শিশুর অটিজম: বুঝুন, মেনে নিন এবং ভালোবাসুন

autism

রোগটির নাম অটিজম। এটি কোনো মানসিক রোগ নয়, বরং নিউরো-বায়োলজিক্যাল ডিজঅর্ডার যা আচরণগত সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। এটা কিছু সমষ্টিগত সমস্যার সম্মিলিত প্রকাশ [Autism spectrum disorder (ASD)]। জন্ম থেকেই এই শিশুরা অটিজমে আক্রান্ত থাকে, তবে লক্ষণগুলো সাধারণত আড়াই থেকে তিন বছর বয়সের মধ্যেই প্রকাশ পায়। এই রোগে শিশুর দৈহিক বিকাশ সাধারণত স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু  সামাজিক ও বাচনিক বৃদ্ধি অবিকশিত থাকে। আক্রান্ত ছেলেশিশুর হার মেয়েশিশুদের  তুলনায় চার-পাঁচ গুন বেশি হয়।

১৯৪৩ সালে সর্বপ্রথম অটিজম সম্পর্কে জনসম্মুখে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়। প্রায় একই সময়ে  জন হপকিনস হাসপাতালের ডা: লিও কান্নের এবং জার্মান বিজ্ঞানী ডা: হ্যান্স এসপারজার এ রোগ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন।

কারণ: 

অটিজম কেন হয় তার সঠিক কারণ আজ পর্যন্ত উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনোবিকাশের প্রতিবন্ধকতার কারণ হিসাবে মস্তিস্কের অস্বাভাবিক জৈব রাসায়নিক কার্যকলাপ, মস্তিস্কের অস্বাভাবিক গঠণ, বংশগতির অস্বাভাবিকতা প্রভৃতির কথা বলে থাকেন। অনেক বিজ্ঞানীদের ধারনা ক্রোমোজম নম্বর ৭-এর অস্বাভাবিকতার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক আছে। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের সুষ্ঠ পরিচর্চার অভাবেও অটিজম হতে পারে। তবে জন্ম পরবর্তীকালের কোনো জটিলতা কিংবা শিশুর প্রতি মায়ের বা ঘনিষ্ঠজনের অমনোযোগিতার কারণে অটিজম দেখা দেয়া না বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। কাজেই কোনো শিশুর অটিজম হলে সেজন্য বাবা মা ও আত্মীয়-স্বজনকে দোষী ভাবা মোটেও ঠিক নয়। একইসাথে সন্তানের বাবা-মাকে দায়ী করার কোনো যুক্তিও নেই।

অটিজমে প্রধানত তিনটি সমস্যা দেখা দেয়:

  • মৌখিক কিংবা অ-মৌখিক যোগাযোগ স্থাপনে সমস্যা;
  • অন্যান্যদের সঙ্গে সামাজিক বিকাশগত সমস্যা; এবং
  • খুব সীমাবদ্ধ ও গণ্ডিবদ্ধ জীবনযাপন ও চিন্তাভাবনা এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ।

এর বাইরে, নিম্নলিখিত সমস্যাগুলোও দেখা যেতে পারে:

  • একই কাজ বার বার করার প্রবণতা;
  • মনোযোগের সমস্যা;
  • শারীরিক বিপদ ও যন্ত্রণার ব্যাপারে আপাতদৃষ্টিতে অসংবেদনশীলতা;
  • নিয়ম বা রুটিনের পরিবর্তনের ঘোর বিরোধিতা;
  • বার বার শরীরের কোনো কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অস্বাভাবিক নাড়াচাড়া;
  • কোনো বিশেষ বস্তুর প্রতি অসাধারণ আসক্তি;
  • ধ্বংসাত্মক, আক্রমণাত্মক বা আত্মঘাতী আচরণ।

