দাঁড়ি, হিজাব ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং নারী-পুরুষ পারস্পরিক আচরণবিধি (অনুবাদ)

Abu Aaliyah – Surkheel Sharif-এর “Beards, Hijabs & Body Language: Gender Relations” লেখাটি থেকে অনুদিত। অনুবাদের সময়ে সামান্য পরিমার্জন করা হয়েছে আমাদের পার্সপেক্টিভের সাথে মিল রাখার জন্য। অনুবাদের অনুমতি নেয়া হয়েছে।

Man and woman

নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে ইসলাম কী বলে? এরা একে অপরের সাথে কীভাবে সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রেখে ওঠাবসা ও চলাফেরা করতে পারে? এ বিষয়ে ইসলামী শরীয়ার জ্ঞান ও বিধিনিষেধ কীভাবে প্রতিদিনের জীবনে কাজে লাগানো যায়? এই লেখায় আমরা এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমেই আমি এই বিষয়ে শরীয়ার মূলনীতিগুলো তুলে ধরব। তারপর আমরা নারী-পুরুষ সম্পর্কের ব্যবহারিক ও প্রাসঙ্গিক দিক নিয়ে আলাপ করব।

১. দৃষ্টি নামিয়ে রাখা:

কুরআনের এই আয়াতগুলো এই বিষয়ে কথা শুরু করার জন্য আদর্শ-

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ

‘বিশ্বাসী পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের শালীনতা রক্ষা করে। এটা তাদের জন্য পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন।

এবং বিশ্বাসী নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের শালীনতা রক্ষা করে এবং তারা যেন তাদের অলঙ্কার সচরাচর দৃশ্যমানের থেকে বেশি প্রদর্শন না করে। এবং তারা যেন তাদের মাথার কাপড় তাদের বুকের উপর টেনে রাখে।’ (সূরা আন-নূর: ৩০-৩১)

আমাদের সমসাময়িক সময়ে আধুনিকতা বলতে আমরা যা বুঝি তার কাছে নৈতিকতার পুরুষানুক্রমিক ধারণাগুলো প্রাগৈতিহাসিক/প্রাচীন বলে মনে হয়। বাস্তবেই নৈতিকতার ঐতিহাসিক বেশ কিছু ধ্যানধারণা বর্তমানের বহুল প্রচলিত উদারনৈতিক মতাদর্শের সাথে রীতিমতো সাংঘর্ষিক। এই সংঘর্ষের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলছে। এমন সামাজিক প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের জন্য দৃষ্টি সংযত রাখার ব্যাপারে অসতর্কতা, অমনযোগী হওয়া অথবা একদমই ভুলে যাওয়া খুব সহজ। অথচ দৃষ্টি এড়ানো বা সংযত রাখার ধারণা কুরআনে আছে। আর তাই আমরা যারা বিশ্বাসী, আমাদের এটা মনে রাখতে হবে, মানতে হবে, সম্মান করতে হবে।

এই আয়াত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, হাদীস বিশারদ এবং কুরআনের মুফাসসির ইবন কাসীর বলেন: ‘এটা হলো বিশ্বাসী বান্দাহদের প্রতি মহান আল্লাহর নির্দেশ যেন তারা নিষিদ্ধ সকল জিনিস থেকে তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে। তাদের উচিৎ শুধু বৈধ জিনিসের দিকে তাকানো আর নিষিদ্ধ সবকিছু থেকে চোখ ফিরায়ে রাখা। কারো দৃষ্টি যদি নিষিদ্ধ কোনো কিছুর দিকে ঘটনাক্রমে চলে যায় তাহলে তার কাজ হলো তক্ষুনি চোখ সরিয়ে নেয়া।’[১]

জারির বিন আব্দুল্লাহ আল-বাজালি, রাদিয়াল্লাহু আনহু, বর্ণনা করেন: ‘আমি আল্লাহ্‌র রাসুলকে (সাঃ) অনিচ্ছাকৃত চাহনি সম্বন্ধে জিগ্যেস করলাম। তিনি আমাকে চোখ ফিরিয়ে নিতে আদেশ করলেন।’[২] রাসুলুল্লাহ (সাঃ) একদিন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন: ‘হে আলী, প্রথম দৃষ্টির পর আরেকবার তাকিয়ো না। কারন যদিও প্রথম দৃষ্টির ব্যাপারে তোমার কোনো দোষ ছিল না, দ্বিতীয়বার তাকানোর কোনো অধিকার তোমার নেই।’[৩]

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন: ‘রাস্তায় বসা থেকে সাবধান থেকো।’ সাহাবারা বললেন: একে অন্যের সাথে কথা বলার জন্য তো আমাদের রাস্তায় বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘বসতেই যদি হয়, রাস্তাকে তার প্রাপ্য অধিকার দাও।’ সাহাবারা জানতে চাইলেন: ‘রাস্তার অধিকার কী, হে আল্লাহ্‌র রাসুল?’ তিনি বললেন: ‘দৃষ্টি সংযত রাখ, কারো ক্ষতি করো না, সালামের জবাব দাও, ভালো কাজ করতে বল আর খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে বল।’[৪]

