যে-মানুষটি মারা গেল তার কী হলো? সে কোথায় গেল?

abandoned-wall

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ পড়ছিলাম। অনেকদিন ধরেই ছোটগল্প পড়ার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। গত কয়েকদিন প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে একটা একটা গল্প পড়ে ঘুমটাকে গাঢ় করে নিচ্ছিলাম।

গল্পগুলোতে কিছু কমন থিম আছে। দুএকটা গল্প বাদে প্রায় প্রতিটা গল্পেই কেউ না কেউ মারা যায়। আর তার পরে যারা বেঁচে থাকে, তাদের সংগ্রামের কাহিনি থাকে। কীভাবে তারা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুস্থানীয় ব্যক্তির মৃত্যুর পর জীবন চালিয়ে যায় থাকে তার ফিরিস্তি। এটা শুধু কবিগুরুর গল্পেই না, অনেক সাহিত্যেরই অভিন্ন বিষয়। কেউ না কেউ মারা যাবে। তারপরও জীবন এগিয়ে যাবে।

মারদাঙা সিনেমায় তো ধুপ ধাপ মানুষ মারা যায়। গল্প এগিয়ে যায়। দর্শক নায়কের বিজয়ে মুখরিত হয়।

ট্রাজেডি হলে তো আবার ভিন্ন কথা। তখন নায়ক বা নায়িকার মৃত্যুতে তোলপাড় শুরু হয়। পরিচালকের উপর রাগ হয়। মেজাজটা বিগড়ে যায়। অন্তরটা মুচড়ে যায়। এর রেশ থেকে যায় অনেকদিন। বাকের ভাইয়ের ফাঁসীতে কি কাণ্ডটাই না হয়েছিল!

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসব গল্প-সিনেমা-নাটক আমাদেরকে শুধু দৃশ্যমান পৃথিবীর জীবনটাই দেখায়। বাবার মৃত্যুর পর একটা পরিবার কীভাবে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকে, মায়ের মৃত্যুর পর একটা সন্তান কীভাবে ঠোকর খেয়ে খেয়ে বেড়ে ওঠে—এ ধরনের নানা মর্মস্পর্শী কাহিনি আমাদের অন্তর কাঁদায়। ক্ষণিকের জন্য আমরা ভেবে চিন্তিত হই: আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানের কী হবে। আমার স্ত্রীর কী হবে। ওরা কীভাবে জীবন চালাবে। নেকড়েঘেড়া এই পৃথিবীতে কীভাবে বাঁচবে?

এই চিন্তা মোটেও অযৌক্তিক না। কিন্তু দৃশ্যমান জগতের প্রতি অতিখেয়ালে যে-জিনিসটা আমাদের চেতনা থেকে হারিয়ে যায়: মৃত্যুর পর আমার কী হবে?

আমার আত্মা কি ফেরেশতারা টেনে-হিঁচড়ে বের করবে? নাকি এক ফোঁটা পানির মতো অনায়াসে বের হবে? আমার আত্মাটা কি কবর থেকেই জান্নাতের সুখ পাবে? নাকি সেখান থেকেই জাহান্নামের শাস্তি শুরু হয়ে যাবে? আমার জান্নাত কি নাবি-রাসূলদের সাথে হবে? নাকি ফিল্মস্টার-রকস্টারদের সাথে হবে?

পরিবার যাতে ভালো থাকে, নিরাপদ থাকে সেজন্য বাবা-মা’র কত চিন্তা। প্রাণের প্রিয় স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের প্রতি কত ভাবনা। তাদের ভবিষ্যত জীবন নিশ্চিত করার জন্য—আমি না-থাকলেও তারা যেন ভালো থাকে—সেজন্য কত প্রস্তুতি, কত কষ্ট, কত ত্যাগ। কিন্তু মৃত্যুদূত যখন আমার সামনে আসবেন, আর আমার বিদায়ের ঘণ্টা বাজবে, তখন কি আমি প্রস্তুত আমার প্রভুর সামনে হাসিমুখে দাঁড়ানোর জন্য? আমি কি আমার স্রষ্টার দেওয়া অত্যাবশ্যকীয় আদেশগুলো মেনে চলেছি? তিনি যেগুলো নিষিদ্ধ করেছেন সেগুলো থেকে দূরে থেকেছি?

গল্প-সিনেমায় জীবনের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। কিন্তু সেটা কেবল এই জীবনের। মৃত্যুর পরের জীবনের কোনো লেশ সেখানে থাকে না। আর আমরাও প্রতিনিয়ত ওগুলোর সামনে পড়তে পড়তে মৃত্যুর পরের চিরকালীন জীবন সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ি। চিন্তার সমস্ত পরিধি জুড়ে তখন থাকে কেবল এই জীবন। কিন্তু মানি আর না-ই মানি, এই জীবন ক্ষণিকের। যে-মুহূর্তে আমি মারা যাব, সেই মুহূর্ত থেকেই আমার ফায়সালা হয়ে যাবে: হয় জান্নাত, নয় জাহান্নাম। আমার কবরটা হয় আলোর রশনিতে ভরে যাবে, নয়তো পরিণত হবে অন্ধকার কুঠুরিতে। নয়নাভিরাম জিনিসে ভর্তি থাকবে চারপাশ, নয়তো ভয়ংকর সব চেপে ধরবে চারপাশ থেকে। প্রশস্ত হবে প্রাসাদের মতো, নয়তো চেপে আসবে পাথরের মতো।

কাজেই আসুন ভেবে দেখি কোন গন্তব্যের জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। কোথায় ঠাঁই পাওয়ার জন্য দুনিয়ার জীবন বিনিয়োগ করছি। আজকের পর যখন কোনো গল্প-উপন্যাস হাতে নেবেন, কোনো নাটক-সিনেমা দেখবেন, ওখানে যখন কেউ মারা যাবে, একবার থেমে চিন্তা করবেন, যে-মানুষটি মারা গেল তার কী হলো? সে কোথায় গেল? জান্নাতের বাগানে নাকি জাহান্নামের গর্তে?

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখকের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে

আরও পড়ুন:

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s