একজন মুসলিম ও একজন সংশয়বাদীর মধ্যে ইসলামের সত্যতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা

Coffee

ভদ্রলোক: ভাই, মুসলিমদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াটা বাধ্যতামূলক কেন?

মুসলিম: কী হলে খুশি হতেন?

ভদ্রলোক: আমার মনে হয় নামাজ ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত না।

মুসলিম: তাহলে আপনি ইচ্ছা হলে নামাজ পড়বেন, না হলে পড়বেন না?

ভদ্রলোক: হ্যাঁ, আমি যদি দরকার মনে করি, তাহলে পড়বোই। আমার প্রয়োজন না হলে কেন পড়বো।

মুসলিম: আপনার কী করা দরকার, কী করা দরকার না — এটা আপনি কি সবচেয়ে ভালো বোঝেন?

ভদ্রলোক: অবশ্যই, আমার নিজের ভালো আমি নিজে বুঝবো না তো কে বুঝবে?

মুসলিম: আপনি যখন কিশোর ছিলেন, তখন কি আপনি নিজের ভালোমন্দ সবচেয়ে ভালো বুঝতেন? এখন কি আপনার কখনো মনে হয় কিশোর বয়সে অনেক ভুল করেছেন, মুরব্বিরা আপনার ভালো আপনার থেকে বেশি বুঝতেন?

ভদ্রলোক: তখন বয়স কম ছিল, এজন্য কিছু ভুল করেছি। এখন বয়স হয়েছে, এখন আমি ভুল করি না।

মুসলিম: তাহলে আপনি কিশোর বয়সে করা ভুলগুলো তরুণ বয়সে গিয়ে উপলব্ধি করেছেন। তরুণ বয়সে করা ভুলগুলো মধ্য বয়সে গিয়ে উপলব্ধি করেছেন। আপনি কি নিশ্চিত মধ্য বয়সে করা কিছু আপনি বৃদ্ধ বয়সে গিয়ে ভুল মনে করবেন না?

ভদ্রলোক: হতে পারে আমার কিছু ভুল এখনো হচ্ছে, তবে সেটা খুবই কম। কিশোর বয়সের মতো নিশ্চয়ই না। অন্তত ধর্মের মতো একটা ব্যাপারে এখন ভুল করার প্রশ্নই ওঠে না। এখন আমার এটা বোঝার মতো যথেষ্ট বুদ্ধি হয়েছে।

মুসলিম: আপনার ভুলের সংখ্যাগুলো হয়তো এখন কম। কিন্তু আপনার ভুলগুলোর প্রভাব, ব্যাপকতা, পরিণতি কিশোর বয়সে করা ভুলগুলো থেকে অনেক বেশি হতে পারে না?

ভদ্রলোক: হতে পারে।

মুসলিম: হতে পারে না, সম্ভাবনা বলুন। সম্ভাবনা কম না বেশি?

ভদ্রলোক: দেখা যাক। বৃদ্ধ বয়সে যাই। তখন চিন্তা করে দেখবো।

মুসলিম: তার মানে আপনি এখন নিশ্চিত না আপনার ভুলগুলো বড় না ছোটো। আপনি নিশ্চিত না যে, আপনার এখন ঠিক যা করা দরকার ঠিক সেটাই আপনি করছেন? আপনার অনিশ্চয়তা কী প্রমাণ করে?

ভদ্রলোক: হ্যাঁ বা না বলতে পারছি না। আমি জানি না।

মুসলিম: আপনি এড়িয়ে যাচ্ছেন। আপনি ঠিকই নিজের ভেতরে বুঝতে পারছেন আপনার কী বলা উচিত, কিন্তু আপনি মুখ দিয়ে সেটা বের করতে পারছেন না। ‘আমি জানি না’ বলে পালানোর চেষ্টা করছেন। প্রথমেই আপনি দাবি করেছেন যে, আপনার জন্য কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ সেটা আপনি সবচেয়ে ভালো জানেন। অথচ এখন যখন উপলব্ধি করলেন আপনি হয়তো জানেন না, তখন আপনি মুখে ‘না’ বলতে পারছেন না। ভাই, আপনার সমস্যা এই না যে, আপনার ধর্ম নিয়ে অনেক সন্দেহ আছে। আপনার আসল সমস্যা হচ্ছে: আপনার উপরে কেউ একজন আছে, যে আপনার ভালো আপনার থেকে ভালো বোঝে, যার কথা আপনাকে কোনো তর্ক না করে মেনে নিতে হবে —এটা আপনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। সেটা কিশোর বয়সেও পারেননি, এখনো পারছেন না।

ভদ্রলোক: আচ্ছা, তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম হয়তো আমি এখনো কিছু ভুল করছি। সেটার সাথে নামাজের সম্পর্ক কী?

মুসলিম: ধরুন আপনি একটি রোবট তৈরি করলেন। তার দেহ, মস্তিষ্ক, চিন্তা করার ক্ষমতা, সবকিছু আপনি নিজে ডিজাইন করলেন। আপনি জানেন যদি রোবটটা প্রতিদিন পাঁচ বার তার ব্যাটারি চার্জ করে, তাহলে তার ব্যাটারি অনেকদিন ভালো থাকবে। যদি না করে তাহলে তার ব্যাটারি সবসময় দুর্বল থাকবে, ধুঁকে ধুঁকে একদিন শেষ হয়ে যাবে। আপনি রোবটকে নির্দেশ দিলেন প্রতিদিন পাঁচ বার ব্যাটারি চার্জ করতে। কিন্তু রোবট দাবি করলো যে, সে দিনে পাঁচবার চার্জ করার কোনো প্রয়োজন দেখছে না। সপ্তাহে একদিন চার্জ করলেই তো হচ্ছে। —এখন সেই রোবটের জন্য কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ, সেটা রোবট বেশি বোঝে, না আপনি বেশি বোঝেন?

ভদ্রলোক: আমি বেশি বুঝি।

মুসলিম: অথচ আপনি দাবি করছেন যে, আপনাকে যে বানিয়েছে, তার থেকে আপনি ভালো বোঝেন আপনার জন্য কী করা দরকার, কী দরকার নয়।

ভদ্রলোক: হুম…

মুসলিম: কষ্ট করে একটু মুখ দিয়ে এই কথাটা বলতে পারবেন, “আমি স্বীকার করছি যে, আমাকে যদি কেউ বানিয়ে থাকে, তাহলে আমার জন্য কোনটা দরকার, কোনটা দরকার না, সেটা সে আমার থেকে বেশি ভালো করে জানে।”

ভদ্রলোক: কথায় যুক্তি আছে।

মুসলিম: আপনাকে যে বানিয়েছে, সে যদি আপনাকে কিছু করতে বলে, আপনি কোনো যুক্তি, তর্ক না করে পুরোপুরি মেনে নিতে পারবেন? সে যদি আপনাকে বলে প্রতিদিন পাঁচ বার কাজকর্ম সব বন্ধ করে দশ মিনিট করে বিশ্রাম নিতে আপনি বাধ্য, না হলে সে আপনাকে শাস্তি দেবে। আপনি কোনো তর্ক না করে, সেটা করবেন?

ভদ্রলোক: তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম করবো। কিন্তু প্রমাণ কী যে, আমাকে সত্যিই কেউ বানিয়েছে? আমি তো সৃষ্টি হয়েছি এককোষী প্রাণী থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে।

মুসলিম: দাঁড়ান, স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে কিনা, সেটা আমরা পরে দেখবো। আগে আপনার প্রথম প্রশ্ন, “ভাই, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াটা কি মুসলিমদের জন্য ফরজ?” — সেই সমস্যাটার আগে সমাধান করি। আপনি সমাধান পেয়েছেন?

ভদ্রলোক: না। সত্যিই সেটা কোনো সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ, সেটা নিশ্চিত হবো কী করে? এটা তো মানুষের বানানো নিয়ম হতে পারে?

মুসলিম: দাঁড়ান, কু’রআন সত্যিই আল্লাহর ﷻ বাণী কি না, সেই প্রমাণ আমরা পরে করবো। আগে আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেই। যদি আপনাকে সত্যিই সৃষ্টিকর্তা বলে থাকে যে, আপনার জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ফরজ, আপনি কোনো ধরনের তর্ক না করে মেনে নেবেন এবং সেটা নিয়মিত করবেন?

ভদ্রলোক: করবো, যদি নিশ্চিত হই স্রষ্টা সত্যিই আছে এবং সত্যিই স্রষ্টা সেই নির্দেশ দিয়েছে, এবং এটা মানুষের বানানো কোনো নিয়ম না।

মুসলিম: ঠিক আছে, এই দুই প্রমাণ আরেক দিন হবে। কথা দিন যে, যদি প্রমাণ হয় স্রষ্টা আপনাকে প্রতিদিন নামাজ পড়ার নির্দেশ সত্যিই দিয়েছেন, এটা মানুষের বানানো কোনো নিয়ম না, তাহলে আপনি অবশ্যই নিয়মিত নামাজ পড়বেন, আর কোনো ধরনের তর্ক করবেন না।

ভদ্রলোক: কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত কেন? তিন ওয়াক্ত হলে কী সমস্যা হতো? প্রতিদিন নামাজ পড়তে হবে কেন? মানুষ দরকার মনে করলে তখনি পড়বে? ধর্ম এত কঠিন কেন?