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, দৃষ্টিকে নিচু করা এবং অশ্লীল, অশোভন, অনৈতিক এবং নিষিদ্ধ সবকিছু থেকে চোখকে সংযত রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চোখ হলো অন্তরে পথ। চোখ না নামানোর ফলে মনের ভিতর যেসব নিষিদ্ধ ছবি ঢুকে পড়ে তার থেকে অন্তর বিষিয়ে যায়, নৈতিকতা বিবর্জিত হয় এবং অশান্ত হয়ে ওঠে।

২. মুসলিমদের জন্য কোথাও সহজ করা এবং কোথাও প্রতিবন্ধকতা আরোপের নীতি:

পূর্ববর্তী যুগে বিশ্বাসী লোকদের উপর যেসব বাধ্যবাধকতার বোঝা ছিল অথবা যেসব অতিরিক্ত বোঝা তারা তাদের নিজেদের উপর চাপিয়ে নিয়েছিল সেসব থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য ইসলামের আগমন। এ ব্যাপারে কুরআন বলে:

يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ

‘আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, তোমাদের জন্য জটিলতা চান না।’ (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৫)

কুরআন আরো জানায়:

الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ ۚ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

‘সেসব লোক, যারা এই রাসুলকে অনুসরণ করে, যেই নবী নিরক্ষর, যার সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জিলে বিবরণ দেখতে পায়, তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন ভালো কাজ করতে, বারণ করেন অসৎ কাজ থেকে; তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু বৈধ করেন ও নিষিদ্ধ করেন সব অপবিত্র বস্তু এবং তাদের উপর থেকে বোঝা নামিয়ে দেন এবং তাদের উপর চেপে থাকা দাসত্ব  অপসারণ করেন। যারা তাঁর উপর ঈমান এনেছে, তাঁকে সম্মান করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং সেই আলোর অনুসরণ করেছে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, তারাই সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।’ (সূরা আল-আ’রাফ: ১৫৭)

ইসলাম যেমন অনেক কাজ সহজ করতে এসেছে, তেমনি এটি এসেছে অন্য কিছু কাজের মাত্রা বাড়ায়ে দিতে (to intensify)। এই সহজ করা বা মাত্রা বাড়ায়ে দেয়ার যুক্তি হলো: এর মাধ্যমে আমরা শেষ যুগের — যে যুগে এখন আমরা আছি — বিভ্রান্তি (confusion), আত্মিক দূষণ (spiritual pollution), খেয়ালখুশির দাসত্ব, এবং ‘আমিই ঠিক’ মানসিকতা থেকে উদ্ভুত যুক্তিতর্কের মধ্যেও নিরাপদে পথ চলতে পারি।

যেসব নীতিমালার মাত্রা বাড়ানো হয়েছে তার একটি হলো মদ্যপান এবং মাদকদ্রব্য সেবনের নিষেধাজ্ঞা। আরেকটি হলো নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। নারী ও পুরুষের মধ্যে সম্পর্কের সীমারেখা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কুরআন যে শুধু যিনা (ব্যভিচার/ fornication) ও অন্যান্য অবৈধ যৌন সম্পর্ককে নিষিদ্ধ করেছে, তা নয়। বরং কুরআন প্রবলভাবে ঘোষণা দেয়: وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا   ‘ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। কারণ এটা অশ্লীল কাজ এবং খারাপ পথ।’ (সূরা বানী-ইসরাইল: ৩২) আল-কুরতুবী বলেন: لَا تَقْرَبُوا الزِّنَا- “যিনার কাছেও এসো না” কথাটি “যিনা করো না” বলা থেকে অনেক বেশি জোরালো এবং সর্বব্যাপী। কারণ এই আয়াত শুধু যিনাকেই নিষিদ্ধ করে না, বরং এমন সকল কাজ এবং পথকেও নিষিদ্ধ করে যা যিনার দিকে নিয়ে যায়।[৫] এই আয়াত এবং এমন আরো আয়াত ও হাদীস থেকে উতপত্তি বিকৃত এবং অশুভ পরিণতির পথে “প্রতিবন্ধকতা তৈরির” নীতির।[৬]

৩. শালীনতার গুরুত্ব:

বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামি স্কলাররা গুরুত্ব দেন যথাযথ এবং মর্যাদাপূর্ণ আচরণের উপর (appropriate and dignified conduct)। অন্যভাবে বললে, নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে হবে শালীনতা (modesty), মর্যাদা (dignity) এবং ভদ্রজনোচিত (respectable)- এই মূলনীতির উপর ভিত্তি করে। বাস্তবে ইসলাম নিজেকে উপস্থাপন করে হায়া-র ধর্ম হিসেবে। হায়া মানে হলো- শালীনতা, লজ্জা এবং পরিমিতি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘প্রত্যেক ধর্মেরই একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে, আর ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো হায়া।’[৭] পরের হাদীসে আল্লাহ্‌র রাসুল আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন: ‘হায়া বিশ্বাসের (ঈমানের) একটি শাখা (আল হায়া শু’বাতুন মিন আল-ঈমান)।’[৮] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আরো বর্ণিত আছে: ‘কোনো বিষয়ের মধ্যে হায়া থাকা মানেই হলো তা বিষয়টিকে সৌন্দর্যময় করবে।’[৯]

এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই। যদিও হায়া-কে বাংলায় শালীনতা, লজ্জাশীলতা অথবা বিনয় হিসেবে অনুবাদ করা হয় তথাপি এর মানে ভীতু, ত্রস্ত অথবা সামাজিকভাবে উদ্বিগ্ন বা নিরাপত্তাহীন লোকদের বুঝায় না। হায়া-র আসল মানে হলো: ‘এমন একটি গুণ যা নিন্দনীয় সব কিছু ত্যাগ করতে প্রভাবিত করে (খুলুকুন ইয়াব’আসু ‘আলা ইজতিনাবি’ল-কাবিহ)।’[১০] অথবা যেমনটি ইবন রাজাব আল- হাম্বালী বলেন: ‘যা মানুষকে লজ্জাজনক বা ঘৃণ্য কাজ থেকে বিরত রাখে তা-ই হায়া।’[১১] এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘পূর্ববর্তী নবীদের যেসব কথা এখনো প্রচলিত আছে তার একটি হলো — তোমার যদি হায়া না থাকে তাহলে তোমার যা খুশি তাই কর।’[১২]

ইবন রাজাব আরো লিখেছেন যে, শালীনতা (modesty) আর লজ্জা (shame) দুটি ভিন্ন জিনিস। প্রথমটি মানুষের একটি অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য যার প্রতি মানুষের সহজাত ঝোঁক আছে। দ্বিতীয়টি হলো এক ধরণের শালীনতা (modesty) যা আল্লাহ্‌র ভয় এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে অর্জিত হয় এবং একে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিপালন করে। তিনি ব্যাখ্যা করেন এইভাবে: ‘জেনে রাখো হায়া দুই ধরণের: প্রথমত, এটি একটি সহজাত প্রবৃত্তি যা অর্জন করা যায় না। এটি হলো আল্লাহ্‌ প্রদত্ত একটি মহৎ গুণ যা তিনি তাঁর বান্দাহকে দান করেন। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘হায়া থেকে ভালো বৈ খারাপ কিছুর জন্ম নেয় না’[১৩] কারণ এটি তাকে নোংরা কাজ করতে এবং চরিত্রের হীন দিক প্রকাশে বাধা দেয় এবং প্রেরণা দেয় সম্মানজনক ও পবিত্র আচরণ করতে।…. দ্বিতীয়ত, যা আল্লাহ্‌র জ্ঞান, তাঁর মহত্ত্বের জ্ঞান এবং তিনি যে তাঁর বান্দাহদের খুব কাছে থাকেন সেই সচেতনতা থেকে অর্জিত হয়; এটি বৃদ্ধি পায় এই বিষয়গুলো সম্বন্ধে সবসময় সম্পূর্ণ সচেতন থাকার মাধ্যমে; অর্জিত হয় দৃষ্টির ছলনা ও বুকের গহীনে লুকিয়ে থাকা অসুস্থতা সম্বন্ধে সচেতন থাকার মধ্য দিয়ে। এটি ঈমানের সর্বোচ্চ উৎকর্ষের একটি। প্রকৃতপক্ষে এটি আত্মিক পরিশুদ্ধির সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি (ইহসান)।’[১৪]

সুতরাং বলা যায় যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে পারস্পরিক আচার ব্যবহারে শালীনতাবোধ — হায়া — একটি মুখ্য উপাদান। কারুর মধ্যে সহজাত শালীনতা যদি কম থাকে তাহলে ঈমান থেকে সৃষ্ট শালীনতাবোধ প্রবলভাবে থাকতে হবে। আল্লাহ্‌র ভয় মানুষকে অশালীন ও অশ্লীল কাজ করার আগে দুবার চিন্তা করাবে। আল্লাহ্‌ সব জানেন, সব দেখেন। আল্লাহকে বিশ্বাস করার মানেই হচ্ছে এটা বিশ্বাস করা যে, আমরা এবং যা আমরা করি সবই তাঁর জ্ঞাত। আল্লাহ্‌ দেখেন, মানে আমরা দৃশ্যমান।

৪. মর্যাদাবোধ:

হায়া-র উপর ইসলাম যে পরিমাণ জোরারোপ করে তা নারী-পুরুষ সম্পর্কের বিষয়ে ইসলামের মূলনীতি এবং সীমারেখা নির্ধারণ করে। ইসলামী শারীয়ার আইনকানুন ও নৈতিক শিক্ষায় এই মূলনীতি প্রতিফলিত হয়। হায়া ইসলামের সাথে এতই ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্বন্ধে বলা হয়: ‘তিনি নিজ ঘরে অবস্থানকারী তরুণী কুমারী থেকে বেশি লজ্জাশীল ছিলেন।’[১৫] (কানা নাবিয়ু আশাদ্দা হায়া’আন মিন আল-আদ্রা’ই ফি খিদরিহা) শালীনতার দৃঢ় ভিত্তি ছাড়া কেউ বলতে পারবে না সে সত্যিকারভাবে সুন্নাহ অনুসরণ করছে।

