সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা (৪): সফল সে-ই যে পরকালে সাফল্য পেল

twilight-at-bali

সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া অসংখ্য লাইফ লেসনের মধ্য থেকে ১২টা লাইফ লেসন নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে চার পর্বের এই ধারাবাহিকটিতে। প্রথমদ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে আমি এই সূরাটি থেকে পাওয়া মোট এগারটি লাইফ লেসন শেয়ার করেছিলাম। এগুলো ছিল:  

১) অসাধারণ লক্ষ্য স্থির করুন (Set extraordinary goals);

২) আপনার লক্ষ্যকে মনশ্চক্ষুতে কল্পনা করুন (Visualise your goals);

৩) দৃঢ় তাওয়াক্কুল রাখুন (Have extraordinary faith);

৪) সঠিক বিষয়ে ফোকাস করুন (Focus on the right thing);

৫) গুরুত্বের ক্রমানুসারে কাজ করুন (Prioritise your tasks);

৬) তাড়াহুড়া করবেন না (Do not rush);

৭) পরিস্থিতি বুঝে কোমল অথবা কঠোর আচরণ করুন (Remember the carrot and the stick);

৮) একই ভুল দুইবার করবেন না (Don’t repeat your mistakes);

৯) চুপ হয়ে থাকা শিখুন (Learn to be quiet);

১০) সম্পর্ক তৈরী করুন (Connect!); এবং

১১) ক্ষমা একটি শিল্প, একে শিখুন (Learn the art of forgiveness)।

গত পর্বের শেষে আমরা দেখেছিলাম যে, কানআনে জন্ম নেয়া ইউসুফ(আ) এখন মিসরের সর্বোচ্চ ক্ষমতাশীল আর সম্মানিত ব্যক্তি। বাবা আর ভাইদেরকেও সম্মানের সাথে মিসরে নিয়ে এসেছেন তিনি। একজন মানুষ জীবনে যা চায় তার সবই তো তিনি পেয়ে গেছেন, এবার কিসের জন্য দু’আ করবেন ইউসুফ (আ)? চার পর্বের এই ধারাবাহিকের শেষ পর্বে আজকে আমরা এই প্রশ্নের উত্তর পাব।

শিক্ষা ১২: সফলতার সংজ্ঞা জানুন (Know the definition of success)

জীবনের বড় কোনো সফলতার কথা মনে করে দেখুন তো। আপনি হয়তো অনেক দু’আ করছিলেন – হে আল্লাহ আমি যাতে ‘এত’ সিজিপিএ নিয়ে গ্রাজুয়েশন করতে পারি, তারপর আপনি সেটা অর্জন করেছিলেন। অথবা মনে করুন, আপনার সেই স্মরণীয় চাকরি প্রাপ্তির দিনটি। আল্লাহর কাছে অনেক অনেক দু’আ করছিলেন – হে আল্লাহ আমাকে এই চাকরিটি মিলিয়ে দাও, এই চাকরিটি পেলে আমার জীবনের সবকিছু সেটল হয়ে যাবে! তারপর চাকরিটি হয়তো আপনি পেয়েও গিয়েছিলেন। কিংবা পছন্দের মানুষকে বিয়ে করার জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করেছিলেন – হে আল্লাহ আমি যাতে অমুককে বিয়ে করতে পারি। লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর আপনার আচরণ কেমন হয়েছিলো তা মনে আছে? নতুন এই অর্জন আপনাকে আল্লাহর ইবাদতে আরো মনোযোগী করে তুলেছিলো, নাকি এই অর্জন আপনাকে নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে অহংকারী করে তুলেছিলো?  আসুন দেখা যাক অভাবনীয় সাফল্য অর্জনের পর নবী ইউসুফ(আ)-এর আচরণ কেমন ছিল।

