এ সময়ের ফিতনাহ: ভোগ, চারিত্রিক স্খলন এবং চরমপন্থার হাতছানি (অনুবাদ)

Abu Aaliyah – Surkheel Sharif-এর “Fitnah: Coming to a Sin-e-World Near You! (Part 1)” লেখাটি থেকে অনুদিত। অনুবাদের সময়ে সামান্য পরিমার্জন করা হয়েছে আমাদের পার্সপেক্টিভের সাথে মিল রাখার জন্য। অনুবাদের অনুমতি নেয়া হয়েছে।

Man sitting

আরবী শব্দ ফিতনাহ-র অর্থ অনেক: পরীক্ষা, মতভেদ, দুঃখ-কষ্ট, প্রলোভন, গৃহযুদ্ধ, এবং এমন অন্য কোনো ঝগড়াঝাটি  যা ‘মুসলিম উম্মাহ-র ঐক্যে ফাটল ধরায় এবং এক দল মুসলিমকে আরেক দলের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।’[১] প্রাচুর্য, নারী ও গৃহযুদ্ধের মতো শাশ্বত ও চিরন্তন ফিতনাহ-র পাশাপাশি দুই পর্বের এই ব্লগ আলোচনায় ভুল পথের আহ্বায়ক, গভর্নমেন্ট দ্বারা ইসলাম ও মুসলিম স্কলারদের পোষ মানানোর চেষ্টা, আমাদের ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যার সক্রিয় প্রচার ও অর্থায়ন, সাম্প্রদায়িক হানাহানি এবং তাকফীরের মতো ফিতনাহগুলো নিয়েও আমরা আলোচনা করব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘শেষ দিনের আগে অন্ধকার রাতের মতো ফিতনাহ আসবে। মানুষের ঘুম ভাঙবে বিশ্বাসী হিসেবে কিন্তু সন্ধ্যা নামার আগেই সে অবিশ্বাসীতে পরিণত হবে। অথবা সন্ধ্যায় বিশ্বাসী থাকবে কিন্তু সকাল নাগাদ অবিশ্বাসী হয়ে যাবে। এবং মানুষ পৃথিবীর ক্ষুদ্র ভাগ পাওয়ার জন্য নিজের ধর্ম বিক্রি করে দেবে।’[২]

১. ধন-সম্পদের ফিতনাহ:

কুরআনে আমাদের মনে করিয়ে দেয়া হয়: ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি পরীক্ষা ছাড়া কিছু নয়। আর আল্লাহ্‌র কাছে রয়েছে বিশাল পুরষ্কার।’ (সূরা আত-তাগাবুন: ১৫) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘নিশ্চয়ই প্রত্যেক জাতির জন্য পরীক্ষা আছে, আর আমার উম্মতের পরীক্ষা হলো ধন-সম্পদ।’[৩] অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন করা, সম্পদের টানে ধর্মকর্ম ভুলে থাকা, সম্পদের মোহে বিভোর হয়ে থাকা অথবা সম্পদের দাসে পরিণত হওয়া — এসবই সম্পদের ফিতনাহ-র মধ্যে পড়ে। একটি হাদীসে আছে: ‘দীনারের দাসের জন্য দুর্ভাগ্য। দিরহামের দাসের জন্য দুর্ভাগ্য। উন্নত কাপড়ের দাসের জন্য দুর্ভাগ্য। এমব্রয়ডারি করা কাপড়ের দাসের জন্য দুর্ভাগ্য। সে দুর্দশাগ্রস্ত হোক, অধঃপতিত হোক। তার গায়ে যদি কাঁটা বিধে, তা যেন উঠিয়ে দেয়া না হয়। যখন তার ইচ্ছা পূরণ হয় তখন সে খুশি থাকে, কিন্তু যখন তার ইচ্ছা পূরণ হয় না তখন সে রেগে যায়।’[৪] এই হলো সম্পদের বা দুনিয়ার দাসের অবস্থা: দুর্দশাগ্রস্ত, হতভাগ্য। যে হৃদয়ের সন্তুষ্টি বা রাগের উৎস আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কিছু, সেই হৃদয় যা কিছু তাকে আকর্ষণ করে তারই পূজারিতে পরিণত হয়। ফলে, সে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সেই ভালোলাগার জিনিসের দাসত্ব করা শুরু করে দেয়।