কিন্তু, একালের ধনসর্বস্ব সমাজব্যবস্থায় শালীনতা কোনোই কাজের জিনিস না। অথচ ইসলাম এর উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করে। শুধু তাই না, ইসলামে হায়ার সাথে আরেকটি গুণ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত যার মানে আধুনিক মানুষের পক্ষে বোঝাই কষ্টকর। এটি হচ্ছে: হাইবা – dignity/ respectability- সম্মান বা মর্যাদা বোধ। ইসলামে এই দুই গুণ (শালীনতা ও মর্যাদাবোধ) একে অপরের সাথে এত গভীরভাবে জড়িত যে একটা না থাকলে অন্যটিরও অস্তিত্ব থাকে না। আর এ দুটি যখন থাকে না তখন নেমে আসে আল্লাহ্‌র অসন্তুষ্টি, আধ্যাত্মিকতার পতন এবং নৈতিকতার স্খলন। এর ফলে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটতে থাকে এবং ক্ষতিকর সামাজিক আচরণ দ্রুতবেগে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে ভিক্টোরিয়ান বা এডওয়ার্ডীয় ইংল্যান্ডে মর্যাদাবোধ বলতে একটা সম্মানজনক মুখোশকে বুঝানো হতো, যার নিচে ঢাকা থাকত রাজ্যের সব ভণ্ডামি। এই অবস্থা কতটা সার্বজনীন ছিল তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু বিতর্কের অন্তর্নিহিত সত্য, অর্থাৎ সমাজে সম্মানজনকভাবে চলাফেরা করার যে একটা ধারণা কিম্বা সমাজের এমন একটি আকাঙ্খা যে ‘ভদ্রজনোচিত’ আচরণ বলে কিছু একটা আছে (যে আচরণ ভন্ডামির বিপরীত)- এটাতো আদতে একটা অত্যন্ত ইসলামিক ধারণা! ভদ্রলোক হলেন তিনি যিনি সংযত, বিনয়ী, সহানুভূতিশীল, সজ্জন, সামাজিক মর্যাদাবোধসম্পন্ন এবং সীমারেখা সম্বন্ধে সচেতন; বিশেষ করে বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের সান্নিধ্যে।

ইসলামে আরেকটি ধারণা আছে যার নাম ফুতুওয়াহ বা ‘আত্মিক সৌজন্য’। ফুতুওয়াহ-র ধারণা থেকে সত্যিকার মুসলিম ভদ্রলোকের কীরকম আচরণ হওয়া উচিৎ তা জানা যায়। ফুতুওয়াহ- এই এক শব্দের মধ্যে রয়েছে যাবতীয় সব উন্নত চরিত্রের ধারণা। এর মধ্যে আছে: হাইবাহ বা সম্মান ও মর্যাদাবোধের ধারণা,  আদাব বা পরিশীলিত ও অভিজাত আচরণের ধারণা, অন্যকে নিজের উপর প্রাধান্য দেয়ার ধারণা, সাহসিকতা- উদারতা- এবং আত্মঅহমিকাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়ার ধারণা।

সমাজ এখন আর সত্যিকারের ভদ্রলোকের (true gentleman) কথা বলে না। এটা যেন হারিয়ে যাওয়া দিনের কথা, যার প্রয়োজন এখন ফুরিয়েছে। জাতি হিসেবে এখন আমাদের ভাবতে হবে যে, এর ফলে আমাদের সমাজের উপর কী প্রভাব পড়ছে। তদুপরি, আমরা মুসলিমরা যখন এইসব নীতিতে ছাড় দেয়া শুরু করেছি, আমরা কি দেখছি না যে এই ছেড়ে দেয়ার ফলে অন্যদের কী হয়েছে আর আমাদেরই বা কী হতে পারে? কোথায় যাচ্ছি আমরা?

৫. দাঁড়ি, হিজাব ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ:

অনেক সমাজবিজ্ঞানী ও ধারাভাষ্যকার দেখিয়েছেন যে, ষাটের দশকে পাশ্চাত্যে নৈতিকতার সামাজিক ধারণা এবং ভালো মানুষের সংজ্ঞায় seismic shift বা ওলটপালট করা পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন শুধু ব্যক্তি মননে আসেনি, বরং এই পরিবর্তন এসেছে ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রের সবস্তরে। চনমনে ষাটে (swinging sixty) শালীনতা, মর্যাদাবোধ এবং শিষ্টাচারের ধারণায় নাটকীয় এবং আমূল পরিবর্তন আসতে থাকে। এর আগে এই ধারণাগুলোর পিছনে খ্রিস্টধর্মের একটা ব্যাপক প্রভাব ছিল। এই পরিবর্তনের ফলে পাশ্চাত্যে খ্রিস্টধর্মের পতন আরম্ভ হয় — যে ধর্ম একসময় সেখানকার জাতীয় সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করত এবং ভালো ও মন্দের মাপকাঠি নির্ধারণ করত। এই পরিবর্তনের ফলে পাশ্চাত্যে সম্মানজনক ব্যবহারের উপর থেকে গুরুত্ব সরিয়ে নিয়ে গুরুত্বারোপ করা হয় ব্যক্তির সম্মান পাওয়ার অধিকারের উপর: a shift from respectability to individual’s right to be respected. [১৬]

সমাজ থেকে শালীনতা ও মর্যাদাবোধ হারিয়ে গেলে যেসব ক্ষতি হয় তা থেকে মুসলমানরাও নিরাপদ থাকে না। একটি হাদীসে আছে: ‘শালীনতা আর বিশ্বাস ঘনিষ্ঠ সাথী। একটা যখন উঠে যায়, অন্যটিও তার পিছন পিছন চলে যায়।’[১৭]

খেয়াল করে দেখুন যে, আমরা কিন্তু হিজাব বা নিকাবের মতো বহুল আলোচিত বিষয় নিয়ে কথা বলছি না। কে কী কাপড় পরবে বা কীভাবে পরবে তা নিয়েও আমরা আলোচনা করছি না। আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু আরো অনেক গভীরের। এটা বাহ্যিক বিষয়ের থেকে বেশি অন্তরের। আমরা কথা বলছি আমাদের আচরণ নিয়ে, আমরা কীভাবে চলাফেরা করব তা নিয়ে এবং বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের সাথে চলাফেরায় আমাদের আত্মিক অবস্থা কেমন হবে তা নিয়ে।

