময়ের জনপ্রিয় মাজহাবী বক্তা হামযা ইউসুফ [৪], আব্দুর রহমান বিন ইউসুফেরাও [২৬] বলেছেন: কেউ যদি মনে করে মাযহাবের চেয়ে সালাফী ইমামের মতামত অধিক সঠিক, তাহলে সেই ইমামকেই সে অনুসরণ করুক – এতে সমস্যার কিছু নেই। অনুকরণীয় এই সব ইমামরা বুঝতে পেরেছেন –নিজেকে হানাফী বা সালাফী হিসেবে চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ কোনও বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো মহান আল্লাহর ﷻ কাছে ভালো মুসলিম হিসাবে কবুল হওয়া।

References:

  1. The Prophet’s (ﷺ) Prayer from the Beginning to the End as Though You See it – Shaykul Hadith Muhammad Naasir-ud-Deen Al-Albaani
  2. Unity of the Muslim Ummah – Dr. Zakir Naik
  3. The Madhab of Rasool Allah (ﷺ) – Dr .Bilal Philips
  4. Maliki Fiqh – Hamza Yusuf
  5. Why follow a Madhab Instead of Sahih Hadith – Mufti Abdur Rahman ibn Yusuf
  6. The Madhab of Imam Ahmad Ibn Hanbal – Shatibi Center of Islamic Sciences
  7. The Issue of the Madhab and Taqleed – Shatibi Center of Islamic Sciences
  8. Which Madhab to Follow? – Dr. Yasir Qadhi
  9. Towards an Ecumenical Conception of Salafiyyah – Dr. Yasir Qadhi
  10. “We follow only the Quran and Sunnah” – Muhammad Haq (Virtual Mosque Blog)
  11. Choosing Opinions that Suit Your Desires – Yahya Ederer (Virtual Mosque Blog)
  12. Who and What is a Salafi – Nuh Ha Mim Keller (http://www.sunnah.org/aqida/aqida11.htm)
  13. Meaning of the word Salaf http://wayofthesalaf.tumblr.com/TheWordSalaf
  14. What does the word Salaf means in Arabic.
  15. Foundations of Islamic Studies – Dr. Bilal Philips
  16. Tolerance of Fiqh Issues – Ismail Kamdar (Muslim Matters Blog)
  17. Article about Imam Malik onhttp://en.wikipedia.org/wiki/Malik_ibn_AnasWikipedia
  18. Article about Imam Malik on IslamicEncyclopedia.org
  19. আদিল্লাতুল হানাফিয়া – আব্দুল্লাহ ইবনে মুসলিম বাহলাবি , পৃষ্ঠা ২২
  20. The Difference Between Salafiyyah and the Neo-Salafis – Dr. Bilal Philips
  21. Ibn al-Uthaymeen – “The Salafi Sect” Vs. The Way of the Salaf
  22. Advice to the (Neo) Salafis – Abu Mussab Wajdi Akkari
  23. The Maliki Argument for not Clasping the Hands During Prayer – Abdullah Bin Hamid Ali
  24. Why Do the Malikis Pray With Their Hands to The Sides? – Suhaib Webb
  25. The Risala – A treatise on Maliki Fiqh – Imam Al-Qayrawani Al-Maliki
  26. Following a Madhab – Mufti Abdur Rahman bin Yusuf 
  27. Difference of Opinion in Islam – Anwar Al-Awlaki
  28. Hanafi Usool Al Fiqh – Muhammad ibn Adam Al-Kawthari
  29. Seerah Part 14 (Torture and Prosecution of the Weak) – Yasir Qadhi
  30. Seerah Part 74 (Incidents Before the Conquest of Makkah) – Yasir Qadhi

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় এখানে: https://adnanfaisal.wordpress.com/2015/04/21/uniting_madhabi_and_salafi/

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close