আহলে হাদিস ও হানাফিদের মধ্যেকার মনোমালিন্য: আমি যা দেখেছি এবং যেমনটি দেখতে চাই

Flowers

মাত্র এক প্রজন্ম আগের কথা। বৃহত্তর সমাজে ‘হুজুর’ বলে পরিচিত শ্রেণীটিকে বাদ দিলে সাধারণ বাঙালি মুসলিমের মধ্যে ইসলামের বাহ্যিক চর্চা ছিল না বললেই চলে। এরই মধ্যে ঘটে গেল এক নীরব বিপ্লব। বিগত প্রজন্মের উদাসীনতাকে ঝেড়ে ফেলে আমারই মতো অসংখ্য তরুণ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আবারও ফিরে আসতে শুরু করল। সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসলামকে জানার ও মানার আগ্রহ বাড়তে লাগল।

ইসলামকে জানার এই অদম্য আগ্রহ থেকে আমরা অনেকেই আবিষ্কার করলাম যে, একদল আলেমের মতে এটা ঠিক তো আরেকদল আলেমের মতে ওটা ঠিক, কিন্তু তাদের উভয়ের মতে ভিন্নমতের অনুসারীরা যা বলছে তা বেঠিক। চারিদিকে অনেক দল ও উপদল। প্রত্যেকেই নিজ নিজ মতবাদের দিকে মানুষকে আহ্বান করছে। এরই প্রভাবে মাত্র কয়েকদিন আগে ইসলামকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া মানুষজন পর্যন্ত নিজেদের পরহেযগারি ও আখলাকের উন্নতির পরিবর্তে বিভক্তিমূলক ও অপ্রয়োজনীয় সব বিষয়ে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ছে।

ইসলামের খুঁটিনাটি বিভিন্ন বিষয়ে আলেমদের মধ্যেকার এই মতপার্থক্য নিজে কোনো সমস্যা নয়, কেননা একাধিক মানুষ কোনো একটি বিষয় নিয়ে গবেষণা করলে ভিন্ন ভিন্ন উপসংহারে পৌঁছতেই পারেন। কিন্তু, গবেষণাজনিত এই স্বাভাবিক মতপার্থক্য যখন মুসলিমদের মধ্যে পারস্পরিক বিভক্তি ও অনৈক্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন তাকে সমস্যা বলে গণ্য না করে আর কোনো উপায় থাকে না।

গত এক দশকেরও বেশি সময়ে এই বিষয়ে অনেক কিছু আমাকে দেখতে হয়েছে। অনেক কথা আমার কানে এসেছে। তারই ভিত্তিতে বিবদমান উভয় পক্ষের যেসব আচরণ সমস্যাটিকে স্থায়ীভাবে জিইয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে তার একটি সারাংশ আমি এখানে করার চেষ্টা করব। ব্যক্তিগত অনুরাগ ও বিরাগের উর্ধে উঠে নির্মোহভাবে আমি আমার বক্তব্য উপস্থাপন করার জন্য সচেষ্ট থাকব। নবী মুসা (عليه السلام)-এর জীবন থেকে দুটি ঘটনাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখিয়ে বিবদমান উভয় পক্ষের কাছে আমার দুটি প্রত্যাশা ব্যক্ত করে লেখাটি আমি শেষ করব। উভয় পক্ষের কাছে আমার প্রত্যাশা থাকবে:

  • ইসলামী বিষয়ে আপনার থেকে ভিন্নমতাবলম্বী আলেমদের জ্ঞানকেও সম্মান করুন। হতে পারে যে, তাদের সামনে জ্ঞানের এমন কিছু দরজা আল্লাহ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন যা আপনার সামনে উন্মোচিত হয়নি, যেমনটি খিযির (عليه السلام) ও মুসা (عليه السلام)-এর ক্ষেত্রে হয়েছিল।
  • নম্র আচরণ করুন। বিনয়ী হোন। আপনার থেকে ভিন্ন মতের অনুসারী আলেমরা ফিরাউনের চেয়ে অধম নন। আপনি নিজেও মুসা (عليه السلام)-এর চেয়ে উত্তম নন।

