ঈদুল আযহার তাৎপর্য (অনুবাদ)

উস্তাদ নুমান আলী খানের একটি ঈদ খুতবার সারাংশ থেকে অনুদিত। ভাষান্তরিত করার সময়ে পূর্ণাঙ্গ ভাব প্রকাশের সুবিধার্থে কোনো কোনো বাক্যে অতিরিক্ত কিছু শব্দ সংযোজন করা হয়েছে।

rainbow-after-storm

পৃথিবীর প্রতিটি সভ্যতারই আছে নিজস্ব ও স্বকীয় সব উৎসব। সেই প্রাচীনকাল থেকে নিয়ে আজকে পর্যন্ত মানবজাতির ইতিহাস ঘাটলে আমরা এমনটিই দেখতে পাই। প্রিয়জনের সান্নিধ্যে উপভোগ্য কিছু সময় কাটানোর পাশাপাশি অতীতে ঘটে যাওয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনাকে — যার আদর্শিক ভিত্তির ওপর সেই সভ্যতাটি দাঁড়িয়ে আছে — বছরান্তে বারবার স্মরণ করার সুযোগ এনে দেয় এই উৎসবগুলো।

প্রজ্ঞাময় আল্লাহ আমাদের মুসলিমদের জন্য বছরে দুটি উৎসব দিয়েছেন, যার মধ্যে একটি উৎসব আমরা পালন করছি আজকে। তো, আজকের এই আনন্দঘন দিনটিতে অতীতের কোন বিশেষ ঘটনাটিকে আমরা স্মরণ করছি? কেন আমরা এভাবেই এই বিশেষ দিনটিকে উদযাপন করছি? কী এর তাৎপর্যই? আসুন, সেই বিষয়ে সামান্য কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করি।

আজ আমরা স্মরণ করছি আমাদের মুসলিমদের জাতির পিতা ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে, যিনি তাঁর দীর্ঘ জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আপাতদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য ও সুকঠিন সব পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি নিজেকে কতটুকু পর্যন্ত সমর্পণ করতে তৈরি ছিলেন তারই পরীক্ষা ছিলো এগুলো। এসব পরীক্ষার প্রতিটিতেই তিনি দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন। আল্লাহর জন্য নিজের জীবনকে পর্যন্ত উৎসর্গ করতে তিনি পিছপা হননি। শাস্তিস্বরূপ তাঁকে যখন অগ্নিকুন্ডের মধ্যে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল তখনও তিনি তাঁর বিশ্বাস ও আদর্শের ওপর অটল ছিলেন (তবে, আল্লাহর ইচ্ছায় সেই আগুনে তাঁর মৃত্যু হয়নি, বরং বিস্ময়করভাবে আগুনকে তাঁর জন্য শীতল ও স্বস্তিদায়ক করে দেওয়া হয়েছিল)। [দেখুন: সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৫১-৭০] শুধু তাই নয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাদেশ আসার পরে নিজের পরম স্নেহের শিশু সন্তানের গলায় ছুরি চালাতে উদ্যত হতে পর্যন্ত তিনি কুন্ঠিত হননি (তবে, শেষ পর্যন্ত তাঁকে তাঁর সন্তানের গলায় ছুরি চালাতে হয়নি; আল্লাহর হুকুমে তিনি নিজের সন্তানকে পর্যন্ত উৎসর্গ করতে পারেন কিনা সেটিই ছিলো পরীক্ষা)। [দেখুন: সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১০০-১১১] এভাবে সময়ে সময়ে আরও অনেক উপায়ে আরও অনেক উপলক্ষে আল্লাহ তাঁর প্রত্যয়ের পরীক্ষা নিয়েছেন। আর প্রতিটি পরীক্ষাতেই তিনি সাফল্যের সাথে উতরে গেছেন। ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর সেই সাফল্যকে আমরা আজ উদযাপন করছি।

পরীক্ষা আমাদের জীবনেও আসবে। কিছু পরীক্ষা এমন আসবে যাতে করে আমাদেরকে নানাবিধ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে। কষ্ট সহ্য করতে হবে। কিছু পরীক্ষা এমন আসবে যেখানে আমাদের অতি প্রিয়জনদের আমরা দেখব নানাবিধ অসুবিধা ও কষ্টের মুখোমুখি হতে। আমাদের এই পরীক্ষাগুলো যত কঠিনই মনে হোক না কেন, ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর পরীক্ষার তুলনায় এগুলো কিছুই নয়। আমাদের মতো দুর্বল ঈমানের মানুষদেরকে তিনি যে সেরকম কঠিন পরীক্ষায় ফেলছেন না সেজন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করা যাবে না।

আমাদের এই পরীক্ষাসমূহ যত জটিল বলে মনে হোক না কেন, নিরাশ হওয়া যাবে না। ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর কাহিনী আমাদেরকে আশাবাদী করে তোলে। অবিশ্বাস্য রকম কঠিন সব পরীক্ষায় তিনি সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হতে পেরেছিলেন। আমরাও পারব। আমাদের পিতৃপুরুষ ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর মতো দৃঢ় প্রত্যয়ের পরিচয় দিতে পারলে আল্লাহ সাহায্যে আমরাও এসব পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উতরে যেতে সক্ষম হব।

আবারও ফিরে আসি আজকের দিনের উৎসব প্রসঙ্গে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আমরা আজ পশু কুরবানী করছি। সেই পশুর গোশতকে কেন্দ্র করেই আজকের এই উৎসব। এই গোশত কীভাবে বিতরণ করা হবে সেবিষয়ে আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। [দেখুন: সূরা হাজ্জ, আয়াত ২৮] অন্যান্যদের পাশাপাশি কারা এই গোশতের হকদার? দুস্থ মানুষেরা এই গোশতের হকদার। অভাবগ্রস্তরা এর হকদার। অস্বচ্ছল সেসব মানুষেরা এর হকদার যারা শত অনটনের মধ্যে নিমজ্জিত থাকা সত্বেও মুখ ফুটে কারও কাছে কিছু চাইতে পারে না। তারাও এর হকদার যারা নিজের আত্মসম্মানটুকু পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে অন্য মানুষের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়।

এদের প্রতি খেয়াল রাখা আমাদের কর্তব্য। তারা যেন খুশি মনে আজকের এই উৎসব উদযাপন করতে পারে। তাদের মুখে হাসি ফোটানোর দায়িত্ব আমাদেরই। আজকের এই দিনে আমাদের ও তাদের আনন্দ একাকার হয়ে যাক। এটিই আমাদের ধর্মের নির্দেশনা।

অতএব আসুন, যাদের দরকার তাদেরকে সাহায্য করতে আমরা সাধ্যমতো এগিয়ে আসি। তাদেরকেও আমাদের উৎসবে আমরা শরিক করে নিই। তারা যে একা নয় সেই অভয়টুকু তাদেরকে দিই। একজন ঈমানদারের উৎসব উদযাপন তো এরকম নিঃস্বার্থই হওয়া উচিৎ।

সবাইকে ঈদ মুবারক!

ইংরেজিতে মূল খুতবাটি শুনুন এখানে:

আরও পড়ুন:

Photo credit: Ben Njeri 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close