সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা (১): লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, লেগে থাকুন

birds-cloud

আমরা সবাই আমাদের জীবনে ভালো কিছু করতে চাই, সফলতা অর্জন করতে চাই। কম-বেশী সবাই কখনো না কখনো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি – কী করলে জীবনে সফলতা আসবে? একেকজন একেকভাবে উত্তর খুঁজতে থাকি – কেউ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দিকে তাকাই, কেউ আশেপাশের সফল মানুষকে অনুকরণের চেষ্টা করি, কেউ বিভিন্ন লেখকের বই পড়ে সফলতার চাবিকাঠি খুঁজি। আমরা ভুলে যাই – এই পৃথিবীতে যত মানুষ এসেছেন তাদের মধ্যে সবচাইতে সফল মানুষ হলেন প্রিয় নবী মুহাম্মাদ(সা)। ভেবে দেখুন তো – তাঁর সফলতার গাইড বুক কোন্‌টা ছিল? উত্তর আপনার জানা – তাঁর জীবনের গাইডবুক ছিল কোরআন। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর অসীম করুণার অংশ হিসাবে আমাদেরকে কোরআন দান করেছেন যাতে আমরা দিশেহারা জীবনের দিকনির্দেশনা খুঁজে পাই। সুতরাং, অন্য যেকোনো উৎসের দিকে তাকানোর আগে, মুসলিম হিসাবে আমাদের দায়িত্ব হলো সর্বপ্রথম কোরআন থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা।

সূরা ইউসুফ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মোটিভেশনাল স্পীচ – যার বক্তা স্বয়ং সর্বশক্তিমান আল্লাহ। এই সূরাটি এমন একটা সময়ে নাজিল হয়েছিল যখন রাসূলুল্লাহ(সা) মানসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিলেন। প্রায় দশ বছর মক্কায় ইসলাম প্রচারের পরেও হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন কুরাইশী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। অপমান আর লাঞ্ছনার পরিমাণ দিনকে দিন বেড়েই চলেছিলো। এই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ(সা)-এর উপর তিনটি বড় বড় বিপদ নেমে আসে। এক – প্রভাবশালী কুরাইশ নেতা, চাচা আবু তালিবের মৃত্যু তাঁকে রাজনৈতিকভাবে অসহায় করে তোলে; দুই – প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা(রা)-এর মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে; তিন – তায়েফে ইসলাম প্রচার করতে যেয়ে তাঁর উপর চরম মানসিক ও শারীরিক লাঞ্ছনা নেমে আসে, যা ছিল নবীজী(সা)-এর জীবনের সর্বনিকৃষ্ট দিন। রাসূলুল্লাহ(সা)-এর এই দুর্দশার সময়ে তাঁকে অনুপ্রেরণা দিতে আল্লাহ সূরা ইউসুফ নাজিল করলেন। সূরা ইউসুফ রাসূলুল্লাহ(সা)-কে এতটাই উজ্জীবিত করেছিল যে, এই সূরা নাজিলের প্রায় দশ বছর পর মক্কা বিজয়ের দিনেও রাসূলুল্লাহ(সা) এই সূরা থেকে আয়াত উদ্ধৃত করেছিলেন।

সূরা ইউসুফ নবী ইউসুফ(আ)-এর অসাধারণ জীবনের কাহিনীই শুধু নয়, অসংখ্য শিক্ষনীয় বিষয় আছে এই সূরাতে। চার পর্বের এই ধারাবাহিক লেখায় আমি সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া অসংখ্য লাইফ লেসনের মধ্য থেকে মাত্র ১২টা  লাইফ লেসন শেয়ার করবো। আপনি ইসলাম প্র্যাকটিস করুন, আর না-ই করুন, আশা করি এই ধারাবাহিকের প্রতিটি লেখা আপনার কাজে আসবে।

শিক্ষা ১: অসাধারণ লক্ষ্য স্থির করুন (Set extraordinary goals)