এবার বিস্তারিত আলোচনার পালা।

পক্ষ ১: হাদিসের দোহাই দিয়ে বিভক্তি        

সেদিন ঢাকার একটি মসজিদে গিয়েছিলাম জুমু’আর নামায আদায় করতে। সেখানকার প্রথা অনুযায়ী ফরয নামাযের শেষে ইমাম সাহেব কয়েকটি লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল সেই মসজিদটিতে ক্বাবলাল-জুমু’আহ চার রাকাত সুন্নত নামায আদায় করতে ‘সময় দেওয়া হয় না কেন’ সেই বিষয়ে। উল্লেখ্য, ঢাকার হাতে গোনা যে কয়েকটা মসজিদে বাংলা ভাষায় খুতবা দেওয়া হয় তার মধ্যে ওই মসজিদটিও অন্তর্ভুক্ত।

উত্তরে ইমাম সাহেব জানালেন যে, নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত কোনো হাদিসে ক্বাবলাল-জুমু’আহ চার রাকাত – এরকম কোনো কথা পাওয়া যায় না। ফলে, ক্বাবলাল-জুমু’আহ চার রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদা বলে আমাদের দেশে যে ধারণা প্রচলিত আছে তা সঠিক নয়। মুসল্লিরা আযানের পর মসজিদে আসবেন। এরপর খুতবা শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত যতটুকু পারেন ততটুকু পর্যন্ত নফল নামায আদায় করবেন। সেটা দুই রাকাত হতে পারে, আবার ১২ রাকাতও হতে পারে।

বেলা ঠিক সাড়ে ১২টায় সেখানকার খতিব সাহেব খুতবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে মিম্বরে আরোহণ করেন। আরবি ও বাংলা মিলিয়ে খুতবা চলে, যদিও বেশিরভাগ কথা থাকে বাংলায়। বেলা সোয়া ১টার দিকে ইকামত দেওয়া হয়। ফলে, খুতবা শুরু হওয়ার আগে কেউ ক্বাবলাল-জুমু’আহ আদায় করতে চাইলে তাকে সাড়ে ১২টা বাজার বেশ কয়েক মিনিট আগেই মসজিদে প্রবেশ করতে হবে।

ইমাম সাহেবের ওই উত্তরে মসজিদে উপস্থিত সাধারণ একজন মুসল্লি দ্বিধান্বিত হয়ে আমাকে বললেন যে, এভাবে এটা নেই ওটা নেই এরকম করতে করতে ইসলামের কিছুই তো আর একসময় অবশিষ্ট থাকবে না! তার এভাবে অবাক হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়, কেননা আমাদের দেশের মুসলিমরা একেবারে ছোটবেলা থেকে জেনে আসছে যে জুমু’আর ফরয নামাযের আগে চার রাকাত ক্বাবলাল-জুমু’আহ আর ফরয নামাযের পরে চার রাকাত বা’দাল-জুমু’আহ হলো সুন্নতে মুআক্কাদা।

সালাফি মতাদর্শের সাথে আমার পূর্ব পরিচয় থাকার সুবাদে ইমাম সাহেবের এই মতটির সাথে আমি আগে থেকেই পরিচিত ছিলাম। কিন্তু, অধিকাংশ হানাফি মাযহাবের অনুসারী একটি দেশে মতটি বেশিরভাগ মানুষের অজানা। ফলে, সাধারণ মুসল্লিদের সন্দেহের উদ্রেক হওয়া এক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক।

তবে, হানাফিরা যেহেতু একে সুন্নতে মুআক্কাদা বলছেন তাই তাদের কথার কোনো ভিত্তি আছে কি না সেটাও একটু খতিয়ে দেখা দরকার। অন্যথায় তাদের প্রতি বেইনসাফি করা হবে। এ বিষয়ে হানাফিদের দিক থেকে যে বর্ণনাগুলো তাদের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় তার মধ্যে মাত্র দুটি এখানে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছি।

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন যে, নবী (ﷺ) জুমু’আর (ফরয নামাযের) আগে চার রাকাত পড়তেন। [সুনান ইবনু মাজাহ]

আবু আব্দুর রহমান আস-সুলামী (রাহ.) বর্ণনা করেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) আমাদেরকে জুমু’আর (ফরয নামাযের) আগে চার রাকাত এবং জুমু’আর (ফরয নামাযের) পরে চার রাকাত পড়ার আদেশ করতেন। পরে যখন আলী (রা.) আগমন করলেন তখন তিনি আমাদেরকে জুমু’আর (ফরয নামাযের) পরে প্রথমে দুই রাকাত এরপর চার রাকাত পড়ার আদেশ করেন। [মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক]