এটা খুবই সম্ভব যে একজন নারী হিজাব বা নিকাব পরেন না, কিন্তু তার হায়া ও হাইবা-র ধারণা অত্যন্ত শক্তিশালী। অন্যদিকে আরেকজন নারীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো কাপড়ে ঢাকা থাকা স্বত্বেও তার শালীনতার এই জ্ঞান নাও থাকতে পারে। কর্পোরেট অফিস, প্রাইভেট বা পাবলিক ইউনিভার্সিটি, কফি শপে, বাজারে, শপিং মলে একটু লক্ষ্য করলেই এটা দেখা যায়। ঢাকার বসুন্ধরা শপিং মলই বলেন আর জেদ্দাহ-র আল বাইকের আউটলেটেই বলেন, খেয়াল করলেই এমন নারীর দেখা পাওয়া যায় যার হিজাব বা বোরকা একটা বাহ্যিক শালীনতার আভাস দেয় কিন্তু তার চলাফেরা, দেহভঙ্গী বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ অন্য কিছুর ইঙ্গিত করে। যদিও তাদের বাহ্যিক অবয়বে হায়া বা হাইবার বহিঃপ্রকাশ, তাদের চলনে বলনে বিপরীত বার্তা। এর মানে এই না যে আমরা বলছি হিজাব ছেড়ে দিতে হবে। আমরা বলছি হিজাব এবং শালীন আচরণ একসাথে থাকবে। একটা দেখা যাবে, অন্যটা অনুভব করা যাবে।

এটা ছেলেদের বেলায়ও সমান প্রযোজ্য। একজন মুসলিম পুরুষের দাঁড়ি না-ও থাকতে পারে, কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের সাথে চাল-চলন ও আচার ব্যবহারে সে হয়তো পূর্ণ শালীনতা ও সম্মানজনক ব্যবহার বজায় রাখে। এর উল্টাটাও দেখা যায়। এমন দাঁড়িওয়ালা লোকজনও দেখা যায় যাদের দৃষ্টি তো সংযত নাইই বরং কামুক, lustful। অথবা কাপড়চোপড় টাইট ও revealing। অথবা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ অশোভন এবং flirtatious। এই অসঙ্গতিগুলো এখন প্রায়ই দেখা যায়। এখানেও আমাদের প্রতিক্রিয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই নির্দেশ অমান্য করা নয়: ‘দাঁড়ি বড় কর এবং গোঁফ ছেঁটে রাখ।’[১৮] বরং দাঁড়ি রাখতে হবে, সাথে ভদ্র পোশাক পরতে হবে এবং শালীন আচরণ করতে হবে।

মানুষের ব্যক্তিত্বে এমন বৈপরীত্য ইসলাম চায় না। ইসলাম চায় দৃষ্টির সংযম, খোদাভীতির আত্মীকরন এবং শালীন ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহারের প্রসার — ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্যেই।

৬. নারী-পুরুষ পারস্পরিক আচরণবিধি:

এখন পর্যন্ত আমরা আলাপ করলাম সেসব মূলনীতি নিয়ে যার উপর ভিত্তি করে নারী–পুরুষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা জানলাম কুরআনের দৃষ্টি সংযত রাখার পরামর্শ। আমরা শুনলাম শালীনতা, লজ্জাশীলতা ও মর্যাদাবোধের গুরুত্ব নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু উপদেশ।

কিছু মুসলমানের ধারণা যে, কোনো কোনো মুসলিম দেশে (যেমন সৌদি আরবে) যেরকম কঠোর gender segregation করা হয়, আমাদের সবাইকেও অমনটি করতে হবে। এ ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। এমন আজব কাজের কোনো ভিত্তি নেই, প্রমাণ নেই। বর্তমান পৃথিবীতে কোথাও চালু আছে এমন কোনো কিছুই নকল করে বাস্তবায়ন করার কোনো রকম দায়ভার আমাদের নেই। যা করা দরকার তা হলো রাসুল্লুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন এবং প্রথম প্রজন্মের মুসমানদের জীবন থেকে শিক্ষা ও জ্ঞান নিয়ে সেই সূত্র ধরে আমাদের কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা। ক্লাসিক্যাল ফিকহ-এর অনুশাসনগুলোও আমাদের হুবুহু প্রয়োগ না করলেও চলবে; আমাদের বরং ফিকহী অনুশাসনগুলোর পেছনের যৌক্তিকতা ও অন্তর্দৃষ্টি সম্বন্ধে জানতে হবে এবং সেই আলোকে আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে হবে এ যুগের মতো করে। এখানে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়: ‘ফাকিহ তিনি নন যিনি মানুষকে আল্লাহ্‌র করুণা থেকে নিরাশ করে দেন। ফাকিহ তিনিও নন যিনি মানুষকে গুনাহ করার লাইসেন্স দিয়ে দেন।’[২০]

যেসব মূলনীতি আমরা উপরে উল্লেখ করলাম তার উপর ভিত্তি করে এখন আমরা আরো কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করব যাতে নারী-পুরুষ সম্পর্কের বিষয়টা একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়:

দৃষ্টি নামিয়ে রাখার ব্যাপারটা আগেই আলোচনায় এসেছে। মুফাসসিররা এর ব্যাখ্যায় বলেন যে, সব দৃষ্টিই নিষিদ্ধ বা illicit নয়। এই আয়াতে যেটা বলা হয়েছে সেটা হলো ‘যা কিছুই বেআইনি বা নিষিদ্ধ তার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া।’[২১] ফলে কামুক দৃষ্টি, আকর্ষণ বা অনুরক্তি নিয়ে তাকানো, বা objectifying look — এ সবই নিঃসন্দেহে নিষিদ্ধ, হারাম। একইভাবে নিষিদ্ধ কারো আওরাহ বা নগ্নতার দিকে দৃষ্টি দেয়া।

নিচের হাদীস আমাদের কীভাবে সতর্ক করছে দেখুন: ‘প্রত্যেক মানুষের জন্যই ব্যভিচারের হিস্যা রয়েছে। চোখের ব্যভিচার হচ্ছে দৃষ্টি।’[২২] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে উপদেশ দিয়েছিলেন: ‘প্রথম দৃষ্টির পর দ্বিতীয়বার তাকাবে না। কারণ যদিও প্রথম দৃষ্টির ব্যাপারে তোমার কোনো দায়ভার নেই, দ্বিতীয় দৃষ্টির কিন্তু তোমার কোনো অধিকার নেই।’[২৩]

এই নিয়ম যে শুধু রক্তমাংসের মানুষের বেলায়ই প্রযোজ্য মোটেও তা নয়। আমাদের ভার্চুয়াল জগতের জন্যও একই নিয়ম খাটে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্রে। আধুনিক যুগে আমাদের অফিস-আদালতে, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে আমাদের শিখানো হয় কথা বলার সময় চোখে চোখে তাকাতে। আপাতদৃষ্টিতে এটা ইসলামিক নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক। এরকমক্ষেত্রে আমাদেরকে কৌশলের সাথে এমনভাবে চোখ সরায়ে নিতে হবে যাতে অন্যরা আমাদেরকে অভদ্র বা অশিষ্ট না ভাবে। যদি ইসলামিক নর্মালের থেকে বেশি eye contact রাখতেই হয়, তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই শারিয়ার সীমারেখা মাথায় রেখে তা করতে হবে।

বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে। আমাদের যোগাযোগগুলোর যেন ন্যায়সঙ্গত কারণ থাকে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের ধর্মে সম্বন্ধহীন নর-নারীর মধ্যে মেলামেশা এক্কেবারে নিষিদ্ধ নয়। তবে যখন বা যে অবস্থায়ই যোগাযোগ হোক না কেন তা অবশ্যই বৈধ কারণে ও সৎ উদ্দেশ্যে হতে হবে। কাজের জন্য যোগাযোগ একটা ভালো উদাহরণ। নারী ও পুরুষের মধ্যে পারস্পরিক আচরণ পেশাদার, মার্জিত ও সম্মানজনক হতে হবে। ‘কাজের ফলাফল নিয়তের উপর,’[২৪] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন। বাহ্যিকভাবে আমাদের সম্পর্কগুলোর ন্যায়সঙ্গত কারণ থাকতে পারে, কিন্তু মনের ভেতর একদম অন্য কিছু থাকতেই পারে। যদি মিটিং-এর পেছনে বিপরীত লিঙ্গের কারও দৃষ্টি আকর্ষণ বা ভালো লাগার বাসনা বা নিজের ভালো লাগাকে চরিতার্থ করা হয় তাহলে তো উদ্দেশ্যই ত্রুটিপূর্ণ এবং কাজটি মারাত্মক ভুল। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের যোগাযোগগুলো তো আরো কম উদ্দেশ্যপূর্ণ  হয় এবং বেশিরভাগ সময়ই অসমিচীন (improper) হয়ে থাকে। আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার যোগাযোগগুলো এতই চপল- চটুল – প্রগলভ এবং ইনফর্মাল হয় যে সেগুলোকে ইসলামের আলোকে সমর্থন করা অসম্ভব।

নারী-পুরুষের ইন্টারঅ্যাকশন পাবলিক প্লেইসে হওয়াটা শারিয়ায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘যখনই কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একা থাকে, শয়তান তাদের সাথে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে থাকে।’[২৫] এর আলোকে আমাদের মিটিং ও ইন্টারঅ্যাকশনগুলো  শুধু যে সদুদ্দেশ্যে হতে হবে তাই না, পাবলিক প্লেইসেও হতে হবে। যদি পাবলিক প্লেইস নিশ্চিত করা সম্ভব না হয় তাহলে অবশ্যই তৃতীয় কাউকে থাকতে হবে। অবাঞ্চিত কোনো কিছু হোক আর না হোক, নির্জনতা (খালওয়াহ) গুনাহর কাজ এবং এর থেকে শত মাইল দূরে থাকতে হবে। যখন বিপরীত লিঙ্গের কারও সাথে ফোনে কথা বলতে হবে, বা টেক্সট ম্যাসেজ আদান প্রদান করতে হবে অথবা সোশ্যাল মিডিয়াতে যোগাযোগ করতে হবে, সকল ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ঠিক থাকতে হবে, স্বচ্ছতা থাকতে হবে, পাবলিক হতে হবে এবং সম্মানজনক টোন থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এখন দেখি স্বামী-স্ত্রী একে অপর থেকে নিজের মোবাইল ফোনকে পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রোটেক্টেড রাখে। এটা একদমই অনুচিত। এর ফলে একধরনের খালওয়া-র সৃষ্টি হয় যা অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। শারিয়ার দিক থেকে চিন্তা করলে ভয়েস কল থেকে টেক্সট ম্যাসেজ উত্তম, আর ভিডিও কল থেকে উত্তম ভয়েস কল। কথোপকথনের দৈর্ঘ্যের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে এবং অন্য কারো সামনে কথা বলা উত্তম।

