সূরা ‘আসর অল্প কথায় আমাদেরকে যা শেখায় (অনুবাদ)

উস্তাদ নুমান আলী খানের একটি লেকচার থেকে অনুদিত। অনুবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় Nouman Ali Khan Collection In Bangla ফেসবুক পেইজে। Underwater

মনে করুন, আপনি পানিতে ডুবে যাচ্ছেন এবং ওই সময় আপনার কোনো জ্ঞান নেই। অর্থাৎ, অজ্ঞান অবস্থায় আপনি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছেন। আপনার কী মনে হয়? এরকম একটা অবস্থায় আপনার হাতে কি বাঁচার জন্য অনেক সময় আছে? আপনি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পানির গভীরে তলিয়ে যাচ্ছেন। এর মানে, আপনার হাতে কিন্তু মোটেও সময় নেই! সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আরবীতে এভাবে সময় শেষ হয়ে আসাকে বুঝানোর জন্য ‘আসর’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ‘আসর’-এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সময়, যেটা শেষ হয়ে আসছে। দিনের শেষ সময়, যখন দিন শেষ হয়ে আসে, তখনই আসর নামাজের ওয়াক্ত হয়। ‘আসর’ শব্দের উংপত্তি হচ্ছে ‘অসির’ শব্দটি থেকে, যার মানে হচ্ছে চিপে রস বের করা। ‘সময়’, যেটা হাতের ফাঁক দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমরা ভেজা কাপড় শুকাতে দেয়ার আগে দুই হাত দিয়ে মুচড়িয়ে যেভাবে পানি বের করি, ‘আসর’ শব্দটি এধরনের অর্থ বোঝাতেই ব্যবহার করা হয়।

তার মানে, এখানে আল্লাহ এমন একটা মুহুর্তের কথা বর্ণনা করছেন যখন আপনি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পানিতে ডুবে যাচ্ছেন এবং আপনার সময় শেষ হয়ে আসছে। এমন অবস্থায় বেঁচে থাকতে হলে আপনাকে সর্বপ্রথম কোন কাজটা করতে হবে? বেঁচে থাকার আশা করতে হলে কোন জিনিসটা আপনার একেবারে শুরুতে দরকার? … কী মনে হয়? … জ্ঞান ফিরে আসা? … অবশ্যই! এটাই এখন আপনার সবার আগে দরকার! যদি জ্ঞান ফিরে না আসে তাহলে আপানার বাঁচার কোনো সম্ভাবনাই নেই। এমনকি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় আপনি যদি জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নও দেখতে থাকেন, তবুও বাচতে হলে আপনাকে কিন্তু জাগতেই হবে। মনে করুন, স্বপ্নের মধ্যে আপনি দেখছেন সেইরকম সুন্দর, সাজানোগোছানো একটা জীবন আপনার। পাহাড়ের পাদদেশে আপনার চমৎকার বাড়ি। আপনি আপনার ফেরারি গাড়িটা নিয়ে লং ড্রাইভে বের হয়েছেন, রাস্তার একপাশে সবুজে ঢাকা পাহাড়, আর অন্য পাশে সুনীল সমুদ্র! কিন্তু যেই আপনার জ্ঞান ফিরে আসলো, আপনি বুঝতে পারলেন যে আপনি আসলে ডুবে যাচ্ছেন, পানির অতলে হারিয়ে যাচ্ছেন। এমতাবস্থায় জেগে ওঠার পরে আপনার কিন্তু এমন মনে হবে না যে, ‘ইশ ! কি বাজে অবস্থা, পানিতে ডুবে যাচ্ছি। এর চেয়ে তো আবার ঘুমিয়ে পড়াই ভালো, কি সুন্দর স্বপ্ন দেখছিলাম’। শুধুমাত্র আপনি যদি মানসিকভাবে অসুস্থ বা পাগল হয়ে থাকেন, একমাত্র তখনই আপনার এরকম মনে হতে পারে। অথবা, কারো যদি বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার মতো সাহস না থাকে, সে এরকম করতে পারে। কারণ,তাদের কাছে বাস্তবতা এতই কঠিন মনে হয় যে, তারা জেগে ওঠার পরও আবার ঘুমিয়ে যাওয়াকেই ভালো মনে করে। এই ধরণের লোক যারা ডুবে যাওয়ার সময় হুশ ফিরে আসার পরও পরিস্থিতি খারাপ দেখে জোর করে ঘুমিয়ে থাকে তারা কি তাদের খারাপ পরিণতির জন্য অন্য কাউকে দায়ী করতে পারবে? পারবে না। শুধুমাত্র নিজেই নিজেকে এর জন্য দায়ী করা ছাড়া আর কিছুই তারা করতে পারবে না।

