ইসলামকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া তরুণদের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি

Brown envelope

প্রিয় সুহৃদ,

শুভেচ্ছা নিও।

তোমার পরিবারে ইসলামের চর্চা হয়তো সেভাবে নেই। শৈশব ও কৈশোরে ইসলামী পরিবেশ তুমি পাওনি। পরিবার ও পরিবেশের প্রভাবে তুমিও একসময় তাদের মতোই ছিলে। এরপর যে কারণেই হোক, কোনো একটি সময়ে তুমি তোমার শেকড়ে ফিরে আসতে চাইলে। তোমার স্রষ্টাকে তুমি নতুন করে চিনতে শুরু করলে। তোমার জীবনে নতুন বাঁক এল। তুমি একজন ভালো মুসলিম হওয়ার চেষ্টা শুরু করলে। পদে পদে তোমাকে নানাবিধ বাঁধা-বিপত্তি মোকাবেলা করতে হলো। তুমি হাল ছাড়লে না। আজও তুমি হাল ছাড়নি।

তোমাকে অভিনন্দন। 

তুমি হয়তো মনে করছ একটি ধার্মিক পরিবারে তোমার জন্ম হলে তোমাকে এসব প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হতো না। হতে পারে তোমার ধারণাটি ঠিক। তবে, এমনও অনেক ধার্মিক পরিবার আছে যেখানে বাচ্চাদের এত কড়া শাসনের ওপর রাখা হয় যে, বড় হয়ে এদের অনেকের মধ্যে ইসলামের অনুশাসনের প্রতি এক রকম বিতৃষ্ণা চলে আসে।

ওরকম মাত্রারিতিক্ত কঠোর কোনো ধার্মিক পরিবারে তোমার জন্ম হলে তোমার পরিণতিও যে সেরকম হতো না তা হলফ করে বলা যায় না। তোমার ওপর ইসলামকে কেউ চাপিয়ে দেয়নি। বরং, তুমি ভালোবেসে ইসলামকে গ্রহণ করেছ।

তুমি সৌভাগ্যবান।

ইসলামের প্রতি তোমার আগ্রহ অপরিসীম। একদিকে তোমার অতীত নিয়ে তুমি অনুতপ্ত, অন্যদিকে তোমার বয়স কম। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় তুমি তোমার জীবনকে পর্যন্ত উৎসর্গ করতে তৈরি আছ। তোমার চারপাশের সমাজটাকে নিয়ে তুমি অনেক স্বপ্ন দেখ। তুমি দুনিয়া বদলের ছক কষ।

কিন্তু, যেহেতু তোমার পরিবার ও পরিবেশ থেকে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাগুলো তুমি পাওনি তাই ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে তোমার জ্ঞানগত ভিত্তি খুবই দুর্বল। শুনতে খারাপ লাগলেও এটিই হলো বাস্তবতা।

তোমার এই দুর্বলতার সুযোগে অনেকেই তোমাকে তাদের নিজেদের দলে ভেড়াতে চাইবে। কেউ বলবে এটা করতে হবে। কেউ বলবে ওটা করতে হবে। প্রত্যেকেই কুরআন ও হাদিস থেকে একের পর এক উদ্ধৃতি দিয়ে তোমাকে সম্মোহিত করে ফেলবে। ফলে, তুমি দ্বিধান্বিত হয়ে পড়বে। কখনো এদের কথাকে যৌক্তিক মনে হবে তো কখনো ওদেরটা। এক পর্যায়ে তুমি কোনো এক দিকে ঝুঁকে পড়বে।

আমি নিজেও এসব ধাপের মধ্য দিয়ে গিয়েছি, ফলে তোমার দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব সম্পর্কে আমি পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। আমার বয়স যে অনেক বেশি হয়েছে তা নয়, তবে হতে পারে যে তুমি বয়সে আমার অর্ধেক। আজকাল মানুষ যে পর্যন্ত বাঁচে সেই হিসেবে ধরলে একজন স্বাভাবিক মানুষের জীবনের অর্ধেকটা আমি পার করে ফেলেছি। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি যা শিখেছি আশা করি তা তোমারও কাজে লাগবে।

তোমার মতো বয়সে বা তার কাছাকাছি কোনো এক সময়ে ইসলামকে আমি আবারও খুঁজে পেয়েছিলাম। তখন আমারও ছিল তোমারই মতো দশা। এ এদিকে ডাকে তো ও ওদিকে। কেউ বলে দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনত করতে হবে। কেউ বলে ময়দানে সময় দিতে হবে। কেউ বলে অন্য সব কাজ পরে, আগে আকিদা ঠিক করতে হবে। কেউ আবার বলে কুরআন নিজে নিজে বুঝে পড়া যাবে না, পড়লে গোমরাহ হয়ে যেতে হবে। তোমাকে আজকাল কে কী বলে তা জানি না, তবে এসবের কাছাকাছি কিছুই হয়তো বলে।