কথাবার্তায় শালীন ও পরিমিত হতে হবে। দুই লিঙ্গের মধ্যে অপেক্ষাকৃত আকর্ষণীয় হওয়াতে মহিলাদের বলা হয়েছে এমন আচরণ না করতে যা পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে:

وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ

‘তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশের জন্য জোরে জোরে পা না ফেলে’ (সূরা নূর: ৩১)।

তাদেরকে আরো বলা হয়েছে:

إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا

‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তাহলে কোমল স্বরে কথা বলো না, যাতে যাদের মনে রোগ আছে তারা যেন তোমাদের বাসনা করে না বসে; বরং সম্মানজনকভাবে কথা বল।’ (সূরা আল-আহযাব: ৩২)

সম্মানজনকভাবে কথা বলা (قُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا)-কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে: ‘উপযুক্ত, শালীন ও সম্মানার্হ কথা’ এবং ‘এমন কথা নয় যা কোমল; এর মানে হচ্ছে নারীরা নিজের স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সাথে এমনভাবে কথা বলবে না যেভাবে কোমলভাবে সে তার স্বামীর সাথে কথা বলবে।’[২৬] এর মানে এই না যে, বিপরীত লিঙ্গের কারও সাথে কথা বলার বেলায় তাকে অভদ্রের মতো কথা বলতে হবে, চাঁচাছোলা হতে হবে, বা এক শব্দে কথা বলতে হবে। যা করতে হবে তা হলো শুধুমাত্র ন্যায়সঙ্গত কারণে কথা বলতে হবে এবং পেশাদার, অকপট ও সম্মানজনক আচরণ করতে হবে।

এত কথার পরে আমাদের ফাইনাল প্রটোকল পাঠকের কাছে আশ্চর্যের কিছু হবে না (আশা করি): নো টাচিং, যেকোনো প্রকার স্পর্শ নিষেধ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করেছেন: ‘মাহরাম নয় এমন কোনো মহিলাকে স্পর্শ করা অপেক্ষা মাথায় লোহার সুঁইয়ের খোঁচা খাওয়া উত্তম।’[২৭] অন্য এক হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘আমি মহিলাদের সাথে হ্যান্ডশেক করি না।’[২৮] স্পর্শ এবং হ্যান্ডশেকের এইসব নিষেধাজ্ঞা আমাদের আত্মিক ও সামাজিক কল্যাণের জন্যই এসেছে। তাই আমাদের এই নিষেধাজ্ঞাগুলোকে মেনে চলতে হবে। বিপরীত লিঙ্গের কারো বাড়িয়ে দেয়া হাত বিনম্রভাবে, ক্রিয়েটিভ উপায়ে এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে যাতে করে বিদ্বেষের জন্ম না হয় বা বেমানান না লাগে। যদি পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে কখনো হ্যান্ডশেক করেই ফেলতে হয় তাহলে সাথে সাথে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে কখনো আর এমন ভুল না করার প্রতীজ্ঞা করতে হবে।

এই হলো সংক্ষেপে এ বিষয়ে ইসলামের বক্তব্য। ইসলামের নারী-পুরুষ সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো শালীনতা, আত্মসংবরণ এবং সম্ভ্রান্ত ব্যবহারে। এখনকার সময়ে যখন বিনয় ও দৃষ্টি সংযত করাকে অদ্ভুত বলে ধরে নেয়া হয় — কখনো এমনকি নিপীড়নমূলক মনে করা হয় — তখন আমাদের, অর্থাৎ মুসলামানদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে এবং আধ্যাত্মিকতায় মনযোগী হতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক অনন্য সাফল্য এই যে তিনি নারী ও পুরুষকে শিখিয়েছেন একে ওপরের থেকে দৃষ্টিকে সংযত রাখতে, যাতে করে তারা তাদের দৃষ্টি আল্লাহ্‌র দিকে নিবদ্ধ করতে পারে।

***

রেফারেন্স:  

১। ইবন কাসীর, তাফসীর কুরআন আল- ‘আযীম (বৈরুতঃ দার আল-মা’রিফাহ, ১৯৮৭), ৩:২৯২

২। মুসলিম, নং-২১৫৯

৩। আবু দাউদ, নং-২১৪৯; আল-তিরমিযী, নং-২৭৭৭, যেখানে তিনি বলেছেন যে হাদিসটি হাসান গারীব

৪। আল-বুখারী, নং-৬২২৯; মুসলিম, নং ২১২১

৫। দেখুনঃ আল-জামি’ লি আহকাম আল-কুরআন (বৈরুতঃ দার আল-কুতুব আল-‘ইলমিয়্যাহ, ১৯৯৬), ১০:১৬৫

৬। Cf. Kamali, Principles of Islamic Jurisprudence (Cambridge: The Islamic Texts Society, 2006), 397-409