সাধারণ নয়, অসাধারণ লক্ষ্য স্থির করতে হবে। অসাধারণ লক্ষ্য কাকে বলে? অসাধারণ লক্ষ্য হলো এমন একটি ভালো লক্ষ্য যা আমাদেরকে আমাদের সাধ্যের শেষ সীমায় নিয়ে যাবে, নিজের সীমাবদ্ধতাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করবে। প্রতিটা মানুষের অসাধারণ লক্ষ্য নির্ভর করে তার বর্তমান অবস্থার উপর। যেমন, আপনি যদি বেনামাজী হন তাহলে আপনার জন্য অসাধারণ লক্ষ্য হতে পারে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া। আবার, আপনি যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী হন তাহলে আপনার জন্য অসাধারণ লক্ষ্য হতে পারে নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা। একটি অসাধারণ লক্ষ্য অর্জন করার পর সেটা সাধারণ হয়ে যায়, এরপর নতুন অসাধারণ লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়।

অসাধারণ লক্ষ্য কেন স্থির করতে হবে? কারণ, একমাত্র অসাধারণই আমাদের মধ্যে প্যাশন সৃষ্টি করে। অসাধারণের বৈশিষ্ট্যই হলো মানুষকে অনুপ্রাণিত করা। আমাদের প্রিয় লেখক অসাধারণ লেখকেরা। আমাদের প্রিয় খেলোয়াড় অসাধারণ খেলোয়াড়েরা। আমাদের প্রিয় বেড়ানোর জায়গা অসাধারণ সুন্দর জায়গাগুলো।

সূরা ইউসুফের প্রথমেই আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন অসাধারণ এক কাহিনী পড়তে যাচ্ছো তুমি। শেক্সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ, হুমায়ূন আহমেদ – সবার গল্পগুলোই এই কাহিনীর কাছে নগণ্য। কারন, আমি যে কাহিনী বলতে যাচ্ছি তা সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনী।

12:3

“আমি তোমার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনী বর্ণনা করছি …” (১২:৩ আয়াতাংশ)

শুধুমাত্র জীবনের বড় বড় লক্ষ্যের ক্ষেত্রেই নয়, যখন যে ভালো কাজটিই আমরা করবো, আমরা সে কাজের জন্য সর্বোচ্চ লক্ষ্য স্থির করবো। যখন কথা বলব সবচেয়ে সুন্দর ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করব। যখন চিন্তা করব গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করব। এমনকি যখন একটা ইমেইল লিখব – চেষ্টা করব অসাধারন সুন্দর ভাষায় তা লিখতে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ কিছু করার জন্য।

যদি আমরা নিজের দিকে লক্ষ্য করে কখনো দেখি কোনো ভাল কাজে আমরা মিডিয়াম বা গুড লেভেলের লক্ষ্য স্থির করেছি, বুঝে নিতে হবে আমরা শয়তানের ফাঁদে পড়ে গেছি! কারণ, আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন সবচাইতে ভালো (best) কাজগুলো করার জন্য, আর শয়তান চায় আমরা যেন সেই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হই । আজ থেকেই আসুন শুরু করি শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই। প্রতি দশ মিনিট পরপর নিজেকে প্রশ্ন করি – আমি এখন যে কাজটি করছি তা কি আমি অসাধারণ সুন্দরভাবে করছি?

শিক্ষা ২: আপনার লক্ষ্যকে মনশ্চক্ষুতে কল্পনা করুন (Visualise your goals)

মনের চোখ দিয়ে আপনার লক্ষ্যকে এমনভাবে দেখার চেষ্টা করুন যেন আপনি ইতিমধ্যে তা অর্জন করে ফেলেছেন। আপনি আপনার লক্ষ্যকে যত স্পষ্ট ভিজুয়ালাইজ করতে পারবেন, তত বেশী আগ্রহ অনুভব করবেন লক্ষ্য অর্জনে কাজ করার জন্য। ভেবে দেখুন লক্ষ্যটি অর্জনের পর আপনার মধ্যে কেমন আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে, কতটা গর্বিত বোধ করছেন আপনি, নিজের জীবনটাকে কেমন ধন্য মনে হচ্ছে! শুধু বড় বড় লক্ষ্যের ক্ষেত্রেই নয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন ছোট কাজ যেমন ক্লাসের সবার সামনে প্রেজেন্টেশন দেয়ার আগে, বা বসের সাথে জরুরী কোনো কথা বলার আগে ভিজুয়ালাইজ করে নিন আপনি কী বলতে চান, কীভাবে বলতে চান – এটা আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করবে।