মুসলিম: আপনি আবার পেঁচিয়ে গেছেন। এখন আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, যে আপনাকে বানিয়েছে, সে আপনার থেকে কম বোঝে আপনার জন্য কোনটা ভালো? একটু আগেই আপনি নিজে স্বীকার করলেন: সে আপনার থেকে সব ব্যাপারে বেশি ভালো জানে। যখন আপনি সেটা স্বীকার করবেন, তখন তাঁর কোনো নির্দেশ নিয়ে আপনি কোনো তর্ক দেখাতে পারবেন না। কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না। তর্ক দেখানো মানেই আপনি দাবি করছেন, আপনি তাঁর থেকে বেশি ভালো জানেন।

ভদ্রলোক: আচ্ছা, প্রমাণ করেন স্রষ্টা আছে।

মুসলিম: করবো। কিন্তু আগে আমরা উপসংহার টানি। আপনি নামাজ পড়েন না, কারণ আপনি হয় বিশ্বাস করেন না আল্লাহ ﷻ সত্যিই আছেন অথবা আপনি বিশ্বাস করেন না কু’রআন সত্যিই আল্লাহর ﷻ বাণী। কারণ এই দুটো যদি আপনি সত্যিই বিশ্বাস করতেন, তাহলে আমরা এতক্ষণ যে যুক্তি দেখালাম, সেই অনুসারে আপনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে বাধ্য, কোনো তর্ক না করে। ইসলামের কোনো নির্দেশ নিয়ে কোনো ধরনের তর্ক করা মানে হচ্ছে, আপনি বিশ্বাস করেন না কু’রআন আল্লাহর ﷻ বাণী, অথবা আল্লাহ ﷻ সত্যিই আছেন। আপনার অবস্থা কোনটা?

ভদ্রলোক: আমি নিশ্চিত নই। যে কোনো একটা হতে পারে, আবার দুইটাই হতে পারে।

মুসলিম: এই সব টালবাহানা করবেন না। আপনার অবস্থান কী সেটা পরিষ্কার করে বলুন।

ভদ্রলোক: আচ্ছা, কু’রআন আল্লাহর ﷻ বাণী, সেটা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই।

মুসলিম: তাহলে আপনি মানেন আল্লাহ ﷻ আছেন, এবং তিনি আপনাকে বানিয়েছেন, এবং তিনি আপনাকে যা করতে বলবেন, সেটা আপনি করতে বাধ্য।

ভদ্রলোক: আপাতত ধরা যাক আমি সেটা বিশ্বাস করি।

মুসলিম: আপনি হয় বিশ্বাস করেন, না হয় করেন না। এখানে কোনো ধরাধরি নেই।

ভদ্রলোক: আপনি কীভাবে নিশ্চিত আল্লাহ ﷻ আছেন কিনা? আল্লাহর ﷻ অস্তিত্ব নিয়ে প্রমাণ দেখান দেখি?

মুসলিম: আচ্ছা, তার মানে আপনার আসল অবস্থা হচ্ছে, আপনি এখনো বিশ্বাস করেন না যে, আল্লাহ ﷻ সতিই আছেন। এখন ধরুন আমি প্রমাণ করলাম আল্লাহ ﷻ সত্যিই আছেন। তাহলে কি আপনি কু’রআনের সব নির্দেশ আর কোনো তর্ক না করে মেনে নেবেন?

ভদ্রলোক: না, প্রমাণ দেখাতে হবে কু’রআন সত্যিই আল্লাহর ﷻ বাণী।

মুসলিম: চমৎকার! তার মানে আমরা যদি প্রমাণ করতে পারি কু’রআন মানুষের লেখা নয়, তারমানে কু’রআন আল্লাহর ﷻ লেখা। তখন প্রমাণ হয়ে যাবে আল্লাহ ﷻ আছেন। তখন কু’রআনের সব আদেশ আপনি কোনো তর্ক না করে মানবেন? আল্লাহর ﷻ থেকে কোনো ব্যাপারে নিশ্চয়ই আপনি বেশি বোঝেন না? নাকি সেই ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত না?

ভদ্রলোক: আগে প্রমাণ দেখান, তারপরে দেখা যাবে। আপনাকে আমি হাজারটা প্রমাণ দেখাতে পারব কুরআন মানুষের লেখা। গত দশ বছর ধরে আমি এটা নিয়ে পড়াশুনা করেছি। বহু বই পড়েছি, শত শত আর্টিকেল পড়েছি। আপনি কোনোভাবেই আমাকে প্রমাণ করতে পারবেন না। কু’রআন আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে তার প্রমাণ কী?

মুসলিম: তাহলে কু’রআন কোথা থেকে এসেছে?

ভদ্রলোক: কু’রআন মানুষ লিখেছে।

মুসলিম: কাদের লেখা?

ভদ্রলোক: আগেকার আরবরা লিখেছে। সাহাবিরা লিখেছে।

মুসলিম: প্রমাণ দেখান।

ভদ্রলোক: এনিয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে। ইন্টারনেটে বহু আর্টিকেল আছে এনিয়ে। প্রমাণের কোনো অভাব নেই।

মুসলিম: আপনার প্রমাণের বিপক্ষে আমিও অনেক প্রমাণ দেখাতে পারবো। অনেক বই লেখা আছে, অনেক ইন্টারনেটে আর্টিকেল লেখা আছে যে, কু’রআন মানুষের লেখা হতেই পারে না।

ভদ্রলোক: ওগুলো সব মুসলিমদের লেখা। মুসলিমরা তো নিজেদের মত সমর্থন করে লিখবেই।

মুসলিম: মোটেও না। অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের লেখা একটা দুইটা না, অনেকগুলো বই আছে। ওরা অনেকেই অমুসলিম। তারাই স্বীকার করেছে কু’রআন এর মতো কোনো আরবি সাহিত্য আর কোনোদিন লেখা হয়নি। এটা ‘সুপারহিউম্যান’ পর্যায়ের কাজ।

ভদ্রলোক: ওগুলো সব মুসলিমদের খুশি করতে লিখেছে। ওদেরকে ফান্ড দেওয়া হয়েছে এই সব বই লেখার জন্য। আরব আমিররা ওদেরকে টাকা খাওয়ায়।

মুসলিম: একই কথা আমি আপনার গুরুদের বেলায়ও বলতে পারি। ওদেরকেও ফান্ড দেওয়া হয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধে বই লেখার জন্য। আপনি যে দাবি করলেন, সেটার পক্ষে আপনার কাছে প্রমাণ নেই, কিন্তু ‘আমার কাছে তথ্য আছে’। সাতটি আমেরিকান দাতা সংস্থা ২০০১-২০০৯ সালের মধ্যে ৪২.৬ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে ইসলামের বিরুদ্ধে ভুয়া বই, ভিডিও, লেকচার, আর্টিকেল লিখে পৃথিবী ভরিয়ে ফেলতে। প্রমাণ দেখতে চাইলে ইন্টারনেটে গিয়ে Fear Inc লিখে সার্চ করুন। ইউটিউবে হাজার হাজার ভিডিও আছে যেগুলো তাদের কুকর্ম। শত বই লেখা হয়েছে ওই ফান্ড ব্যবহার করে। আপনি সেগুলো পড়েই মগজ ধোলাই হয়ে গেছেন। মনে করেছেন বড় বড় প্রফেসর, পিএইচডি করা মানুষ লিখেছে, তাদের কাজ কি কখনো ভুল হতে পারে? অথচ এরা সব সেই দাতা সংস্থাগুলোর ফান্ডিং খেয়ে লিখেছে। আপনি ওদেরকে মানতে রাজি আছেন, অথচ আমার অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজের প্রফেসরদের লেখা বই মানতে রাজি না?

ভদ্রলোক: তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম আপনার বা আমার কারো রেফারেন্সই গ্রহণযোগ্য না। রেফারেন্স ছাড়া শুধুই যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেন।

মুসলিম: কু’রআন যে অসাধারণ এক আরবি, যার মতো কোনো সাহিত্য কেউ লেখেনি, এটা মানবেন?

ভদ্রলোক: এটা তো মুসলিমদের দাবি। মুসলিমরা তো কু’রআন সম্পর্কে ভালো কথা বলবেই।

মুসলিম: না ভাই, এটা অমুসলিম প্রফেসরদেরও দাবি। যারা আরবিতে ডক্টরেট করেছেন। তারাই এই কথা বলেছেন। যে কোনো আরব সাহিত্যিককে ধরে জিজ্ঞেস করেন: তার জানা সবচেয়ে উচ্চ মার্গের আরবি সাহিত্য কোনটা? সবাই এক কথা বলবে। আরব সাহিত্যিক লাগবে না, কোনো আমেরিকান অমুসলিম আরবি প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করেন, সে-ও একই কথা বলবে। জীবনে কুরআন পড়েনি, কিন্তু অনেক আরবি সাহিত্য পড়েছে, এমন কাউকে কুরআন পড়তে দিন। দেখুন তার কী প্রতিক্রিয়া হয়।

ভদ্রলোক: অসাধারণ আরবি হলেই কি সেটা স্রষ্টার কাছ থেকে আসতে হবে নাকি। মুহাম্মাদ অনেক বড় একজন সাহিত্যিক ছিলেন। আপনাকে আমি বহু বই দেখাতে পারবো, যেখানে ঐতিহাসিকরা প্রমাণ করেছেন, মুহাম্মাদ নিজে কু’রআন লিখেছেন খ্রিস্টানদের কাছ থেকে শিখে। তাওরাত, বাইবেল থেকে অনেক কিছু হুবহু কপি করেছে।

মুসলিম: আচ্ছা, তার মানে দাঁড়ায় যে, হয় কু’রআন রাসুল ﷺ নিজে লিখেছেন, না হয় সাহাবিরা বা আরবরা মিলে লিখেছে, না হয় সেটা আল্লাহর ﷻ কাছ থেকে এসেছে। এর বাইরে কোনো আইডিয়া আপনার মাথায় আছে?