কিসের এখন আর অভাব আছে নবী ইউসুফ(আ)-এর জীবনে? পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্য আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন। মিসরের ইতিহাসের কঠিনতম সময়ে কোষাধ্যক্ষ হিসাবে প্রবল প্রজ্ঞা আর বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি – দীর্ঘ সাত বছরের দুর্ভিক্ষও কাবু করতে পারেনি মিসরের খাদ্যভান্ডারকে। চতুর্দিকে তাঁর প্রশংসা আর প্রশংসা। শুধু তাই নয় – নিজের মা-বাবা আর ভাইদেরকে কানআন থেকে নিয়ে এসে সম্মানের সাথে প্রাচুর্যময় দেশ মিসরের নাগরিকত্ব পাইয়ে দিয়েছেন। ক্ষমতা, টাকা, সম্মান, জনপ্রিয়তা, সুখী পরিবার – কোনো কিছুরই অভাব নেই নবী ইউসুফ(আ)-এর জীবনে। কিন্তু চোখ-ধাঁধানো এই সাফল্য আর ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তাও চুড়ান্ত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারলো না নবী ইউসুফ(আ)-কে;  মহান আল্লাহর কাছে তিনি দু’আ করলেন চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য:

12:101

‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজ্য দান করেছ ও স্বপ্নের ব্যাখা শিক্ষা দিয়েছ। হে আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা! তুমি ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। তুমি আমাকে আত্মসমর্পণকারীর (মুসলিমের) মৃত্যু দাও ও আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করো’। (১২:১০১)

পশ্চিমা সাহিত্যে সফলতার সবচেয়ে বিখ্যাত সংজ্ঞাটি দিয়েছেন আর্ল নাইটিংগেল: ‘Success is the progressive realization of a worthy ideal’[৭]। আর ইসলাম বলে মানুষের একমাত্র worthy ideal হলো মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে আত্মসমর্পণ করা। আল্লাহর ইচ্ছার কাছে যে ব্যক্তি আত্মসমর্পণ করে তার ধর্ম হলো ইসলাম, আর সেই ব্যক্তি হলো মুসলিম।

ইসলামিক জীবন-ব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের মধ্যে দুটি প্রচলিত ভুল ধারণা আছে:

  • এক গ্রুপের ধারণা – ইসলামিক জীবনযাপন মানে সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়া। ইসলাম পালন করতে চাইলে চাকরি-বাকরি ছেড়েছুড়ে মসজিদে মসজিদে ঘুরতে হবে। হাসি-ঠাট্টা করা যাবে না, সবসময় মুখ গোমড়া করে রাখতে হবে, বেড়াতে যাওয়া যাবে না – ইত্যাদি।
  • আরেক গ্রুপের ধারণা – ‘আল্লাহ এক’ বলে স্বীকার করার পর যা ইচ্ছা তা করলেই হয়, ইচ্ছা হলো তো নামাজ পড়লাম ইচ্ছা হলো তো পড়লাম না, সুদ-ঘুষ সহ যে কাজটাকে আমার কাছে সঠিক বলে মনে হবে সেটা করলেই চলবে, কালেমা যখন পড়েছি একদিন না একদিন কোনো এক চিপা দিয়ে তো বেহেশতে যাবই যাব।

এই দুটি ধারণাই ভুল, কারণ ইসলাম একটি মধ্যপন্থী ধর্ম [১২]। ইসলাম পালন করা মানে এই নয় যে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে সারাদিন মসজিদে পড়ে থাকতে হবে। আবার ইসলাম মানে এ-ও নয় যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছেড়ে দিয়ে দিন-রাত চাকরি বা ব্যবসা নিয়ে পড়ে থাকলেও ঠিক আছে। ইসলাম মানে হলো:

  • আল্লাহ যেভাবে ইবাদত করতে বলেছেন সেইভাবে নিয়মিত তাঁর ইবাদত করা [দেখুন: কুরআন ৫১:৫৬]; এবং
  • পড়াশুনা, চাকরি-বাকরি, আচার-ব্যবহার থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য চেষ্টা করা [দেখুন: কুরআন ৬৭:২]।