ইউসুফ(আ)-এর বাল্যকালেই আল্লাহ তাঁকে স্বপ্নের মাধ্যমে দেখিয়ে দিলেন তাঁর ভবিষ্যত। জানিয়ে দিলেন, তাঁর অবস্থান হবে তাঁর বাবা নবী ইয়াকুব(আ), তাঁর মা এবং তাঁর বাকী ১১ ভাইয়ের চেয়ে উপরে। এই স্বপ্ন নি:সন্দেহে সারাজীবন ইউসুফ(আ)-কে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

12:4

“ইউসুফ তার পিতাকে বললো: হে আমার বাবা! আমি (স্বপ্নে) এগারটি নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্র দেখলাম; দেখলাম ওরা আমাকে সিজদা* করছে।” (১২:৪)

*এই সিজদা ছিল সম্মান প্রদর্শনের সিজদা, ইবাদতের সিজদা নয়। আগের নবীদের শরীআয় সম্মানের জন্য সিজদা করা বৈধ ছিল।

আপনার লক্ষ্য যদি হয় এখন থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো পড়া, তাহলে ভিজুয়ালাইজ করুন কেয়ামতের দিনের কথা যখন আপনাকে কবর থেকে উঠানো হবে। সূর্য ঠিক মাথার উপরে, চারিদিকে কোটি কোটি মানুষের হুড়াহুড়ি-কান্নাকাটি। এখুনি আপনার বিচার শুরু হবে, ভেবে দেখুন তখন আপনার কেমন লাগবে যখন আপনি আল্লাহর সামনে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের আমলনামা নিয়ে দাড়াবেন!

শিক্ষা ৩: দৃঢ় তাওয়াক্কুল রাখুন (Have extraordinary faith)

তাওয়াক্কুল শব্দের অর্থ হলো ‘এটা হবেই’ — এই বিশ্বাস নিয়ে সেই অনুযায়ী কাজ করা। যেমন, আপনি বিশ্বাস রাখেন যে আজ রাতে আপনি মারা যাবেন না এবং আগামীকাল অফিসে যেতে পারবেন। কিন্তু আপনি কি শুধু এই বিশ্বাস নিয়ে বসে আছেন? না, আপনার এই বিশ্বাস এতই দৃঢ় যে আপনি রাতে এলার্ম দিয়ে বিছানায় যান যাতে কাল সকালে সময়মতো ঘুম থেকে উঠতে পারেন – এটাই তাওয়াক্কুল। আমরা যদি আমাদের লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে চাই তাহলে আমাদেরকে তাওয়াক্কুল রাখতে হবে। নিজের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে এই ভেবে যে, যদি আল্লাহ চান তো আমি এটা পারবোই পারবো।

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী তাওয়াক্কুলের অন্যতম উপাদান হলো দু’আ করা। কারণ, ঈমানদার বিশ্বাস করে যে আমি যতই দৃঢ় বিশ্বাস রাখি আর পরিশ্রম করি না কেন, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আমার লক্ষ্য অর্জিত হবে না। বড় থেকে ছোট প্রত্যেক কাজে আমাদের পূর্ন বিশ্বাস নিয়ে চেষ্টা করার সাথে সাথে আল্লাহর কাছে প্রাণ ভরে দু’আ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ(সা) আমাদের বলেছেন, এমনকি জুতার ফিতা ছিড়ে গেলেও যেন আমরা আল্লাহর কাছে দু’আ করি।

আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের অনন্য নজির স্থাপন করেছেন ইউসুফ(আ)-এর বাবা ইয়াকুব(আ)। ইউসুফেরা ছিলেন মোট ১২ ভাই, তার মধ্যে প্রথম ১০ ভাই ছিলেন এক মায়ের সন্তান, আর ছোট দুই ভাই (ইউসুফ ও বিনইয়ামিন) ছিলেন আরেক মায়ের সন্তান। বড় ১০ ভাইয়েরা ছোট ২ ভাইকে প্রচন্ড হিংসা করতো। ইয়াকুব(আ) ভালমতোই জানতেন যে, তার বড় ভাইয়েরা যেকোনো সুযোগ পেলেই ইউসুফের কোনো ক্ষতি করে ফেলবে। তাই তারা যখন ইয়াকুবের(আ) কাছে যেয়ে বললো তারা ইউসুফকে নিয়ে ‘খেলতে’ যাবে, বৃদ্ধ ইয়াকুব(আ) সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন ইউসুফকে তাদের সাথে না দিতে।