যাই হোক, স্বাভাবিকভাবে ধরে নিই যে হুশ ফিরে আসার পরে সে যখন দেখল যে অবস্থা খুব খারাপ, সে ডুবে যাচ্ছে তখন সে আর ঘুমালো না; কিন্তু এর পরে সে কী করবে? এমন একটা অবস্থায় আপনি কী করতেন? … হাত, পা সবকিছু নাড়িয়ে চেষ্টা করতেন না পানির উপরে উঠতে? যদি সাঁতার নাও জানেন, তারপরও তো চেষ্টা করতেন। … কি? করতেন না? … আর এই চেষ্টা করতে করতে যখন আপনি বুঝতে পারবেন যে এলোপাথাড়ি হাত-পা না ছুড়ে , একটা নির্দিষ্ট স্টাইলে হাত-পা নাড়ালে আপনি উপরের দিকে যাচ্ছেন, তখন আপনি ঠিক ওভাবেই হাত-পা নেড়ে উপরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকবেন।

মানে হলো, বাঁচার জন্য সর্বপ্রথম আপনাকে বেহুশ অবস্থা থেকে জেগে উঠতে হবে। এর পরে সাঁতার কেটে উপরের দিকে যেতে হবে। অথবা অন্য কোনো উপায়ে হলেও উপরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু যেই না আপনি পানির উপরে মাথা তুলে বড় করে নিঃশাস নিতে গেলেন, তখনি আপনি পায়ের গোড়ালিতে একটা শিকলের উপস্থিতি টের পেলেন। সেই শিকলের অপর প্রান্তে কিছু একটা বাঁধা আছে যেটা আপনাকে আবার পানির নিচে টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। অপর প্রান্তের সেই জিনিসটা আর কিছুই না, সেটা আপনার ভাই, যে এখনো ঘুমিয়ে আছে পানির নিচে। তার মানে, আপনি ভেসে ওঠার পরও আবার ডুবে যাচ্ছেন, কারণ আপনার ঘুমন্ত ভাই আপনার সাথে শিকল দিয়ে বাঁধা। তাহলে আপনি এখন কী করবেন? … অবশ্যই আপানাকে এখন আপনার সেই ভাইকে ঘুম থেকে ওঠাতে হবে, তাই না? হয়তো আপনি আপনার সেই ভাইকে অনেক ভালোবাসেন, অথবা বাসেন না। কিন্তু মূল ব্যাপারটা হচ্ছে, এই মুহুর্তে আপনি আপনার সেই ভালোবাসা থেকে কিন্তু তাকে ডেকে তুলছেন না! আপনি নিজের গরজেই তাকে ডাকছেন। কারণ এই পরিস্থিতিতে আপনি যদি তাকে ডেকে না তোলেন তাহলে আপনি নিজেও কিন্তু বাঁচবেন না।