আমাদের ই-ওয়ার্ল্ডের ভোগবাদী জীবনে এই বিশেষ ফিতনাহ থেকে বেঁচে থাকা মোটেও সহজ না। আদতে কিন্তু ধন-সম্পদ খারাপ কিছু না। যা খারাপ তা হলো সম্পদের পূজা করা, দাসত্ব করা বা সবসময় ধনসম্পদেরই চিন্তা-সাধনা করা। ধন-সম্পদের প্রতি যুক্তিসঙ্গত এবং সঠিক মনোভাব থাকাটা জরুরি। সম্পদকে কখনোই জীবনের লক্ষ্যে পরিণত করা যাবে না, বরং সম্পদ হলো লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপায় মাত্র। ইবন তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহকে আল্লাহ ও আখেরাতকে অন্বেষণকারীর লোকজন সম্পদকে কিভাবে দেখবে এই প্রশ্ন যখন করা হয়েছিল, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন ‘আমরা টয়লেটকে যেভাবে দেখি, সম্পদকেও সেভাবে দেখতে হবে। প্রয়োজনে আমরা টয়লেটের আশ্রয় নিই, কিন্তু আমাদের অন্তরে এর কোনো স্থান নেই।’[৫]

বর্তমান যুগের একজন আধ্যাত্মিক স্কলার শেইখ জালীল আহমাদ আখুন ধন-সম্পদ ও দুনিয়া থেকে নিরাসক্ত থাকতে বলছেন এভাবে:

যখন কেউ তার অন্তর আল্লাহ্‌র ভালোবাসা এবং তাঁর সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা দিয়ে পূরণ করে, তার অন্তর থেকে দুনিয়ার আকর্ষণ আস্তে আস্তে পালিয়ে যায়। এটাকে এরোপ্লেন জার্নির সাথে তুলনা করা যায়। যখন বিমান টার্মাকে থাকে তখন জানালা দিয়ে তাকালে টার্মিনাল বিল্ডিং ও অন্য বিমানগুলোকে বিশালাকার বলে মনে হয়। যখনই বিমান টেইক অফ করে উপরের দিকে উঠা শুরু করে, আগে বিশাল মনে হওয়া জিনিসগুলো আস্তে আস্তে ছোট থেকে আরো ছোট হতে থাকে, একসময় মিলিয়েই যায়। একইভাবে, আমরা যখন আল্লাহ্‌র ভালোবাসা দিয়ে নিজেদের অন্তরকে পূর্ণ করার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করি, যখন আমাদের অন্তর আল্লাহ্‌র দিকে জার্নি শুরু করে, উপরের দিকে উঠতে থাকে, দুনিয়া তার কাছে ততোই ছোট হয়ে আসতে থাকে। একসময় মিলায়ে যায়।

২. গৃহযুদ্ধের ফিতনাহ:

হাদীসে এসেছেঃ ‘শেষ দিনের আগে অন্ধকার রাতের মতো ফিতনাহ আসবে। মানুষের ঘুম ভাঙবে বিশ্বাসী হিসেবে, কিন্তু সন্ধ্যা নামার আগেই সে অবিশ্বাসীতে পরিণত হবে। অথবা, সন্ধ্যায় বিশ্বাসী থাকবে, কিন্তু সকাল নাগাদ অবিশ্বাসী হয়ে যাবে। যে এসময় বসে থাকবে সে যে দাঁড়িয়ে থাকবে তার থেকে ভালো; দাঁড়িয়ে থাকা লোক হেঁটে চলা লোক থেকে ভালো। হেঁটে চলা ব্যক্তি দৌড়ানো ব্যক্তি থেকে ভালো। সুতরাং এমন সময়ে তোমাদের ধনুক ভেঙ্গে ফেলো, ধনুকের জ্যা ছিঁড়ে ফেলো এবং পাথরে আঘাত করে তোমাদের তলোয়ার ভোঁতা করে ফেলো। যদি এমন কেউ তোমাদের ঘরে প্রবেশ করে, তাহলে আদমের দুই ছেলের মধ্যে যে উত্তম ছিল তার মতো হও।’[৬] এর মানে, যখন একদল মুসলমান আরেকদল মুসলমানের মুখোমুখি হয়ে যায়, তখন কোনো প্রকার উত্তেজনা ছড়ানোর কাজ করা যাবে না বা কথা বলা যাবে না। অন্য মুসলিমকে হত্যা করার প্রশ্নই উঠে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: সিবাব আল-মুসলিমু ফুসুক ওয়া কিতালুহু কুফর- ‘কোনো মুসলমানকে গালমন্দ করা পাপ, কিন্তু হত্যা করা কুফর।’[৭]