আমি কী করেছিলাম জান? আমি ঠিক করেছিলাম নিজে কুরআন ও হাদিস পড়ে ভালোমতো না বুঝে আমি কোনো ইসলামী মুভমেন্টে যোগ দেব না – চাই সেটা দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ হোক বা রাজনৈতিক কর্মকান্ড হোক। তারা আমার দিকে যতই বাঁকা চোখে তাকাক না কেন, আগে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তারপর বোঝা যাবে কে বেশি ঠিক।

এই জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকগুলো বছর কেটে গেল। শেষ পর্যন্ত কোনো ইসলামী মুভমেন্টে আমার যোগ দেওয়া হয়নি। আগামীতেও যোগ দেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। আল্লাহর অন্য কোনো ফয়সালা থেকে থাকলে সেটা ভিন্ন কথা।

তোমাকে আমার মতো হতে হবে তা আমি বলছি না। প্রতিটি মানুষই আলাদা। তাই তোমার সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে। তবে, তুমি যা-ই কর না কেন, জেনে ও বুঝে তারপর সিদ্ধান্ত নিও। হাশরের ময়দানে তোমার কাজের জবাব তোমাকেই দিতে হবে। কোনো ‘বড় ভাই’ সেদিন তোমার পক্ষে কোনো কথা বলবে না। বলবে কীভাবে? সে নিজেই তো “নাফসি, নাফসি” করতে থাকবে।

দুনিয়ার জীবন তো একটিই। ধর্মীয় বিষয়ে এখানে বড় ধরণের ভুল কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তার পরিণতিতে তোমার আখিরাত বরবাদ হয়ে যেতে পারে। তাই আবারও বলছি, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিও।

ফিতনায় পরিপূর্ণ এই শেষ যমানায় তোমার সবচেয়ে বড় বন্ধু হলো কুরআন। তুমি কি মোটামুটি শুদ্ধ তাজউয়ীদ সহকারে কুরআন তিলাওয়াত করতে পার? না পারলে জলদি তা শিখে নাও। অন্য যাবতীয় ধর্মীয় কাজ আপাতত শিকেয় তোল। তাজউয়ীদে বড় আকারের ত্রুটি থেকে থাকলে তোমার সূরা ফাতিহা-ই ঠিক হচ্ছে না। তোমার প্রতিটি নামায ত্রুটিপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। আখিরাতে সবার আগে নেওয়া হবে এই নামাযের হিসাব। নামায ঠিক থাকলে বাদবাকি হিসাব সহজ হয়ে যাবে। সবার আগে তাই এদিকে মন দাও।

তাজউয়ীদ ঠিক করার পর সামান্য হলেও আরবি ভাষা শেখার দিকে মন দাও। বেশি না, নামাযে যা নিয়মিত পড়া হয় তা বুঝতে পারলেও আপাতত চলবে। নামাযের সাথে সংশ্লিষ্ট মাসলা-মাসায়েল ভালো করে শিখে নাও। এসব ‘সামান্য বিষয়’ নিয়ে পড়ে থাকার জন্য কেউ কেউ তোমাকে টিটকারি করবে। তা তারা করুকগে। তোমার আখিরাতের হিসাব তো আর তারা দেবে না।

এরপর ব্যক্তিগত ইবাদাত এবং দৈনন্দিন জীবনে সবসময় লাগে এমন সব বিষয়ের মৌলিক হুকুম-আহকাম শেখার দিকে মনযোগ দাও। কুরআন তিলাওয়াত, যিকির, দরুদ ও নফল ইবাদাতের দিকে মন দাও। নিজের চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা কর। সৎভাবে জীবনযাপন কর। পারলে মানুষকে যথাসাধ্য সাহায্য কর। কারও কোনো ক্ষতি করো না। শুনতে সহজ মনে হলেও এ এক কঠিন সাধনা। এই সাধনাতে ব্রতী না হয়েই সমাজ ও বিশ্ব নিয়ে বড় কোনো ইসলামী কাজ তুমি করে ফেলবে এমন চিন্তা তোমার মাথায় থেকে থাকলে তা এখনই তুমি ঝেটিয়ে বিদেয় করে দাও।

তোমার আশেপাশে যারা তোমার কথা শুনতে পারে তাদের পিছনে মেহনত কর। তোমার উন্নত ও অনুকরণীয় চরিত্র দিয়ে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান কর। রাতারাতি কোনো ফলাফল আশা করো না। বছরের পর বছর ধরে ধৈর্য সহকারে এদের পিছনে তুমি মেহনত করে যাও।