সুনান ইবনু মাজাহর এই হাদিসটির সনদ দুর্বল হলেও মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক-এ সংকলিত এই বর্ণনাটি এবং ভিন্ন একাধিক সংকলনে লিপিবদ্ধ এরকম আরও কয়েকটি বর্ণনা অনেক বিশিষ্ট আলেমের মতে নির্ভরযোগ্য এবং প্রমাণ হিসেবে গ্রহণীয়। অতএব, চার রাকাত ক্বাবলাল-জুমু’আর পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না বললে সেক্ষেত্রে সত্যের অপলাপ হওয়ার একটি সম্ভাবনা থেকে যায়।

“হাদিসের দোহাই দিয়ে বিভক্তি” শিরোনামে এতক্ষণ পর্যন্ত যাদের কথা আলোচনা করলাম – যারা প্রায়ই বলে থাকেন যে, এই বিষয়ে কোনো সহিহ হাদিস নেই, ওই বিষয়ে কোনো সহিহ হাদিস নেই – তারা মূলত সালাফি ও আহলে হাদিস মতাদর্শের অনুসারী। আমাদের দেশে সালাফির সংখ্যা খুব বেশি না হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আহলে হাদিস মতাবলম্বী অনেকদিন ধরে বসবাস করে আসছেন। তারা যা বলেন তা কেন বলেন তা বুঝতে হলে তাদের মতাদর্শ ও কর্মপন্থা সম্পর্কে কিছু ধারণা আমাদের থাকা দরকার।

আহলে হাদিস: সংক্ষিপ্ত পরিচিতি   

আমাদের দেশে আহলে হাদিস মতাদর্শের অনুসারী যারা আছেন তারা কুরআন ও সহিহ সনদে বর্ণিত হাদিসকে ইসলামের প্রতিটি ক্ষেত্রের বিধিবিধান ও দিকনির্দেশনা আহরণের ক্ষেত্রে প্রধানতম উৎস বলে বিবেচনা করেন। কিয়াস এবং ফিকহি মাযহাবসমূহের ব্যবহৃত নানাবিধ উসুলের ব্যাপারে তারা আগ্রহী নন। হাদিস গ্রন্থগুলোর মধ্যে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমকে তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। অন্যান্য হাদিস গ্রন্থগুলোর মধ্যে সহিহ সনদে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে শুধুমাত্র সেগুলো তারা গ্রহণ করেন এবং জাল হাদিসের পাশাপাশি দুর্বল সনদে বর্ণিত হাদিসগুলোও তারা বর্জন করে চলেন। আলেমদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষদেরও হাদিস পড়তে তারা ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেন।

আহলে হাদিস মতাবলম্বীরা তাকলিদ অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জন্য আলেমদের অন্ধভাবে অনুসরণ করার ঘোর বিরোধী। তবে, তাকলিদের বিরোধিতা করলেও হাদিসের বিশুদ্ধতা বা অশুদ্ধতা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কিছু হাদিস বিশেষজ্ঞের তাকলিদ তাদের করতেই হয়। সেই আলেম যে হাদিসকে সহিহ বলে রায় দিচ্ছেন তাকে তারা সহিহ বলে মেনে নিচ্ছেন, যেটাকে দুর্বল সাব্যস্ত করছেন সেটাকে তারা দুর্বল বলেই গণ্য করছেন।

সরাসরি হাদিস পড়ে সেই অনুযায়ী চলার বিষয়টা বেশ রোমাঞ্চকর। আমাদের নবী (ﷺ) এভাবে এই কাজটি করেছেন, আমিও ঠিক সেভাবেই তা করার চেষ্টা করছি। এতে অন্তরে যে তৃপ্তি পাওয়া যায় তার কোনো তুলনা হয় না।

কিন্তু …

সাধারণ মানুষ যেহেতু কোনো একটি বিষয়ে বর্ণিত প্রতিটি হাদিস সম্পর্কে অবহিত নয় তাই আরেকদিক থেকে দেখলে বিষয়টি খুবই বিপদজনক। হতে পারে যে: (১) আমি যে হাদিসটি পড়েছি সেটির হুকুম অন্যত্র বর্ণিত আরেকটি হাদিস দ্বারা রহিত হয়ে গেছে; অথবা (২) সেটি কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য; অথবা (৩) কাজটি একাধিক উপায়ে করা যায়; অথবা (৪) সাহাবীরা এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন বটে তবে নিজেরা এর ওপর আমল করেননি। বিশিষ্ট আলেমরা হাদিসটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সেটা না জানলেও অধিকাংশ সময়ে হাদিসের ভুল প্রয়োগের আশঙ্কা থেকে যায়।