অন্য মুসলমানকে হত্যা না করার জন্য সাধ্যাতীত চেষ্টা করা এমনকি নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়া এক জিনিস, যার উল্টা হলো নিজের বিপরীত মতের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যার চেষ্টা করা; এ সম্বন্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘যদি দুইজন মুসলিম খোলা তলোয়ার হাতে একজন আরেকজনের মোকাবেলা করে, হত্যাকারী এবং যাকে হত্যা করা হলো উভয়ই জাহান্নামে যাবে।’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিগ্যেস করা হলো: হত্যাকারীর ব্যাপারটা বুঝলাম, কিন্তু যাকে হত্যা করা হল সে-ও জাহান্নামে যাবে? তখন তিনি উত্তর দিলেন: ‘সে-ও তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল।’[৮]

গৃহযুদ্ধের সাথে যদি ধর্মীয় চরমপন্থা এবং তাকফীরকে যোগ করা হয় তাহলে পরিস্থিতি আরো জটিল ও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আমাদের সময়ে এখন এই সবগুলো একসাথেই চলছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগে থেকেই সাবধান করেছেন: ‘সত্যিকারভাবে আমি তোমাদের জন্য এমন এক লোকের ভয় করি যে কুরআন পড়বে এবং পড়তে পড়তে কুরআনের ঔজ্জ্বল্য তার চেহারায় ফুটে উঠবে। সে ইসলামের অবলম্বনে পরিণত হবে, তাকে পরিবর্তন করবে আল্লাহ্‌ যেমন চান সেভাবে। এরপর সে এর থেকে আলাদা হয়ে যাবে, তাকে দূরে ছুঁড়ে ফেলবে এবং তার প্রতিবেশীকে শিরক-এর দায়ে অভিযুক্ত করে তলোয়ার নিয়ে আক্রমণ করবে।’ তাঁকে জিগ্যেস করা হলো: হে আল্লাহ্‌র রাসুল, শিরক-এর দায়ে কে বেশি অভিযুক্ত হওয়ার দাবীদার — অভিযোগকারী নাকি অভিযুক্ত? তিনি উত্তর দিলেন: ‘অভিযোগকারী।’[৯]

গৃহযুদ্ধ যদি ঈমান কেড়ে না নেয় বা জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ না-ও করে, তবুও এটি অন্ততপক্ষে মানুষের বুদ্ধি ও বিবেক লোপ করে দেয়। বাস্তবতা থেকে আমরা এটা বুঝতে পারি। নিচের হাদীসেও এটা বলা হয়েছে: আবু মুসা বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘কিয়ামত আসার আগে হারজ আসবে!’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম: হে আল্লাহ্‌র রাসুল, হারজ কী? তিনি বললেন: ‘হত্যাযজ্ঞ।’ কিছু লোক বলল: এখন তো আমরা (যুদ্ধে) এত সংখ্যক মুশরিক প্রতি বছর হত্যা করি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘এটা মুশরিকদের হত্যা করার মতো হবে না। যা হবে তা হলো, তোমরা একজন আরেকজনকে হত্যা করবে; ব্যাপারটা এমন দাঁড়াবে যে, মানুষ তার প্রতিবেশীকে, ভাগ্নে/ভাতিজাকে এবং আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করবে!’ কিছু লোক বলল: হে আল্লাহ্‌র রাসুল, তখন কি আমাদের জ্ঞান থাকবে? তিনি বললেন: ‘না! কারণ ততোদিনে বেশীরভাগ মানুষের বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পাবে এবং শুধু নিকৃষ্ট শ্রেণীর মানুষ অবশিষ্ট থাকবে যাদের কোনো জ্ঞানবুদ্ধি থাকবে না। তারা সবাই ভাববে যে, তারা কিছুর উপর দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আসলে তারা কোনো কিছুর উপরই থাকবে না।’[১০] এমন ক্ষেত্রে তাকওয়া, ইলম (জ্ঞান) এবং ধৈর্যের প্রয়োজন। ইবন আল-কাইয়্যিম এ বিষয়ে লিখেছেন:

‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতের জন্য অসৎ কাজের নিষেধ করার দায়িত্ব পালন করতে বলেছেন যাতে করে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা পাওয়া যায়। কিন্তু, যদি খারাপ কাজের অপসারণের চেষ্টা এর থেকে বেশি খারাপ কাজের দিকে নিয়ে যায় যা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের আরো বেশি অপছন্দ, তাহলে প্রথম খারাপ কাজের সমালোচনা করা যাবে না, এই কাজ ও যে কাজটা করছে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুল তাকে অপছন্দ করা সত্বেও না। এটা হচ্ছে ক্ষমতায় যারা আছে তাদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মতো। বাস্তবে, কিয়ামত পর্যন্ত সকল অমঙ্গল ও দুর্দশার কারণ এটি। ইসলামের উপর ছোট-বড় যত দুর্দশা ও দুর্গতি এসেছে সেগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে দেখা যাবে যে, সেগুলো এসেছে এই মূলনীতিকে অবহেলা করার কারণে। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ধৈর্য না ধরে এর অপসারণ করার চেষ্টা করে এর থেকে বেশী অশুভ শক্তির জন্ম দেয়া হয়েছে।’[১১]

শারীয়ার দাবী হলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ ও হত্যায় অংশ না নেয়া, মানুষকে উস্কানি না দেয়া, সোশ্যাল মিডিয়া মারফত খবর ও প্রোপাগান্ডা না ছড়ানো — এ ধরনের সকল কাজ থেকে দূরে থাকা এবং আগুনে ইন্ধন দেয়ার মতো কোনো কাজ না করা। আসলে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিতে নীরব থাকাই সর্বোত্তম রাজনৈতিক সক্রিয়তা। অবিশ্বাসী আগ্রাসী আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধতে যেখানে বিরাট সম্মান আছে, গৃহযুদ্ধে এমন কোনো সম্মান বা গৌরব নেই।

৩. নারী এবং নারীকে পাওয়ার ফিতনাহ:

আল্লাহ্‌ কুরআনে বলেন: ‘মানুষের জন্য সুন্দর করা হয়েছে নারী ও সন্তানসন্ততির বাসনা, রাশিকৃত সোনা-রুপা, ব্র্যান্ডেড ঘোড়া, গবাদিপশু ও ক্ষেতখামারের মতো আকর্ষণীয় জিনিস।’ (সূরা আলি-ইমরান: ১৪) কুরআনের অন্যখানে এই জিনিসগুলোকে পজিটিভভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, মানুষকে বলা হয়েছে এগুলোর জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে। কিন্তু এখানে এগুলোকে দেখানো হচ্ছে লোভের জিনিস হিসেবে, যেগুলোকে পুরুষরা মারাত্মক রকম ভাবে চায়। এই লিস্টে নারীর সবার আগে থাকাটা মোটেও অস্বাভাবিক বা আশ্চর্যের কিছু না। হাদীসেও এরকম উল্লেখ আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘পুরুষের জন্য নারী থেকে বড় কোনো ফিতনাহ আমি রেখে যাই নি।’[১২] এমন সতর্কবাণী যে অগ্রাহ্য করে বা হাল্কাভাবে নেয় সে হয় নিরেট বোকা নাহয় চরম রকম উদাসীন। আরেকটা হাদীসে এসেছে: ‘পৃথিবী সবুজ ও মধুর। আল্লাহ্‌ তোমাদের এখানে রেখেছেন জিম্মাদার হিসেবে যাতে তিনি দেখতে পারেন তোমরা কেমন আচরণ কর। অতএব পৃথিবীর ব্যাপারে সতর্ক হও এবং মেয়েদের বেলায় সাবধান হও; কারণ ইসরাইলের সন্তানদের প্রথম পরীক্ষা ছিল নারীদের নিয়ে।’[১৩]

অ্যালকোহলের প্রভাবে মানুষের জ্ঞান এমনই লোপ পায় যে, স্বাভাবিক অবস্থায় সে যা করার চিন্তাও করে না নেশাগ্রস্ত হয়ে তা-ই সে করে বসে। শয়তানের শক্তি এর থেকে অনেকগুণ বেশী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘মহিলারা ‘আওরাহ; যখনই সে বাইরে বের হয়, শয়তান তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে।’[১৪] ‘আওরাহ–কে সাধারণত নগ্নতা হিসেবে অনুবাদ করা হয়, তবে এটা দিয়ে দুর্বলতা বা অশোভন কাজকেও বুঝানো যায়।[১৫] মহিলাদের ‘আওরাহ বলার কারণ হলো তাদের কমনীয়তা; কারণ, তাদের বাইরে আকর্ষণীয়ভাবে বের হওয়া মানে যেন নিজের ঘরকে অরক্ষিত করে ফেলা। ইসলামে নারীর কমনীয়তা, আকর্ষণীয়তা, মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য — এসব হলো একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার; এগুলো বাড়ির ভেতরের জিনিস, বাইরের না।

