আশুরা – যেদিন সাগর হয়েছিল দ্বিখন্ডিত, কারবালা হয়েছিল রক্তাক্ত (অনুবাদ)

দাউদ ওয়ালিদ-এর একটি লেখা থেকে পরিমার্জিত আকারে অনুদিত।

solitary-confinement-cell

মুহাররম। হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস। বছরের যে চারটি সম্মানিত মাসে রক্তপাত নিষিদ্ধ তার মধ্যে একটি মাস হলো এই মুহাররম। কেবলই এর ধর্মীয় তাৎপর্যের কারণে নয়, ইতিহাসের পাতায়ও এই মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। এর মধ্যে দুটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ্য, যা সংঘটিত হয়েছিল এই মাসের দশম দিনে। বনি ইসরাঈল এই দিনেই ফিরাউনের কবল থেকে অলৌকিক উপায়ে মুক্তি লাভ করেছিল। ইমাম হুসাইন (رضي الله عنه) এবং তাঁর সহযাত্রীরা এই দিনেই শাহাদাত বরণ করেছিলেন।

***

কুরআনে বর্ণিত নিকৃষ্টতম মানুষ হলো ফিরাউন। সে নিজেকে “আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ প্রতিপালক” বলে ঘোষণা করার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছিল। বনি ইসরাঈলকে সে দাস বানিয়ে রেখেছিল। তাদের প্রতি তার আচরণ এক পর্যায়ে এতটাই নির্দয় হয়ে উঠেছিল যে, বনি ইসরাঈলের সদ্য ভূমিষ্ঠ প্রতিটি ছেলে সন্তানকে হত্যা করতেও সে কুন্ঠিত হয়নি। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধাচরণ করার ‘অপরাধে’ নিজের স্ত্রী আসিয়াকে পর্যন্ত শিরশ্ছেদ করে মেরে ফেলার নির্দেশ সে দিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বলে বলীয়ান হয়ে একজন মানুষ কতটুকু পর্যন্ত নিচে নামতে পারে তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ফিরাউন।

এমনই দম বন্ধ হয়ে আসা একটি পরিস্থিতিতে ফিরাউনের যুলুম থেকে বনি ইসরাঈলকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তাদেরই মধ্য থেকে দুজনকে আল্লাহ নবী হিসেবে বেঁছে নিলেন। এই দুজন নবী হলেন মুসা (عليه السلام) এবং হারুন (عليه السلام)। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে বনি ইসরাঈল একসময় দাসত্বের গ্লানি থেকে মুক্তি পেল। সাগর দ্বিখন্ডিত হলো। আল্লাহ প্রেরিত নবীদ্বয়কে প্রত্যাখ্যান করার শাস্তিস্বরূপ ফিরাউন তার বাহিনীসহ ধ্বংস হয়ে গেল। তবে, ফিরাউনের কবল থেকে মুক্তি লাভ করার পরেও আল্লাহর প্রতি চরম অকৃতজ্ঞ হওয়ার কারণে শাস্তিস্বরূপ চল্লিশ বছর ধরে দিশাহীন অবস্থায় তারা পথেপ্রান্তরে ঘুরে বেড়াতে লাগল, যদিও তাদের প্রতিশ্রুত গন্তব্য ছিল মাত্র মাসখানেকের পথ।

***

এর কয়েক হাজার বছর পরের ঘটনা।

শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) এরই মধ্যে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগও বিগত হয়েছে। মুসলিম জাহানের খলিফা মু’আউইয়াহ (رضي الله عنه) ছেলে ইয়াযিদকে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেছেন। মদ্যপ আর ফরয নামায তরককারী বলে বদনাম ছিল ইয়াযিদের। এরকম দুশ্চরিত্র একজন ব্যক্তির হাতে খিলাফতের গুরুদায়িত্ব অর্পিত হবে? মুসলিম উম্মাহ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে।

মু’আউইয়াহ (رضي الله عنه) মারা গেলেন। মসনদে আসীন হলো ইয়াযিদ। ভয়ভীতি দেখিয়ে হলেও তার আনুগত্য মেনে নেওয়ার জন্য মানুষকে বাধ্য করতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি সে রাখল না। যেসব সাহাবী তখনও বেঁচে ছিলেন তাঁদের অনেকের জন্য তা ছিল খুবই কঠিন একটি সময়।

প্রিয় নবীর (ﷺ) প্রাণপ্রিয় নাতি হুসাইন (رضي الله عنه), যাকে জান্নাতে যুবকদের সর্দারদ্বয়ের একজন বলে হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে, ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত হতে অস্বীকার করার মাধ্যমে অহিংস উপায়ে প্রতিবাদ জানালেন। এই খবর গিয়ে পৌঁছল ইরাকে। সেখানকার কুফা শহরের অধিবাসীরা হুসাইন (رضي الله عنه) এবং আহলে বাইতের সদস্যদের তাদের শহরে আমন্ত্রণ জানাল। তিনি কুফায় আসলে ইয়াযিদের পরিবর্তে তারা তাঁর হাতে বাইয়াত করবে বলে অঙ্গীকার করল। তাঁদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও তারা দিলো। তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করে হুসাইন (رضي الله عنه) সপরিবারে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা করলেন। পথিমধ্যে পরিস্থিতি প্রতিকূল মোড় নিলো। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ডামাডোলে কুফাবাসীরা তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে বসল।

