জুমু’আর নামাযের সময়ে কোনো কাজ বা বিনোদন নয়

jama-masjid-delhi

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেরি করে জুমু’আর নামায পড়তে বের হচ্ছি। বাংলাতে বয়ান শেষ হওয়ার পর চার রাকাত নামায আদায় করার জন্য যে বিরতি দেওয়া হয় সেই সময়ে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করছি। ভাঙাচোরা আরবি যতটুকু বুঝতে পারি তাতেই মোটামুটি কাজ চলে যাচ্ছে।

যাওয়ার পথে দেখি মুচি জুতা সেলাই করছে। নির্মাণকর্মী ইট ভাঙছে। দোকানদার দোকান খুলে বসে আছে। রেস্তোরাঁকর্মী মুরগি নিয়ে ব্যস্ত। ছাপাখানার কর্মী বই বাঁধাইয়ের কাজে মগ্ন। সুন্নতি দাঁড়িওয়ালা শ্রমজীবি মানুষ পর্যন্ত কাজে লিপ্ত। ভবনের সামনে দারোয়ান পাহারারত। মসজিদের সামনে গাড়ি ভর্তি পুলিশ পর্যবেক্ষণরত।

পুলিশ বা দারোয়ান – এই দুই পেশার মানুষের কথা বাদ দিলে বাকি সবার কাজ ফেলে এই সময়ে মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দেওয়ার কথা, অথবা অন্তত নামাযের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু, তাদের দেখে মনে হয় না আর পনের মিনিট পরেই শুরু হতে যাওয়া জুমু’আর ফরয নামায ধরার তাড়া কারও আছে। এদের অনেকের হয়ত ইচ্ছা আছে, কিন্তু মালিক কাজে আটকে রেখেছে – এমনটিও হতে পারে।

মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের স্থান সংকুলান হচ্ছে না এটি যেমন সত্য, তেমনি আমাদের আশেপাশেরই অনেক মানুষ জুমু’আর নামায আদায় করছে না বা ইচ্ছা থাকা সত্বেও আদায় করতে পারছে না – সেটিও একটি বাস্তবতা। অথচ, জুমু’আর নামাযের হুকুম অনেক কড়া। আল্লাহর আদেশ হলো:

62:9

“হে মুমিনগণ! জুমু’আর দিন যখন নামাযের জন্য ডাকা হয় তখন আল্লাহর যিকিরের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় – যদি তোমরা উপলব্ধি কর।” [কুরআন, সূরা জুমু’আহ, আয়াত ৯]

জুমু’আর নামাযের খুতবার জন্য ইমাম সাহেব মিম্বরে ওঠার পর যে আযান দেওয়া হয় – যেটি আমাদের দেশে অধিকাংশ স্থানে বেলা ১টা ২০ মিনিটের দিকে বা তার কিছু পরে দেওয়া হয় – তারপর একজন মুসলিম পুরুষের দুনিয়াবী কোনো কাজে ব্যস্ত থাকার সুযোগ নেই। নিরাপত্তাকর্মী, জরুরী চিকিৎসার সাথে জড়িত ব্যক্তি – এরকম কিছু মানুষের জন্য ছাড় থাকতে পারে, কিন্তু এর বাইরে বেশিরভাগ মানুষকে এই সময়ে মসজিদে যেতেই হবে। দোকানদার, নির্মাণকর্মী – এরা কোনোভাবেই এই ছাড়ের আওতায় পড়ে না।

মাত্র কয়েকটা মিনিট। এরপর আবারও কাজে ফিরে যাওয়া যাবে।

62:10

“অতপর নামায শেষ হয়ে গেলে তোমরা যমিনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” [কুরআন, সূরা জুমু’আহ, আয়াত ১০]

আমাদের দেশের অধিকাংশ মসজিদে বেলা ১টা ৪০ মিনিটের দিকে জুমু’আর ফরয নামায শেষ হয়ে যায়। ফলে, সপ্তাহে মাত্র ২০ মিনিটের মতো সময় দিলেই কুরআনের এই আদেশের উপর আমল করা হয়ে যায়।