সব অটিস্টিক শিশুর আচরণ একরকম নয়। বিভিন্ন শিশু বিভিন্ন ধরনের আচরণজনিত সমস্যায় ভোগে। অটিজমে আক্রান্তদের আচার-ব্যবহার এবং সংবেদন পদ্ধতি অন্যদের চেয়ে অনেক আলাদা হয় এবং আক্রান্তদের মধ্যেও থাকে অনেক পার্থক্য। শব্দ, আলো, স্পর্শ ইত্যাদির প্রতি অটিস্টিকদের আচরণ সাধারণদের থেকে বেশ পৃথক ও অদ্ভুত। তবে, এদের মধ্যে অনেক শিশুরই কৈশোরের দিকে কিছুটা উন্নতি হয়।

লক্ষণসমূহ:

যদি আপনার শিশু

  • চোখের দিকে না তাকায় (Avoid normal eye contact);
  • নাম বা ডাকে সাড়া না দেয়;
  • সামাজিক হাসি বিনিময় না করে;
  • বিশেষ কিছু নিয়ে প্রচণ্ড জেদ করে এবং নিষেধ করলে আরো বেশি করে করে;
  • বলতে বা বোঝাতে না পারে সে কী চায়;
  • কথা বলতে অস্বাভাবিক দেরি হয়;
  • কিছুদিন আগেও বেশ কয়েকটা শব্দ বলতে পারতো, কিন্তু এখন তা পারে না;
  • অন্যদের সঙ্গে হেসে খেলা করে না বা অন্যদের সঙ্গে খেলা করতে পারে না;
  • অন্যদের ব্যাপারে কোনোই আগ্রহ থাকে না;
  • বুড়ো আঙুলের ওপর ভর দিয়ে হাঁটে;
  • কেবল একা একা খেলতে পছন্দ করে;
  • নিজেকে নিয়েই সারাদিন ব্যস্ত থাকে;
  • তার চাহিদা আঙুল দিয়ে দেখাতে বা বোঝাতে সক্ষম না হয়;
  • কোনো কিছু করতে বললে তা না করে;
  • মাঝে মাঝে অতিরিক্ত রেগে যায় এবং জিনিসপত্র ছোড়ে বা  ভেঙ্গে ফেলে;
  • অস্বাভাবিক বেশি চঞ্চল মনে হয়;
  • বার বার শরীরের কোনো কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে নাড়াচাড়া করে;
  • কোনো বিশেষ খেলনার প্রতি প্রচণ্ড আকর্ষণ অনুভব করে; অথবা
  • একেবারে স্বাধীনভাবে নিজের কাজ নিজে করে —

তাহলে হতে পারে যে শিশুটি অটিজমের শিকার হয়েছে। লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে বাড়তে থাকতে পারে। এমনটি হলে যথাশীঘ্র শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে এবং সঠিক দিকনির্দেশনা মতো চলতে হবে।

চিকিৎসা ও করণীয়:

অটিজমে আক্রান্ত শিশুর জন্য প্রথম চিকিৎসাই হলো তার রোগকে শনাক্ত করা। অটিজম চিকিৎসায় ওষুধের তেমন কোনো কার্যকরী ভূমিকা নেই৷ সাইকোথেরাপিও এ রোগ থেকে শিশুকে মুক্তি দিতে পারে না। এজন্য কোনো ঝাড়ফুক বা কুসংস্কারের আশ্রয় না নিয়ে বরং যত দ্রুত সম্ভব শিশুটিকে যথোপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা উচিত। তবে, প্রতিটি অটিস্টিক শিশুই আলাদা হওয়ায় তাদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারটি একজনের থেকে অপরেরটা আলাদা৷ এর মাধ্যমে শিশুর দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাগুলি খুঁজে বের করে তা দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি, শিশুটির মাঝে কী প্রতিভা আছে তাও খুঁজে বের করতে হবে। আর সেই প্রতিভার বিকাশে শিশুটিকে সার্বিকভাবে সহায়তা  দিতে হবে। এর ফলে শিশুটি তার সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসতে সচেষ্ট হবে। অটিস্টিক শিশুর আচরণগত অস্বাভাবিকতা থাকায় পরিবারের অনেকের মনে বিরক্তির সৃষ্টি হতে পারে। অভিভাবকদের এ ব্যাপারে খুব সচেতন ও যত্নবান হতে হবে। ধৈর্য আর সংবেদনশীলতা নিয়ে শিশুটির স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে হবে। অটিস্টিক শিশুরাও অনেক ভালো ও গঠনমূলক কাজ করতে পারে। তাই পুরোপুরি হতাশ হওয়া যাবে না।