ভদ্রলোক: না।

মুসলিম: যদি আমি প্রমাণ করি কু’রআন রাসুল ﷺ নিজে লিখেননি, এবং সাহাবিরাও লিখেননি, তাহলে আপনি মেনে নেবেন কু’রআন আল্লাহর ﷻ কাছ থেকেই এসেছে।

ভদ্রলোক: হতে পারে। নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না।

মুসলিম: হতে পারে আবার কী? তিনটা সম্ভাবনার মধ্যে যদি দুইটা সম্ভাবনা ভুল হয়, তাহলে তৃতীয় সম্ভাবনা সঠিক। এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার।

ভদ্রলোক: চতুর্থ সম্ভাবনা থাকতে পারে, যেটা হয়তো সঠিক।

মুসলিম: চতুর্থ সম্ভাবনা কী? কুরআন শূন্য থেকে সৃষ্টি হয়েছে? ‘চতুর্থ সম্ভাবনা থাকার সম্ভাবনা থাকতে পারে’ —এটা কোনো যৌক্তিক দাবি না। এভাবে কোনো যুক্তি তর্ক করা যায় না। যদি সঠিক পদ্ধতিতে যুক্তি তর্ক করতে চান, তাহলে আগে নিজের অবস্থান ঠিক করুন। তারপরে আসুন, কথা বলি। চতুর্থ সম্ভাবনা আছে, নাকি নেই?

ভদ্রলোক: এখনকার মতো ধরে নিলাম নেই।

মুসলিম: এখন আমি যদি প্রমাণ করি, কুরআন রাসুল ﷺ নিজে লেখেননি, সাহাবীরাও লেখেননি, মানবেন যে সেটা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে?

ভদ্রলোক: মানতে পারি।

মুসলিম: মানলে কী হবে?

ভদ্রলোক: মানবো, আর কী হবে?

মুসলিম: কিছু একটা তো হতেই হবে। শুধু শুধু তর্ক করে সময় নষ্ট করবো কেন? তর্কের কোনো ফলাফল তো হতে হবে।

ভদ্রলোক: কী চান?

মুসলিম: আপনাকে মুসলিম হয়ে যেতে হবে। মুসলিমদের মতো নামাজ পড়তে হবে। রোজা রাখতে হবে। যাকাত দিতে হবে। আপনার প্রতি মাসে বেতনের পর খরচ থেকে যা বাঁচে, সেখান থেকে প্রত্যেক মাসে মানুষের জন্য দান করতে হবে। করবেন?

ভদ্রলোক: আমি তো মুসলিমই?

মুসলিম: আপনি কু’রআন আল্লাহর ﷻ কাছ থেকে এসেছে যদি না মানেন, তাহলে আপনি মুসলিম হলেন কীভাবে?

ভদ্রলোক: আমি মুসলিম, কিন্তু আমি ঠিক নিশ্চিত না।

মুসলিম: না ভাই, মুসলিম হলে আপনি গভীরভাবে বিশ্বাস করবেন যে, আল্লাহ ﷻ আছেন, কু’রআন তাঁর বাণী। আপনি সবসময় চেষ্টা করবেন কু’রআনের সব বাণী মেনে সেভাবে জীবন যাপন করার।

ভদ্রলোক: সেটাই তো জানতে চাচ্ছি। আমি তো এখনো চিন্তা ভাবনা করে নিশ্চিত হতে পারছি না। বরং চারিদিকে হাজার হাজার প্রমাণ দেখতে পাচ্ছি যে, কু’রআন আল্লাহ বা কোনো স্রষ্টার কাছ থেকে আসেনি। এত সমস্যা থাকলে কীভাবে বিশ্বাস করবো? মনে এত সন্দেহ নিয়ে নাক-চোখ বন্ধ করে জোর করে কী কিছু বিশ্বাস করা যায়?

মুসলিম: আপনার কষ্টের কথা বুঝতে পারছি। আজকে এই সমস্যা মুসলিমদের মধ্যে মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে। ঠিক আছে, চলেন চেষ্টা করি আপনাকে কিছু প্রমাণ দেখানোর। প্রথমে প্রমাণ করি কু’রআন সাহাবিরা লেখেননি। কী প্রমাণ দেখালে আপনি মানবেন যে, তা সাহাবিরা লেখেননি?

ভদ্রলোক: এমন কোনো প্রমাণ দেখান যে, কু’রআন মুহাম্মাদ নিজে লিখেছেন। তাহলে বিশ্বাস করবো কু’রআন সাহাবিরা লেখেননি।

মুসলিম: রাসুল ﷺ কু’রআন লিখেছেন এটা তো আপনাদের দাবি। সেটার বিপক্ষেই তো আমি যুক্তি দেখাবো।

ভদ্রলোক: আচ্ছা, তাহলে প্রমাণ দেখান, সাহাবিরা লেখার আগেই কু’রআন লেখা ছিল। কোনো নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ দেখাতে হবে যে, কু’রআন সত্যিই সাহাবিদের লেখার আগে থেকেই, একদম মুহাম্মাদ-এর সময় থেকেই বই আকারে লেখা ছিল। এবং সেটা এখনো অক্ষত আছে।

মুসলিম: হাফিজ কি জানেন?

ভদ্রলোক: হ্যাঁ, যারা কু’রআন মুখস্ত করেছেন।

মুসলিম: সাহাবিরা কু’রআন কম্পাইল করার আগে কমপক্ষে তিনশ হাফিজ ছিলেন, যারা পুরো কুরআন মুখস্ত করেছেন। শ খানেক হাফিজ নানা যুদ্ধে মারা গিয়েছেন। হাজারো মুসলিম ছিলেন, যারা কুরআনের নানা অংশ মুখস্ত করেছেন। তাদের কাছে কু’রআন অক্ষতভাবে লেখা ছিল।

ভদ্রলোক: মানুষ মুখস্ত করলে সেটা লেখা হলো কি করে? কোনো কাগজে লেখা থাকতে হবে। না হলে সেটা নির্ভরযোগ্য হবে কীভাবে?

মুসলিম: আপনার ইমেইলগুলো কোথায় আছে?

ভদ্রলোক: গুগলের কাছে।

মুসলিম: গুগুলের কাছে যে ইমেইলগুলো আছে, সেগুলো তো কাগজে লেখা নেই। আছে কম্পিউটারের ডিস্কে। এখন আমি যদি দাবি করি আপনার ইমেইলগুলো সব ভুয়া, কারণ সেগুলো কাগজে লেখা নেই, ইলেক্ট্রনিক সিগন্যালে ভেসে বেড়াচ্ছে। সব গুগলের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বানানো ভুয়া মেইল, আপনাকে বোকা বানাচ্ছে —তাহলে আপনি কী বলবেন?

ভদ্রলোক: কী যে বলেন! কম্পিউটার কাগজের থেকে অনেক বেশি নির্ভরশীল। ইমেইলগুলো একাধিক কম্পিউটারে আছে। একটা কম্পিউটারের থেকে হারিয়ে গেলে আরেকটা কম্পিউটারের পাওয়া যাবে। কয়েকটা কম্পিউটারে একই ইমেইল পাওয়া গেলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে, ইমেইলগুলো বিকৃত হয়নি। তাছাড়া ইমেইল যারা পাঠিয়েছে, তাদেরকে জিগ্যেস করলেই জানতে পারবো তারা ঠিক সেই ইমেইলটাই পাঠিয়েছে কিনা। তার কাছে কপি আছে।

মুসলিম: এক্সাক্টলি! আপনি শেষ পর্যন্ত মানুষকেই জিগ্যেস করবেন যাচাই করার জন্য। একইভাবে হাজার হাজার মানুষের ব্রেইনে কু’রআন লিখে রাখলে সেটাও নির্ভরযোগ্যভাবে থাকে। একজন ভুল করলে, আরেকজন ঠিক করে দিতে পারে। একশ জন ভুল করলে বাকি হাজার জন ঠিক করে দিতে পারে। এইভাবে কু’রআন সংরক্ষণ করা কাগজে লেখা থেকে বেশি নির্ভরযোগ্য, কারণ কাগজে লেখার সময় লেখকের বানান ভুল হতে পারে। সেই ভুল কপি হতে গিয়ে আরও ভুল হতে পারে। প্রিন্ট করার সময় প্রিন্টিং মেশিনে ভুল হতে পারে। প্রিন্টের কপি হওয়ার সময় সেই ভুল ছড়িয়ে যেতে পারে। কাগজে কালি মুছে যেতে পারে। লেখা বিকৃত হয়ে যেতে পারে। কাগজ কোনোভাবেই নির্ভরযোগ্য মাধ্যম না। মুখস্ত না করে হাজার হাজার কপি লেখার কারণে বাইবেল, তাওরাতের কী ভয়াবহ বিকৃতি হয়েছে দেখছেন না? ইহুদি, খ্রিস্টান স্কলাররা পর্যন্ত দাবি করছেন যে, তাদের ধর্মগ্রন্থে ব্যাপক বিকৃতি হয়েছে, আসল তাওরাত এবং ইঞ্জিল আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাওরাত এবং বাইবেলের এত ভার্সন তারা কোনোভাবেই আর মিলাতে পারছে না। এই বিশাল সমস্যার কারণ তাওরাত এবং বাইবেলের অনেকগুলো লিখিত কপি থাকা। যদি তারা না লিখে হাজার হাজার মানুষকে দিয়ে বংশ পরম্পরায় মুখস্ত করিয়ে রাখত, তাহলে আর কোনো সমস্যাই থাকত না। এজন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে অনেকগুলো জায়গায় কোনো তথ্য ধরে রাখা। ঠিক একই কাজ হাফিজরা করেছেন। তাদের ব্রেইনে ইলেক্ট্রনিক সিগন্যালে কু’রআন রেকর্ড করে রাখা আছে। বুঝতে পারছেন যে, কাগজে লেখার থেকে ইলেক্ট্রনিক সিগন্যালে কোনো তথ্য ধরে রাখা আরও বেশি নির্ভরযোগ্য? সেটা যদি অনেকগুলো কম্পিউটারে বা ব্রেইনে রাখা থাকে?

