আমাদের রামাদান বৃথা যাবে না যদি …

ঈমানের স্তর হলো তিনটি।

এক – মুসলিম। মুসলিম হলো সেই ব্যক্তি যে বাহ্যিকভাবে ইসলামের মৌলিক ফরজগুলো (শাহাদাহ, সালাত, সাওম, যাকাত, হাজ্জ) পালন করে আর কবিরা গুনাহ থেকে নিজেকে যথাসম্ভব দূরে রাখে। এই ব্যক্তির সাথে চলাফেরা করলে, মেলামেশা করলে এবং তার বাহ্যিক কাজকর্ম দেখলে একজন বুঝতে পারবে যে তার ধর্ম ইসলাম। মুসলিম হলো ঈমানের ন্যুনতম স্তর। মুসলিম হওয়ার কর্মকান্ডগুলো আনুভূমিক মাত্রার (of horizontal dimension)। এই কাজগুলো আশেপাশের মানুষেরা সহজেই দেখতে পায়। কাজেই, ইসলাম বলতে বোঝায় বাহ্যিক আত্মসমর্পণ (outward submission)।

দুই – মু’মিন। একজন মু’মিন শুধু সালাত পড়ার জন্য সালাত পড়ে না, সবাই সাওম রাখে তাই আমিও রাখি – এভাবে চিন্তা করে না। সে যখন সালাত পড়ে, তখন সে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে; সে যখন সাওম রাখে তখন নিজেকে সবরকম মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার প্রাণপন চেষ্টা করে; যাকাতের টাকা পকেট থেকে দেয়ার সময় তার মন খচখচ করে না, বরং নিজের উপার্জনকে পবিত্র করতে পেরেছে বিধায় সে পরিতৃপ্তি অর্জন করে।

মু’মিন ব্যক্তি সব কবিরা গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখে, আর সগিরা গুনাহ থেকেও নিজেকে বিরত রাখতে সবসময় চেষ্টা করে। মু’মিন বলতে এমন একজন মানুষকে বোঝায় যার অন্তরে ঈমান দৃঢ়ভাবে গেড়ে বসেছে। ঈমান কাজ করে উল্লম্ব মাত্রায় (in vertical dimension) – কারণ এটি একজন মানুষের অন্তরের সাথে তার স্রষ্টার সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতাকে নির্দেশ করে। একজন মু’মিনের অন্তরের এই অবস্থা তার চলাফেরাকে প্রভাবিত করে। যেহেতু তার অন্তর অধিকাংশ সময় স্রষ্টার সাথে যুক্ত থাকে – তাই সে মিথ্যা বলতে অস্বস্তি বোধ করে, ব্যবসাবাণিজ্যে চুরি করতে গেলে অপরাধবোধে ভোগে, খারাপ কিছু ঘটে গেলে হতাশ হয়ে ভাগ্যকে দোষ দেয় না – আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে সে সবসময় চেষ্টা করে।

