সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা (৩): সহ্য করুন, ক্ষমা করে দিন

cord-wrap

সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া অসংখ্য লাইফ লেসনের মধ্য থেকে ১২টা লাইফ লেসন নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে চার পর্বের এই ধারাবাহিকটিতে। প্রথমদ্বিতীয় পর্বে আমি এই সূরাটি থেকে পাওয়া মোট আটটি লাইফ লেসন শেয়ার করেছিলাম। এগুলো ছিল: 

১) অসাধারণ লক্ষ্য স্থির করুন (Set extraordinary goals);

২) আপনার লক্ষ্যকে মনশ্চক্ষুতে কল্পনা করুন (Visualise your goals);

৩) দৃঢ় তাওয়াক্কুল রাখুন (Have extraordinary faith);

৪) সঠিক বিষয়ে ফোকাস করুন (Focus on the right thing);

৫) গুরুত্বের ক্রমানুসারে কাজ করুন (Prioritise your tasks);

৬) তাড়াহুড়া করবেন না (Do not rush);

৭) পরিস্থিতি বুঝে কোমল অথবা কঠোর আচরণ করুন (Remember the carrot and the stick); এবং

৮) একই ভুল দুইবার করবেন না (Don’t repeat your mistakes)।

গত পর্বের শেষে আমরা দেখেছিলাম যে, মিসর থেকে ফিরে এসে ইউসুফ(আ)-এর বড় দশ ভাই তাদের বাবা ইয়াকুব(আ)-কে অনুরোধ করে যাচ্ছিলো তিনি যেন পরের যাত্রায় বিনইয়ামিনকে তাদের সাথে নিয়ে যেতে দেন। ইয়াকুব(আ) আপত্তি জানাতে থাকলেও তারাও ক্রমাগত অনুরোধ করে যাচ্ছিল।

সেই আলোচনার ধারাবাহিকতায় আজকের পর্বে শেয়ার করছি আরও তিনটি লাইফ লেসন।

শিক্ষা ৯: চুপ হয়ে থাকা শিখুন (Learn to be quiet)

ভেবে দেখুন তো এরকম কিছু আপনার জীবনে ঘটেছে কিনা – আপনি ফেইসবুকে আপনার মতামত জানিয়ে নিজের টাইমলাইনে কিছু লিখেছেন। সাথে সাথেই আপনার সাথে অমত পোষণ করে একজন ঝাঁপিয়ে পড়লো আপনার উপর। আপনি উত্তর দিলেন, তো সে আপনাকে আরো খেপিয়ে দিয়ে কিছু লিখলো, আপনি আবার উত্তর দিলেন, সে আরো বেশী খেপিয়ে দিয়ে মন্তব্য করলো। ফেইসবুকের এক সামান্য স্ট্যাটাস মেসেজ নিয়ে মহাবিরক্তিতে দিন কাটা শুরু হলো আপনার। কোনো কাজেই মনোযোগ দিতে পারছেন না, ঘুরেফিরে তীর্যক কথাগুলো আপনার মনের দেয়ালে শুধু ধাক্কা দিতে থাকলো। কী করবেন এরকম পরিস্থিতিতে? এর ইসলামিক উত্তর খুব সহজ – মানুষটির মঙ্গল কামনা করে কেটে পড়ুন। [দেখুন: কোরআন ২৫:৬৩ এবং ২৮:৫৫]

উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) বলেছেন, ‘চুপ থাকার জন্য আমি কখনোই অনুতপ্ত হইনি, কিন্তু আমি বহুবার অনুতপ্ত হয়েছি আমার বক্তব্যের জন্য’।

আমরা যদি একটু ভালো করে চিন্তা করি তাহলে দেখব, খুব সম্ভবত আমরা নিজেরাও অতীতে কখনো না কখনো কোনো বন্ধুর উপর একইভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম – হয় অফলাইনে, নতুবা অনলাইনে। অন্যের ভুল ধরার ক্ষেত্রে আমরা একেকজন শার্লক হোমস হয়ে যাই, আর নিজের ভুল স্বীকার করার ক্ষেত্রে হয়ে যাই ইবলিস। [উল্লেখ্য, ইবলিসের বিশ্বাস হলো সে আদমকে সম্মান না করে কোনো ভুল তো করেইনি, বরং মহান আল্লাহ আদমকে তার উপর স্থান দিয়ে ভুল করেছেন!]