ভদ্রলোক: কম্পিউটার আর মানুষের ব্রেইন এক হলো নাকি? কম্পিউটার ভুলে যায় না। মানুষ ভুলে যায়।

মুসলিম: ডিস্কে তথ্য নানা কারণে কারণে মুছে যেতে পারে। ডিস্ক নষ্ট হয়ে যায়, মাঝে মাঝে ডিস্কের অংশবিশেষ আর পড়া যায় না। সফটয়ারের বাগ-এর কারণে তথ্য বিকৃত হয়ে যায়। মানুষের মস্তিস্ক যেমন নির্ভরযোগ্য না, তেমনি কম্পিউটারও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য না। এজন্যই গুরুত্ত্বপূর্ণ ডাটাবেজ একাধিক ডিস্কে, একাধিক কম্পিউটারে সংরক্ষণ করা থাকে। নিয়মিত সেই তথ্য যাচাই করে দেখা হয় সেটা বিকৃত হয়ে গেছে কিনা। একইভাবে অনেকগুলো ব্রেইনেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নির্ভরযোগ্যভাবে ধরে রাখা যায়, যদি সেই তথ্য বার বার যাচাই করে দেখা হয় যে, তা অক্ষত অবস্থায় আছে কি না। আপনি কাগজের বই বলতে কম্পিউটারে কম্পোজ করা, প্রিন্টারে প্রিন্ট করা বই মনে করছেন। একশ বছর আগে মানুষ কীভাবে বই প্রিন্ট করত, কপি করতো, সেটা কিছুক্ষণ ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন, কাগজের বই লেখা কতটা ঝুকিপূর্ণ। হাজার বছর আগে চামড়ায়, পাথরে, মাটির ফলকে লেখার থেকে হাজার মানুষের মুখস্ত করে রাখাটা সবদিকে থেকে বেশি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি ছিল।

ভদ্রলোক: আপনি কীসের সাথে কী তুলনা করছেন! কম্পিউটারের নির্ভরযোগ্যতা কোথায়, আর মানুষের নির্ভরযোগ্যতা কোথায়! এই দুয়ের মধ্যে কোনো তুলনা হয়?

মুসলিম: একজন ৬০ বছর বয়স্ক হাফিজকে ডাকুন, যিনি হয়তো ১০-১২ বছর বয়সে হাফিজ হয়েছেন। তিনি আপনাকে কু’রআনের ৭৭,৪২৯টা শব্দ হুবহু, একই ক্রম অনুসারে, দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলন সহ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করে শোনাবেন। ৫০ বছর ধরে তার ব্রেইন ৭৭,৪২৯টা শব্দ হুবহু, একটার পর একটা, ঠিক জায়গা মতো মনে রেখেছে। শুধু শব্দগুলো নয়, সেই শব্দগুলোর বিশেষ উচ্চারণ, কোথায় থামতে হবে, কোথায় থামা যাবে না, কোথায় লম্বা উচ্চারণ, কোথায় লম্বা বিরতি এরকম অনেক তথ্য মনে রেখেছে। ডাটা এর সাথে মেটাডাটা সহ মনে রেখেছে। এবার ৫০ বছর আগের একটা ডিস্ক আনেন তো দেখি পড়া যায় কিনা?

ভদ্রলোক: হুম, কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু হাফিজ থাকলে কীভাবে প্রমাণ হলো যে, সাহাবিরা নিজেরা কু’রআন লেখেননি।

মুসলিম: সাহাবিরা যদি কু’রআন নিজেরা মিলে লিখে থাকেন, তাহলে হাফিজরা কী মুখস্ত করেছেন?

ভদ্রলোক: সাহাবিরা হাফিজদেরকে যা শিখিয়েছেন, সেটাই তারা মুখস্ত করেছেন, আর কি?

মুসলিম: না, আপনি ভুলে যাচ্ছেন, সাহাবিরা কু’রআন লেখার আগে থেকেই হাফিজ ছিলেন। যারা সরাসরি রাসুলের ﷺ কাছ থেকে শুনে মুখস্ত করেছেন। হাজার সাহাবি রাসুলের ﷺ পেছনে নিয়মিত নামাজে কু’রআন তিলাওয়াত শুনেছেন। যদি সাহাবিরা পরে নিজেরা কু’রআন লিখতেন, হাফিজরা সেটা ধরে ফেলতেন। আন্দোলন হতো। ইতিহাসে কোনো বিরাট গণ্ডগোল লেখা থাকতো। সেরকম কিছুই লেখা নেই।

ভদ্রলোক: লেখা নেই, কারণ সাহাবিরা এবং হাফিজরা মিলে এই কাজ করেছে। খলিফারা হাফিজদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। ঐতিহাসিকরা কোনো কিছু খুঁজে পায়নি।

মুসলিম: প্রমাণ দেখান।

ভদ্রলোক: প্রমাণ নেই, বরং প্রমাণের অভাবটাই একটা বড় প্রমাণ যে, কোনো বড় ধরনের ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। এটা হওয়াটাই স্বাভাবিক।

মুসলিম: প্রমাণের অভাব কোনো প্রমাণ না। এলিয়েনরা আছে, এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। আমি যদি বলি এলিয়েনের কোনো প্রমাণ নেই, সেটাই প্রমাণ করে যে, এলিয়েন আছে, কারণ এলিয়েনের অস্তিত্ব ধামাচাপা দেওয়াটাই স্বাভাবিক — তাহলে এটা পাগলের কথা। আপনি হাফিজদেরকে নিয়ে যা বলছেন সেটা অবাস্তব। হাফিজরা বছরের পর বছর ধরে কষ্ট করে কু’রআন শিখেছেন। তারা সেই কু’রআনের জন্য জীবন দিয়ে দিতে রাজি ছিলেন। এরকম হাজার হাজার নিবেদিত প্রাণ মানুষকে কোনো খালিফা ভয় দেখিয়ে সবার মুখ বন্ধ করে দিতে পারতেন না। বিরাট মারামারি হতো। বহু হাফিজ জীবন দিয়ে দিতেন, তারপরেও এরকম কিছু হতে দিতেন না। আপনি সম্পূর্ণ অবাস্তব একটা দাবি করছেন।

ভদ্রলোক: ধরে নিলাম এরকম কিছু হয়নি। তাতে কী প্রমাণ হলো?

মুসলিম: প্রমাণ হলো যে, সাহাবিরা নিজেরা বানিয়ে কু’রআন লিখেননি। মানবেন?

ভদ্রলোক: এখনকার মতো মানলাম। তাহলে কু’রআন মুহাম্মাদ নিজে লিখেছে। আপনাকে আমি হাজারটা প্রমাণ দেখাতে পারবো। এটা নিয়ে আমি প্রচুর পড়াশুনা করেছি। শত শত ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। আপনি কোনোভাবেই এত প্রমাণ অস্বীকার করতে পারবেন না।

মুসলিম: লিখে লাভ?

ভদ্রলোক: বিরাট লাভ। নিজেকে নবী বলে পরিচয় দিতে পারবে। হাজার হাজার মানুষ তার কথা শুনবে। বিরাট ক্ষমতা দখল করতে পারবে। আজকাল পিররা যা করছে।

মুসলিম: আজকাল ভণ্ড পিররা যা করছে, তার সবকিছুর পেছনে উদ্দেশ্য হচ্ছে টাকা। রাসুল ﷺ অনেক সম্পত্তি বানিয়েছেন, এর প্রমাণ আছে আপনার কাছে? তিনি যে অত্যন্ত গরিবের মতো জীবন পার করেছেন, প্রায় কিছুই রেখে যাননি, সেই ইতিহাস তো সবাই জানে?

ভদ্রলোক: সম্পত্তি না কামালে কী হবে, ক্ষমতা পেয়েছে, সম্মান পেয়েছে।

মুসলিম: ক্ষমতা সম্মান দিয়ে কী হয়?

ভদ্রলোক: মানুষ সবসময় ক্ষমতা, সম্মান চায়। এটাই মানুষের স্বাভাবিক চাওয়া।

মুসলিম: ক্ষমতা সম্মান পেয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষ কী চায়?

ভদ্রলোক: আরামে থাকতে চায়। মানুষকে নিজের অধীনে করে রাখতে চায়। নিজের ইচ্ছামতো যা খুশি করতে চায়।

মুসলিম: ঘুরে ফিরে একই কথা – সম্পত্তি। একটু আগেই তো বললাম যে, ইতিহাসে কোনো প্রমাণ নেই যে, রাসুলের ﷺ অনেক সম্পত্তি ছিল। তাহলে ক্ষমতা সম্মান এই সব দিয়ে কী লাভ হলো?

ভদ্রলোক: সাধারণ মানুষ হিসেবে বাঁচতে কারো ভালো লাগে না। মানুষ সবসময়ই বিশেষ কেউ হতে চায়।

মুসলিম: বিশেষ কেউ হয়ে মানুষ কী করতে চায়?

ভদ্রলোক: আচ্ছা, ঘুরে ফিরে একই কথা আসছে। আরাম-আয়েশের জীবন চায়। না হলে সে নিজের নাম রেখে যেতে চায়, যেন মারা গেলেও সবাই তার কথা বলে। মানুষ শুধুই বিখ্যাত হওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করতে পারে, টাকা পাক, আর না পাক।

মুসলিম: তাহলে স্বীকার করুন যে, রাসুল ﷺ যদি নিজে ধর্ম বানিয়ে প্রচার করেও থাকেন, তাহলে সেটা অন্তত সম্পত্তির জন্য ছিল না। তিনি কোনো মহামানব ছিলেন, তিনি মানুষের ভালোর জন্য ধর্ম প্রচার করেছেন। সেটা তার নিজের বানানো ছিল কিনা সেটা আমরা পরে দেখছি। কিন্তু আপনি এটা মানছেন যে, এর পেছনে সম্পত্তি কোনো কারণ ছিল না?

