শিশু সন্তানের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে একটি প্রস্তাবনা

Girl on swing

বাচ্চারে মোরালিটি শেখানো যায় কেম্নে? ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, নাকি সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে? নাকি দুইটার কোনো ব্লেন্ডেড ভার্সন? পশ্চিম থেকে কি কিছু শিখার আছে, নাকি আমাদের ইসলামি সোর্সই যথেষ্ট? আমাদের উপমহাদেশ সোর্স হিসেবে তৃতীয় শ্রেণীর থেকেও নিচে, এব্যাপারে কোনো মতানৈক্য থাকার কথা না। বুক ফেটে যায় বলতে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য, আরব বিশ্ব বা অন্য কোনো মুসলিম দেশও আলোকবর্তিকা হাতে পথ দেখাচ্ছে না।

নিজে সৌদি আরবে বড় হয়েছি, অনেক আত্মীয়স্বজন এখনো থাকেন, ওদের সমাজটার ভিতরের অনেক খবর আমার জানা আছে। লোম খাঁড়া হওয়ার মতো ঘটনা যা মিডিয়ায় আসে না তা আমি কিছু কিছু শুনেছি। আমার একজন টীচার (যিনি মদীনা ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেন) একবার বলেছিলেন যে তিনি তার সাত বছরের মেয়েকে যখন সৌদি আরব নিয়ে যান, তখন ফুল নিকাব পরান। এক কথায় কারণ বলেছিলেন: they are just animals!

মিসরের ঈভ টীজিং/ হ্যারাসমেন্ট-এর ঘটনার কুখ্যাতি অনেকদিনের। ইন্টারনেটে একটা ভিডিও দেখেছিলাম, এক ভদ্রমহিলার কায়রোর একটা কুখ্যাত স্পট দিয়ে হেঁটে যাওয়ার ভিডিও। এই পথ (একটা ব্রীজ) উনাদের পাড়ি দিতে হয় ইজ্জত হাতে নিয়ে। এই ভিডিও যেদিন করা হয়, সেদিন তিনি একটা হিডেন ক্যামেরা নিয়ে যাচ্ছিলেন। উনাকে কী এক্সপেরিয়েন্স করতে হয়েছিল একটু দেখে নিতে পারেন। ইউটিউবে পাবেন। উত্তাল মুবারাক বিরোধী আন্দোলনের সময় বা পরবর্তীতে মুরসী বিরোধী ‘বিপ্লবের’ সময়ও কিন্তু শ্লীলতাহানির বিস্তর অভিযোগ এসেছে। মোনা আল তাহাওয়ীকে পছন্দ না করতে পারি, যা তার সাথে হয়েছে, তা সমর্থন করব কেম্নে?

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের এই অবস্থা হওয়ার ছিল? কেন হল?

..كلّ مولود يولد على الفترة

সব শিশুই বিশুদ্ধ/ খাঁটি/ পবিত্র অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে …

এটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসের একটা অংশ। পরের অংশ আজকের টপিকের সাথে সরাসরি না গেলেও self assessment আর direction পাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরের অংশে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন যে, শিশুর বাবা-মা পরবর্তীতে তাকে ইহুদী বা খ্রিস্টান বানিয়ে ফেলে। তাহলে আমাদের আলোচ্য বিষয়ে কি এইটা বলা যায় যে আমাদের বাবা-মায়ের কারণে আমরা পিউরিটি ল্যুজ করি? আমাদের ব্যর্থতায় আমাদের বাচ্চারা?

বিষয়টা  নিয়ে আমি আর আমার বউ কিছুদিন থেকেই ভাবছি, বিতর্ক করছি। কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছি না। কেউ কাউকে কনভার্টও করতে পারছি না। আবার ছেলে বড় হচ্ছে। সঠিক শিক্ষা তার দরকার। কোনটা মোরাল আর কোনটা ইম্মোরাল সেইটা জানা শুধু না, কেন মোরাল বা ইম্মোরাল সেটা তার জানতে হবে। নিজে সিদ্ধান্ত নেয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। নাইলে সারাজীবন সিদ্ধান্তহীনতার dilemma-য় ভুগবে, পথ হারানোর আশঙ্কা থাকবে। কিন্তু কীভাবে শিখাবো? ধর্ম? পাপ পুণ্য? নাকি মনুষ্যত্বের মন্ত্র: সবার উপর মানুষ সত্য? নাকি দুটো একসাথে? 