অন্যের কোনো আচরণ পছন্দ না হলে আমরা চুপ করে যাব, আর আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা রাখব। কেউ আমাদের সাথে যতই বিরক্তিকর কথা বলুক না কেন,  খ্যাঁচখ্যাঁচ করে না উঠে আমরা তাদের ছোটখাটো ভুলকে না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাব। যদি তার ভুলটি এমন কিছু হয় যার ফলে বৃহত্তর ক্ষতির আশংকা থাকে তখন তাকে সুন্দর ব্যবহারের সাথে সম্ভব হলে ব্যক্তিগতভাবে (প্রাইভেটলি) শুধরে দিব [৯][১০]। ভেবে দেখুন, কতবার এমন হয়েছে যে কাউকে সবার সামনে শুধরে দিতে যেয়ে আমরা অন্য মানুষের মন ভেঙ্গেছি? ফলে সে শুধরে না যেয়ে বরং আরো বেঁকে বসেছে!

আমাদের আরেক প্রবণতা হলো পর্যাপ্ত পড়াশুনা না করেই ইসলাম নিয়ে মন্তব্য করা। আমাদের কেউ জিজ্ঞেস করার আগেই আমরা ফতোয়া দেয়া শুরু করি – এটা হালাল, ওটা হারাম, এই ব্যাটা নাস্তিক, ওই ব্যাটা মুনাফিক, আরে এ তো বেহেশতে যাবে, ওই লোক নির্ঘাত দোজখে যাবে ইত্যাদি। ইসলামের সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি হলো ফতোয়া দেয়া। একজন মুফতিকে কোরআন, হাদিস, উসুল, ফিকহ সহ ইসলামের প্রত্যেকটা বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতে হয়। এমনকি আবু বকর(রা)-কে কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করা হলে উনি বলেছিলেন, ‘কোন্‌ জমিন আমাকে জায়গা দিবে আর কোন্‌ আসমান আমাকে রক্ষা করবে যদি আমি আল্লাহর কিতাব সম্বন্ধে না জেনে কোনো কথা বলি?’

এবার আসুন ফিরে যাই ইউসুফ(আ)-এর ঘটনায়। ছেলেদের ক্রমাগত অনুরোধে বিনইয়ামিনকে মিসরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিতে বাধ্য হলেন বাবা ইয়াকুব(আ)। ইউসুফ(আ) যখন তাঁর দশ সৎ ভাইয়ের সাথে বিনইয়ামিনকে দেখলেন তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন যেভাবেই হোক ছোট ভাইকে আমার সাথে রেখে দিতে হবে। এ সময় আল্লাহ ইউসুফ(আ)-কে খুব অদ্ভূত একটা কাজ করতে হুকুম করলেন, যার মাধ্যমে বাবা ইয়াকুব(আ)-এর ধৈর্যও চরমভাবে পরীক্ষিত হবে – ইউসুফ(আ) এক ফাঁকে বিনইয়ামিনের ব্যাগে রাজার কাপ (যেটা খুব দামী এবং তাদের ন্যাশনাল সিম্বল ছিলো) রেখে দিলেন। হৈ হৈ রৈ রৈ করতে করতে খবর রটে গেল রাজার কাপ হারানো গেছে। তল্লাশী করতে করতে সেই কাপ পাওয়া গেলো বিনইয়ামিনের ব্যাগে (উল্লেখ্য, ইসলাম মিথ্যা বলা ও ওয়াদা ভংগের অনুমতি দেয় না, কিন্তু বড় কোনো ক্ষতি এড়ানোর জন্য ট্রিক করা ইসলাম সমর্থন করে)[১]। চুরির আইন অনুসারে ইউসুফ(আ) বিনইয়ামিনকে তাঁর কাছে রেখে দিলেন । বিনইয়ামিনের বিরুদ্ধে যখন চুরির বিচার চলছে তখন তাকে রক্ষা না করে দশ সৎ ভাই বরং এটা প্রমাণ করতে লেগে গেল যে তারা বিনইয়ামিনের এর মতো চোর নয়। তারা দশ ভাই যে মায়ের সন্তান তারা সবাই খুব ভালো। অন্যদিকে, বিনইয়ামিন ও তার হারিয়ে যাওয়া ভাই ইউসুফ(আ) অন্য মায়ের সন্তান। তারা ইউসুফ(আ)-এর ছোটবেলার একটা ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে বলল যে বিনইয়ামিনের ভাই ইউসুফও চুরি করেছিলো, কাজেই বিনইয়ামিনও যে চুরি করবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। চোখের সামনে নিজের ব্যাপারে এরকম ডাহা মিথ্যা শুনেও ইউসুফ(আ) কোনো জবাব দিলেন না, শুধু মনে মনে তাদের এই কথাকে ঘৃণা করলেন।