তবে অবশ্যই ইহকালের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে পরকালের সাফল্যের উপর। আল্লাহ মানুষকে তাঁর ইবাদত করার আত্মিক চাহিদা (Spiritual need) দিয়ে তৈরী করেছেন। মানুষ যখন এই আত্মিক চাহিদাকে উপেক্ষা করে তখন সে বিভিন্ন পার্থিব বস্তু (যেমন – সম্পদ, টাকা, গান-বাজনা, নতুন নতুন গ্যাজেট, নিত্যনতুন হুজুগ ইত্যাদি) দিয়ে নিজের সেই চাহিদা পূরণের চেষ্টা করে। সে কখনোই এভাবে সফল হয় না, বরং তার হৃদয়ের ব্যধি আরো বাড়তেই থাকে।

হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন – ‘হে আদম সন্তান! তুমি আমার ইবাদতে নিজেকে ব্যস্ত রাখো, আমি তোমার হৃদয় প্রাপ্তি দ্বারা পূর্ণ করে দেব এবং দারিদ্র্যতা থেকে তোমাকে দূরে রাখব। আর তুমি যদি তা না করো, তোমার দুই হাতই পূর্ণ থাকবে, কিন্তু তবুও তোমার দারিদ্র্যতা আমি দূর করব না (অর্থাৎ, চাহিদা পূরণ করব না)’। – (তিরমিযী, আহমাদ, ইবনে মাজাহ)

ইসলামিক জীবন-ব্যবস্থায় সফলতার সাথে ওতপ্রোতভাবে যে বিষয়টি জড়িত তা হলো – নিয়ত বা উদ্দেশ্য (intention)। যে কোনো লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রেই একজন মুসলিমের উদ্দেশ্য যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা না হয়ে অন্য কিছু হয়ে থাকে, তাহলে সে পরকালে এই কাজের জন্য কোনো পুরষ্কার পাবে না। আমাদের নিয়ত যদি হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, তখন আমরা যে কোনো হালাল কাজ সম্পাদন করলেই আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরষ্কার পাবো। এমনকি আমরা যখন অফিসে বসে কাজ করি, তখন যদি এই উদ্দেশ্যে কাজ করি যে আমি যে টাকা আয় করছি তা দিয়ে আমি সংসার চালিয়ে আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালন করবো, তাহলে আমরা আল্লাহর থেকে পুরষ্কার পাবো, কিন্তু আমরা যদি শুধু জীবনটাকে ‘এনজয়’ করবো এই উদ্দেশ্য নিয়ে চাকরি করি তাহলে আল্লাহর থেকে কোনো পুরষ্কার পাবো না। আমরা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করবো তখন অফিসে জবাবদিহিতার ভয় না থাকলেও আমরা ঘুষ খাব না, কাজে ফাঁকি দেব না। কারণ, আমরা তখন এই বিশ্বাস নিয়ে কাজ করব যে, আমার বসের চোখকে আমি ফাঁকি দিতে পারলেও আল্লাহকে কখনোই আমি ফাঁকি দিতে পারবো না।

শেষ কথা:

শৃঙ্খলা (Discipline) আসলে কোনো ঐচ্ছিক ব্যাপার নয়। শৃঙ্খলার একমাত্র বিকল্প হলো অনুশোচনা। আমরা যদি আজ নিজেকে নিয়মতান্ত্রিক না করি, কাল আমরা অনুশোচনা করবো। আজ পড়াশুনা না করলে, কালকে এমন চাকরি করতে হবে যা আমাদের ভালো লাগবে না। আজ পরিশ্রম না করলে কাল থাকতে হবে কম বেতনের চাকরি নিয়ে। একইভাবে, এই দুনিয়ায় আমরা যদি আল্লাহর আহবানের প্রতি যদি সাড়া না দেই, আল্লাহও পরকালে আমাদের ডাকে সাড়া দেবেন না যখন আমরা জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে থাকবো।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, অতীত আর ভবিষ্যৎ সমান নয়। বর্তমানের দুর্দশাই ভবিষ্যতের সাফল্যের পথ খুলে দেয়। শিশু ইউসুফকে অন্ধকার কূপে ফেলে দেয়া হয়েছিলো বলেই প্রাচুর্যতা আর আপ্যায়নে তাঁর কৈশোর কেটেছে মন্ত্রীর বাসায়; আবার বছরের পর বছর জেলে বন্দি ছিলেন বলেই পরে রাজার সান্নিধ্যে ইউসুফ আসতে পেরেছিলেন; সাত বছর দুর্ভিক্ষের সাথে লড়াইয়ে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিতে পেরেছিলেন বলেই তিনি হতে পেরেছিলেন মিসরের আজিজ (বাদশাহ)। কাজেই, অতীতের ব্যর্থতাকে চ্যালেঞ্জ করুন, ধৈর্য আর পরিশ্রম নিয়ে লেগে থাকুন, আল্লাহ চাইলে অন্ধকার কূপের আপনিও একদিন সম্মানিত বাদশাহ হতে পারবেন। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।

যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার মুক্তির পথ করে দেবেন। আর তাকে ধারণাতীত উৎস থেকে জীবনের উপকরণ দান করবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হবেন; আল্লাহ তার ইচ্ছা অবশ্যই পূর্ণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্য নির্দিষ্ট মাত্রা স্থির করেছেন।  (সূরা তালাক ৬৫:২-৩)

জীবন আগেও কেটেছে, পরেও কাটবে। আমাদের বাবা-দাদা, তাদের বাবা-দাদা, আবার তাদেরও বাবা-দাদা সবাই কিন্তু ততটুকু আনন্দ-উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা আর আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন ঠিক যতটুকু নিয়ে আজ আমরা করছি। তারা মরে যাওয়ার পর কয়দিন তাদের কথা ভেবে আমরা বেলা কাটিয়েছি? প্রত্যেক রাজার কোনো এক পূর্বপুরুষ দাস ছিলো, আর প্রত্যেক দাসের কোন এক পূর্বপুরুষ রাজা ছিলো – আমরা কে কাকে মনে রেখেছি? একজন কিন্তু সব ঠিকই মনে রেখেছেন, আর তিনি কড়ায়গন্ডায় সব হিসেবও মিলিয়ে দেবেন। আসুন, আমরা তাঁর ইচ্ছার কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করে চুড়ান্ত সাফল্যের দিকে অগ্রসর হই।

রেফারেন্স:

  1. Pearls from Surat Yusuf – Dr. Yasir Qadhi http://muslimmatters.org/2011/04/22/the-best-of-stories-pearls-from-surah-yusuf-part-1/
  2. Leadership Lessons from the Life of Rasoolullah (SAW) – Mirza Yawar Baig
  3. তাফসীর ইবনে কাছির
  4. আহসানুল বায়ান – হাফিয সালাহ উদ্দীন ইউসুফ
  5. Anger Management – Dr. Yasir Qadhi
  6. Notes from a Friend  – Anthony Robbins
  7. The Strangest Secret – Earl Nightingale
  8. Focal Point – Brian Tracy
  9. Description of Prophet Muhammad (Peace Be Upon Him) – Shaykh Hamza Yusuf http://sheikhhamza.com/transcript/Description-of-the-Prophet(SAW)
  10. 10 Rules of  #TwitterFiqh – Shaykh Yahya Ibrahimhttp://muslimmatters.org/2014/01/06/10-rules-twitterfiqh/
  11. Ties of Kinship, Al-Adab Al-Mufrad – Imam Bukharihttp://www.sunnipath.com/library/Hadith/H0003P0002.aspx
  12. In Pursuit of the Middle Path – Dr. Yasir Qadhi http://youtu.be/S1Yrq5JqdhU

মূল লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখকের ব্যক্তিগত ব্লগে

এই ধারাবাহিকের আগের তিনটি পর্ব পড়ুন এখানে:

Advertisements

One thought on “সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা (৪): সফল সে-ই যে পরকালে সাফল্য পেল

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s