পরের আয়াতে মজার একটা বিষয় এসেছে:

وَإِذَا رَأَوْا تِجَارَةً أَوْ لَهْوًا انفَضُّوا إِلَيْهَا وَتَرَكُوكَ قَائِمًا

“কতক লোক যখন ব্যবসা অথবা কোনো খেলা দেখল তখন তোমাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে সেদিকে ছুটে গেল। …” [কুরআন, সূরা জুমু’আহ, আয়াত ১১]

চাকরি অথবা ব্যবসার জন্য অনেক মানুষের জুমু’আর ফরয নামায ছুটে যাচ্ছে। প্রিয় দলের খেলা সরাসরি দেখতে গিয়েও আমাদের অনেকের জুমু’আর নামায বাদ পড়ছে।

সামান্য কয়টা টাকা অথবা বিনোদনের নেশায় আমাদের কি ক্ষতিটাই না হয়ে যাচ্ছে!

قُلْ مَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ مِّنَ اللَّهْوِ وَمِنَ التِّجَارَةِ ۚ وَاللَّهُ خَيْرُ الرَّازِقِينَ

“বলে দাও, আল্লাহর কাছে যা আছে তা ব্যবসা ও খেলা অপেক্ষা অনেক শ্রেয়। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।” [কুরআন, সূরা জুমু’আহ, আয়াত ১১]

আমরা যারা জুমু’আর নামায আদায় করতে পারছি তাদের উচিৎ এর জন্য শুকরিয়া আদায় করা। আল্লাহর কত বান্দা ইচ্ছা থাকা সত্বেও মালিকের আপত্তির কারণে জুমু’আর নামায আদায় করতে পারছে না। আল্লাহ এদের সবার বিকল্প রিযিকের ব্যবস্থা করে দিন। আমরা যারা নিজের ব্যবসা বা আরামের খাতিরে আল্লাহর বান্দাদের জুমু’আর নামায আদায় করতে দিচ্ছি না তাদেরও বোধোদয় হোক। আল্লাহর অবাধ্য হয়ে অর্থ উপার্জন করলে সেই টাকায় কোনো বরকত থাকে না। তাঁর অনুগত বান্দা হয়ে চলার মাধ্যমে আমাদের সবার রিযিকে বরকত আসুক।

***

মূল লেখাটি এখানেই শেষ। এখন বাড়তি কিছু আলোচনা টানছি আমার দেরি করে মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কৈফিয়ত দিতে। এই প্রসঙ্গে আমি যা বলতে যাচ্ছি তা একান্তই আমার ব্যক্তিগত মত। একমত হওয়া বা না হওয়া আপনার সিদ্ধান্ত।

***

কিশোর বয়স থেকেই আমি চেষ্টা করতাম দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে ইমাম সাহেব বাংলাতে যে বয়ান করেন তা শুনতে। এই আলোচনা শেষ হয় ১টা ১৫ মিনিটের দিকে। এরপর ক্বাবলাল জুমু’আর চার রাকাত নামায আদায়ের জন্য পাঁচ মিনিটের বিরতি। তহবিল সংগ্রহ বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘোষণা না থাকলে ১টা ২০ মিনিটের দিকে ইমাম সাহেবের মিম্বরে আরোহন এবং মুয়াযযিন সাহেবের আযান। ১টা ৩০ থেকে ১টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে কোনো এক সময়ে ইকামত। ১টা ৪০ মিনিটে বা তার কিছু পরে দুই রাকাত ফরয নামায সমাপ্ত। তারপর ইমাম সাহেবের লম্বা মুনাজাত, যা শেষ হতে লেগে যায় আরও পাঁচ-সাত মিনিট। ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে অনেকে মসজিদ থেকে বের হতে শুরু করেন। যারা বা’দাল জুমু’আর চার রাকাত নামায আদায় করেন তাদের মসজিদ থেকে বের হতে প্রায় ২টার মতো বেজে যায়।