Cox's Bazar

আমরা এখন ছুটি কাটাচ্ছি কক্সবাজারে। ইনানীতে ছিলাম বেশ কিছু সময়। রিসোর্টের চারপাশে গ্রাম। বাড়িগুলো বড় শান্তি শান্তি। পুকুর আছে বাড়িতে, সুপারি বাগান আছে পুকুর পাড়ে। মূল কক্সবাজারের মতো প্রাণহীন না এই এলাকা। রেগুলার ফিজিক্যাল এক্টিভিটিতে অভ্যস্ত আমরা দুইজনই। তাই নিয়ম করে সকাল-বিকাল হাঁটছি, সাগরে ঝাপাচ্ছি আর সুইমিং পুলে সাঁতার কাটছি। গতকাল বিকালে মেরিন ড্রাইভ ধরে হাঁটছিলাম। পরপর দু’টা স্থানীয় বাচ্চাদের দলের সাথে দেখা। প্রথমে দেখা একদল মেয়ের সাথে; এরা সবাই পাশের স্কুলে সিক্সে পড়ে। কি যে নিরীহ কৌতূহল বাচ্চাগুলার চোখেমুখে। হা করে দেখছে আমাদেরকে, বিশেষ করে আমার বউকে। আমার বউও পারে বটে! ওদের সাথে গল্প জুড়ে দিলো। ডিটেইলে আর না গেলাম, মোদ্দাকথা বড় ভাল্লাগলো ওদেরকে, ওদের শিশুর সরলতাকে। এরপর ছেলেদের একটা ছোট দল আমাদের ক্রস করল। বেশি না, তিন কি চার জন হবে। একই বয়েসি। এদেরও অনেক কৌতূহল। তবে মোটেও সরল বা নিরীহ না। ওদের চোখ মাপছে আমার বউকে! দুটি একই বয়েসি ছেলেমেয়ের দলে যেন আকাশপাতাল তফাৎ। একই এলাকায় বসবাসকারী, একই আর্থ -সামাজিক প্রেক্ষাপটে বড় হওয়া, (হয়তো) একই স্কুলে পড়ুয়া, (হয়তো) একই মক্তবে কুরআন শিখতে যাওয়া দুইদলের মধ্যে কীভাবে এত পার্থক্য হয়ে গেল? কেন মেয়েরা তাদের সারল্য (ফিতরাতের অংশ?) ধরে রাখলো আর ছেলেরা সারল্য হারিয়ে ফেললো, ফিতরাতকে করাপ্ট করে ফেললো?

এইটা কি বয়েসের দোষ? নাকি boys will be boys? নাকি আকাশ সংস্কৃতির কুফল? নাকি আল্লাহর যথাযথ ভয় কাজ না করা, বা অসম্পূর্ণ ইসলামী শিক্ষা? কেন জানি আমাদের ‘ইসলামিক সার্কেলে’ এইসব আলোচনা হলে এই কিছু কারণের মধ্যেই আমরা ঘুরপাক খাই। আকাশ সংস্কৃতির পিন্ডি চটকানো হয় সবচেয়ে বেশি। যেন স্যাটেলাইট টিভি আসার আগে আমরা খুব ধোঁয়া তুলসি পাতা ছিলাম। সাথে চলে আসে কন্সপিরেসি থিওরি: সবই মুসলমানদের ঈমান আকিদা নষ্টের বিধর্মীয় মাস্টার প্ল্যান!