৭। ইবন মাজাহ, সুনান, নং- ৪১৮১। হাদীসটিকে এর বহু ইসনাদের কারণে সাহীহ হিসেবে গ্রেড করা হয়। দেখুনঃ আল-আলবানি, সিলসিলাত আল-আহাদীস আল-সাহীহাহ (বৈরুতঃ আল-মাকতাব আল ইসলামী, ১৯৮৫), নং-৯৪০

৮। আল-বুখারী, নং-৯; মুসলিম, নং- ৩৫

৯। আল-বুখারী, আল-আদাব আল মুফরাদ, নং- ৬০১। আল-আলবানী এ হাদীসকে সাহীহ বলেছেন, আল-আলবানি, সাহীহ-আল আদাব আল-মুফরাদ (সৌদি আরবঃ দার আল-সিদ্দিক, ১৯৯৪), নং-৪৬৯

১০। ইবন হাজার আল-‘আসকালানী, ফাতহুল বারী (মিশরঃ দার আল-‘আলামিয়্যাহ, ২০১৩), ১:৮০

১১। জামি’ আল-‘উলুম ওয়া’ল-হিকাম (বৈরুতঃ মুআসসাসাহ আল-রিসালাহ, ১৯৯৮), ১:৪৯৮

১২। আল-বুখারী, নং- ৩৪৮৩

১৩। আল-বুখারী, নং- ৬১১৭

১৪। জামি’ আল-‘উলুম ওয়া’ল-হিকাম (বৈরুতঃ মুআসসাসাহ আল-রিসালাহ, ১৯৯৮), ১:৫০১-২

১৫। আল-বুখারী, নং-৩৫৬২; মুসলিম, নং- ২৩২০

১৬। দেখুনঃ Jonathan Sacks, The Persistence of Faith (London: Continuum, 205): Callum G. Brown, Death of Christian Britain (Oxon: Routledge, 2009)

১৭। আল-বুখারী, আল-আদাব আল মুফরাদ, নং- ১৩১৩। আল-হাকীম, মুসতাদরাক, ১:২২, যিনি বলেনঃ ‘দুই শেইখের (বুখারী ও মুসলিম) মানদণ্ড অনুসারে হাদীসটি সাহীহ।’

১৮। আল-বুখারী, নং-৫৮৯২; মুসলিম, নং- ২৫৯

১৯। তাবারী, তারিখ, ২:৬৫৫; ইবন সা’দ, তাবাকাত, ১:২:১৪৭; আবু নুয়া’ইম, দালা’ইল আল-নুবুওয়াহ, নং-২৪১; ইবন আবি শাইবাহ, মুসান্নাফ,১৪:৩৩৬। আল-আলবানি তার আল-গাযালীর ফিকহ আল-সীরাহ-র ভেরিফিকেশনে হাদিসটিকে এর সমন্বিত সনদ অনুসারে হাসান বলেছেন।

২০। আল-কুরতুবি কর্তৃক উদ্ধৃত, আল-তাযকিরাহ বি আহওয়াল আল-মাওতা ওয়া উমুর আল-আখিরাহ (রিয়াদঃ দার আল-মিনহাজ,২০০৬),৮০০।

২১। ইবন জুযায়ী, আল-তাসহিল লি ‘উলুম আল-তানযিল (বৈরুতঃ মাক্তাবাহ আল-‘আসরিয়্যাহ,২০০৩), ৩:১২০। আরো দেখুন ইবন আল-জাওযী, যাদ আল-মাসীর (বৈরুতঃ আল-মাক্তাব আল-ইসলামি, ২০০২),৯৯৪

২২। আবু দাউদ, নং-২১৫৩, হাদিসটি সাহীহ। দেখুনঃ আল-আলবানি, সাহীহ আল-জামী’ আল-সাগীর (বৈরুতঃ আল-মাক্তাব আল-ইসলামি, ১৯৮৬), নং- ৫১৬১

২৩। আল তিরমিযী, নং- ২৭৭৭, তিনি বলেছেন হাদীসটি হাসান গারীব

২৪। আল-বুখারী, নং-১; মুসলিম, নং- ১৯০৭

২৫। আল তিরমিযী, নং- ২১৬৫, তিনি বলেছেন হাদীসটি ‘হাসান সাহীহ গারীব।’

২৬। ইবন কাসীর, তাফসীর কুরআন আল-‘আযীম, ৩:৪৯১

২৭। আল-তাবারানী, মু’যাম আল-কাবির, ২০:২১০। আল আলবানি তার সিলসিলাত আল-আহাদিস আল-সাহিহাহ গ্রন্থে এই হাদিসকে সাহীহ বলেছেন (রিয়াদঃ দার আল-মা’আরিফ, ১৯৯৫), নং-২২৬

২৮। ইবন মাজাহ, নং-২৮৪৭; আল-তিরমিযী, নং-১৫৯৭। তিরমিযী বলেছেন হাদিসটি হাসান সাহিহ।

***

আরও পড়ুন:

Advertisements

One thought on “দাঁড়ি, হিজাব ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং নারী-পুরুষ পারস্পরিক আচরণবিধি (অনুবাদ)

  1. পিংব্যাকঃ এ সময়ের ফিতনাহ: ভোগ, চারিত্রিক স্খলন এবং চরমপন্থার হাতছানি (অনুবাদ) | আমার স্পন্দন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s