তো, আপনি তাকে ডেকে তুললেন। জেগে ওঠার পরে আপনার ভাই বলল, ‘আরে আমি কি সুন্দর ফেরারি গাড়ি নিয়ে লং ড্রাইভে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলাম আর তুই খামোখাই আমাকে ডেকে তুললি? আমি আবার ঘুমাতে যাচ্ছি’। অর্থাৎ, সে আপনাকে বেমালুম উপেক্ষা করলো। তখন কি আপনি বলবেন যে, ‘ঠিক আছে, আমার কি আসে যায়। তোমার যা ভালো লাগে সেটাই কর’। … আপনি কিন্তু মোটেই এরকম করবেন না। সে যদি আবার ঘুমিয়ে যায়, আপনি তাকে ধাক্কা দিতে দিতে বলবেন, ‘ওঠ, আরে ওঠ। তাড়াতাড়ি কর। আমাদেরকে বাঁচতে হলে পানির উপরে উঠতে হবে। এভাবে থাকলে চলবে না’। এভাবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ঘুম থেকে উঠে বলবে, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, বল কী করতে হবে?’, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি চেষ্টা করবেন তাকে ঘুম থেকে তোলার। তারপর আপনারা দুইজনে একসাথে সাঁতার কেটে পানির উপরে ভেসে উঠলেন। কিন্তু ওঠার পরে বুঝতে পারলেন যে, এবার অন্য আরেকজন আপনাদের দুইজনকে আবার পানির নিচে টানছে। সেটা কে? সেটা হতে পারে আপনার বাবা, মা, দাদা, নানা, বোন, ছেলে, মেয়ে, কিংবা প্রতিবেশী। আর এভাবেই সমস্ত প্রক্রিয়াটা বারবার চলতে থাকবে।

তার মানে, বাঁচার জন্য একজন মানুষকে চারটি ধাপ পার করতে হবে:
১। সবার আগে নিজেকে ঘুম থেকে উঠতে হবে।
২। এরপরে সাতার কেটে উপরে যাওয়ার চেষ্টায় থাকতে হবে।
৩। এবং একই সময়ে তার পরিচিত অন্যদেরকেও (যাদের সাথে সে বন্ধনে জড়িত) ঘুম থেকে ওঠাতে হবে। তাদেরকে বাস্তবতা বুঝতে হবে।
(চতুর্থ ধাপটা নিচে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে)

এভাবে চলতে চলতে গ্রুপের একজন যদি বলে যে, ‘ভাই, আমি আর পারছি না। এভাবে আর কত? আর কতবার এরকম উপরে উঠে আবার আরেকজনের টানে নিচে আসতে হবে? আমি মনে হয় আর পারব না।’ তখন অন্য আরেকজন এগিয়ে এসে সাহস দিতে হবে, বলতে হবে – ‘না। আমরা ইনশাআল্লাহ একসাথেই এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাব। তোমাকে পারতেই হবে। আর অল্প কয়েকবার বাকি। চলো, চলো।’ আমরা মুভিতে অনেক সময়ই এধরনের অবস্থা দেখে থাকি। একদল লোক যখন কোনো জায়গা থেকে পালাতে যেয়ে অনেক বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হয় এবং দলের দুর্বল সদস্য যখন বলে যে আমি আর পারছি না তখন অন্যরা কীভাবে তাকে উৎসাহ দিয়ে সজীব রাখে। তারা সবাই একসাথে কাজ করে, একে অন্যকে আপ্রাণ সাহায্য করে, কারণ তাদের বেঁচে থাকাটাও একে অন্যের উপরে নির্ভরশীল।