ভদ্রলোক: মানলাম। প্রমাণ করেন যে, তিনি নিজে বিখ্যাত হওয়ার জন্য কু’রআন লেখেননি।

মুসলিম: তিনি যদি নিজে বিখ্যাত হতে চাইতেন, কু’রআনে তিনি নিজের ভুলের কথা কয়েকবার লিখতেন না। যেমন, রাসুল ﷻ একবার এক অন্ধ সাহাবীকে মনোযোগ না দিয়ে আরব নেতাদেরকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন দেখে তার ভুল সংশোধন করে ১০টা আয়াত এসেছে। ঘটনাটা আল্লাহর ﷻ কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, রাসুল ﷺ কীভাবে বিরক্ত হয়ে তাকিয়েছিলেন, কী চিন্তা করে সাহাবিকে মনোযোগ না দিয়ে অন্যদেরকে দিয়েছিলেন, তার সেই ভাবাটা কত বড় ভুল ছিল, তার কী করা উচিত ছিল —সেটা আল্লাহ ﷻ দশ-দশটা আয়াতে বিস্তারিত বলেছেন। এরকম রাসুলের ﷺ কয়েকটা ভুলের কথা কুরআনে আছে, যেগুলো সংশোধন করে আল্লাহ ﷻ আয়াত দিয়েছেন। তিনি ﷺ নিজে সেই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তার অনুসারীদের কয়েকবার শুনিয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ নামাজে তার ভুলের কথাগুলো বার বার তিলাওয়াত করছে। মসজিদে হাজারো মানুষের সামনে সেই আয়াতগুলো ইমামরা জোরে জোরে সবাইকে শোনাচ্ছে। যুগে যুগে কোটি কোটি মুসলিম সেই আয়াতগুলো পড়বে। ব্যাপারটা তার জন্য কতটা অপমানজনক চিন্তা করে দেখেছেন? -এই কাজ কে করবে যদি তার উদ্দেশ্য থাকে বিখ্যাত হওয়ার? ব্যাপারটা হচ্ছে অনেকটা এরকম: একজন ডাক্তার তার নিজের আবিস্কার করা সার্জারির একটা নতুন পদ্ধতির উপর বই লিখছে, যেন সে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তুলে দিতে পারে, রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যেতে পারে। সবাই যেন তার পদ্ধতি অনুসারে এখন থেকে সার্জারী করে। কিন্তু বইয়ের মধ্যে সে লিখেছে যে, সেই পদ্ধিতে সার্জারী করতে গিয়ে সে নিজেই কত ভুল করেছে। —আপনার কি মনে হয়, কেউ যদি নিজে বিখ্যাত হতে চাইত, তাহলে সে তার অনুসারীদের কাছে নিজের ভুলের কথা বারবার প্রচার করতো?

ভদ্রলোক: মুহাম্মাদ তার অনুসারীদের কাছে নিজেকে সৎ প্রমাণ করার জন্য নিজের কিছু ভুলের কথা বলেছে। এভাবে সে মানুষকে বোঝাতে পারবে যে, কুরআন আসলে তার লেখা না। এটা তার একটা কৌশল। এটা কোনো প্রমাণ হলো না।

মুসলিম: তার মানে আপনি দাবি করছেন ডাক্তার এরকম করতেই পারে বিখ্যাত হওয়ার জন্য? আপনি সত্যিই সুস্থ মস্তিস্কে এই দাবি করছেন?

ভদ্রলোক: এগুলো সাবজেক্টিভ ব্যাপার। অন্য কোনো অবজেক্টিভ প্রমাণ দেখান।

মুসলিম: আপনি নিজে সাবজেক্টিভ কথা বলে কুরআনকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। অথচ বিপক্ষে অবজেক্টিভ প্রমাণ চাচ্ছেন। আপনার কাছে প্রমাণ হতে হলে কী হতে হবে? আমাকে পরিস্কার করে বলেন অবজেক্টিভ কী হলে কুরআন আপনার কাছে মানুষের লেখা না বলে প্রমাণ হবে।

কিন্তু তার আগে একটা ব্যাপার ঠিক করা দরকার। যেহেতু ইসলাম আপনার কাছে সত্য ধর্ম না, কারণ আপনি বিশ্বাস করেন না কু’রআন আল্লাহর ﷻ কাছ থেকে এসেছে, তাহলে এখনি আপনার পরিবারকে ডেকে বলুন, আপনার যেন জানাযা পড়া না হয়। মুসলিমদের মতো গোসল করিয়ে, সাদা কাপড় জড়িয়ে, মসজিদে গিয়ে জানাযা পড়িয়ে, কবর যেন দেওয়া না হয়। যারা কু’রআন আল্লাহর ﷻ বাণী বলে বিশ্বাস করে, জানাযা শুধু তাদের জন্য। আপনার জন্য না। আপনার পরিবারকে ডাকুন। তাদেরকে বলুন আপনার জানাযা যেন না পড়ানো হয়। আমি অপেক্ষা করছি। আরেকদিন আপনার বাকি সমস্যাগুলো শুনবো।

আরেকদিন …

ভদ্রলোক: ভাই, আমি কু’রআন নিয়ে অনেক গবেষণা পড়ে দেখলাম। কু’রআনে অনেক ব্যাকরণ ভুল আছে। কু’রআনে মুহাম্মাদ-এর নিজের কথা লেখা আছে। সব আল্লাহর কথা না। আল্লাহ কু’রআনে কখনো নিজেকে ‘সে’ ‘তিনি’, ‘আল্লাহ’ বলে সম্বোধন করতো না, সব সময় ‘আমি’ থাকতো। বাইবেলের কথা হুবহু কপি করা থাকতো না। কু’রআনে অনেক ঘাপলা আছে। আপনারা শিক্ষিত মানুষ হয়েও কীভাবে বিশ্বাস করেন এটা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে?

মুসলিম: রবীন্দ্রনাথের লেখায় প্রথম আলোর আধুনিক বাংলা বানান রীতি অনুসারে প্রচুর বানান ভুল আছে।

ভদ্রলোক: কী উল্টোপাল্টা কথা বলেন? প্রথম আলো বাংলা বানান রীতি তৈরী হয়েছে কয়েকদিন আগে। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভুল লিখতে পারেন নাকি?

মুসলিম: আরবি ব্যাকরণের নিয়মকানুন সংকলন হয়েছে কুরআনের প্রায় একশ বছর পরে। সবচেয়ে প্রাচীন আরবি ব্যাকরণবিদের কাজের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে ১১৭ হিজরীতে। কু’রআন থেকেই আরবি ব্যাকরণের অনেক নিয়ম ঠিক করা হয়েছে। আর আপনি সেই আরবি ব্যাকরণ দিয়ে কুরআনকে ভুল বলছেন? ব্যাপারটা প্রথম আলোর বাংলা বানান রীতি দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে ভুল বলার মতো হাস্যকর না?

ভদ্রলোক: আচ্ছা, আমি সেটা জানতাম না। ঠিক আছে, তাহলে কুরআনে আল্লাহ নিজেকে ‘আমি’ না বলে ‘আমরা’, ‘সে’, ‘তিনি’, ‘আল্লাহ’ বলে সম্বোধন করে কেন? এটাই কি প্রমাণ হয় না, যে এগুলো সব আসলে মুহাম্মাদ-এর নিজের কথা?

মুসলিম: সম্রাট আকবর উত্তেজিত হয়ে বুক চাপড়িয়ে বললেন, ‘এই রাজা ক্ষমতায় থাকতে এটা কোনোদিন হতে দেবে না! সে কোনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করে না! সম্রাট আকবর কারো সামনে মাথা নত করে না!’ — আপনার কথা অনুসারে এই কথাটা ভুল। তার বলা উচিত ছিল, ‘আমি ক্ষমতায় থাকতে…, আমি কোনো অন্যায়ের সাথে… আমি কারো সামনে… ’?

ভদ্রলোক: তাহলে ‘আমরা’ কেন? আল্লাহ না এক। ‘আমরা’ মানে কি এই দাঁড়ায় না যে, এগুলো সব মুহাম্মাদ-এর নিজের কথা? সে তার মুশরিক ঐতিহ্য ছাড়তে পারেনি?

মুসলিম: সম্রাট আকবর বললেন, ‘হাম ইয়ে নেহি হোনে দেগা যবতক হাম জিন্দা হ্যায়!’ এখানে হিন্দিতে ‘হাম’ কি ‘আমি’ না ‘আমরা’?

ভদ্রলোক: আমি।

মুসলিম: আরবিতে ‘নাহনু’ হচ্ছে হিন্দির ‘হাম’, যাকে বলে রাজকীয়-আমি। ল্যাটিনে একে বলা হয় pluralis majestatis। ইংরেজি ছাড়াও জাপানি এবং চীনা ভাষাতেও এর ব্যবহার আছে। কুরআনের অনুবাদকরা ‘আমরা’ লিখে আপনার মতো লক্ষ মুসলিমদের বিভ্রান্তিতে ফেলে দিয়েছেন।

ভদ্রলোক: তাহলে এবার বলেন কুরআন ভর্তি তাওরাত, বাইবেলের কথার কপি কেন?

মুসলিম: তাহলে কী হওয়ার কথা? কুরআনে একটা কথাও থাকার কথা না, যেটা বাইবেলের সাথে মিলে যায়?

ভদ্রলোক: অনেকটা। ইসলাম আর খ্রিস্টান ধর্ম আলাদা ধর্ম না?