এসব বিষয়ে জানতে আহলে হাদিস মতাবলম্বীরা তাদের নিজেদের ঘরানার আলেমদের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন। দুঃখজনকভাবে, এই আলেমদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের অনুসারীদের মনের মধ্যে এমন একটি ধারণা বদ্ধমূল করে দেন যে, একমাত্র তারাই সুন্নাহ ও হাদিসের প্রকৃত অনুসারী এবং সমাজের বাদবাকি মুসলিম যারা আছে তারা সবাই ভুল পথের ওপর আছে। এজন্য প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যে অস্ত্রটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় তা হলো: “এই বিষয়ে কোনো সহিহ হাদিস নেই”।

নিজের মতবাদের অন্ধ অনুসারীরা যতই বাহবা দিক না কেন, বিবেকসম্পন্ন কোনো অনুসারীর কাছে যখন প্রতিভাত হয়ে উঠবে যে এতদিন ধরে কোনো কোনো বিষয়ে তাকে ভুল বোঝানো হয়েছে – যেমনটি একটু আগে বর্ণিত ইমাম সাহেবের বক্তব্যের ক্ষেত্রে হয়েছে, যিনি বলেছিলেন ক্বাবলাল-জুমু’আহ চার রাকাত সংক্রান্ত কোনো সহিহ হাদিস নেই, কিন্তু পরে যাচাই করে দেখা গেছে যে সেই বিষয়ে নির্ভরযোগ্য হাদিস আছে – তখন সেই আলেম তো বটেই এমনকি সেই গোটা মতধারার প্রতি তার আস্থার একটি সঙ্কট তৈরি হবে।

মনে করার কোনো কারণ নেই যে, একবার আস্থার এই সঙ্কট তৈরি হলে সহজে তা কাটিয়ে ওঠা যাবে। আমার জীবনের যে সময়টিতে আহলে হাদিস মতাদর্শের কাছাকাছি মতবাদ সালাফি ঘরানার দ্বারা আমি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ও আচ্ছন্ন ছিলাম তখন শা’বান মাসের মধ্যম রজনী, যাকে আমাদের এখানে শবে বরাত বলে, তার সম্পর্কে আমি পড়তাম যে, এই রাতের গুরুত্ব সাব্যস্ত করে যেসব হাদিস বর্ণনা করা হয় সেগুলো হয় জাল অথবা অতি দুর্বল বর্ণনা। আমি নিজেও তা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম। অনেক পরে আমি জানতে পারলাম যে, এমনকি ইমাম নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী পর্যন্ত – যাকে তারা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় হাদিস বিশেষজ্ঞ বলে মনে করেন – এই রাতের গুরুত্ব সম্পর্কিত কিছু হাদিসকে নির্ভরযোগ্য বলে মত দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সালাফি ও আহলে হাদিসরা যার চিন্তাধারা দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত সেই ইমাম ইবনে তায়মিয়া পর্যন্ত এই রাতের ফযিলত স্বীকার করেছেন। এসব জানার পর আমার মনে হয়েছিল যে, এতদিন ধরে আমি প্রতারিত হয়ে এসেছি। আস্থায় সেই যে চিড় ধরেছিল তা আর জোড়া লাগেনি।

অতএব, নির্ভরযোগ্য অনেক হাদিসকে এভাবে অনির্ভরযোগ্য বানিয়ে দিলে আখেরে তা সালাফি ও আহলে হাদিসদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিই বয়ে নিয়ে আসবে।

পক্ষ ২: মাযহাবের দোহাই দিয়ে বিভক্তি       

নানাবিধ ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে আমাদের এই অঞ্চলে ইসলাম ও হানাফি মাযহাব অনেকটা সমার্থক হয়ে গেছে। যেসব মুসলিম শাসকেরা প্রায় আটশ’ বছর ধরে ভারতবর্ষ শাসন করেছিলেন তাদের বেশিরভাগই ছিলেন হানাফি মাযহাবের অনুসারী। যেসব সুফি ধর্মপ্রচারক ও মুজাহিদদের হাত ধরে এই ভূখন্ডে ইসলাম এসেছে তারা প্রায় সবাই ছিলেন হানাফি। প্রযুক্তির কল্যাণে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ার আগে পর্যন্ত ইসলাম যে একাধিক বৈধ উপায়ে চর্চা করা যায় তা এখানকার সাধারণ মানুষ বা আলেম কেউই সামনাসামনি দেখেননি বললেই চলে।

