নিউরোটিক মা + পাপেট ছেলে = ছেলের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি

“আপু, আপনি যা বলেছেন প্রত্যেকটা কথাই খুব বাস্তব। মনে হলো আমার জীবনটাই তুলে ধরেছেন আপনি।”

“আপু ঠিকই বলেছেন, কিন্তু আমাদের দিকটা তো কেউ দেখে না! আমরা যাই করি কেবল ভুল বোঝারই শিকার হই। সবাই নিজেরটা বুঝলে কী করে হবে? কাউকে না কাউকে তো ছাড় দিতে হবে!”

“আপু, আপনার থেকে অন্তত এমন একপেশে কথা আশা করিনি।”

ফেইল্ড দাম্পত্যে অসুখী পোস্ট-মেনোপজাল নিউরোটিক মায়েদের সম্পর্কে আমার লেখা পোস্টের প্রতিক্রিয়া। ছেলেরা বোকা না, অলস কুঁড়ে অন্ধও না। অন্যায়কে তারা দেখতে পায়। কেউ যখন বলে এটা অন্যায়, তখন মাথা নেড়ে মেনেও নেয়। কিন্তু …

এই কিন্তুতে গিয়েই পৃথিবী তাদের যেন থেমে যায়।

কিন্তু ১: সবই বুঝি, ‘কিন্তু’ কী করব? আমার মাকে তো যাই বলব তাই নিয়েই উনি বিশাল কান্নাকাটির যজ্ঞ বাধিয়ে ফেলবেন। কাজের কাজ কিছু হবে না, উল্টো আমি কত অকৃতজ্ঞ সন্তান তাই নিয়ে আরেকবার মহাকাব্য শুনতে হবে।

কিন্তু ২: স্বীকার করি, মা অন্যায় কথা বলেছেন। ‘কিন্তু’ আমার মা কোথা থেকে এসেছেন সেটাও তো তুমি দেখবে! উনি জীবনে কখনও সম্মান পাননি, সবকিছু মুখ বুজে সয়ে গেছেন আমাদের মানুষ করার জন্য। এখন আমরা প্রতিষ্ঠিত হয়ে তাঁকে সুখী করার দিন। আমরা কী করে মুখ ফিরিয়ে নিই?

কিন্তু ৩: মানি, তোমার আলাদা থাকার অধিকার আছে। ‘কিন্তু’ মানুষ কী বলবে একবার চিন্তা করে দেখেছ? তাছাড়া এই বৃদ্ধ বয়সে উনারা যাবেনই বা কোথায়?

কিন্তু ৪: হ্যাঁ, উনি তোমাকে খোঁটা দিয়ে কথা বলেন। ‘কিন্তু’ উনি তোমাকে এটা ভালোবেসেই বলেন। উনার মন ভর্তি অনেক মায়া আর ভালোবাসা। দেখ না, সেদিন তরকারির একটা ভালো পিস তোমার জন্য তুলে রেখেছিলেন?

কিন্তু ৫: হতে পারে তাঁরা তোমাকে বিভিন্ন সময় কটু কথা বলেছেন। ‘কিন্তু’ তুমিও কি কম যাও? সেদিন তুমি কীভাবে উত্তর দিয়েছিলে? এটুকু সহ্য করতে পার না?

কিন্তু ৬: দেখ, উনারা যাই করুক, শেষ পর্যন্ত উনি আমার মা। উনাকে কষ্ট দিয়ে আমি জান্নাত পাব না। আমি উনার পাশেই থাকব। তুমি এভাবে মেনে নিতে না পারলে চলে যাও।

কিন্তু।

কিন্তু।

কিন্তু।

সমস্যা সমাধানের কয়েকটা ধাপ আছে। প্রথম ধাপ একনলেজমেন্ট: স্বীকার করা যে, সেখানে কোনো একটা সমস্যা আছে। নিউরোটিক মায়েদের অন্ধের যষ্ঠি ছেলেদের ডিনায়াল মেকানিজম খুব কড়া। কারণ বড় হতে হতে মায়েদের ইমোশনাল অনেক অন্যায় কাজ/আচরণ তারা দেখে দেখে কনফিউজড হয়ে এসেছেন। প্রথম প্রথম হয়তো আপত্তি জানিয়েছেন, তাতে করে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে, এরপর সেঁকো বিষ খাওয়ানো সাপের মতো তারা সুপার কন্ডিশন্ড হয়ে গেছেন। মায়ের দোষকে দোষ মনে করা খারাপ। অন্যায়। অমন ভাবলে বিপদ হবে।

White net bridge across forest

সে ছেলেগুলোর কিন্তু তেমন কোনো দোষ নেই। বড় হওয়ার সময় থেকেই তারা কনফিউজিং মেসেজ পেয়ে বড় হচ্ছেন। এই মা আমার অসুখ, খাবার নিয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছেন, রেজাল্ট খারাপ করলে রাগ হয়ে যাচ্ছেন, আবার এই মা-ই দিব্যি বাবাকে ভীষণ অসম্মান করে যাচ্ছেন, করেই যাচ্ছেন! কাজের লোকের গায়ে হাত তুলছেন। মা আমার কাছে শান্তি খুঁজছেন, আবার ওদিকে আমার জন্য কোনো স্পেসই রাখছেন না। ছোট ছেলের মতো এখনও খাইয়ে দিচ্ছেন, উঠতে বসতে সবকিছুতে তাগাদা দিচ্ছেন। উনার সামনে আমি কি বড় হব না ছোট হব এটাই বুঝে উঠতে পারছি না।

এসব অদ্ভুতুড়ে কিম্ভুত কনফিউজিং মেসেজ পেতে পেতে সে ছেলেগুলো মায়েদের পাপেট হয়ে যায়। মা তুমি যা বল, যখন যেভাবে বল, তাই ঠিক। তোমার ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করলেই আমার ইহকাল পরকাল সব সেট হয়ে যাবে।

এভাবে তাঁরা ভাবতেই পারেন। পারেনই।

কিন্তু!