মুসলিম: না। কুরআন মূলত হচ্ছে খ্রিস্টান, ইহুদিদের ভুলগুলোর সংশোধন করে মানুষকে আবার সঠিক ইসলাম ধর্মে ফিরিয়ে আনা। ইহুদি, খ্রিস্টানরা তাদের ধর্মকে বিকৃত করে ফেলেছিল। তারা আল্লাহর ﷻ সম্পর্কে ধারণা নষ্ট করে দিয়েছিল। ইতিহাস বিকৃত করে ফেলেছিল। ধর্মের আইন, রীতিগুলো নিজেদের সুবিধামত পরিবর্তন করে নিয়েছিল। কুরআন সেগুলোকে ঠিক করে দিয়েছে। তাওরাত এবং ইনজিল আল্লাহই ﷻ পাঠিয়েছিলেন। আল্লাহ ﷻ নিশ্চয়ই একবার এক কথা বলে আরেকবার পুরোপুরি আলাদা কথা বলবেন না? আপনি তাওরাতের অনেক কিছুই ইঞ্জিলে হুবহু পাবেন। ইঞ্জিলের অনেক কিছুই কুরআনে হুবহু পাবেন। যদি কুরআন পুরোপুরি আলাদা হতো, তাহলে বরং দাবি করতাম যে, হয় কুরআন ﷻ আল্লাহর কাছ থেকে আসেনি, না হয় তাওরাত, ইনজিল এই দুটো আল্লাহর ﷻ কাছ থেকে আসেনি। এক স্রষ্টার কাছ থেকে কখনো সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা আসতে পারে না। ইসলাম সেটা দাবি করে না। ইসলাম কোনো নতুন ধর্ম না। নবী ইব্রাহিম ﷺ কে ইসলাম দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে নবী মুসা ﷺ এবং ঈসা ﷺ কেও ইসলাম দেওয়া হয়েছিল। পরে মানুষ ইসলাম ধর্মকে ব্যাপক বিকৃত করে ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম নাম দিয়ে প্রচার করা শুরু করে। নাম দেখলেই তো বোঝা যায় এগুলো মানুষের বানানো। ইহুদি (Judaism) হচ্ছে জুডা গোত্রের নাম অনুসারে রাখা। আর খ্রিস্ট বা যিশুর নাম অনুসারে খ্রিশ্চিয়ানিটি। ধর্ম নিজে বানানোর এরচেয়ে বড় প্রমাণ আর হতে পারে না। তবে বিকৃত করলেও আজকের তাওরাত এবং বাইবেলে এখনো আল্লাহর ﷻ বাণীর কিছুটা রয়ে গেছে। সেগুলো তো অবশ্যই কুরআনের সাথে মিলবে।

ভদ্রলোক: আপনারা তো সেটাই বলবেন: অন্যরা সব ভুল, একমাত্র আপনারাই সঠিক। সব ধর্মই একই দাবি করে: সে নিজে ঠিক, বাকি সব ভুল। এই সব দাবি প্রমাণ করে না যে, কুরআন সত্যিই কোনো স্রষ্টার কাছ থেকে এসেছে।

মুসলিম: কী হলে প্রমাণ হবে কুরআন আল্লাহর ﷻ কাছ থেকে এসেছে? রাতের বেলা কু’রআনের সব কপি জ্বল জ্বল করবে? কম্পিউটারে কু’রআন থাকলে সেটা নিজে থেকেই অন হয়ে যাবে? অলৌকিক ঘটনা তো অশিক্ষিত গ্রামের মানুষদের বোঝানোর জন্য দরকার। আপনার মতো শিক্ষিত মানুষের তো অলৌকিক ঘটনার দরকার হওয়ার কথা না। শিক্ষিত মানুষদের জন্য নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করাই যথেষ্ট।

ভদ্রলোক: কু’রআন-এ এমন কথা লেখা থাকবে, যা মানুষ পড়ে সাথে সাথে বুঝে যাবে যে, সেটা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে।

মুসলিম: যেমন?

ভদ্রলোক: যেমন, কু’রআনে মহাবিশ্ব সৃষ্টির একদম পরিষ্কার বর্ণনা লেখা থাকবে।

মুসলিম: কার সূত্র অনুসারে? আইনস্টাইন, হকিং, নাকি গুথ-এর? এরা কেউ তো কারো সাথে একমত হতে পারছে না।

ভদ্রলোক: নিরপেক্ষ সূত্র থাকবে। যে কেউ পড়ে বুঝতে পারে।

মুসলিম: সেই সূত্র মুখে বলবেন কীভাবে? আইনস্টাইনের ফিল্ড ইকুয়েশন ইংরেজিতে তিলাওয়াত করেন তো দেখি? তারপর সেটা কয়েকজন কৃষককে মুখস্ত করান দেখি? মহাবিশ্ব সৃষ্টির উপর জ্ঞানগর্ভ পেপার পড়ে বাংলাদেশের ৯৭% মানুষের কি নৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকভাবে কোনো সংস্কার হবে? সেই জ্ঞান দিয়ে অল্প কিছু আঁতেলের ইগোতে খোচা মারা ছাড়া আর কার কী লাভ হবে?

ভদ্রলোক: আচ্ছা সূত্র না থাকলে, সাধারণ ভাষায় পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকবে। এখন যেসব আয়াত আছে, সেগুলোর মানে একেকজন একেকভাবে করে। এরকম বিভ্রান্তি থাকলে হবে না।

মুসলিম: আপনি সাধারণ মানুষের ভাষায় বিগ ব্যাং ব্যাখ্যা করতে পারবেন, যেটাতে কোনো ফাঁকফোকর নেই? যতভাবেই চেষ্টা করেন, বিজ্ঞানীরা ভুল খুঁজে পাবেই। বিজ্ঞানীরা একে অন্যের সূত্র নিয়েই মারামারি করে, আর সাধারণ ভাষায় বর্ণনা শুনলে তো ছিড়ে খেয়ে ফেলবে। গণিতের ভাষা ছাড়া আর কোনো ভাষাতে বিজ্ঞানকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যায় না। চেষ্টা করতে যাওয়াটাও হাস্যকর। আপনার বিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা অপমানজনক পর্যায়ের। অনুগ্রহ করে বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলে নিজেকে আর অপদস্থ করবেন না।

ভদ্রলোক: তাহলে অন্য কিছু থাকবে যেটা মানুষের পক্ষে কখনো জানা সম্ভব ছিল না।

মুসলিম: তাহলে আগেকার মানুষ বুঝত কীভাবে সেটা সত্যি, না বানানো কথা? আপনি যদি ১,০০০ বছর আগে জন্মাতেন, আর কু’রআনে এমন কিছু কথা থাকত যেটা ২০১৬ সালে এসে মানুষ সঠিক বলে জানবে, তাহলে আপনি এবং আপনার মতো লক্ষ লক্ষ বুদ্ধিজীবী ১০১৬ বছর ধরে কু’রআনকে ভুল বলতেন।

ভদ্রলোক: তাহলে কু’রআনে অন্য এমন কিছু লেখা থাকবে, যেটা পড়ে মানুষের আর কোনো সন্দেহ থাকবে না ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে।

মুসলিম: তার মানে কু’রআন পড়েই মানুষ মুসলিম হয়ে যাবে? কোনো হিন্দু, খ্রিস্টান কু’রআন পড়া শুরু করলে, শেষ করে সাথে সাথে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!’ বলে চিৎকার দেবে?

ভদ্রলোক: হ্যাঁ, যদি কু’রআন সত্যিই আল্লাহর কাছ থেকে এসে থাকে, তাহলে এটা পড়া মাত্র মানুষ বুঝতে পারবে।

মুসলিম: সেটা বহু মানুষ বুঝেছে। হাজার হাজার আরব কু’রআন তিলাওয়াত শুনেই বুঝে গিয়েছিল এটা আল্লাহর ﷻ বাণী। তারা পুরো কু’রআন বই হিসেবেও পায়নি, পুরোটাও শোনেনি। কিছু সূরা শুনেই কাফির, মুশরিক থেকে মুসলিম হয়ে গেছে। শুধু আরব না, আরবের বাইরের রাজ্যগুলোতেও সেটা হয়েছে। আজকেও প্রতি বছর হাজার হাজার ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু শুধু কুরআন পড়েই মুসলিম হয়ে যাচ্ছে। এসব মানুষ মুসলিম হয়েছে কীভাবে? যারা সত্যিই নিরপেক্ষভাবে আন্তরিকতার সাথে সত্য খোঁজার চেস্টা করেছেন, তারা ঠিকই কুরআন পড়ে বুঝে গেছেন এটা আল্লাহর ﷻ বাণী। দেখেন, প্রমাণ হয়ে গেল রাসুল ﷺ নিজে কু’রআন লেখেননি।

ভদ্রলোক: উল্টোটা বরং বেশি হয়েছে। কোটি কোটি মানুষ কু’রআন পড়েও মুসলিম হয়নি। যারা বেশি পড়াশুনা করেনি, যাদের চিন্তাভাবনা সফিস্টিকেটেড না, তারাই চোখ বন্ধ করে ধর্ম বিশ্বাস করে। ঠিকমতো চিন্তা করলে কেউ ধর্ম সম্পর্কে কোনোদিন নিশ্চিত হতে পারত না।

মুসলিম: তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন ফিজিক্স, ফিলোসফির প্রফেসররা, বহু বছরের নাস্তিকরা যখন কুরআন পড়ে মুসলিম হয়ে যায়, তারা ঠিকমত চিন্তা না করেই সেটা করে? তারা আপনার মতো সফিস্টিকেটেড পার্সোনালিটি না?