কারবালা নামক স্থানে ইয়াযিদের সেনাপতি উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ তাঁদের গতিরোধ করে ফেলল। হুসাইনকে (رضي الله عنه) তাঁর অধিকাংশ সফরসঙ্গীসহ কারবালার ময়দানে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। প্রিয় নবীর পবিত্র রক্ত যাদের ধমনীতে বইছে তাঁদের রক্তে রঞ্জিত হলো কারবালা।

কুফাবাসীরা রাষ্ট্রীয় যুলুমের কাছে মাথা নত করে করে বিশ্বাসঘাতকতা করার কারণেই হুসাইন (رضي الله عنه) এবং তাঁর সফরসঙ্গীদের এভাবে হত্যা করা যালিমদের জন্য সহজ হয়েছিল। পরবর্তী বছরে ইয়াযিদের বাহিনী মদিনা আক্রমণ করে বসে। মদিনাবাসীরাও ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিল। যালিম ইয়াযিদের বাহিনী পবিত্র মদিনা শহরে ব্যাপক হত্যা ও লুটতরাজ চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে নিরাপদ ও সম্মানিত নগরী মক্কার নিরাপত্তা ও সম্মান পর্যন্ত তাদের হাতে ভূলুন্ঠিত হয়। সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন আয-যুবায়ের (رضي الله عنه) ইয়াযিদের বশ্যতা স্বীকার না করে মক্কাকে কেন্দ্র করে পৃথক একটি খিলাফত পরিচালনা করছিলেন। মক্কা যখন আক্রান্ত হয় তখন আল্লাহর সম্মানিত ঘর কা’বা পর্যন্ত আক্রমণকারীদের আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি। যালিমদের হামলায় পবিত্র কা’বা ঘরে আগুন ধরে গিয়েছিল।

***

বনি ইসরাঈলের অবাধ্যতা, কুফাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতা, অত্যাচারী ইয়াযিদের যুলুম সত্বেও অসংখ্য মুসলিমের নীরবতা – এই বিষয়গুলোর আলোচনা আজকের যুগেও প্রাসঙ্গিক। শক্তিমানের অন্যায় ও অনাচারের মুখে দুর্বল হিসেবে বিপর্যস্ত অবস্থায় আল্লাহর নাযিল করা নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে পারা অনেক কঠিন একটি কাজ। এরকম সঙ্গিন সময়ে আল্লাহর নাযিল করা নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে ব্যর্থ হলে অবস্থার উন্নতি হওয়ার পরিবর্তে অন্যায় ও অনাচারের মাত্রা উল্টো আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

অত্যাচারীর আজ্ঞাবহ হতে পারার মধ্যে গৌরবের কিছু নেই। অন্যের অন্ধ অনুকরণের মধ্যেও নেই কোনো সম্মান। অলৌকিক উপায়ে সাগর দ্বিখন্ডিত হয়ে ফিরাউনের কবল থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পাওয়ার পরেও বনি ইসরাঈল তাদের পূর্ববর্তী মনিবদের অনেক বিশ্বাস ও রীতিনীতি পরিত্যাগ করতে পারেনি। এতে করে তাদের কপালে কেবল অপমান ও লাঞ্ছনাই জুটেছিল।

মুহাররম মাসের প্রথম দশ দিন – বিশেষত আশুরার দিনটি – নফল রোযা রাখা এবং অধিক পরিমাণে দু’আ করার মাধ্যমে অতিবাহিত করতে চেষ্টা করা উচিৎ। সেইসাথে, নবী মুসা (عليه السلام) তাঁর কওমকে সঙ্গে নিয়ে যেসব প্রতিকূলতার মোকাবেলা করেছেন এবং তাঁর কওমের যেসব অনাকাঙ্খিত আচরণ তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে সেবিষয়ে সুযোগ থাকলে আমাদের পড়াশোনা করা দরকার। এতে করে নবীদের মহান আদর্শ অনুসরণ করে আল্লাহর নাযিল করা নির্দেশনা অনুযায়ী চলার মাধ্যমে কীভাবে আমাদের মহান স্রষ্টার নৈকট্য অর্জন করা যেতে পারে তা আমরা জানতে সক্ষম হব। পাশাপাশি, ইমাম হুসাইন (رضي الله عنه) এবং আহলে বাইতের মহান জীবনী এবং তাঁদের ত্যাগ ও সংগ্রামের কাহিনী জানার ব্যাপারেও আমাদের আগ্রহ থাকা দরকার। তাঁদের কাহিনী আমাদেরকে অনুপ্রেরণা জোগাবে।

আমরা নিজেরা যালিম হব না। যালিমের ক্রীড়ানক হব না। যালিমের সহযোগী হব না। যেখানে কথা বলার সুযোগ আছে সেখানে চুপ থেকে যুলুমের প্রসারে সাহায্য করব না। আশুরার দিনে ঘটা দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার মূল শিক্ষা এটিই।

ইংরেজিতে মূল লেখাটি পড়ুন এখানে: http://almadinainstitute.org/blog/muharram-a-month-of-resisting-oppression/

আরও পড়ুন:

ইংরেজিতে পড়ুন:

ভিডিও লেকচার:

1) Protect This House: Hasan, Husain & the Merits of Ahl-ul-Bayt – Shaykh Mokhtar Maghraoui

 

2) Joy and Sadness for Sayyiduna al-Husayn, peace be upon him

 

Photo credit: J Miller

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close