12:77

ওরা বলল, ‘সে যদি চুরি করে থাকে, তার আপন ভাই (ইউসুফ) ও তো পূর্বে চুরি করেছিলো’। কিন্তু ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে গোপন রাখল ও ওদের কাছে প্রকাশ করলো না। সে মনে মনে বলল, ‘তোমাদের অবস্থা তো এর চেয়েও খারাপ, আর তোমরা যা বলছ সে-সম্বন্ধে আল্লাহ ভালো করেই জানেন’। (১২:৭৭)

রাগ-নিয়ন্ত্রণ:  

আমরা যেসব মুভি-নাটক দেখি, বই পড়ি – এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের শেখায় রাগ করতে পারাটা হলো ‘গাটস’-এর ব্যাপার, যে রাগ করতে না পারে তার কোনো পার্সোনালিটি নেই। আর ইসলাম বলে ঠিক উল্টো কথা – যে রেগে যায় তার কোনো পার্সোনালিটি নেই। কারণ, রেগে যাওয়া মানুষ তার নিজের নিয়ন্ত্রণ শয়তানের হাতে সমর্পণ করে। আপনি যা করেননি তার জন্য কেউ হয়তো আপনাকে দোষ দিচ্ছে, বা আপনি যে কাজ অপছন্দ করেন ইচ্ছে করে সেই কাজই সে বার বার করে যাচ্ছে, অথবা অন্যদের কাছে আপনার বদনাম করে বেড়াচ্ছে – এরকম পরিস্থিতিতে পড়লে আমাদের করণীয় কি? কোরআন ও সুন্নাহ থেকে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা জানতে পারি:

  • নিজের কন্ঠকে গাধার মধ্যে উচ্চ না করে বরং নামিয়ে ফেলুন [দেখুন: কোরআন ৩১:১৯]
  • যে আপনাকে রাগিয়েছে তাকে ক্ষমা করে দিন [দেখুন: কোরআন ৪২:৩৭]
  • ধৈর্য ধরুন এবং সৌজন্য সহকারে এড়িয়ে চলুন [দেখুন: কোরআন ৭৩:১০]
  • তার দোষের কথা ভুলে গিয়ে গুণের কথা মনে করুন [সহিহ মুসলিম]
  • রাগ আসে শয়তানের তরফ থেকে। সুতরাং, ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ বলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান। [৫]
  • আমরা রেগে গেলে শয়তান দ্রুত বেগে আমাদের রক্তে ছুটাছুটি করে আমাদের আরো রাগিয়ে দেয়। আগুনের তৈরী শয়তানকে জব্দ করার জন্য তাই অজু করুন। [৫]
  • দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়ুন, বসে থাকলে শুয়ে পড়ুন। সোজা কথা, এক্কেবারে ইন্যাক্টিভ হয়ে যান। নচেৎ রাগের মাথায় আপনি হয়তো এমন কিছু বলে ফেলবেন বা করে ফেলবেন যার জন্য সারাজীবন আফসোস করতে হবে। [৫]
  • আপনার ধৈর্যের জন্য আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা রাখুন।

মনে রাখবেন, আপনার সাথে যে ভালো ব্যবহার করে তার সাথে ভালো ব্যবহার করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই, কৃতিত্ব হলো যে খারাপ ব্যবহার করে তার সাথে ভালো ব্যবহারে।

শিক্ষা ১০: সম্পর্ক তৈরী করুন (Connect!)

কাজ শেষে বাসায় ফিরে কম্পিউটার, মোবাইল আর টিভিতে বুঁদ হয়ে না থেকে মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরী করুন। আল্লাহর পরেই আমাদের উপর সবচাইতে বেশী অধিকার আমাদের বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী আর সন্তান-সন্তুতির – বাসায় ফিরে তাদেরকে সময় দিন। ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশীদের – বাসায় গিয়ে, ফোন করে, ইমেইল করে, যেভাবেই পারুন যোগাযোগ রক্ষা করুন, যে আপনার সাথে যোগাযোগ রাখে না তার সাথে আরো বেশী করে যোগাযোগ করুন। কোথাও গেলে মটকা মেরে বসে না থেকে আমাদের অন্য মানুষদের সাথে সম্পর্ক তৈরী করতে হবে। মহান আল্লাহ একেক মানুষকে একেক রকম শারীরিক গঠন, চিন্তা-ভাবনা, দক্ষতা দিয়ে তৈরী করেছেন যাতে আমরা একে অন্যকে জানার জন্য প্রয়োজনীয়তা বোধ করি [দেখুন: কোরআন ৪৯:১৩]।