ভদ্রলোক: সেরকম খুবই কম হয়। যারা মুসলিম হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই আবেগের তাড়নায় মুসলিম হয়ে গেছে। ঠিকমতো ঠান্ডা মাথায় চিন্তাভাবনা করেনি।

মুসলিম: প্রমাণ দেখান।

ভদ্রলোক: এটা জানা কথা। আমি অমুসলিমদের মুসলিম হওয়ার কিছু ঘটনা পড়েছি। সব ঘটনা একই রকম। আবেগী ঘটনা।

মুসলিম: আমি অনেকগুলো ঘটনা পড়েছি, যেখানে নাস্তিকরা কঠিন যুক্তি দিয়ে নিজেকে মানিয়েছে। আমি অমুসলিম প্রফেসরদের ঘটনা পড়েছি যারা নিজেদের ফিল্ডের জ্ঞান ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, কুরআন সত্যিই আল্লাহর বাণী। সুতরাং প্রমাণ হয়ে গেল আপনি ভুল, আমি ঠিক।

ভদ্রলোক: এভাবে কয়েকটা ঘটনা পড়লে হবে না। পরিসংখ্যান ঠিকমতো নিতে হলে কমপক্ষে এক হাজার স্যাম্পল নিয়ে, বিভিন্ন ডেমোগ্রাফি কভার করে, তারপরে দাবি করতে হবে।

মুসলিম: সেটা আপনি করেছেন?

ভদ্রলোক: … যাই হোক, আমরা প্রসঙ্গ থেকে সরে এসেছি। কু’রআনে এমন কিছু লেখা থাকবে, যেটা মানুষ কোনোদিন চিন্তাও করেনি। আপনারা যেই সব আয়াতে বৈজ্ঞানিক তথ্য আছে বলে দাবি করেন, সেগুলো সব ভুল। আমি অনেক বই, আর্টিকেল পড়েছি, যেখানে আপনাদের দাবি করা সব বৈজ্ঞানিক আয়াতের ভুল প্রমাণ করা আছে। ওগুলো সব ইউরোপীয়, চাইনিজ বৈজ্ঞানিক, ফিলোসফারদের আগে থেকেই দাবি করা ছিল। তাই কোনো বৈজ্ঞানিক আয়াত প্রমাণ হিসেবে দেখাবেন না। গাণিতিক প্রমাণও দেখাবেন না। ওগুলো সব গোঁজামিল দেওয়া। নিজেদের পছন্দ মতো আয়াত বাদ দিয়ে কোনোমতে হিসেব মিলিয়েছে। অন্য কিছু থাকলে দেখান।

মুসলিম: সেই অন্য কিছুটা তাহলে কী বলেন? আপনি প্রমাণের সংজ্ঞা দেবেন না, অথচ প্রমাণ দেখালে বলবেন যে, সেটা কোনো প্রমাণ না। এটা তো হলো না। প্রমাণের সংজ্ঞা দেন।

ভদ্রলোক: আজকে পৃথিবীতে বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম না। এটাই বড় প্রমাণ যে, কুরআন স্রষ্টার কাছে থেকে আসেনি। যদি সত্যিই কুরআন স্রষ্টার কাছে থেকে আসতো, তাহলে আজকে পৃথিবীতে বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম হতো।

মুসলিম: এটা একটা পুরোপুরি ভুল যুক্তি। কুরআন নাজিল হওয়ার ১০০ বছর পরে আপনি কি এই দাবি করতেন যে, আজকে কেন পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম না?

ভদ্রলোক: না, কারণ তখনও কুরআন পৃথিবীর সব মানুষের কাছে পৌছায়নি।

মুসলিম: ৫০০ বছর পরে?

ভদ্রলোক: হয়তো না। তখনও সব দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ছিল না।

মুসলিম: ১৫০০ বছর পরে?

ভদ্রলোক: আপনি আজকের কথা বলছেন? হ্যা, আজকে অবশ্যই আমরা সেটা দাবি করতে পারি।

মুসলিম: কেন?

ভদ্রলোক: ইন্টারনেটের জন্য আজকে পৃথিবীর সব মানুষের কাছে কুরআন পৌছে গেছে। আজকে সব দেশে লাইব্রেরিতে কু’রআন আছে। মানুষ ইচ্ছা করলেই কু’রআন পড়তে পারে।

মুসলিম: আজকে পৃথিবীতে প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষ প্রতিদিন একবেলাও পেট ভরে খেতে পারে না। সেই দুই বিলিয়ন মানুষ মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ খরচ করে কুরআন পড়বে? বই কিনে ইসলাম সম্পর্কে জানবে?

ভদ্রলোক: কিন্তু তারা ইসলামের কথা শুনতেই পারে। আজকে ইসলামের কথা জানে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

মুসলিম: আজকে কোটি কোটি মানুষ জানে ফরমালিন একটা বিষ। ফরমালিন দেওয়া খাবার খেলে মানুষের শরীর নষ্ট হয়ে যায়। বাচ্চারা বড় হয় জটিল সব সমস্যা নিয়ে। এটা তারা টিভিতে বহুবার দেখেছে। খবরের কাগজে পড়েছে। বই-এ পড়েছে। তারপরেও তারা কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য, বাজার করতে একটু বেশি কষ্ট হবে, সেটা থেকে বাঁচার জন্য প্রতিদিন ফরমালিন দেওয়া খাবারই খায়। প্রতিদিন জেনে শুনে নিজের হাতে বাচ্চাদেরকে বিষ খাওয়ায়। বাবা-মা হয়ে কীভাবে কেউ তার সন্তানদেরকে বিষ খাওয়াতে পারে?

ভদ্রলোক: অভ্যাস পরিবর্তন করা কঠিন। সময় লাগে। তাছাড়া সবাই ফরমালিনের ক্ষতির ব্যাপারে নিশ্চিত না।

মুসলিম: ফরমালিনের মতো একটা সাধারণ ব্যাপার মানা যদি এত কঠিন হয়, তাহলে ধর্মের ব্যাপারে এত সহজ হবে? ইসলামের কথা জানা, আর ইসলাম সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। আজকে অনেক মুসলিমরাই ইসলাম সম্পর্কে অনেক ভুল জানে, অমুসলিমরা তো দূরের কথা। ইসলামের কথা আপনি জানেন। আপনি তো কুরআন মানেন না। আপনার মতো বিলিয়ন মানুষের মগজ ধোলাই করে দিয়েছে কিছু ইহুদি, খ্রিস্টান, নাস্তিক, আর শয়তানরা। বিলিয়ন মানুষ আছে যাদেরকে গিয়ে কেউ ঠিকভাবে ইসলাম বোঝায়নি। এরা ইসলাম সম্পর্কে জেনেছে ইহুদি, খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের কাছ থেকে। এরা কোনোদিন কোনো মুসলিম আলেমকে গিয়ে জিগ্যেস করে যাচাই করার চেস্টা করেনি ভুল শিখেছে কিনা। ওরা কেন মুসলিম হবে? মানুষকে তাদের সারাজীবনের বিশ্বাস পরিবর্তন করতে বলা এত সোজা?

ভদ্রলোক: তার মানে এটাই দাঁড়ায় যে, কুরআন বিফল হয়েছে মানবজাতিকে মুসলিম বানাতে। সুতরাং কুরআন স্রষ্টার কাছ থেকে আসেনি। কুরআন যদি সত্যিই স্রষ্টার কাছ থেকে এসে থাকে, তাহলে দাবি করবো স্রষ্টা বিফল হয়েছেন মানুষকে সঠিক পথ দেখাতে।

মুসলিম: এই দাবি আপনি কুরআন নাজিল হওয়ার ১০০ বা ৫০০ বছর পরে করবেন না। আপনি ঠিকই বুঝতে পারছেন, তখনকার পরিস্থিতিতে সেটা অবাস্তব দাবি। তাহলে কেন ১৫০০ বছর পরে গিয়ে একই অবাস্তব দাবি করছেন? এই দাবি তখনই করতে পারবেন, যখন পৃথিবীর সাত বিলিয়ন মানুষের প্রত্যেকের কাছে কুরআন গিয়েছে, তারা সময় নিয়ে চিন্তাভাবনা করে দেখেছে। যতদিন সেটা না হচ্ছে, ততদিন আপনার দাবির কোনো ভিত্তি নেই। পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ কুরআন বুঝলেই যে সাথে সাথে সিরিয়াস মুসলিম হয়ে যাবে, আমি সেটা দাবি করছি না। তবে সেই সুযোগটা যদি তারা পেত, তাহলে অন্তত আপনার দাবির কোনো ভিত্তি থাকত। এখন আপনার দাবির কোনো ভিত্তি নেই। অবাস্তব একটা দাবি।

ভদ্রলোক: সারা পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ কুরআন অনুসারে জাহান্নামে যাচ্ছে, আর আপনি দাবি করেন কুরআন আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে? আল্লাহ কিরকম স্রষ্টা হলো যে, সে এমন এক কু’রআন পাঠাল, যেটা পড়ে মানুষ ভালো হয়ে যায় না, আবার ভালো না হলে শাস্তিও দেয়? এখানে মানুষের কী দোষ?

মুসলিম: প্রথমত, কয়জন জান্নাতে গেল, তার সাথে কুরআন আল্লাহর ﷻ বাণী হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এটা একটা অপ্রাসঙ্গিক যুক্তি। আপনার কথাটা শুনতে বেশ যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে, কিন্তু আসলে আপনার যুক্তিটা হচ্ছে এরকম—
১) আল্লাহ কুরআন পাঠিয়েছেন।
২) কুরআন পড়লে মানুষ জান্নাতে যাবে।
৩) পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ কুরআন পড়েনি।
৪) সুতরাং বেশিরভাগ মানুষ জাহান্নামে যাবে।
৫) সুতরাং কুরআন আল্লাহর কাছ থেকে আসেনি।

(২) এবং (৪) হচ্ছে ভুল প্রেমিস। আপনি এগুলো নিজে থেকেই ধরে নিয়েছেন। একারণে আপনার পুরো আর্গুমেন্ট ভুল।

আর আপনাকে কে বলেছে বেশিরভাগ মানুষ জাহান্নামে যাবে? আপনার কাছে কি আল্লাহর ﷻ কাছ থেকে বাণী এসেছে ২০১৬ সালে কয়জন জাহান্নামে যাবে আর কয়জন জান্নাতে যাবে?