কেউ কেউ অটিষ্টিক শিশুদেরকে মানসিক প্রতিবন্ধী বলে থাকেন। কিন্তু, চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এ ধরণের কথার সাথে একমত নন। তারা বলেন, অটিষ্টিক শিশু কখনো কখনো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শীতা প্রদর্শন করতে পারে। তবে, এই পারদর্শীতা প্রদর্শনের জন্য এই ধরনের শিশুদের বিশেষ ধরণের শিক্ষার একান্ত প্রয়োজন। আর এ কারণে অটিজমে আক্রান্ত শিশুকে বিশেষ প্রয়োজনসম্পন্ন শিশু বা বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদাসম্পন্ন বলা হয়। এসব শিশুকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তাদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

অটিস্টিক শিশু ও বাংলাদেশ:

বিশ্বজুড়ে অটিজম বাড়ছে। বিশ্বে এই রোগ এতই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যে জাতিসংঘ প্রতিবছর ২রা এপ্রিলকে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক হিসেবে বলা হয়েছে, আগে যেখানে প্রতি ৫০০ জন শিশুর মধ্যে একজনের অটিজম পাওয়া যেতো এখন সেখানে প্রতি ১১৬ জনের মধ্যে একজন অটিজমের শিশু পাওয়া যাচ্ছে। অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে বাংলাদেশে নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই৷ তারপরও বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন গড়ে প্রতি হাজারে ১০ থেকে ২০ জন শিশু এই রোগে আক্রান্ত। উন্নত দেশগুলোতে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশে অটিজম সম্পর্কে এখনো সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। এ কারণে হয়ত অটিজমের রোগী সঠিকভাবে চিহ্নিত হচ্ছে না। অনেক মা-বাবা শুরুতে বুঝতেই পারেন না যে তাদের শিশুটি অটিস্টিক৷ অনেকেই মনে করে এসব বৈশিষ্টগুলো শিশুদের ইচ্ছে বা মনের খেয়াল। তাই অনেকে শিশুদের সাথে খারাপ আচরন করে। শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা যাদের আছে তাদের মধ্য থেকে মূলত অটিজমের রোগী চিহ্নিত হচ্ছে। এখনো বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে এ রোগ সম্পর্কে কোনো সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশে অটিস্টিক শিশুদের যেমন সঠিক কোনো পরিসংখ্যান এখনো পর্যন্ত নেই, তেমনি নেই শিশুদের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠানও। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অটিস্টিক শিশুদের উন্নয়নের আরো উদ্যোগ নেয়া হবে। কিন্তু, অটিস্টিক শিশুদের জন্য কাজ করছেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন সবার আগে প্রয়োজন অটিস্টিক শিশুদের বিশেষ শিক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা। এই শিক্ষার মাধ্যমে তাদেরকে স্বাধীনভাবে চলার উপযোগী করা সম্ভব।

অটিজম আক্রান্ত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দেয়া গেলে দেখা যাবে তারা সমাজের জন্য দায় নয় বরং সম্পদ হয়ে উঠতে পারে, কারণ অটিজম কোনো রোগ বা প্রতিবন্ধকতা নয় বরং অটিজম শিশুদের প্রতিভা। তারা অনেক প্রতিভাবান হয়ে থাকে, এমন সব প্রতিভা তাদের থাকে যা ভাবা যায় না। যোগাযোগে অক্ষমতার আড়ালে তাদের মধ্যে অসাধারণ প্রতিভা রয়েছে যা কাজে লাগাতে পারলে দেশে ও মানুষের অনেক কল্যাণ হবে। তবে, এই প্রতিভা কাজে লাগানোর জন্য অটিস্টিক শিশুদের বিশেষ ধরণের শিক্ষার একান্ত প্রয়োজন। পর্যাপ্ত সচেতনতা আর সংবেদনশীল আচরণই পারে একজন অটিস্টিকের সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখিকার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close