12:13

সে (ইয়াকুব) বলল, ‘তোমরা তাকে নিয়ে গেলে আমার কষ্ট হবে, আর আমার ভয় হয় তোমরা তার ওপর নজর না দিলে তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে’। (১২:১৩)

বড় দশ ভাই তারপরেও অনবরত অনুরোধ করতে থাকলে অগত্যা ইয়াকুব(আ) রাজি হলেন ইউসুফকে তাদের সাথে যেতে দিতে। হিংসার আগুনে জ্বলে তারা ইউসুফকে খেলার নাম করে জংগলে নিয়ে এক পরিত্যক্ত কূপে ফেলে দিল, আর এসে ইয়াকুবকে(আ) বলল যে ছোট্ট ইউসুফকে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে। ইউসুফের রক্তমাখা কাপড় দেখে ইয়াকুবের(আ) বুক কষ্টে ফেটে গিয়েছিলো ঠিকই, তবু তিনি কিন্তু হা-হুতাশ করেননি, চিল্লাপাল্লা করে বাসা মাথায় তোলেননি। বরং, তিনি আল্লাহর উপর পূর্ন আস্থা রাখলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ইউসুফ একদিন নবী হবেই এবং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবেই। ইয়াকুব(আ) জানেন, আল্লাহ কখনো এমন কিছু করেন না যাতে বান্দার অমঙ্গল হয়। সাময়িক কষ্টগুলোতে ধৈর্য্যের পরীক্ষায় পাশ করলেই আল্লাহ বান্দাকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি দেন।

12:18

আর তারা জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে এনেছিলো। সে (ইয়াকুব) বলল, বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী গড়ে নিয়েছে। সুতরাং আমার পক্ষে পূর্ণ ধৈর্য্যই শ্রেয়। তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল। (১২:১৮)

আমরা প্রত্যেকটা মানুষই আমাদের নিজেদের জন্য একটা সীমাবদ্ধতার দেয়াল তৈরী করে রাখি, তারপর আমরা শুধু ওই দেয়াল ঘেরা জগতের ভেতরেই ঘুরাফেরা করতে পছন্দ করি। মানুষের নিজের তৈরী সীমাবদ্ধতার এই জগতকে বলে ‘কমফোর্ট জোন’। মহান আল্লাহ অনেক সময় আমাদেরকে আমাদের কমফোর্ট জোনের বাইরে ঠেলে দেন, যেন আমরা সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভেঙ্গে নিজের উন্নতি করতে পারি। ইয়াকুব(আ)-এর জীবনে সবচেয়ে প্রিয়পাত্র ছিলেন তাঁর পুত্র ইউসুফ(আ)।  কিন্তু, আল্লাহ চাচ্ছিলেন ইয়াকুব(আ) যেন ধৈর্যশীলদের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদা অর্জন করেন, তাই তিনি প্রাণপ্রিয় পুত্র ইউসুফকে তাঁর থেকে আলাদা করে দিলেন। ইয়াকুব যত বেশী ধৈর্য ধরবেন, ততই তাঁর মর্যাদা বাড়তে থাকবে। একইভাবে মহান আল্লাহ অনেক সময় আমাদেরকেও আমাদের কমফোর্ট জোনের বাইরে ঠেলে দেন যাতে আমরা আমাদের মর্যাদা উন্নত করতে পারি। হঠাৎ করে চলে যাওয়া চাকরি আমাদের নতুন স্কিল শিখতে বাধ্য করে, অসুখগুলো আমাদেরকে বাধ্য করে দু’আ করতে, প্রিয়জনের মৃত্যু আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদেরও একদিন মরে যেতে হবে।