এখন, আহলে হাদিসদের বেশ কিছু ধর্মীয় আমল হানাফিদের থেকে দৃশ্যমানভাবে আলাদা। যেমন: তারা নামাযে বুকে হাত বাঁধেন, সশব্দে ‘আমিন’ বলেন, রুকুতে যাওয়ার আগে ও রুকু থেকে উঠে দুই হাত উত্তোলন করেন ইত্যাদি। তাদের নিজস্ব মসজিদ থেকে অন্যান্য মসজিদের আগে ফজর, যোহর, আসর ও মাগরিবের আযান দেওয়া হয়। আসরের আযান তো প্রায় এক ঘন্টা বা তারও আগে দেওয়া হয়। ইকামতের শব্দগুলো দুইবার করে না বলে তারা একবার করে বলেন। অন্যদের চেয়ে বেশ কয়েক মিনিট আগে ইফতার করেন। রমযান মাসে বিশ রাকাতের বদলে আট রাকাত তারাবীর নামায আদায় করেন। ওযুর সময় বর্তমানে প্রচলিত কাপড়ের মোজার ওপর মাসেহ করাকে বৈধ মনে করেন। সর্বোপরি, নির্দিষ্ট কোনো ফিকহি মাযহাব মানার পক্ষপাতী তারা নন।

গত দুই শতাব্দীর কিছু কম সময় ধরে আহলে হাদিস মতাবলম্বীরা ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের নিজস্ব কায়দায় ইসলাম চর্চা করে আসছেন। তাদের এই আমলগুলো যেহেতু দৃশ্যমানভাবে আলাদা তাই তাদেরকে সহজেই হানাফিদের থেকে পৃথক করে ফেলা যায়। শুরু থেকেই সংখ্যাগুরু হানাফিদের অনেকে তাদেরকে ‘দলছুট’ এবং ‘মূলধারা থেকে বিচ্যুত’ বলে গণ্য করে এসেছেন। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের আর্থিক ও অন্যান্য আনুকূল্য এবং অন্যদিকে স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে গত এক-দুই দশকে সালাফি ও আহলে হাদিস মতধারা বিশেষত আমাদের দেশের বড় কয়েকটি শহরে ব্যাপক আকারে প্রসার লাভ করেছে। ফলে, সাম্প্রতিককালে অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে মসজিদসমূহে তারা অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। তাদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে হানাফিদের কট্টর অংশের সঙ্গে তাদের সংঘাতও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এতে করে কোথাও কোথাও তাদেরকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ঢাকার একটি বড় মাদ্রাসার সাথে সংলগ্ন মসজিদের এক ঘটনা একবার আমার কানে এসেছিল, যেখানে নামাযের মধ্যে সশব্দে আমিন বলার ‘অপরাধে’ একজনকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ওই একই মসজিদে সালাফি কায়দায় নামায আদায় করার কারণে ওই মাদ্রাসারই কেউ একজন রেগে গিয়ে সেই মুসল্লির কাছে কৈফিয়ত তলব করেছিলেন। ওই ভুক্তভোগী নিজে ঘটনাটি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, ফলে এতে অবিশ্বাস করার কিছু নেই।

সমস্যাটি ওই মাদ্রাসার কি না জানি না, তবে সেখান থেকে পাশ করা একজন মাওলানা সাহেব ‘আহলে হাদিস ফিতনা’ বিরোধী ওয়াজ এবং লেখালেখি করে একটি মহলে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তারই মতো আরেকজন বক্তার মতে কাদিয়ানি, শিয়া ও আহলে হাদিস হলো একই পর্যায়ের ফিতনা।

বর্তমানে ‘আহলে হাদিস ফিতনা’ বিরোধী এই গোষ্ঠীর গাত্রদাহের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু হলেন ডা. জাকির নায়েক এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত পিস টিভি। মাদ্রাসা ঘরানা থেকে পড়াশোনা করা অনেকের কথাবার্তা গত বেশ কয়েক বছর ধরে আমি ফেসবুকে পর্যবেক্ষণ করছি। এদের কারও কারও মতে আজকের দিনে মুসলিম সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় ফিতনা হলেন ডা. জাকির নায়েক। ঠুনকো অজুহাতে পিস টিভি নিষিদ্ধ হওয়ার পর এদেরেকে দৃষ্টিকটুভাবে আনন্দিত হতে দেখা গেছে।