সবসময় মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করতে হবে। ইউসুফ(আ)-এর জীবনের পিছনের একটা ঘটনা থেকে আমরা মানুষকে সাহায্য করার আদব শিখতে পারি। ইউসুফ (আ) যখন জেলে ছিলেন তখন তাঁর কাছে রাজার দূত রাজার দেখা স্বপ্নের অর্থ জানতে চেয়েছিলো। উত্তরে ইউসুফ(আ) শুধু স্বপ্নের অর্থ বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং নিজ উদ্যোগে বলে দিয়েছিলেন আসন্ন দুর্ভিক্ষ থেকে মিসর রাজ্যকে বাঁচাতে চাইলে রাজার করণীয় কী। অথচ, এই সেই দূত যে অনেক বছর আগে ইউসুফ(আ)-কে কথা দিয়েছিলো সে রাজার কাছে গিয়ে এটা বলবে যে ইউসুফ বিনা দোষে জেলে বন্দী আছে। এরকম অকৃতজ্ঞ বন্ধু যদি আমাদের কাছে সাহায্য চাইতো তাহলে আমরা কি তাকে সাহায্য করতাম? ইউসুফ(আ) কিন্তু একবারও সেই অকৃতজ্ঞতার কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন না, বরং সে যা সাহায্য চেয়েছিলো তার চেয়ে বেশী সাহায্য করলেন।

12:46

12:47

12:48

12:49

সে বলল, ‘হে ইউসুফ, হে মহাসত্যবাদী! সাতটি শুঁটকো গাই সাতটি মোটাসোটা গাইকে খেয়ে ফেলছে, আর সাতটি সবুজ শিষ ও অপর সাতটি শুকনো শিষ সম্বন্ধে তুমি আমাদেরকে ব্যাখা করো, যাতে আমি লোকদের কাছে ফিরে যেতে পারি এবং ওরা জানতে পারে’। ইউসুফ বলল, ‘তোমরা সাত বছর একটানা চাষ করবে, এ সময় যে শস্য সংগ্রহ করবে ওর মধ্যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে, আর বাকী সব শিষ সহ রেখে দিবে। তারপর আসবে সাতটি কঠিন বছর যখন তোমরা পূর্বে সঞ্চিত খাবার খাবে, আর অল্প কিছু সংরক্ষণ করবে (পুনরায় চাষ করার জন্য)। এবং এরপর আসবে এক বছর সে-বছর মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে, এবং সে-বছর মানুষ ফলের রস  নিংড়াবে (অনেক আনন্দ করবে)।  (১২:৪৬-৪৯)

এই আয়াতে মহান আল্লাহ ইউসুফ(আ)-এর মাধ্যমে আমাদের শেখালেন –

কীভাবে মানুষকে সাহায্য করতে হয়:

  • আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাহায্য করা
  • কেউ কৃতজ্ঞতা জানাক আর না-ই জানাক তবু তাকে সাহায্য করা
  • নিজ থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া
  • সাহায্যপ্রার্থী যতটুকু চাচ্ছে তার চেয়ে বেশী দিয়ে সাহায্য করা
  • নিজেকে সুপিরিয়র মনে না করে সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়া
  • ‘আমি সাহায্য না করলে তুমি এটা পারতে না’ – এই জাতীয় ভাব না নেয়া

একইভাবে, কোনো সমস্যায় পড়লে সুন্দর কথার মাধ্যমে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হবে। অনেক সময় আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা একটা কিছু বুঝার চেষ্টা করে হয়তো পারি না, কিন্তু আমার পাশের চেয়ারে বসা বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলে সে এক মিনিটেই আমাকে এটা বুঝিয়ে দিতে পারতো। আমি পারি না বলার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই, সাহায্য চাওয়ার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই – যদি এই সাহায্য চাওয়ার উদ্দেশ্য হয় নিজেকে ইম্প্রুভ করা।

