ভয়কে জয় করুন, আপনার মুসলিম পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে চলুন

Level crossing

একবার আমার এক বন্ধুর বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়েছিলাম। ২০১২ সালের কথা। তাদের বাসায় আগেও অনেকবার গিয়েছি। দাঁড়ি রাখার পর সেবারই প্রথম। খাবারের এক পর্যায়ে আন্টি জিজ্ঞেস করলেন, এরকম পরিবর্তন কেন? জঙ্গি দলে যোগ দিয়েছি নাকি। বন্ধু সেদিন তার মাকে আশ্বস্ত করেছিল, না ওরকম কিছু না। আমার সেই বন্ধু যদি কখনো দাঁড়ি রেখে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম মানা শুরু করে, সেই বাসায় যে তুলকালাম বাঁধবে সেটা অনুমান করতে পারি। 

একটা বাসায় নিয়মিত প্রথম আলো রাখে। কালের কণ্ঠ রাখে। সকালে উঠেই বাড়ির লোকজন নিয়মিত সন্ত্রাসীদের খবর পড়ে। দেশি-বিদেশি। তারা দেখে বিশেষ কিছু সন্ত্রাসীরা আল্লাহু আকবার বলে হামলা শুরু করে। মরার জন্য মরিয়া। তারা দেখে এসব সন্ত্রাসীরা কখনো ধর্মান্তরিত, কখনো পথ-ফিরে-পাওয়া—হঠাৎ পরিবর্তন। মুখে দাঁড়ি। মাথায় টুপি। গায়ে পাঞ্জাবি। টাখনুর উপর পায়জামা, প্যান্ট—আজকাল আমাদের দেশে নারী সন্ত্রাসীও পাওয়া যাচ্ছে। অবধারিতভাবে তারা নিকাবধারী—তো এরকম একটা পরিবারে, সমাজে যদি কোনো তরুণ-তরুণী দীর্ঘদিন ভুলপথে থাকার পর ইসলামে ফিরে আসে, পরিপূর্ণভাবে ইসলাম মানা শুরু করে, সেই পরিবারে রিঅ্যাকশন কী হবে? সমাজ তাকে কী বলবে?

স্বাভাবিক: ছেলেটা বা মেয়েটা জঙ্গি হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এখন এরকমই।

আরও শঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে, যারা নতুন করে ইসলামের পথে আসতে চাচ্ছেন তাদের সামনে একটা বিশাল প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। শুরুতেই ঈমানের কঠিন পরীক্ষা। পত্রিকার খবরগুলো পড়ে দেখেন, তাদের কথা অনেকটা এরকম: হঠাৎ করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করেছে। আগে খালি জুম্মা পড়ত। মাঝে মাঝে নামাজ-কালাম করত। নিজেকে এখন আইসোলেটেড করে ফলেছে। তো ক্রমাগত যখন এরকম একটা ন্যারেটিভ প্রচারিত হতে থাকে তখন দুর্বল ঈমানের লোকেরা পড়বে মহাসমস্যায়। তারা ভাববেন, যেভাবে আছি সেভাবেই ভালো আছি।

আমার এক বন্ধু খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি রাখে। নিয়মিত নামাজ পড়ে। দাঁড়িটা বড় করতে পারছে না। শেভ করে ফেলে। বাসা থেকে দাঁড়ি নিয়ে আকাবাঁকা কথা শোনা অস্বাভাবিক না।

যত যা-ই বলি, জীবনের মায়া সবারই আছে। সবাই ট্যাগহীন থাকতে চায়। জামাতি, জঙ্গি ইত্যাদি নামে যে-অপবাদ চালু আছে, নতুন ইসলামিরা তার শরিক হতে চাইবে না। প্রথমদিকে আমি “জামাতি” কাউকে আমার ফেসবুক বন্ধুতালিকায় যোগই করতাম না।

তরুণ বয়সে দাঁড়ি রাখা, নিকাব পরা এমনিতেই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সমাজের জনপ্রিয় ধারায় এই বয়সটা মেয়ে পটানোর। ছেলে ঘোরানোর। দাঁড়ি রাখলেও সেটা হবে ফ্যাশন করে। তো এসবের হাতছানি মাড়িয়ে ইসলাম মানাটা এমনিতেই ধকলের ব্যাপার। তার উপর যদি এতসব ঝামেলা, “নাই” হয়ে যাওয়ার ভয় যোগ হয়, তাহলে তো কথাই নেই।