এই ঘরানার সবচেয়ে চরমপন্থী অনুসারী যারা আছেন তাদের কেউ কেউ মক্কার মসজিদুল হারামের কোনো কোনো ইমামের পিছনে নামায আদায় করাকে পর্যন্ত বৈধ বলে মনে করেন না, কারণ ওই ইমাম সাহেবদের দাঁড়ির দৈর্ঘ্য তাদের মতে ঠিক নেই।

এই মানসিকতাটি যদি নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে উৎসারিত হয়ে থাকে তাহলে সেই শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার আজ সময়ের দাবী। নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষকের কাছ থেকে এই মানসিকতা সঞ্চারিত হয়ে থাকলে সেই মানসিকতার পরিবর্তন আবশ্যক। মতপার্থক্যমূলক কতিপয় বিষয়ে ভিন্ন আরেকটি মত অনুসরণ করার কারণে সেই মতের অনুসারীদের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন আচরণ করা এবং তাদেরকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখা মুসলিম ভ্রাতৃত্বের পরিপন্থী। আর তাছাড়া তারা যেভাবে ইসলাম অনুসরণ করছেন তার পক্ষেও তো হাদিস এবং সাহাবী ও সালাফদের থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত বর্ণনা আছে। কেউ এভাবে বুঝেছেন, কেউ ওভাবে; কেউ এভাবে মানছেন, কেউ ওভাবে – স্রেফ এই ভিন্নতার কারণে হানাফিদের মধ্যে যারা তীব্রভাবে দলান্ধ তারা যে দৃষ্টিতে সালাফি ও আহলে হাদিসদের দেখেন তা অগ্রহণযোগ্য।

বিতর্ক হতেই পারে, কিন্তু বিদ্বেষ অবশ্যই বর্জনীয়। দুঃখজনকভাবে, সৌহার্দ বজায় রেখে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে বিদ্বেষটাই আজকাল বেশি দেখা যাচ্ছে। যেহেতু হানাফিরা আমাদের দেশে সংখ্যাগুরু এবং সালাফি ও আহলে হাদিসরা সংখ্যায় অনেক কম তাই এ বিষয়ে হানাফিদের দায়িত্ব তাদের প্রতিপক্ষের তুলনায় অনেক বেশি।

হানাফি মাযহাব: একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি   

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমরা বেশিরভাগই হানাফি মাযহাবের অনুসারী। সরাসরি কুরআন ও হাদিস পড়ে ইসলামের বিধিবিধান ও দিকনির্দেশনা নিজে নিজে আহরণের পরিবর্তে তারা ইসলামের প্রাথমিক যুগের প্রসিদ্ধ কিছু বিশেষজ্ঞ আলেমের তাকলিদ করার পক্ষপাতী। এক্ষেত্রে কুফার অধিবাসী ইমাম আবু হানিফা (জন্ম ৮৫ হিজরি) এবং তাঁর প্রধানতম ছাত্র আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ আশ-শায়বানি এবং পরবর্তী প্রতিটি প্রজন্মে ফিকহি বিষয়ে তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারীদের মতামতের ভিত্তিতে ইসলামের হুকুম-আহকাম মেনে চলার চেষ্টা তারা করেন।

হানাফি মাযহাব মানে ব্যক্তি আবু হানিফার অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং তিনি এবং তাঁর ছাত্ররা যে মূলনীতি বা উসুলের ভিত্তিতে ইসলামের হুকুম-আহকাম আহরণ করতেন সেই উসুলের অনুসরণ করা। বলা হয়ে থাকে যে, ইমাম আবু ইউসুফ এবং ইমাম মুহাম্মাদ আশ-শায়বানি সম্মিলিতভাবে অথবা আলাদা আলাদাভাবে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিষয়ে মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফার মতের বিপরীতে রায় দিয়ে গেছেন। যেহেতু একই উসুল ব্যবহার করে এই ভিন্নমতগুলো এসেছে তাই সেগুলোও হানাফি মাযহাবের অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে, আজকের দিনেও কোনো গবেষক যদি সেই একই উসুল ব্যবহার করে নতুন কোনো বিষয়ে কোনো মত ব্যক্ত করেন তাহলে সেই মতটিও হানাফি মাযহাবের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।