তিন – মুহসিন। মুহসিন এমন ব্যক্তি যে মুসলিম ও মু’মিন তো বটেই, বরং সে তার সব কাজে ইহসান (excellence) অর্জন করেছে। অর্থাৎ, কোনো কাজে শুধু যতটুকু না করলেই নয় কেবলমাত্র ততটুকু অর্জন করা তার লক্ষ্য নয়, বরং সে ওই কাজে নিজের সাথেই নিজে প্রতিযোগীতা করে ছাড়িয়ে যেতে চায়। একজন মুহসিন – যখন দেখা হবে হাসিমুখে কথা বলবে, প্রতিবেশী চাওয়ার আগেই সে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবে, নিজ আগ্রহে কুরআন মাজিদকে বুঝতে চাইবে, ভালো কিছু জানতে পারলে মানুষের সাথে তা শেয়ার করবে। একজন মুহসিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে – সে আল্লাহকে না দেখতে পেলেও আল্লাহ্‌ তাকে সবসময়ই দেখছেন। ইবাদতের ক্ষেত্রে সে শুধু ফরজ পালন করেই বসে থাকে না – সুন্নাতে মুআক্কাদা, তাহাজ্জুদ আদায়ের চেষ্টা করে; রামাদানের পরেও তার সাওম রাখা শেষ হয় না, সে নফল সাওম রাখে; নিজের দানকে শুধু যাকাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে না, যেকোনো ভালো কাজেই সে সাদাকাহ করে। আর মুহসিনের সর্বোচ্চ পর্যায় হলো সেটা যখন সে নিজের মৃত্যুকে, বিচার দিবসকে মাথায় রেখে সব কাজ করে। মৃত্যুচিন্তা তার মধ্যে জবাবদিহিতার জন্ম দেয়। মৃত্যুর কথা স্মরণ করার অর্থ এই নয় যে সে জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়বে, বরং এটা তার মধ্যে ভালো কাজের উৎসাহ সৃষ্টি করবে। সে চিন্তা করবে – সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে – কাজেই যত বেশী করে সম্ভব আগেভাগে ভালো কাজগুলো করে নিই!

Frosty and sunny morning

এই শ্রেণীবিন্যাসটি বিযুক্ত (discrete) নয়, বরং যুক্ত (fluid)। অর্থাৎ, একজন ঈমানদার কেবলমাত্র কোনো একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীতে পড়বে – এমন কোনো কথা নেই। একজন ব্যক্তি হয়তো কোনো ক্ষেত্রে মুসলিম, কোনো ক্ষেত্রে মু’মিন আবার কোনো ক্ষেত্রে মুহসিন। তবে, আমরা যে যেই শ্রেণীতেই থাকি না কেন – রামাদান মাস হলো আমাদের নিজেকে সেই শ্রেণী থেকে তার পরের শ্রেণীতে নিয়ে যাওয়ার মাস। এই মাসে শয়তান শিকলে বন্দী থাকে, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় – অর্থাৎ ভালো কাজ করা এই মাসে খুব সহজ, খারাপ কাজ করা কঠিন, খারাপ কিছু করতে মন চায় না।

রামাদানের এই সুযোগকে কাজে লাগানোর এখনই সময়। আমরা যদি এখনো বাহ্যিকভাবে ইসলামে নিজেকে সমর্পণ না করে থাকি তাহলে আসুন আমরা এই মাসে নিয়মিত সালাত আদায়ের মাধ্যমে, সাওম রাখার মাধ্যমে পরিপূর্ণ মুসলিম হতে চেষ্টা করি; আমাদের অন্তর যদি আল্লাহর সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে তাহলে আসুন কুরআনের অর্থ পড়ে, সীরাত পড়ে, ভালো কিছু লেকচার শুনে ইবাদতগুলোর মর্মার্থ অনুধাবন করার চেষ্টা করি; আর অন্তত কিছু কাজ বেছে নিই যেগুলোতে আমরা ইহসান (excellence) অর্জনের চেষ্টা করব – এটা হতে পারে নিয়মিত তারাউইহ (তারাবি) আদায় করা, মসজিদে যেয়ে ফজরের সালাত আদায় করা, কখনোই রেগে না যাওয়া, বিপদ আসলেও ধৈর্য্য ধরে আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ আস্থা রাখা – যেটাই করব, ইহসান সহ করব।

এই রামাদানে নিজের লেভেল যতটুকু আপগ্রেড করব তার কিছু অংশও যদি রামাদান শেষে ধরে রাখতে পারি – তাহলেই আমরা বুঝতে পারব – আমাদের রামাদান বৃথা যায়নি, এই রামাদান থেকে কিছু হলেও আমরা অর্জন করতে পেরেছি।

মূল লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখকের ফেসবুক প্রোফাইলে

আরও পড়ুন: 

Photo credit: Frank Wuestefeld

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s