বয়সের দোষ যদি হবেই বা, তাহলে মেয়েদের হয় নাই কেন? Boys will be boys হলে আল্লাহ কেন দৃষ্টি সংযত রাখতে বললেন? পারবেনা জেনেও বললেন? নাকি পারবে বলে বললেন? অসম্পূর্ণ ইসলামি শিক্ষা বা আল্লাহকে ভয় না পাওয়ার ব্যাপারটাও মানতে পারি না, যখন দেখি ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেগুলা পহেলা বৈশাখে রক্ত দিয়ে মা-বোনের সম্ভ্রমহানির প্রতিবাদ করে, আর আজন্ম ‘ইসলামি পরিবেশে’ বড় হওয়া, ছোটকাল থেকে হালাল হারাম শিখা আমিও বারবার হোঁচট খাই (আল্লাহু মুস্তা’আন)। আকাশ সংস্কৃতি? এইটা কোনো যুক্তিই না। গেল শতকের সত্তরের দশকে আমার মা স্কুলে যেতেন গ্রাম থেকে জেলা শহরে। উঁচু ক্লাসে উঠতে উঠতে উনার সাথের সব মেয়েই পড়া ছেড়ে দেয়। আমার মা দেননি। তিনি দুই/আড়াই কিলোমিটার রাস্তা একা হেঁটে স্কুলে যাওয়া চালু রাখলেন। বোরকা পরতেন আমার মা। তা সত্তেও উনাকে অকথ্য ‘ইভ টীজিং’ সহ্য করতে হতো। একটা চার লাইনের ছড়া আম্মার কাছে শুনে আমারও মুখস্ত হয়ে গেছে। আমি চ্যলেঞ্জ করতে পারি যে, আপনি কল্পনার লাগাম ছেড়ে দিয়েও এরকম অশ্লীল ছড়া বানাতে পারবেন না। তখন আমরা কোন আকাশ সংস্কৃতির কবলে ছিলাম?

এইসব খেলো কথাবার্তা বলে যতদিন আমরা শাক দিয়ে মাছ ঢাকবো, ততদিন কোনো সমাধান হবে না। এখনো কি সময় হয়নি সিরিয়াস আত্মপর্যালোচনার, কঠিন প্রশ্ন করার? শুরু না করলে, সমস্যার স্বীকৃতি না দিলে সমাধান আসবে কোত্থেকে? উম্মাহর শুদ্ধি/ ইসলাহ বড়, নাকি বড় সালাফি-মাযহাবী গন্ডগোল?

আমার বেড়ে ওঠার এক্সপেরিয়েন্স বলি। হালাল হারাম বা জায়েয নাজায়েয-এর সাথে আমার পরিচয়  একদম ছোটবেলা থেকে। এইটা করা যাবে না, নাজায়েজ। ওইটা করলে আল্লাহ খুশি হবেন। পর্দা করা ফরয। চোখেরও পর্দা আছে। চোখেরও যিনা আছে। মেয়েদের সাথে কথা না বলাই ভালো, বললে যদি সীমালঙ্ঘন হয়ে যায়!

এর কোনোটাই স্ট্রিক্টলি রিলিজিয়াস দৃষ্টিকোণ থেকে ভুল কথা না। কিন্তু এই শিক্ষা দেয়ার কি এর থেকে ভালো উপায় নাই? আমি শিউর, আপনাদের যাদের রিলিজিয়াস পারিবারিক ব্যকগ্রাউন্ড আছে, আপনারাও এগুলো না হলেও এর কাছাকাছি জিনিস পরিবার থেকে অথবা হুজুর থেকে শুনেছেন। আন্দাজ করতে পারি ইনানীর সেই ছেলেগুলোও শুনেছে। কিন্তু যে কারণে বলা, সেই উদ্দেশ্য কতটুকু সফল হলো? আমার নিজেরে দিয়ে বলতে পারি, এই লাইনের শিক্ষা কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে অক্ষম। এই শিক্ষা কী করতে হবে আর কী করতে হবে না সেই কথা বলে, বলে না যেটা করতে হবে সেটা কেন করতে হবে। অন্যভাবে বললে, এই শিক্ষা অনেকটা মুখস্ত পড়ার মতো। কী পড়লাম না বুঝেই পড়লাম, পরীক্ষার হলে লিখতে পারলেই হলো। চিন্তার উদ্রেক এই শিক্ষা করে না। আর করতে পারে না বলেই আমার মতো বেড়ে ওঠারাও হোঁচট খায়।

আমাদের দেশে আরো অনেক বিভাজনের মতো ধর্মীয় শিক্ষা নিয়েও একটা বিভাজন আছে এবং দিনদিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। একদিকে “ধর্ম শিক্ষা ছাড়া মানুষ হবে না” এক্সট্রিম, অন্যদিকে “ধর্ম শিক্ষার দরকার নাই” এক্সট্রিম। সবসময় যেমন হয়, সত্য আসলে আছে মাঝামাঝি কোথাও। এই মাঝামাঝি জায়গাটা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।