কালের আবর্তনে অন্যান্য বিষয়ের মতো হানাফি মাযহাবও বিবর্ধিত হয়েছে। এই মাযহাবের প্রাথমিক যুগের মতসমূহের চাইতে পরিবর্তী সময়ের মতামতে অনেক বেশি শর্তাবলী যুক্ত হয়েছে। আবার, আরবের হানাফি আলেমদের মধ্যে মানুষের জন্য সহজ করে দেওয়ার যে প্রবণতা দেখা যায় তা ভারতীয় উপমহাদেশের হানাফি আলেমদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না।

আমাদের এই অঞ্চলে হানাফিরা দেওবন্দি ও ব্রেলভী এই দুই ভাগে বিভক্ত। এদের উভয়েই হানাফি মাযহাব অনুসরণের ব্যাপারে কঠোর হলেও একে অন্যকে পথভ্রষ্ট বলে মনে করে। আমাদের দেশের কওমি মাদ্রাসা এবং তাবলীগ জামাআতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেওবন্দি ঘরানার অনুসারী। তারা নিজেদেরকে ‘আহলে হক’ বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে, বিভিন্ন মাযার ও খানকার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হলেন ব্রেলভী ঘরানার অনুসারী। নিজেদেরকে তারা ‘ছুন্নি’ বলেও পরিচয় দিয়ে থাকেন।

কোনো একটি মাযহাবের ভিত্তিতে মানুষকে যখন ইসলামের হুকুম-আহকাম শেখানো হয় তখন প্রতিটি মতের পক্ষে হাদিসভিত্তিক প্রমাণসমূহ সাধারণত উল্লেখ করা হয় না। কী করতে হবে আর কী করা যাবে না কেবল সেটা বলে দেওয়া হয়। ফলে, অল্প সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় করণীয় ও বর্জনীয় কাজসমূহ শিখে ফেলতে পারে।

তবে …

এভাবে শেখালে সাধারণ মানুষের সময় বাঁচলেও কোনটি সরাসরি আল্লাহর নাযিল করা প্রত্যাদেশ এবং কোনটি মানুষের মত তা বলে না দেওয়ার কারণে কোন বিষয়টি অপরিবর্তনীয় এবং কোন বিষয়ে দ্বিতীয় চিন্তার সুযোগ আছে তা মানুষ বুঝতে পারে না।

বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ তা একটা উদাহরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে বলছি। নামায সঠিক হওয়ার জন্য যে পানি দিয়ে ওযু বা গোসল করা হচ্ছে তা পাক হওয়া জরুরী। পানিতে নাপাকি থাকলে সেই পানি দিয়ে ওযু বা গোসল করে নামায আদায় করা যাবে না। পানির আধার যদি অনেক বড় হয় তাহলে সেই পানিতে সামান্য নাপাকি পড়লেও তার দ্বারা পানির স্বাদ, গন্ধ বা রঙ পরিবর্তিত না হলে সেটিকে পাক পানি বলেই গণ্য করা হবে এবং তার দ্বারা ওযু ও গোসল করা যাবে। আর পানির আধারটি যদি এমন হয় যে সেখানে অল্প পানি ধরে তাহলে সেই সামান্য নাপাকির দ্বারা পানির স্বাদ, গন্ধ বা রঙ যদি পরিবর্তিত নাও হয় তাহলেও তাকে নাপাক পানি বলে গণ্য করা হবে। পানির আধারে অল্প পানি ধরে নাকি বেশি পানি ধরে তা আপেক্ষিক একটি বিষয়। হানাফি মাযহাবের মূলধারার মত হলো পানির আধারটি যদি দৈর্ঘ্যে দশ হাত ও প্রস্থে দশ হাত হয় তাহলে সেটিকে বেশি পানি বলে গণ্য করা হবে এবং এর চেয়ে ছোট হলে অল্প পানি বলে ধরা হবে। এটি হাদিসভিত্তিক কোনো কথা নয়, বরং ইমাম আবু হানিফার ছাত্ররা তাঁদের যুগের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এই রায়টি দিয়েছিলেন যা আজও বইতে শেখানো হচ্ছে। এখন এমনটি হতেই পারে যে, আমি আমার বাড়ির ছাদে নতুন একটা পানির ট্যাংক বসালাম যেটি দৈর্ঘ্যে দশ হাত ও প্রস্থে দশ হাতের চেয়ে কম কিন্তু সেই যুগে ওই মাপের পানির আধারে যে পরিমাণ পানি ধরত তার চেয়ে তিনগুন বেশি পানি আমার ট্যাংকে ধরে। বইয়ের কথা ধরে বসে থাকলে সামান্য এক ফোঁটা নাপাকি সেখানে পড়লেই আমার পুরো ট্যাংকের পানি নাপাক হয়ে যাবে, চাই তাতে যত বেশি পানি ধরুক না কেন।

