সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের ইসলাম নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করার সম্ভাব্য বিপদ

inside-library

২০১৫ সালের নভেম্বর মাসের শেষের দিকের কথা। একজন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট হিসেবে তখন আমি থাকতাম মালয়েশিয়াতে। আমাদের ইন্সটিটিউটেরই একজন বাংলাদেশী পি.এইচ.ডি. গবেষক আমাকে ফোন দিলেন। বাংলাদেশ থেকে আসা অনেক সিনিয়র একজন প্রফেসর অল্প কয়েকদিনের জন্য তাঁর বাসায় উঠেছেন। আমাকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বললেন। 

বিকেলের দিকে আমি প্রফেসর সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে সেই বাসায় গেলাম। কফিতে চুমুক দিতে দিতে অনেক কথা হলো। আমার পড়াশোনার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি খোঁজখবর নিলেন। টুকটাক কিছু পরামর্শ দিলেন। দেশ নিয়ে কথা হলো। বিভিন্ন দেশের অ্যাকাডেমিয়ার ভালোমন্দ নিয়ে আলাপ হলো। ইসলাম প্রসঙ্গেও বেশ সময় নিয়ে অনেক কথা হলো।

একটা কথা তিনি সবসময় বলে থাকেন – “যা কিছু ভালো তা-ই ইসলাম”। বিবেক ও যুক্তি যেটিকে ভালো বলে সেটিই ভালো, আর যেটিকে মন্দ বলে সেটিই মন্দ। যা কিছু কল্যাণকর তা আমরা করার চেষ্টা করব। যা কিছু অকল্যাণকর তা আমরা বর্জন করব। সেদিনও তিনি আমাদেরকে তা বোঝাতে চেষ্টা করলেন।

কিন্তু, আমার মানদন্ডে যেটি ভালো বা মন্দ কুরআন ও সুন্নাহর মানদন্ডেও যে সেটি ভালো বা মন্দ হবে এমন কোনো কথা নেই। ফলে, আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করতে হলো – একজন মুসলিম হিসেবে আমি পরিমিত মাত্রায় মদ পান করতে পারি কি? বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে আমরা জানি যে, পরিমিত মাত্রায় মদ পান করা হৃদযন্ত্রের জন্য ভালো। যেহেতু পরিমিত মাত্রায় মদ পান করার মধ্যে কিছু কল্যাণ আছে তাই যুক্তির দাবী হলো অল্প কয়েক পেগ মদ গেলা যেতেই পারে।

একটু মদ গিললে আরও একটু গেলার লোভ তুমি সামলাতে পারবে কি? তিনি জানতে চাইলেন। আমি লিমিটের মধ্যেই থাকতে পারব – আমার জবাব। এখন বলুন, এই পরিস্থিতিতে আমি সীমিত পরিমাণ মদ খেতে পারব কি? তিনি বললেন, একজন মুসলিম প্রকাশ্যে মদ খেলে সমাজে ভুল বার্তা যেতে পারে। অতএব, প্রকাশ্যে মদ খাওয়াটা তার জন্য ঠিক হবে না। তবে, পরিমিত মাত্রায় মদ খেলে তোমার কাজে যদি বাড়তি সুবিধা হয় তাহলে ব্যক্তিগত পরিসরে তুমি তো তা খেতেই পার।

কুরআনের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক কথা। তিনি অনেক বয়স্ক মানুষ। বয়স-জনিত স্পর্শকাতরতা এবং তাঁর সম্মান বিবেচনায় নিয়ে আমি বা তাঁর হোস্ট কেউই আর কথা বাড়ালাম না। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের অধিকারী বয়স্ক কোনো মানুষকে তার নিজস্ব মত থেকে টলানো অনেক কঠিন একটি কাজ।

সেই সন্ধ্যাতেই ইসলামের মৌলিক ধর্মীয় বিশ্বাস সংক্রান্ত আরেকটি পয়েন্টে তিনি এমন একটি মত ব্যক্ত করলেন যেটি ইসলামের মূলধারার ধর্মীয় বিশ্বাসের বিপরীত। আছারি, আশআরি বা মাতুরিদি — যে ঘরানার বিশেষজ্ঞকেই জিজ্ঞেস করা হোক না কেন, সবাই এক বাক্যে বলবেন যে তাঁর ব্যক্ত করা সেই মতটি কুরআন ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে সঞ্চারিত হাদিস এবং মুসলিম ইতিহাসের প্রসিদ্ধ সব আলেমের মতের সাথে সাংঘর্ষিক।

তাঁর সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে যা বুঝলাম তা হলো কুরআন, সুন্নাহ, আকিদা, ফিকাহশাস্ত্র – এসব বিষয়ে মৌলিক পর্যায়ের জ্ঞানও তাঁর নেই। দীর্ঘ আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তা তিনি স্বীকারও করে নিয়েছেন।