ইউসুফ(আ)-এর ঘটনায় ফিরে যাওয়া যাক। ইউসুফের সৎ ভাইয়েরা কানআন ফিরে গেলে বাবা ইয়াকুব(আ) আরো ভেঙ্গে পড়লেন যখন শুনলেন বিনইয়ামিন মিসরেই রয়ে গেছে। তিনি ছেলেদেরকে বললেন, ‘তোমরা ইউসুফ আর বিনইয়ামিনকে খুঁজে এনে দাও’। সৎ ভাইয়েরা বুঝলো তাদেরকে আবার মিসরে যেতে হবে, সেখানে গিয়ে মিসরের মন্ত্রীর কাছে অনুনয়-বিনয় করে বিনইয়ামিনকে ফেরত চাইতে হবে। এসময় এই সৎ ভাইদের মধ্যে অনুশোচনা বোধও শুরু হয়। তারা বুঝতে পারে ছোট ভাই ইউসুফ আর বিনইয়ামিনের সাথে তারা যে আচরণ করেছিলো তা ঠিক ছিলো না। তারা মিশরে ফিরে যেয়ে কোষাধ্যক্ষ ইউসুফের কাছে তাঁর সাহায্য চাইলো।

12:88

যখন ওরা তার কাছে উপস্থিত হল তখন বলল, ‘হে আযীয (বাদশাহ)! আমরা ও আমাদের পরিবার-পরিজন বিপদে পড়েছি, আর আমরা অল্প মাল এনেছি। আপনি তো আমাদের রসদ দেন পুরো মাত্রায়, আর আমাদের কিছু দানও করেন। আল্লাহ তো দাতাদের পুরষ্কার দিয়ে থাকেন’। (১২:৮৮)

এই আয়াতে আল্লাহ আমাদের শেখালেন –

কীভাবে কারো সাহায্য চাইতে হয়:

  • যার সাহায্য চাইছেন তাকে সম্মানের সাথে সম্বোধন করা
  • নিজের করুন অবস্থা স্বীকার করে নেয়া
  • সাহায্যকারীর প্রশংসা করা
  • সাহায্যকারীর মঙ্গল কামনা করা

এই চারটি কন্ডিশন মেনে আমরা যদি কারো সাহায্য চাই, আল্লাহ চাইলে আমরা সাহায্য পাবোই।

শিক্ষা ১১: ক্ষমা একটি শিল্প, একে শিখুন (Learn the art of forgiveness)

ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষমা করা – এই দুইটি কাজই মানুষ হিসাবে আমাদেরকে মর্যাদাকে উন্নত করে। আমরা যদি ক্ষমার শিল্পকে আয়ত্ত না করতে পারি তাহলে আমাদের মনের মধ্যে বাসা বাঁধবে ঘৃণা আর অহংকার। এটি শিখতে না পারলে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও কর্মজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে, ভয়াবহ কঠিন হবে পরকালের হিসাব।

ইউসুফ(আ) যখন তাঁর সৎ ভাইদের কাছে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে দিলেন তখন তারা সাথে সাথে তাদের ভুল স্বীকার করে নিলো এবং ক্ষমা চাইলো।

12:91

ওরা বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আল্লাহ নিশ্চয়ই তোমাকে আমাদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন আর আমরা নিশ্চয়ই অপরাধী ছিলাম’। (১২:৯১)

এই আয়াতে মহান আল্লাহ আমাদের শেখালেন-

কীভাবে ক্ষমা চাইতে হয়:

  • ‘আমি অমুক কারণে ওই কাজটা করেছিলাম’ জাতীয় একটা শব্দও না বলা
  • ক্ষমাকারীর প্রশংসা করা
  • অনুশোচনা সহ নিজের দোষ স্বীকার করে নেয়া

পরবর্তীতে আপনার বাবা-মা, স্বামী/স্ত্রী বা বসের কাছে যখনই কোনো ব্যাপারে ক্ষমা চাইতে যাবেন, নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে কোনো যুক্তি দিবেন না, নিজের ভুল স্বীকার করে নিয়ে মন থেকে ক্ষমা চান। আজ হয়তো আপনি বুঝতে পারছেন না, কিন্তু একদিন ঠিকই বুঝতে পারবেন যে এই ভুল বুঝাবুঝির পিছনে আপনার দোষই বেশী ছিলো।