মাযহাবে এই ধরণের যেসব মতামত আছে – যা সরাসরি হাদিসভিত্তিক নয়, বরং তৎকালীন যুগের বাস্তবতার নিরিখে যা বলা হয়েছিল – তা নিয়ে বর্তমান যুগের বাস্তবতার নিরিখে দ্বিতীয় চিন্তা এবং পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকা উচিত। অন্যথায় অনেক ক্ষেত্রেই তা মানুষের জন্য অসুবিধার কারণ হয়ে উঠতে পারে। সেইসাথে, মাযহাবের মধ্যেই যেসব বিষয়ে একাধিক মত আছে সেসব বিষয়ে প্রয়োজন সাপেক্ষে সহজ মতটি মানার সুযোগ যার দরকার তার জন্য করে দেওয়া উচিত।

উভয় পক্ষের কাছে আমার প্রত্যাশা:

আমাদের দেশে আহলে হাদিস ও হানাফিদের মধ্যে এই যে মতপার্থক্য আমরা আজ দেখছি তা অনেকদিন ধরেই আছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এরই মধ্যে সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ নিয়ে কীভাবে বসবাস করা যায় এবং ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য কল্যাণমূলক কাজ করা যায় সেই প্রচেষ্টা আমাদের চালিয়ে যেতে হবে। দলান্ধতা থেকে আমাদের সবাইকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। আচরণের দিক দিয়ে আমাদেরকে আরও পরিণত হতে হবে। মতের অমিল যেন মনোমালিন্য পর্যন্ত না পৌঁছায় এবং একদল মুসলিম যেন অন্য আরেকদল মুসলিমকে ঘৃণা করতে শুরু না করে সে বিষয়ে সদা সতর্ক থাকতে হবে।

মুসা (عليه السلام) অনেক সম্মানিত একজন নবী হওয়া সত্বেও নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য খিযির (عليه السلام)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। খিযির (عليه السلام)-কে এমন কিছু বিষয়ের জ্ঞান দান করা হয়েছিল যা মুসা (عليه السلام)-কে দেওয়া হয়নি। আহলে হাদিস বলি বা হানাফি, আপনি যে ঘরানার আলেম, তালিবুল-ইলম বা অনুসারী হোন না কেন, আপনাকে তো মুসা (عليه السلام)-এর মতো জ্ঞান দান করা হয়নি। এমনটি কি হতে পারে না যে, আপনি যাকে প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করছেন তার কাছে কোনো কোনো বিষয়ের এমন কিছু জ্ঞান পৌঁছেছে যা এখনও পর্যন্ত আপনার অধরা রয়ে গেছে? অতএব, আপনার সাথে ভিন্নমত পোষণকারী মুসলিম আলেমদের জ্ঞানকেও সম্মান করুন। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখুন।

সবশেষে, আপনার ও আমার মুখের ভাষা নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। নবী মুসা (عليه السلام)-কে আল্লাহ যখন ফিরাউনের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তখন তাঁকে তার সাথে নম্রভাবে কথা বলার আদেশ করেছিলেন। হতে পারে যে, এতে করে সে কথা শুনবে। আজকের দিনে যারা মুসলিমদের ইসলামের দিকে আহ্বান করছেন তারা কেউই নবী মুসা (عليه السلام)-এর চেয়ে উত্তম নন। যাদেরকে উদ্দেশ্য করে এই কথাগুলো তারা বলছেন তারাও ফিরাউনের চেয়ে অধম নয়। এমনকি তারা তো অবিশ্বাসীও নয়। তারাও তো আপনারই মুসলিম ভাই। মুসলিম ভ্রাতৃত্বের খাতিরে হলেও আপনার চেয়ে খানিকটা ভিন্ন মতবাদে বিশ্বাসী আরেকজন মুসলিম ভাইয়ের প্রতি একটু নমনীয় ও সহনশীল কি হওয়া যায় না? আপনার ও আমার মুখের ভাষাকে আরেকটু পরিশীলিত কি করা যায় না?

***

আরও পড়ুন:

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close