আমরা যদি অসাধারণ লক্ষ্য অর্জন করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে আমাদের কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা যদি এমন কিছু পেতে চাই যা কখনো পাইনি, তাহলে আমাদের এমন কিছু করতে হবে যা কখনো করিনি। এমনভাবে পরিশ্রম করতে হবে যেভাবে আগে কখনো করিনি। এমনভাবে নামাজে মনোযোগ দিতে হবে যেভাবে আগে কখনো দেইনি। ফজরের নামাজের জন্য ঘুম থেকে ওঠা যতই দু:সাধ্য মনে হোক কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে সেই অসাধ্য সাধনের পেছনেই ছুটতে হবে।

শিক্ষা ৪: সঠিক বিষয়ে ফোকাস করুন (Focus on the right thing)

আপনি আপনার অফিসের টেবিলে কাজ করতে বসেছেন। এই মুহূর্তে আপনি কী নিয়ে চিন্তা করবেন তা সম্পূর্নই আপনার ব্যাপার। আপনি চাইলেই চিন্তা করতে পারেন – গতকাল রাতে ঘুমটা ভালো হয়নি, শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে, সকালে আরেকটু ঘুমাতে পারলে ভালো হতো, ধুর এখন আবার ওই বোরিং ফাইলটা নিয়ে বসতে হবে, এই ফালতু কাজগুলি করে আমার লাভ কী? অন্যদিকে আপনি চাইলেই চিন্তা করতে পারেন – ওয়াও! আজকে আমি ওই প্রবলেমটা নিয়ে চিন্তা করবো? এখানে তো আমার এমন কিছু করার সুযোগ আছে যা আর কেউ কোনোদিন করেনি। আমি যদি আমার সময় নষ্ট না করে প্রোডাক্টিভ কিছুতে কাজে লাগাই আল্লাহ আমার উপর কতই না খুশী হবেন! আমার কাজ যদি মানুষের জীবনে ভালো কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে তাহলে আল্লাহ অবশ্যই আমাকে অনেক পুরষ্কার দিবেন! লক্ষ্য করে দেখুন, প্রথম ধারার চিন্তাগুলি আপনার মধ্যে কেমন ম্যাড়ম্যাড়ে ভাব তৈরী করেছিলো, আর দ্বিতীয় ধারার এই চিন্তাগুলো আপনার মধ্যে কেমন প্যাশন তৈরী করছে! যেকোনো পরিস্থিতিতেই আমরা কী অর্জন করবো, ভালো না খারাপ বোধ করবো – তা নির্ভর করে আমরা কিসের উপর ফোকাস করছি তার উপর।

ভালো ফোকাস করতে হলে ভালো প্রশ্ন করতে হয়। হায় আল্লাহ আমার সাথে কেন এমন হয়, আমার এখন কী হবে, এরকম হওয়ার দরকার কি ছিলো – জাতীয় প্রশ্ন না করে এমন প্রশ্ন করুন যেটার উত্তর পেলে আপনার পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। প্রশ্ন করুন – এই পরিস্থিতিতে আমি সবচেয়ে ভালো কী করতে পারি? কীভাবে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারি?

যেসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের কোনো কাজে আসবে না সেসব প্রশ্ন করতে ইসলাম নিরুৎসাহিত করে। পক্ষান্তরে, যেসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের মঙ্গল করবে সেসব প্রশ্ন করতে ইসলাম আমাদের উৎসাহ দেয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, ‘আমার গভীর জ্ঞানের উৎস হচ্ছে আমি কখনো প্রশ্ন করতে লজ্জা বোধ করি না’। সূরা ইউসুফের প্রথম দিকে মহান আল্লাহ ভালো প্রশ্নকারীদের প্রশংসা করেছেন, কারণ শুধু এরাই সৎপথপ্রাপ্ত হয়।

12:7

ইউসুফ ও তার ভাইদের কাহিনীতে নিশ্চয়ই প্রশ্নকারীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। (১২:৭)

লাইফ স্কিল কোচেরা বলেন যে, ফোকাস করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সময় হলো কাজ শুরুর প্রথম এক ঘণ্টা। যদি প্রথম একঘণ্টায় ফেইসবুক, ই-মেইল, ইউটিউব বা অন্য কোনো ধরণের ডিস্ট্র্যাকশন থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেন, তাহলে বাকী সময় ফোকাস করা অনেক সহজ হয়। রাসূলুল্লাহ(সা)ও গুরুত্ব দিয়েছেন ভোরে উঠে কাজের জন্য বেরিয়ে যাওয়ার প্রতি।দিনের শুরু থেকেই ফোকাস করুন এবং Extraordinary effort দিন।

