ফাসাদের বিভিন্ন অর্থ এবং ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পরিণাম

Careless

আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অনেক আয়াতে ফাসাদের কথা উল্লেখ করেছেন। ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের তিনি পছন্দ করেন না বলে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। [৫:৬৪২৮:৭৭]

বিভিন্ন আয়াতে তিনি বিভিন্ন বিষয়ের সাথে ফাসাদের কথা মিলিয়ে উল্লেখ করেছেন, যা থেকে ফাসাদের বিভিন্ন অর্থ স্পষ্ট হয়। যেমন:

১. আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার ভঙ্গ করা, আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা [২:২৭]
২. রক্ত প্রবাহিত করা [২:৩০]
৩. শস্যক্ষেত্র নষ্ট করা ও প্রাণনাশ করা [২:২০৫]
৪. মাপে কম দেওয়া [৭:৮৫],[১১:৮৫]
৫. ঈমান না আনা, অবিশ্বাস করা [১০:৪০]
৬. জাদু করা/ অসত্যকে সত্যের মতো করে উপস্থাপন [১০:৮১]
৭. চুরি করা [১২:৭৩]
৮. কুফরী করা, অবাধ্যতা করা [১৬:৮৮], [১৭:৪]
৯. আল্লাহর পথে বাধা দেওয়া [১৬:৮৮]
১০. অহংকার করে প্রত্যাখ্যান করা [২৭:১৪]
১১. পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করা [২৮:৮৩]

এছাড়া ফাসাদের সাধারণ অর্থে বিভিন্ন আয়াতেই ব্যবহার হয়েছে। যেমন: অশান্তি সৃষ্টি করা, অকল্যাণকামী হওয়া ও বিশৃঙ্খলা করা।

ফাসাদের মূল শাব্দিক অর্থ হলো, যে কোনো কিছুর স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তিত হওয়া। যেমন ধরুন, পানি। এর রং, গন্ধ ও তারল্যের স্বাভাবিক একটি অবস্থা আছে। কোনো একটি পরিবর্তন হলে আক্ষরিক অর্থে তাতে ফাসাদ চলে আসে। তারল্য নষ্ট হলে সেটা হয় স্যুপ হবে বা অন্য কিছু। গন্ধ বা রং পরিবর্তন হলে আমরা সেটাকে পচা পানি, দুর্গন্ধময় পানি ইত্যাদি নামে অভিহিত করবো; শুধু ‘পানি’ নামে নয়। অবশ্য এই ফাসাদটি আক্ষরিক ফাসাদ, এটি নিন্দনীয় নয়। একই ফাসাদ যদি ক্ষতিকর হতো, যেমন পানিতে ক্ষতিকর কিছু মেশানো, তাহলে তা নিন্দনীয় ও অপরাধ হতো।

ফাসাদ যে ক্ষেত্রে প্রবেশ করে, সে ক্ষেত্রের মৌলিকত্ব ও স্বাভাবিকতা নষ্ট করে দেয়। শিক্ষাক্ষেত্রের উদ্দেশ্য মানুষকে শিক্ষিত করে তোলা; শিক্ষিতজনের মূল্যায়ন করা। ফাসাদ আসায় অশিক্ষিতরা এখান থেকে শিক্ষিতের সার্টিফিকেট নিয়ে বের হয়। বছর জুড়ে যারা পড়াশোনা করে, পরিশ্রম করে, তাদের চেয়ে এক রাত যারা পরিশ্রম করে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সংগ্রহ করে, তারাই শিক্ষিত বলে মর্যাদা পায়।

চিকিৎসাখাতের উদ্দেশ্য মানুষকে সুস্থ রাখা। এতে ফাসাদ ঢুকলে মানুষ আর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে না। ভুল ঔষধ, অপ্রয়োজনীয় টেস্ট ও সার্জারি -ইত্যাদি মামুলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে বাজার ব্যবস্থায় ফাসাদ ঢুকলে মানুষ আরো গরীব হয়।

নেতৃত্বের উদ্দেশ্য মানুষের সেবা করা। সমাজের নেতা তাদের সেবক। কিন্তু তাতে ফাসাদ ঢুকলে সমাজ থেকে তিনি সেবা প্রত্যাশা করেন, বরং চাপিয়ে দেন। বিচারালয়ের উদ্দেশ্য ন্যায়বিচার ও ইনসাফ নিশ্চিত করা। এতে ফাসাদ ঢুকলে ইনসাফ দূরীভূত হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এতে ফাসাদ ঢুকলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়।

ফাসাদের বিপরীত হলো শুদ্ধতা, শৃঙ্খলা ও শান্তি। শান্তি আনয়নে ফাসাদ দূর করতে হবে। ফাসাদ আর শান্তি একসঙ্গে থাকতে পারে না।

পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে ফাসাদ হওয়ার কারণ হিসেবে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

30:41

স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন ফাসাদ ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (সঠিক পথে) ফিরে আসে। [৩০: ৪১]

আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন আয়াতে ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের জন্য কঠোর শাস্তি প্রস্তুত রাখার কথা উল্লেখ করেন। কোনো কোনো আয়াতে অতীতে ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কী হয়েছিল তা দেখে নিতে বলেন।

কোথাও তিনি ওপরে উল্লিখিত বিভিন্ন দোষে দোষীদেরকে ফাসাদ সৃষ্টিকারী হিসেবে অভিহিত করেছেন, আবার কোথাও কাফের-মুশরিক ও মুনাফিকদেরকে ফাসাদ সৃষ্টিকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তবে সুনির্দিষ্টভাবে সম্ভবত ফেরাউন ছাড়া আর কোনো ব্যক্তিকে ফাসাদ সৃষ্টিকারী হিসেবে উল্লেখ করেননি। ফেরাউনের ফাসাদের বিভিন্ন বিবরণ আল-কুরআনে দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতে তার সবগুলো ফাসাদের সারাংশ চলে আসে:

28:4

ফেরাউন তার দেশে উদ্ধত হয়েছিল এবং সে দেশবাসীকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে তাদের একটি দলকে দুর্বল করে দিয়েছিল। সে তাদের পুত্র-সন্তানদেরকে হত্যা করত এবং নারীদেরকে জীবিত রাখত। নিশ্চয় সে ছিল ফাসাদ সৃষ্টিকারী। [২৮: ৪]

ফেরাউনের পরিণাম কী হয়েছিল, তা আল্লাহ তায়ালার ভাষায়:

10:90

10:91

আর বনী-ইসরাইলকে আমি পার করে দিয়েছি সমুদ্র। তারপর তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেছে ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনী, দুরাচার ও বাড়াবাড়ির উদ্দেশে। এমনকি যখন তারা ডুবতে আরম্ভ করল, তখন (ফেরাউন) বলল, এবার বিশ্বাস করে নিচ্ছি যে, তাঁকে ছাড়া কোন মা’বুদ নেই, যাঁর ওপর ঈমান এনেছে বনী-ইসরাইলরা; বস্তুত: আমিও তাঁরই অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত। [১০:৯০]
(আল্লাহ বলেন) এখন একথা বলছ! অথচ তুমি ইতোপূর্বে নাফরমানী করছিলে। এবং পথভ্রষ্টদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলে। [১০:৯১]

ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পরিণাম এমনই।।।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখকের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে

Advertisements

One thought on “ফাসাদের বিভিন্ন অর্থ এবং ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পরিণাম

  1. পিংব্যাকঃ এ সময়ের ফিতনাহ: ভোগ, চারিত্রিক স্খলন এবং চরমপন্থার হাতছানি (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s