কিন্তু, এটা মনে রাখলে ভালো হবে, নিউরোসিসের পেশেন্ট হ্যান্ডেল করার বেস্ট উপায় হচ্ছে তাকে নিউরোসিসের পেশেন্টের মতো করেই ট্রিট করা। ইমোশন কন্ট্রোলের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখা গেলে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া। এধরণের পেশেন্টকে পরিবারে কীভাবে ডিল করতে হয় তাই নিয়ে খোলামেলা কথা বলে পরিবারের সবাই একটা টিম হিসেবে কাজ করা। (একা একটা নতুন মেয়েকে পরিবারে ঢুকিয়ে দিলেই সব নরমাল হয়ে যাবে এমন ভাবাটা আরেকটা ছেলেমানুষি।) মায়ের ব্যাকগ্রাউন্ড/হিস্ট্রি এগুলো কম্প্যাশন, সিম্প্যাথি বাড়াতে সাহায্য করবে, তাতে করে ওষুধের পাশাপাশি কেয়ারে কিছুটা সাহায্য হতে পারে। সমস্যা একনলেজমেন্ট স্টেপে কম্প্যাশনের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই।

বৃদ্ধ বয়সে প্রত্যেক বাবা মায়েরই অধিকার আছে নিজের সন্তানের সেবা পাওয়ার। একসাথে না থেকে আলাদা থাকলে যদি শান্তিপূর্ণভাবে সেটা করা যায় তবে সেটা শেষ পর্যন্ত উইন-উইন ই হবে। এসব ক্ষেত্রে স্ত্রীকে বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার ধামকি না দিয়ে বিভিন্ন ধরণের নেগসিয়েশন করা যেতে পারে (আমি সপ্তাহে দুই রাত মায়ের সাথে থাকব, সপ্তাহে তিন দিন রান্না করে উনাদের পাঠাতে হবে, উনাদের অসুস্থতায় প্রয়োজন হলে তোমার সেবা চাইতে হতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি)।

নিউরোটিক মায়েদের ছেলেরা লো এনার্জির হন, কারণ এমন একজন মানুষের লাঠি হওয়া অনেক পরিশ্রমের ব্যাপার। তার সাথে প্রতিটা ইন্টার‌্যাকশন হয় খুব ক্যাল্কুলেটেড, অতএব সে ছেলে যে উদ্যোগ নিয়ে মায়ের সাথে একটা বাউন্ডারি তৈরি করবেন, এমন সম্ভাবনা কম। জিনিসটাকে আরও কমপ্লিকেটেড করার জন্য, স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠতা মাকে কষ্ট দিবে, এই ভয় থেকে তাঁরা স্ত্রীর সাথে দূরত্বও রাখার চেষ্টা করেন। সুতরাং সম্পর্কের প্রথম থেকেই সে ছেলের জন্য এমন কোনো ড্রাইভিং ফোর্স থাকে না যে, মায়ের সাথে একটা দূরত্ব রেখে এডাল্ট বাউন্ডারি তৈরি করবেন। স্বামীর এই উদাসীনতার কোনো আকাশপাতাল কারণ খুঁজে না পেয়ে স্ত্রী নিজেকেই দোষ দিতে শুরু করবে।

এডাল্ট বাউন্ডারি তৈরি করার সময় মা কষ্ট পেতে পারেন সাময়িক, কিন্তু এটা মনে রাখলে ভালো হবে, নিউরোটিক মায়ের হাতে আপনার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ তুলে দেয়াটা বোকামি। এখানে উনি লোয়ার হ্যান্ড, আপনি আপার হ্যান্ড। আপনি গার্ডিয়ান, উনি কম্প্রোমাইজড। সুতরাং যত সহজে সম্ভব হয়, এডাল্ট স্পেস তৈরি করুন। সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে নীরব শীতলতা। ধরা যাক, আপনার স্ত্রীর প্রতি একটু মনোযোগ দেয়াতে তিনি জ্বলে উঠলেন, আজেবাজে কথা বলতে শুরু করলেন, ঠিক একবার উত্তর দেবেন ভদ্রভাবে তারপর উইথড্র করবেন। কিছুক্ষণ পর যখন মান ভাঙাতে বাড়তি যত্ন শুরু করবেন, স্মিত হেসে বলবেন দাঁড়াও মা ওর একটু খোঁজ নিয়ে আসি, আসছি তুমি বস। এক মিনিটের জন্য ভেতরে যাবেন, তারপর মায়ের সাথে সময় দিবেন। এই ধরণের সাইলেন্ট পাওয়ার প্লেগুলি কিছুদিন ডেমন্সট্রেট করলেই মা যা বোঝার বুঝে নেবেন।

***

আমার ছেলে হওয়ার পর মেয়েদের তরফ থেকে কথা বলার আগে একবার হলেও ছেলের মুখটা মনে পড়ে। ভাবি, ও আমার একপেশে ভাবনার শিকার হবে না তো? পৃথিবীটা মেয়েদের জন্য কঠিন বলার সময় ভুলে যাচ্ছি না তো, পৃথিবীটা অনেক ছেলের জন্য আরও কঠিন?

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখিকার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে

আরও পড়ুন:

Advertisements

One thought on “নিউরোটিক মা + পাপেট ছেলে = ছেলের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি

  1. পিংব্যাকঃ সন্তানের খাতিরে হলেও আপনার পরিবারের গুমোট পরিবেশ দূর করার উদ্যোগ নিন | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s