চরম বিরূপ পরিবেশেও নিজের লক্ষ্যের দিকে কীভাবে ফোকাস করতে হয় তার শিক্ষা আমরা পাই নবী ইউসুফ(আ)-এর কাছ থেকে।  কূপ থেকে পানি তুলতে গিয়ে  ছোট্ট ইউসুফ(আ)-কে খুঁজে পেল একদল যাযাবর। কানআন (বর্তমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন) এলাকার ছেলে ইউসুফকে তারা নিয়ে বিক্রি করে দিল মিশরের বাজারে। ইউসুফকে কিনে নিল মিশরের অন্যতম প্রভাবশালী এক মন্ত্রী (আযীয)। মন্ত্রীর কোনো সন্তান ছিল না, আর ইউসুফ ছিলেন অকল্পনীয় রকম সুন্দর এক ছেলে। মন্ত্রী তার স্ত্রীকে বললো ইউসুফকে নিজের ছেলের মতোই বড় করতে। এভাবে করে ১০-১৫ বছর কেটে গেল, ইউসুফ হয়ে উঠলেন পৃথিবীর সর্বকালের সবচাইতে হ্যান্ডসাম যুবক।

মন্ত্রী কাজের চাপে সারাদিন বাইরে বাইরে থাকে, মন্ত্রীর স্ত্রীর খুব একা একা লাগে। দিনে দিনে মন্ত্রীর স্ত্রী চরম আকর্ষণ বোধ করা শুরু করলো ইউসুফের প্রতি। খালি বাসা পেয়ে মন্ত্রীর স্ত্রী ইউসুফকে সিডিউস করা শুরু করলো।  দিনের পর দিন ইউসুফকে কাবু করার নিত্যনতুন অপচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলো সে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে কয়জন পুরুষ পারতো তার চিন্তা-চেতনা মন্ত্রীর স্ত্রীর দিকে না দিয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে দিতে? ইউসুফ(আ) তাই করেছিলেন। মন্ত্রীর স্ত্রী দরজা বন্ধ করে তাঁর সাথে চাপাচাপি করলে তিনি দৌড়ে পালিয়ে আসেন। এলাকার তাবত সুন্দরীরা একাট্টা হয়ে ইউসুফকে দেখতে এসে সবাই যখন তাঁর রূপে পাগল হয়ে যায় তখনও ইউসুফ ফোকাস হারাননি। নিজের সহজাত চাহিদা, এক ঝাঁক সুন্দরীর অনুরোধ, মন্ত্রীর স্ত্রীর আদর-আপ্যায়ন – এর কোনো কিছুতেই ইউসুফ লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন না। ইউসুফের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আর তাই তিনি একাগ্রতার সাথে আল্লাহর কাছে দু’আ করলেন:

12:33

ইউসুফ বললো, হে আমার রব! এই মহিলারা আমাকে যার প্রতি আহবান করছে তা অপেক্ষা কারাগার আমার অধিক প্রিয়। তুমি যদি তাদের ছলনা হতে আমাকে রক্ষা না করো, তাহলে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বো এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হবো। (১২:৩৩)

রেফারেন্স:

1. Pearls from Sura Yusuf – Dr. Yasir Qadhi

2. Leadership Lessons from the Life of Rasoolullah (SAW) – Mirza Yawar Baig

3. তাফসীর ইবনে কাছির

4. আহসানুল বায়ান

5. Anger Management – Dr. Yasir Qadhi

6. Notes from a Friend  – Anthony Robbins

7. The Strangest Secret – Earl Nightingale

8. Focal Point – Brian Tracy

মূল লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখকের ব্যক্তিগত ব্লগে

আরও পড়ুন:

Advertisements

6 thoughts on “সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা (১): লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, লেগে থাকুন

  1. I think, this website should have link to share the article in Facebook.

    1. “আমার স্পন্দন”-এর প্রতিটি লেখার একেবারে শেষে ফেসবুকে শেয়ার করার অপশন আছে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close