মুশকিল হলো, তিনি সাধারণ কোনো মানুষ নন। আমার জন্মেরও আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তিনি পি.এইচ.ডি. করেছেন। পাশ্চাত্যের উন্নত অর্থনীতির কোনো দেশে নাগরিকত্ব নিয়ে তিনি সহজেই সেখানে থেকে যেতে পারতেন। কিন্তু, সেসব হাতছানি পায়ে ঠেলে ‘জ্ঞানের ইসলামীকরণ’ (Islamisation of knowledge)-কে তাঁর জীবনের মিশন হিসেবে তিনি বেঁছে নিয়েছেন। আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এজন্য তিনি দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন। ‘জ্ঞানের ইসলামীকরণ’ বলতে যা বোঝায় তাতে তাঁর অবদান আছে। এই বিষয়ে তিনি পাঠ্যসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেছেন, বই লিখেছেন, অ্যাকাডেমিক জার্নালে আর্টিকেল প্রকাশ করেছেন এবং বিভিন্ন সেমিনার ও কনফারেন্সে পেপার প্রেজেন্ট করেছেন।

ইসলামকে তিনি অন্তর দিয়ে ভালোবাসেন। তাঁর সীমিত সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব তা দিয়েই ইসলামের জন্য কিছু হলেও করার চেষ্টা তিনি করেছেন। অ্যাকাডেমিক কাজের বাইরে সমাজসেবামূলক ভালো কিছু উদ্যোগও তাঁর আছে। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে নিজ জেলা শহরে কিছু প্রতিষ্ঠান তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই যে তিনি জীবনভর এত কিছু করেছেন তাতে বাহ্যত আমার কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু, ইসলামের একেবারে মৌলিক কিছু বিষয় নিয়েই যার জ্ঞান এত ভাসাভাসা তিনি ‘জ্ঞানের ইসলামীকরণ’ বিষয়ে সারা জীবন ধরে যা লিখেছেন ও বিভিন্ন ফোরামে মানুষকে যেসব ধারণা দিয়েছেন তার কতটুকু আসলেই ইসলাম আর কতটুকু ইসলাম থেকে বিচ্যুতি তা পর্যালোচনার দাবী রাখে।

‘জ্ঞানের ইসলামীকরণ’ নিয়ে সেক্যুলার অ্যাকাডেমিয়াতে যারা কাজ করছেন – বিশেষত অনারব গবেষকেরা – তাঁদের সবার ইসলামী জ্ঞানের অবস্থা যে এমন তা বলা একেবারেই উচিৎ হবে না। তবে, টুকটাক কিছু সমস্যা যে আছে তা আমি বুঝেছি কয়েকটি অ্যাকাডেমিক কনফারেন্সে অংশ নিয়ে।

উদাহরণস্বরূপ, একবার ‘ইসলামীকরণ’ বিষয়ক একটা আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক কনফারেন্সে গিয়ে দেখলাম যে, সেখানকার কিনোট স্পিকার হচ্ছেন বাংলাদেশী বংশদ্ভুত কানাডার নাগরিক একজন প্রফেসর। এক ঘন্টা ধরে তিনি তাঁর কিনোট স্পিচ দিলেন। অর্থনীতির এমন কঠিন সব বিষয় নিয়ে তিনি কথা বললেন যে তাঁর বেশিরভাগ কথাই আমার মাথার উপর দিয়ে গেল। সামনের সারিতে বসা প্রফেসরেরা অবশ্য বেশ মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনছিলেন। পুরো কনফারেন্সে তিনিই ছিলেন মধ্যমণি। অর্থনীতি শাস্ত্রে তাঁর জ্ঞান ও পান্ডিত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। তবে, আল-গাযযালি ও আশ-শাতিবী থেকে মাকাসিদ আশ-শারি’আহ সংক্রান্ত কিছু উদ্ধৃতি দেওয়া ছাড়া মুসলিম চিন্তাবিদদের তেমন কোনো উল্লেখ ওই বক্তৃতার মধ্যে ছিল বলে আমার মনে পড়ছে না। সেদিনকার আলোচিত বিষয়টির সম্পর্কে ইসলামের মূল প্রস্তাবনা কী এবং কেন তা অর্থনীতির প্রচলিত মতবাদ ও চর্চা থেকে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিকভাবে স্বতন্ত্র তা-ও পরিস্কার হলো না।

***

এতক্ষণ ধরে যাদের উদাহরণ আমি দিলাম তাঁদের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো বিরাগ নেই। ইসলামকে ভালোবাসেন বলেই তাঁরা ‘জ্ঞানের ইসলামীকরণ’ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এজন্য আল্লাহ তাঁদেরকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। কিন্তু, এখান থেকে – এবং এর বাইরে আরও কিছু উদাহরণ দেখে – সেক্যুলার অ্যাকাডেমিয়াতে ‘ইসলামীকরণ’ এবং ‘ইসলামী গবেষণার’ নামে যা হচ্ছে তার প্রতি আস্থার একটি সঙ্কট আমার মধ্যে তৈরি হয়েছে।