মাঝখানের জায়গার সন্ধানে:

فَخِيَارُكُمْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُكُمْ فِي الْإِسْلَامِ إِذَا فَقُهُوا

যারা জাহিলিয়্যাতে বেস্ট ছিল, তারা ইসলামেও বেস্ট, যদি সে ধর্মীয় বুঝ-সমঝ অর্জন করতে পারে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, আর ইমাম বুখারী তাঁর সহিহ বইয়ে স্থান দিয়েছেন।

এই হাদীসের স্বপক্ষে প্রমাণ রাসুলুল্লাহর জীবনেই আছে। জাহেলী মক্কার ভালো লোক যারাই ছিল, প্রায় সবাইকেই আল্লাহ পথ দেখিয়েছিলেন। আবু বকর, উমার, উসমান, তালহা, যুবায়ের সহ আরো যারা প্রথম  দিকে ঈমান এনেছিলেন, সবার পূর্ববর্তী রেকর্ড দেখেন। ইনাদের সবার ভালো মানুষ হিসেবে সুখ্যাতি ছিল। এর সাথে যখন ধর্মের বুঝ তাদের আসল, সবাই একেকজন তারকায় পরিণত হলেন।

এইখান থেকে তাহলে একটা জিনিস ডিডাক্ট করা যায়। সেটা হলো যে: মানুষের কিছু মৌলিক গুনাবলী আছে, যা ধর্ম সাপেক্ষ নয়। এই মৌলিক জায়গাটা যাদের আছে, তারা যখন ধর্মীয় জ্ঞান না ঠিক, ধর্মীয় understanding লাভ করে, তখন তারা অন্য লেভেলে পৌঁছে যায়। এটাই হচ্ছে মু’মিনের desired level. আমার মনে হয় এইখান থেকেই বাচ্চাদের শিক্ষা দেয়ার মূলনীতি (pedagogy) পাওয়া যেতে পারে। প্রথমে মনুষ্যত্বের মৌলিক পাঠের গাঁথুনি, এর উপর রিলিজিয়াস শিক্ষার পত্তন!

আমি যে খুব বেশী র‍্যাডিকাল কিছু বলছি না, তার পক্ষে আমার কাছে প্রমাণ আছে। একদম প্রথম হিজরি শতকে মাদীনা মুনাওয়ারার  একজন মা, ‘আলিয়া বিন্ত শারিক, তার বছর সাতেকের ছেলেকে শিক্ষকের কাছে পাঠানোর সময় কী বলছেন শুনেন:

تعلم العلم، اذهب الي ربيع فتعلم من ادبه قبل علمه

জ্ঞান অর্জন কর। রাবী’আর কাছে যাও, এবং তার জ্ঞান থেকে শিখার আগে তার আদাব থেকে শিখ।

রাবী’আ (ইবনু আব্দুর রাহমান) ছিলেন তখনকার মাদীনার সবথেকে বড় আলেমদের একজন। তিনি তাবে’য়ী ছিলেন। আর বাচ্চাটা? ইমাম মালিক ইবনে আনাস রাহিমাহুল্লাহ, মাদীনার ইমাম! দুই বছর তিনি আদাব শিখলেন রাবী’আর কাছে!

আরেকটা ঘটনা শুনুন। এটা আরো পরের ঘটনা। ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ মক্কা থেকে মাদীনা চলে এসেছেন, সাথে তার মা। উদ্দেশ্য? ইমাম মালিকের কাছে পড়া। একদিন মালিকের কাছে পড়া শেষে শাফেয়ী বাড়ি ফিরেছেন। ঘরে ঢুকার আগে মা জিজ্ঞেস করলেন: কী নিয়ে ফিরেছ (মানে মালিকের সাথে এত সময় কাটায়ে কী শিখলা)? শাফেয়ী উত্তর দিলেন: জ্ঞান এবং আদাব। মা বললেন ফিরে যাও, তুমি কিছুই নিয়ে আসোনি! শাফেয়ী দুঃখ ভরা মন নিয়ে মালিকের কাছে ফিরে ঘটনা বললেন। মালিক তাকে শিখায়ে দিলেন: আবার যাও। এইবার মা যখন জিজ্ঞেস করবেন তখন আদাব আগে বলবা, জ্ঞান পরে। বলবা আমি আদাব আর জ্ঞান নিয়ে ফিরেছি। মালিক নিশ্চয়ই তার নিজের ছোটবেলার কথা মনে রেখেই এই সাজেশন দিয়েছিলেন। এইবারের উত্তরে মা সন্তুষ্ট হয়ে দরজা খুলে ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন!