তার মানে, বাংলা বয়ানের শুরু থেকে ধরলে প্রায় সোয়া এক ঘন্টা একজন মানুষকে মসজিদে থাকতে হয়। ছাত্র অবস্থায় এবং সংসারী হওয়ার আগে এতে আমার কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু, এখন ছুটির দিনে দুপুরে একটানা এত সময় বের করা খানিকটা কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে।

এরই মাঝে বেশ লম্বা একটা সময় দেশের বাইরে বসবাস করে এলাম। আমি যেখানে ছিলাম সেখানকার জুমু’আর নামাযের টাইম ম্যানেজমেন্ট আমাদের দেশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি বাস্তবসম্মত বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথেই আযান। এরপর ক্বাবলাল জুমু’আহ আদায়ের জন্য মিনিট পাঁচেকের বিরতি। বিরতি শেষে দ্বিতীয় আযান এবং খুতবা। খুতবা দেওয়া হয় সেই দেশের স্থানীয় ভাষায়। প্রথম ও দ্বিতীয় খুতবা মিলিয়ে খুতবার দৈর্ঘ দশ থেকে বিশ মিনিট। তারপর ফরয নামায। নামায শেষে সম্মিলিত দু’আ। যার ইচ্ছা শরিক হচ্ছে, যার ইচ্ছা চলে যাচ্ছে। শেষে যার ইচ্ছা বা’দাল জুমু’আহ আদায় করছে, যার ইচ্ছা চলে যাচ্ছে।

এই পদ্ধতিতে ইমাম সাহেব মিম্বরে ওঠার পর থেকে নিয়ে জুমু’আর নামাযের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সময় লাগছে মাত্র আধা ঘন্টা। আর খুতবা সংক্ষিপ্ত করা তো আমাদের নবীর (ﷺ) সুন্নত। এত দীর্ঘ সময় ধরে মানুষকে মসজিদে আটকে রাখার আমাদের দেশীয় অভ্যাসটি সেই সুন্নতের পরিপন্থী বলে আমি মনে করি।

আরবি ও বাংলা মিলিয়ে খুতবা দিলে আগের বয়ানটির আর কোনো প্রয়োজন থাকে না। পনের থেকে বিশ মিনিটের মধ্যে দুটি খুতবা শেষ করতে পারলে মাত্র আধা ঘন্টা থেকে চল্লিশ মিনিটের মধ্যে জুমু’আর নামাযের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা আমাদের দেশেও সম্ভব।

নির্দিষ্ট কোনো মাযহাব অনুসরণ করার কারণে বাংলা ভাষায় খুতবা দেওয়া সম্ভব না হলে সেক্ষেত্রে বাংলা বয়ানের সময়কে কমিয়ে আনা যেতে পারে। বক্তা ভালো হলে কোনো একটি বিষয় ব্যাখ্যা করতে দশ থেকে পনের মিনিট যথেষ্ট সময়। এছাড়াও, বাংলা বয়ান ও দ্বিতীয় আযানের মধ্যে কোনো বিরতি না দিয়ে পাঁচ মিনিট অতিরিক্ত সময় অনায়াসে বাঁচানো যায়। এই বাংলা বয়ানটি যেহেতু খুতবা নয় তাই সেই সময়ে ক্বাবলাল জুমু’আহ আদায়ে প্রতিবন্ধকতা আরোপ করার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

শত ব্যস্ততা সত্বেও নিজ ভূমিতে অবস্থানকারী প্রতিটি মুসলিম পুরুষকে জুমু’আর নামায যেহেতু আদায় করতেই হয় তাই এর আনুষ্ঠানিকতাকে খুব বেশি দীর্ঘায়িত করা অনুচিত। জুমু’আর মিম্বর ওয়াজের মঞ্চ নয়। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার কোনো লেকচার বা ক্লাসও নয়। অল্প কথায় দরকারী কিছু কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারাটাই হলো জুমু’আর খুতবা বা বয়ানের প্রকৃত সার্থকতা।

Photo credit: Jorge Royan

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s