ভয় নিয়ে একটা ঘটনা মনে পড়ছে। আমার বিয়ের অনুষ্ঠানের দিনগুলো ছিল উত্তাল সময়। গাড়ি পোড়ানো হচ্ছে, ট্রেনের লাইন উপড়ে ফেলা হচ্ছে, চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছোঁড়া হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ঘরে বসে টিভি চ্যানেল আর পত্রিকার খবরগুলো দেখলে এরকম অরাজক পরিস্থিতিতে ঘর থেকে বের হতেই অনেক হিম্মতের দরকার হয়, সেখানে ট্রেনে করে চট্টগ্রাম যাওয়া তো বালাই ষাট।

নৈরাজ্যকারীরা মিডিয়ার সচেতন বা অচেতন প্রচেষ্টায় সমাজে এমন একটা সন্ত্রাস (সন্ত্রাস মানে অতিশয় ভয়) সৃষ্টি করতে পেরেছিল যে, মানুষজন আতঙ্কিত হতে বাধ্য হয়েছিল। তো এরকম এক বিকেলে আমি প্রায় বিশ-পঁচিশজনের বহর নিয়ে চিটাগাং পৌঁছাই। বাকি ছিল আমার চারজন কাছের বন্ধু। কয়েক দফা তাদেরকে আশ্বস্ত করে, অভয় দিয়ে এবং নিজেরা এসেছি এসব কথা বলে তাদেরকে আনতে পেরেছিলাম। তাদের সঙ্গে যখন ফোনে কথা বলছি, টিভিতে তখনো দেখানো হচ্ছিল গাড়ি পোড়ানোর দৃশ্য। আল্লাহর প্রশংসা, আমি এবং আমার পরিবার নিরাপদে চিটাগাং গিয়েছি, এসেছি।

মিডিয়াতে সবকিছু না-হলেও অনেক কিছু রাঙিয়ে দেখায়। “চলচ্চিত্রায়ন (সিনেমাইজড)” করে। নিরীহ খবরে যোগ করে উত্তেজনা। ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে এক ফোঁটা জলের কাহিনিকে ট্র্যাজেডিতে রূপান্তর করে। রচনা করে একটি “টাইটানিক”—হাজার হাজার মানুষ ডুবে মরলেও মন কাঁদে জ্যাক আর রোজের প্রেমকাহিনির জন্য।

কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের কাছে জাল বর্ণনার অস্ত্র নেই। আমরা মানুষকে ইসলামে ভেড়ানোর জন্য আষাঢ়ে গল্পের ফাঁদ ফেলতে পারি না। ফাযায়েলের নামে উদ্ভট আর মনগড়া কাহিনি বলার অধিকার আমাদের নেই। কাহিনি যতটুক, ততটুকুই বলার অনুমতি আছে। আমরা বলতে পারি না, ইসলামে এলে খালি শান্তি আর শান্তি—বরং ইসলাম একটা চ্যালেঞ্জ। এখানে রোমাঞ্চ আছে, ঝড় আছে, শান্তি আছে, কষ্ট আছে, ভালোবাসা আছে, ঘৃণা আছে। ইসলামে এলে বাবার চক্ষুশূল হতে পারেন, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি পাবেন এটা বলতে পারি। ইসলামে এলে বন্ধুমহলে খ্যাত বা “হুজুর” পদবি পেতে পারেন, কিন্তু মহাকাশের ওপারে আল্লাহর মজলিশে আপনার খ্যাতি ছড়াবে এটা বলতে পারি। দাঁড়ি রেখে মেয়ে পটানোর “অধিকার” খোয়াতে পারেন, কিন্তু দুনিয়াতেই “জান্নাতি” স্ত্রী পেতে পারেন এটা বলতে পারি। নিকাব করে নিজের মায়ের চোখ রাঙানি খেতে পারেন, কিন্তু “ফেরেশতারা” আপনার জন্য আল্লাহর কাছে দু‘আ করবেন এটা বলতে পারি। প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, একাত্তর টিভি বা সমমনা প্রচার মাধ্যমগুলোতে “জঙ্গি” হিসেবে আপনার নাম প্রচার হতে পারে। পরিবারের মান জলাঞ্জলি যেতে পারে। কিন্তু নিশ্চিত থাকেন, যদি সঠিক ইসলামে থাকেন, জান্নাতিদের “তালিকায়” নাম থাকবে আপনার।

লোভ দেখাচ্ছি না, এটা আপনার “ক্ষণস্থায়ী” জীবন-যন্ত্রণার “স্থায়ী” পুরস্কার।

যেন ভুল না বোঝেন: ইসলামের নাম করে রণাঙ্গনের বাইরে যেকোনো ধরনের হামলার বিরুদ্ধে আমি।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখকের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে

আরও পড়ুন:

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s