এসব বিষয় নিয়ে গবেষণামূলক ও কন্সেপচুয়াল কাজ করতে হলে কুরআন, হাদিস এবং ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাস্ত্র সম্পর্কে যে গভীর জ্ঞানের প্রয়োজন হয় তা অর্জন না করেই অর্থনীতি, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া বিভিন্ন দেশের অনারব ব্যক্তিরা গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক লেখালেখির ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। ড্রাইভিং না শিখে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করলে দুর্ঘটনা যেমন অনিবার্য, তেমনি এভাবে অপ্রস্তুত অবস্থায় ইসলাম নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করতে গেলে এখানে-ওখানে বড় ধরণের ভুল হবেই। ভালো আলেমদের সাহচর্যে না থাকলে এই ভুলগুলো সনাক্ত করা সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত এসব গবেষকদের পক্ষে এক প্রকার অসম্ভব।

***

মূলধারার অ্যাকাডেমিয়ার কর্তৃত্ব এখন ডারউইনবাদী সেক্যুলারদের হাতে। দর্শন বা বিজ্ঞান – কোনো ক্ষেত্রেই ধর্মের গুরুত্ব সেখানে নেই। ধর্ম নিয়ে যে গবেষণাগুলো সেখানে হয় সেগুলো বিশ্বাসীর দৃষ্টিকোণ থেকে করা হয় না। অন্যান্য শত শত বইয়ের মতো বাইবেল বা কুরআন সেখানে গবেষণার উপাদান মাত্র। বিশ্বাসের কোনো জায়গা আজকের দিনের অ্যাকাডেমিয়াতে নেই।

অন্যদিকে, যেসব প্রতিষ্ঠানে বিশ্বাসীর দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞানচর্চা করা হয় – যেমন মাদ্রাসা – সেসব প্রতিষ্ঠানকে অ্যাকাডেমিয়া শব্দটি আজকাল যে অর্থে ব্যবহৃত হয় সেই অর্থে অ্যাকাডেমিয়া বলা যায় না। বিশ্বাসীদের প্রতিষ্ঠিত এসব প্রতিষ্ঠানকে ইংরেজিতে বলা হয় সেমিনারি (seminary)। গত হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই সেমিনারি ব্যবস্থার মাধ্যমেই ইসলামী জ্ঞানের চর্চা হয়ে আসছে। ইসলামের মূলধারার ব্যাখ্যা এসব প্রতিষ্ঠান থেকেই পাওয়া যায়, অ্যাকাডেমিয়া থেকে নয়।

***

বর্তমান পৃথিবীতে জ্ঞানের নেতৃত্ব অ্যাকাডেমিয়ার হাতে। কোনো পরামর্শের দরকার হলে সরকার বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অ্যাকাডেমিয়ার বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হয়। মাদ্রাসার একজন বিশেষজ্ঞ কোনো একটি বিষয়ে যত গভীর জ্ঞানের অধিকারী হোন না কেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে তাঁর পরামর্শ চাওয়া হয় না। অতএব, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ইসলামের সেবা করতে ইচ্ছুক এমন কিছু মেধাবী কিন্তু বিশ্বাসী মুসলিমকে অ্যাকাডেমিয়াতে আসতে হবে। গবেষণা করতে হবে। লিখতে হবে। বিভিন্ন ফোরামে অংশগ্রহণ করতে হবে।

কিন্তু, এজন্য নিজের ইসলামী জ্ঞানের ভিত্তিকে সবার আগে মজবুত করতে হবে। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা রাখতে হবে। পাশাপাশি, যে বিষয়ে আমি গবেষণা করছি সেই বিষয় সম্পর্কে ইসলামের বিধিবিধান ও দিকনির্দেশনা আমার নখদর্পনে থাকতে হবে। ইসলামের মূল রেফারেন্স বইগুলো যেহেতু আরবিতে তাই আরবি ভাষা না জানলে ওসব জ্ঞান কখনোই আমাদের নখদর্পনে আসবে না। ফলে, আরবি ভাষা শিখতে হবে। ইংরেজিতে পড়াশোনা করে ইসলাম নিয়ে গবেষণা করতে গেলে তার পরিণতি হবে অন্ধের পথ দেখানোর মতো।

অতএব, প্রয়োজনীয় ইসলামী জ্ঞান অর্জন না করে ইসলাম নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো কাজে হাত দেওয়া থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকতে হবে। সেই জ্ঞান যে গন্ডি বেঁধে দেয় তার মধ্যে থেকে প্রচলিত অ্যাকাডেমিয়ার রিসার্চ মেথোডোলজি ব্যবহার করে ইসলাম বিষয়ক গবেষণামূলক ও কন্সেপচুয়াল কাজগুলো করতে হবে। আর কেউ সেই সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে ‘ইসলামপন্থী গবেষক’ হওয়ার বদলে একজন সাধারণ মুসলিম হয়ে থাকার মধ্যেই তার পরকালীন মুক্তি নিহিত থাকার সম্ভাবনা বেশি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s