ভদ্রলোক: কুরআনেই লেখা আছে অমুসলিমরা জাহান্নামে যাবে। পৃথিবীর বেশিরভার মানুষ অমুসলিম। সুতরাং বেশিরভাগ মানুষ জাহান্নামে যাবে।

মুসলিম: কুরআনে কোথাও লেখা নেই। বরং যাদের কাছে ইসলাম সঠিকভাবে পৌছায়নি, যারা ইসলাম নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ পায়নি, তারা হচ্ছে আহলুল ফাতরাহ। আল্লাহ ﷻ তাদেরকে কিয়ামতের সময় পরীক্ষা করবেন। তখন তাদেরকে জান্নাত বা জাহান্নাম দেওয়া হবে। কুরআনেই বলা আছে, যারা মুসলিম না, তারা জান্নাতে যাবে, নাকি জাহান্নামে যাবে, সেটা শুধু আল্লাহ ﷻ জানেন। ফিরাউন যখন নবী মুসাকে ﷺ জিগ্যেস করেছিল যে, তাদের বাপ-দাদারা কি তাহলে সবাই জাহান্নামী, তখন মুসা ﷻ বলেননি, ‘হ্যা, তারা সবাই জাহান্নামী, কারণ তারা ইসলাম মানেনি।’ বরং তিনি বলেছেন যে, তাদের পরিণতি শুধুমাত্র আল্লাহ ﷻ জানেন। [দেখুন: কুরআন, ২০:৪৭-৫২] আল্লাহ ﷻ কুরআনেই পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন, ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ অমুসলিমদের বিচার তিনি ﷻ নিজে করবেন। কোথাও তিনি ﷻ তাদেরকে সোজা জাহান্নামে পাঠাবেন বলেননি। বরং তিনি ﷻ বলেছেন তিনি কাউকে কখনোই শাস্তি দেবেন না, যতক্ষণ তার কাছে কোনো বার্তাবাহক ইসলামের বাণী নিয়ে গিয়ে ভালো করে না বোঝাচ্ছে। [দেখুন: কুরআন, ১৭:১৫]

ভদ্রলোক: এগুলো আপনার কথা। এগুলো কোনো ইসলামী আলেম বলেন না। আপনি নিজের মনমতো যুক্তি দেখাচ্ছেন।

মুসলিম: কয়জন ইসলামী আলেমের সাথে আপনি কথা বলেছেন?

ভদ্রলোক: আমি অনেক লেকচার শুনেছি। সব আলেম পৃথিবীর সব অমুসলিমদের জাহান্নামী বলে।

মুসলিম: প্রমাণ দেখান। নবী মুসা ﷺ একজন নবী হয়ে অমুসলিমদেরকে ঢালাওভাবে জাহান্নামী বলে ফাতওয়া দেননি। আর আপনি কয়েকজন ইমামের, নেতার ফাতওয়া শুনে ধরে নিয়েছেন তাদের কথা আল্লাহর ﷻ বাণী? তারা নবী মুসা ﷺ থেকে বেশি জানে?

ভদ্রলোক: আচ্ছা আরেকদিন রেফারেন্স দেখাবো। দাঁড়ান, আপনাকে আমি আরও কিছু সমস্যা দেই…

মুসলিম: আপনি এখন পর্যন্ত যেই ছয় সাতটা সমস্যা দিলেন, তার সবগুলোর সমাধান পেয়েছেন?

ভদ্রলোক: চিন্তা করে দেখবো। আগে এটার উত্তর দেন: আজকে পৃথিবীতে এত গরিব মানুষ কেন? যদি ইসলাম সত্যি হতো …

মুসলিম: থামেন। আগে যেই উত্তরগুলো দিলাম, সেগুলো ভুল প্রমাণ করেন।

ভদ্রলোক: এখন করতে পারছি না। পরে করবো। আগে বলেন, পৃথিবীতে এত অন্যায় হয় কীভাবে? যদি আল্লাহ ﷻ সত্যিই থাকেন, তাহলে তিনি কেন বাঁধা…

মুসলিম: না, আগে আপনাকে এই ছয় সাতটা সমাধান ভুল প্রমাণ করতে হবে। তারপরে অন্য কোনো সমস্যা শুনবো। আগে বলেন, আমার উত্তরগুলো ঠিক, নাকি আপনার দাবিগুলো ঠিক।

ভদ্রলোক: ধরে নিলাম আপনার উত্তরগুলো ঠিক।

মুসলিম: তার মানে দাঁড়ায় আপনার দাবিগুলো এখন পর্যন্ত ১০০% ভুল। আপনি কয়টা সমস্যার সমাধান পেলে মুসলিম হবেন?

ভদ্রলোক: যথেষ্ট সমস্যার সমাধান পেতে হবে। এত সমস্যা মাথায় নিয়ে কোনোদিন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা যায় না।

মুসলিম: আজকে দশটা সমস্যার উত্তর দিলাম। কালকে আপনি আরও বিশটা সমস্যা নিয়ে আসবেন। সেগুলোর উত্তর দেবো। তারপর আরেকদিন আপনি তিরিশটা সমস্যা নিয়ে আসবেন। ঠিক কয়টা সমস্যার সমাধান পেলে আপনি মুসলিম হবেন বলেন?

ভদ্রলোক: বড় বড় সমস্যাগুলোর সমাধান তো পেতেই হবে। নাহলে বিশ্বাস করবো কীভাবে?

মুসলিম: না ভাই, বিশ্বাস করতে হলে আপনাকে ‘লিপ অফ ফেইথ’ নিতে হবে। আপনি যদি দিনের পর দিন শুধু সমস্যা খুঁজে যান, সবসময় কোনো একটা কারণ খুঁজতে থাকেন অবিশ্বাস করার জন্য, তাহলে আপনার নিয়ত কখনোই ছিল না সত্য খুঁজে পাওয়ার। আপনি নিজেকে সেলফ ডিলিউশনে ডুবিয়ে রেখেছেন যে, আপনি নিষ্ঠার সাথে সত্য খুঁজছেন, এবং খুঁজে পেলে আপনি মানবেন। আপনি মানবেন না, কারণ আপনার আসল সমস্যা হচ্ছে: আপনার উপরে কেউ আছে, যার কথা আপনাকে কোনো তর্ক না করে মেনে নিতে হবে, যার কথামতো আপনার জীবন পার করতে হবে —এটা আপনি মানবেন না। আপনি নিজের ইচ্ছামতো জীবন পার করবেন। আপনার নীতি হচ্ছে: I am my own master, I am my own God। ফিরাউন নীতি। আপনাকে আগে নিয়ত বিশুদ্ধ করতে হবে। যদি আপনি সত্যিই আন্তরিকতার সাথে সত্য খুঁজে থাকেন, তাহলে যে কয়টা সমস্যার সমাধান পেয়েছেন, সেটা যথেষ্ট আপনার বাকি সব সমস্যাকে বাতিল ধরে নিয়ে বিশ্বাস করার জন্য।

ভদ্রলোক: আপনার জন্য যথেষ্ট হতে পারে, কারণ আপনি আমার মতো পড়াশুনা করেননি। মাত্র ছয়-সাতটা সমস্যার উত্তর পাওয়া আমার জন্য কিছুই না। আমি গত দশ বছরে কয়েকশ সমস্যা খুঁজে পেয়েছি।

মুসলিম: আপনাকে একটা কথা জিগ্যেস করি? আপনি নিশ্চয়ই ইসলামের বিরুদ্ধে অনেকগুলো আর্টিকেল, বই পড়েছেন। ইসলামের বিরুদ্ধে অনেক আলোচনা শুনেছেন। হয়ত ইউটিউবে খ্রিস্টানদের প্রচুর ভিডিও দেখেছেন। ইসলাম ত্যাগীদের জীবনী পড়েছেন। আপনার জীবনে যত ঘন্টা আপনি ইসলামের বিরুদ্ধে বা নাস্তিকতা নিয়ে পড়াশুনা, চিন্তা করে ব্যয় করেছেন, ঠিক তত ঘন্টা কি আপনি ইসলামের পক্ষে বই, আর্টিকেল, লেকচার পড়েছেন বা শুনেছেন? আপনি ঠিকই ইসলামের বিরুদ্ধে পিএইচডি করা লেখকদের বই পড়েছেন। কিন্তু ইসলামী সাইন্সে পিএইচডি করা কোনো আলেমকে গিয়ে কোনোদিন অনুরোধ করেছেন আপনাকে নির্ভযোগ্য কিছু বই, আর্টিকেল, লেকচার দিতে? আমার মতো নাদান মুসলিম, আত্মীয়স্বজনদের সাথে ইসলাম নিয়ে যুক্তিতর্ক করে জিতে গিয়ে, নিজের পিঠ নিজেই না চাপড়িয়ে, এসব বিষয়ে দক্ষ কোনো আলেমের কাছে গিয়ে কখনো যুক্তিতর্ক করেছেন? আপনি নিজেকে খুব ভালো করে প্রশ্ন করে দেখেন তো, আপনি সত্যিই নিরপেক্ষ, সৎ ছিলেন কিনা?

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখকের ব্যক্তিগত ফেইসবুক প্রোফাইলে প্রথম, দ্বিতীয়তৃতীয় পর্ব আকারে।

আরও পড়ুন:

Photo credit: McKay Savage

Advertisements

3 thoughts on “একজন মুসলিম ও একজন সংশয়বাদীর মধ্যে ইসলামের সত্যতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা

  1. পিংব্যাকঃ পরকালীন জীবনে বিশ্বাসের যৌক্তিকতা (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

  2. পিংব্যাকঃ যেসব কারণে কুরআন মানুষের সৃষ্টি হতে পারে না | আমার স্পন্দন

  3. পিংব্যাকঃ একজন ঈমানদার যেভাবে পর্যায়ক্রমে তার ঈমান হারিয়ে ফেলতে পারে | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s