পাশাপাশি, কুরআন বোঝার জন্য চেষ্টা কর। এখান থেকে এক আয়াত, ওখান থেকে আরেক আয়াত – এরকম খাপছাড়াভাবে পড়বে না। পুরো কুরআন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বারবার পড়তে থাক। ভালো কোনো অনুবাদের সাহায্য নাও। অন্তত তিনবার কুরআনের অনুবাদ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা পড়ে যাও। তাড়াহুড়া করো না। কুরআনের কোনো বক্তব্য বুঝতে না পারলে তাফসির গ্রন্থের সাহায্য নাও।

এভাবে এক বছর, দুই বছর, পাঁচ বছর কুরআনের পিছনে লাগাও। তোমার মৃত্যু অবধি কুরআনের অধ্যয়নে লেগে থাকো। আশা করা যায়, আল্লাহর ইচ্ছায় তুমি তুষ থেকে কুড়ো আলাদা করতে পারবে। কুরআনের ভাব ও ভাষ্যের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক কোনো মতবাদ অন্তত কেউ তোমাকে আর গিলিয়ে দিতে পারবে না।

হাদিস পড়তে চাইলে রিয়াদ্বুস-সালিহীন পড়। পারলে ব্যাখ্যাসহ পড়। কিন্তু, ভুলেও হাদিস থেকে কোনো হুকুম-আহকাম নিজে নিজে আহরণ করতে যেও না। এ বিষয়ে আলেমদের সাহায্য নাও। কোনো একটি হাদিস ‘আম নাকি খাস, নাসিখ নাকি মানসুখ তা তো আর তুমি জান না। এই বিষয়ে অন্যান্য সনদে আর কী কী হাদিস আছে তা-ও তুমি জান না। আসলে তুমি তো হাদিসের অনুবাদ পড়ছ। এই অনুবাদটি সঠিক না ভুল তা-ও তুমি জান না। অল্প কয়েকটি হাদিস পড়েই মানুষের সাথে বাদানুবাদে লিপ্ত হয়ো না। তোমার সাথে ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তির পক্ষেও হয়তো হাদিস আছে।

তোমার চারিদিকে ইসলামের নামে অনেক মত ও পথ তুমি দেখতে পাবে। তাদের যুক্তিতে বিচলিত হওয়ার কোনো দরকার তোমার নেই। তুমি সেসব আলেমদের ও তাদের ছাত্রদের অনুসরণ কর যাদের জ্ঞানের পরম্পরা কোনো প্রকার বিচ্ছিন্নতা ব্যতীত সরাসরি আমাদের প্রিয় নবী (ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছেছে। অর্থাৎ, ওই আলেম যার কাছ থেকে ইসলামের জ্ঞান অর্জন করেছেন তিনি, তিনি যার কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন তিনি, এভাবে করে তাবা-তাবেয়ী, তাবেয়ী ও সাহাবী থেকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) পর্যন্ত এই জ্ঞানের পরম্পরা সরাসরি পৌঁছেছে। এটিই হলো ইসলামী জ্ঞানের মূল ধারা, যেখানে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে জ্ঞান সরাসরি সঞ্চারিত হয়। বই তো রেফারেন্স মাত্র।

যেসব গবেষক, লেখক, বক্তা, শিক্ষক ও দাঈ প্রিয় নবী (ﷺ) থেকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সরাসরি সঞ্চারিত এই জ্ঞানের ধারক ও বাহক নন তাদের কাছ থেকে স্পর্শকাতর কোনো বিষয়ে ফতোয়া নেওয়া থেকে সাবধান। যারা মূলধারার আলেমদের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন তাদের কথায় কোনো পাত্তা তুমি দিও না। তারা যে তোমাকে জাহান্নামের আগুনের দিকে ডাকছে না তা তুমি নিশ্চিত হলে কীভাবে?

ইসলামী জ্ঞানের মূলধারার সাথে যতটুকু পার সংযুক্ত থাক। এখানেই তোমার দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ আছে।

তোমাকে শর্টকাট কোনো রাস্তা দেখাতে পারলাম না বলে দুঃখিত। ধৈর্য ধর। লেগে থাক। হঠকারিতা পরিহার করে গঠণমূলক ও অর্থবহ কিছু করার চেষ্টা কর। তোমার অনেক সম্ভাবনা। প্রিয় নবীর (ﷺ) জ্ঞানের সরাসরি ও অবিচ্ছিন্ন উত্তরাধিকারী নয় এমন কারও কথার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তোমার এই সম্ভাবনাকে তুমি নিঃশেষ করে দিও না।

ভালো থাকবে।

তোমারই এক শুভাকাঙ্খী

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close