এবার ইউসুফ(আ)-এর পালা ভাইদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার। নিজেকে ইউসুফের জায়গায় কল্পনা করে দেখুন – কেউ যদি আপনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে পরিত্যক্ত কোনো কূয়ায় ফেলে দিত আপনি কি তাকে ক্ষমা করতে পারতেন? কেউ যদি প্রায় চল্লিশ বছর আপনার বাবা-মাকে আপনার থেকে আলাদা করে রাখতো আপনি কি তাকে ক্ষমা করতে পারতেন? শেষবার যখন দেখা হয়েছিলো সেইবারও যে আপনাকে ‘চোর’ বলে অপবাদ দিয়েছে আপনি কি তাকে ক্ষমা করতে পারতেন? ইউসুফ(আ) তাঁর ভাইদের শুধু ক্ষমাই করলেন না, তিনি চল্লিশ বছরের সব কষ্টের স্মৃতি এক নিমিষেই ভুলে গেলেন। এটা সম্ভব হয়েছে এই কারণে যে তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য ছিলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করা। আর তাই ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে তিনি তাঁর ভাইদেরকে পুরোপুরি ক্ষমা করে দিলেন, কারণ আল্লাহ ক্ষমাকারীকে ভালবাসেন।

12:92

সে বলল, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু’। (১২:৯২)

ইউসুফ(আ) তাঁর ভাইদেরকে বললেন তাদের বাবা-মাকে মিসরে নিয়ে আসতে। মিসরে প্রবেশের সময় ইউসুফ(আ) তাঁর বাবা-মাকে বিরাট সংবর্ধনা দিলেন। সিংহাসনে বসতে দিয়ে বাবা-মাকে উপযুক্ত সম্মান দিলেন। বলা হয়ে থাকে, ইউসুফের অসামান্য কর্মদক্ষতা ও সততার কারণে এই সময় মিসরে ইউসুফের ক্ষমতা ও মর্যাদা রাজার সমান বা বেশী ছিলো।

12:100

আর ইউসুফ তার পিতামাতাকে উচ্চাসনে বসালো আর সে বলল, ‘হে আমার পিতা! এই আমার আগের স্বপ্নের ব্যাখা। আমার প্রতিপালক তা সত্যে পরিণত করেছেন। আর তিনি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছেন ও শয়তান আমার আর আমার ভাইদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদের মরুভূমি থেকে এখানে এনে দিয়ে আমার উপর অনুগ্রহ করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা করেন তা সূক্ষ্মভাবে করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞানী, শ্রেষ্ঠ বিচারক। (১২:১০০)

ইউসুফ(আ)-এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের শেখালেন-

কীভাবে ক্ষমা করতে হয়:

  • ক্ষমা চাওয়ার সাথে সাথে ক্ষমা করে দেয়া
  • অপরাধটি মনে করিয়ে দিয়ে আর কখনোই কোনো কথা না বলা
  • ‘আমি তোমাকে ক্ষমা করছি’ বললে ক্ষমাপ্রার্থিকে ছোট করা হয়, সেটা না বলে তাকে সম্মান করে এভাবে বলা – ‘আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন’
  • ক্ষমাপ্রার্থীর দোষকে গোপন করে শয়তানের উপর বা অন্তরের কুমন্ত্রণার উপর দোষ চাপানো
  • তার এই ভুলের মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে কে শেখাতে চেয়েছেন তা নিয়ে চিন্তা করা।

ইসলামের শিক্ষা কতই না সুন্দর, তাই না!

আজ এ পর্যন্তই। শেষ লেসনটি এই ধারাবাহিকের আগামী পর্বে প্রকাশিত হবে, ইনশাআল্লাহ।

***

রেফারেন্স:

1. Pearls from Surat Yusuf – Dr. Yasir Qadhi

2. Leadership Lessons from the Life of Rasoolullah (SAW) – Mirza Yawar Baig

3. তাফসীর ইবনে কাছির

4. আহসানুল বায়ান

5. Anger Management – Dr. Yasir Qadhi

6. Notes from a Friend  – Anthony Robbins

7. The Strangest Secret – Earl Nightingale

8. Focal Point – Brian Tracy

9. Description of Prophet Muhammad (Peace Be Upon Him) – Shaykh Hamza Yusuf

http://sheikhhamza.com/transcript/Description-of-the-Prophet(SAW)

10. 10 Rules of  #TwitterFiqh – Shaykh Yahya Ibrahim

http://muslimmatters.org/2014/01/06/10-rules-twitterfiqh/

11. Ties of Kinship, Al-Adab Al-Mufrad – Imam Bukhari

http://www.sunnipath.com/library/Hadith/H0003P0002.aspx

মূল লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখকের ব্যক্তিগত ব্লগে

এই ধারাবাহিকের আগের দুটি পর্ব পড়ুন এখানে:

আরও পড়ুন:

Advertisements

One thought on “সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা (৩): সহ্য করুন, ক্ষমা করে দিন

  1. পিংব্যাকঃ সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা (৪): সফল সে-ই যে পরকালে সাফল্য পেল | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s