যাই হোক, এখন আসুন আমরা দেখি আল্লাহ এই সূরায় কী বলেছেন:
প্রথমে তিনি বলেছেন, “وَالْعَصْرِ”: “সময় চলে যাচ্ছে, শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
তারপরে তিনি বলেছেন, “إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ”: “মানুষ ক্ষতির মধ্যে ডুবে আছে।”
“… إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا”: “শুধুমাত্র তারা ব্যতীত, যারা বিশ্বাস করে …” কী বিশ্বাস করে?
খেয়াল করুন, আল্লাহ কিন্তু এখানে বলেননি যে, যারা ফেরেশতা, কিতাব, নবী রাসুল, মৃত্যু, কিয়ামত ইত্যাদিতে বিশ্বাস করে। তিনি এসব কিছুই বলেননি। এগুলো অবশ্যই বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই সূরার বিষয়বস্তুর দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে কী সেই বিষয়, যেটা এখানে মানুষকে সবার আগে বিশ্বাস করতে হবে? সেটা হচ্ছে, তাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে যে, তারা ক্ষতির মধ্যে আছে! তারা ডুবে যাচ্ছে। আর তারা যদি এটা বিশ্বাস করে নেয় এবং সেই অনুসারে নিজেদের ঈমানকে ঠিক করে নেয়, তাহলে তারা সাঁতার কেটে ক্ষতি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করবে। আর একে আল্লাহ তা’আলা কীভাবে বর্ণনা করেছেন? তিনি বলেছেন – “وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ”, তারা ভালো কাজ করে; তারা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য কাজ করে। ‘সালিহাত’ হচ্ছে একটা বিশেষণ, যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, ‘এমন জিনিস যা অন্য জিনিসকে ঠিক করে’। অর্থাৎ, কিছু একটা ভুল ছিল এবং এটা সেই ব্যাপারটাকে ঠিক করে। তার মানে, তারা এমন কাজ করে যেটা প্রতিকূল পরিস্থিতিকে ঠিক করে। রূপক অর্থে আমরা যেটাকে সাঁতার কাটার সাথে তুলনা করছি।

কিন্তু, যেহেতু তারা অন্য মানুষদের সাথেও শিকল দিয়ে আটকানো, সেহেতু তাদেরকে শুধু নিজে সাঁতরালে হবে না, আরো কিছু করতে হবে। কী সেটা ? “وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ” – অর্থাৎ, তাদেরকে বাকি সবার কাছে, যারা ঘুমিয়ে আছে, তাদেরকে এই সত্যটা বলতে হবে। শুধু বললে হবে না, বারবার বলতে হবে, যতক্ষণ না তাদের ঘুম পুরোপুরি ভেঙ্গে যায়। কারণ, আপনি যাদের বাঁচাতে চেষ্টা করছেন তাদের একবার দুইবার এসব বললে তাদের ঘুম নাও ভাঙ্গতে পারে। এমনও হতে পারে, কিছুক্ষণ জেগে থেকে তারা আবার ঘুমিয়ে পড়ছে। আপনি আবার তাদের ওঠালেন, একটু পরে তারা আবার ঘুমিয়ে পড়লো। এভাবে চলতে চলতে দেখা গেল আপনি ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলছেন। আর এই কারণেই আল্লাহ আরও বলেছেন: “وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ” – আপনাকে এই কাজটা ‘সবর’ সহকারে করে যেতে হবে। সবর অর্থ: নিয়মানুবর্তিতা, ধৈর্য্য, অধ্যবসায়, দৃঢ়তা ইত্যাদি। অর্থাৎ, আপনাকে লক্ষ্যে অটুট থেকে কাজ করে যেতে হবে। কারণ, আপনার বাঁচা-মরা এর সাথে জড়িত। আপনি এতকিছু করার পরে যদি একটুর জন্য ধৈর্য্যহারা হয়ে যান, তাহলে তো আপনি নিজেও ডুবে যাবেন। যেমন ধরুন, আপনার ঈমান আছে (১), আপনি ভালো কাজও করেন (২), এবং আপনি মানুষকে সত্যের পথে ডাকছেন (৩); কিন্তু আপনার সবর (৪) নেই। তার মানে, এতকিছুর পরও আপনি ঠিকই ডুবে যাবেন। অর্থাৎ, ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে থাকতে হলে আপনাকে এই চারটি শর্তের সবগুলোই পূরণ করতে হবে। প্রতিটি শর্তই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং একটির সাথে অন্যটি ক্রমানুসারে সংযুক্ত। যেটা এই সূরাতে অতন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সূত্র: https://www.facebook.com/NAKBangla/posts/1706083899646229

ইংরেজিতে মূল লেকচারটি দেখুন এখানে:

 

আরও পড়ুন:

Photo credit: Jeremy Bishop

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s