তাহলে দেখতে পাচ্ছি ইসলামের প্রথম যুগে মানুষের প্রায়োরিটি জ্ঞান খুবই টনটনে ছিল, আমাদের মত স্ক্র্যাম্বল্ড ছিল না। বাচ্চাদের পড়ালেখা কুরআন বা হাদীস দিয়ে শুরু হতো না, হতো আদাব দিয়ে। এই আদাবকে আমি নীতিশাস্ত্র বলতে চাই। আমার কোনো ধারণা নাই আদাবের কন্টেন্ট কি ছিল। তবে ধারণা করতে পারি এইখানে মনুষ্যত্বের শিক্ষা দেয়া হতো, আচার-ব্যবহার শিখানো হতো, বিনয় শিখানো হতো, সৌজন্য শিখানো হতো, মানুষের মর্যাদা শিখানো হতো, বাবা-মায়ের হক শিখানো হতো, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য শিখানো হতো, নরম ভদ্র আচরণ শিখানো হতো, নিচু গলায় কথা বলা শিখানো হতো, শ্রমিকের অধিকার শিখানো হতো, সালাম বিনিময় শিখানো হতো, রোগীর সেবা বা মেহমানের আপ্যায়ন ইত্যাদি মহৎ গুণের শিক্ষা দেয়া হতো। সাথে জেন্ডার রিলেশন্স শিখানো হত কি না আমার জানা নাই, তবে যদি শিখানো হতো, অবাক হওয়ার কিছু নাই। কারণ উনারা আমাদের মতো ডাম্ব ছিলেন না, ছিলেন তাদের যুগের স্মার্টেস্ট। আর যদি শিখানো নাও হয়, আমরা যুগের উপযোগী নতুন কারিকুলাম বানাচ্ছি না কেন? কিসে আটকানো আমরা? কোথায় আমাদের হাত পা বাঁধা?

ইমাম মালিকের অনেক মহিলা শিক্ষক আর মেয়ে ছাত্রী ছিলেন। ইমাম বুখারীর অনেক মহিলা শিক্ষক ছিলেন, যাদের মধ্যে কেবল বসরাতেই ছিলেন ৭০ জন! শাইখ আকরাম নাদওয়ী হাফিযাহুল্লাহ চল্লিশ খন্ডে মহিলা হাদীস স্কলারদের জীবনী সংগ্রহ করেছে। একটা হেলথি পুরুষ-মহিলা সম্পর্ক না থাকলে ফিমেইল স্কলারশিপ ফ্লারিশ করত বলে আমার মনে হয় না।

আমার বিদ্যার দৌড় এইটুকুনই। আমার কাছে সমাধান আছে সেই দাবী আমি করি না। আমি শুধু কিছু প্রশ্ন তুলেছি মাত্র। আর সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছি। ইসলামের pedagogy নিয়ে আমাদের দেশের স্কলারদের ভাবার প্রয়োজন। আপাদমস্তক বদলানোর সময় এসেছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। আর শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙেচুরে নতুন করে শুরু না করলে এই আপাদমস্তক বদলানোর কাজটা সম্ভব হবে না।

মাননীয় আলিম উলামাদেরই এই কাজ করতে হবে। নাহলে আশানুরূপ ফল আসবে না, ধর্মেরও ফায়দা হবে না। মাঝখান থেকে কিছু লোক শুধু পানিই ঘোলা করবে।

যা বলেছিলাম, আমি মোটামুটি আমার বউয়ের সাথে এখন একমত: ছেলে আগে মনুষ্যত্বের মৌলিক জিনিস শিখবে, পরে তার রিলিজিয়াস এডুকেশন শুরু হবে। ইনশাআল্লাহ!

***   ***   ***

আরও পড়ুন:

Advertisements

2 thoughts on “শিশু সন্তানের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে একটি প্রস্তাবনা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close