আজকের ই-বিশ্ব পাপের রাজ্য। পর্ণোগ্রাফী এখানকার মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। নিষ্পাপ বাচ্চারাও এখানে যৌনতার স্বীকার। এমন পরিস্থিতিতে আমরা যখন শোভন আচরণের কথা বলি, নারীর কমনীয় দিককে ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে বলি বা দৃষ্টি সংযত করতে বলি, আমাদের কথা লোকজন সহজভাবে নেয় না, ভ্রু কুচকায়। নগ্নতা ও যৌনতা যে সমাজে সহজে গ্রহণযোগ্য, ক্ষনে ক্ষনে সেলফি তোলা যে সমাজের নতুন বাস্তবতা, যে সমাজে ভোগই হলো শেষ কথা, সেই সমাজে নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বেলায় শালীনতা, সৌজন্য বা সম্মানজনক আচরণের ধারণা বড়ই বেমানান ঠেকে, ভিনগ্রহ থেকে আমদানী করা বলে মনে হয়। নারী বা পুরুষ হওয়ার যে একটা সম্ভ্রান্ত, ভদ্র, বা শালীন পথ থাকতে পারে — যেমনটি ইসলাম বলে — এটাই আজকের দিনের লোকের কাছে হাস্যকর, অপ্রয়োজনীয় বাকওয়াজ। এমন কথা বললে নারী-বিদ্বেষীর সার্টিফিকেট মিলে যায় নগদে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত পড়তে হলে দেখুন আমার আগের অনুবাদ: দাঁড়ি, হিজাব ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং নারী-পুরুষ পারস্পরিক আচরণবিধি।

সংযম, শালীনতা, সম্মানজনক আচরণ — এসব নীতিকে বহু আগেই আমাদের সামাজিক প্রথা থেকে কেটে বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। এর প্রভাব মুসলমানদের উপর পড়ার কথা ছিল, পড়েছেও। একটা হাদিসে এসেছে: ‘শালীনতা ও বিশ্বাস (ঈমান) ঘনিষ্ঠ বন্ধু; একজন চলে গেলে অন্যজনও তাকে অনুসরণ করে।’[১৬] মুসলমানরা নিজেরা যখন এসব নীতির ব্যাপারে আলগা দেয়া শুরু করে বা উদারনৈতিক সংবেদনশীলতার টেবিলে জায়গা পাওয়ার জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে আপোস করা শুরু করে তখন আমরা তো সেই একই পথে হাঁটবো যে পথে অন্যরা হেঁটেছে! সেই গোল্লায় যাবো, যেখানে সবাই একসাথে যাচ্ছে।

আমরা কিন্তু শুধু হিজাব বা নিকাব নিয়ে কথা বলছি না। কে কী কাপড় পরবে বা কীভাবে পরবে তা নিয়েও আলোচনা করছি না। আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু আরো deep। আমরা কথা বলছি আমরা কিভাবে চলাফেরা করব তা নিয়ে, এবং অপজিট জেন্ডারের সাথে চলাফেরায় আমাদের ভেতরকার অবস্থা কেমন হবে সেটা নিয়ে। পরিশেষে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু আমাদের আত্মার পরিশুদ্ধি নিয়ে, আল্লাহ্‌র সাথে সম্পর্ক নিয়ে।

আল্লাহ্‌ আদেশ করেন: ‘বিশ্বাসী পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের শালীনতা রক্ষা করে। এটা তাদের জন্য পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন। (সূরা আন-নূর: ৩০)। ইবন আল-কাইয়্যিম এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:

‘দৃষ্টি সংযত করা এবং প্রাইভেট পার্টসের হেফাজতের কথা বলার পরে আল্লাহ্‌ পরিশুদ্ধির কথা বলছেন। এর থেকে বুঝা যায় যে, নিষিদ্ধ জিনিস থেকে দৃষ্টি সংযত রাখার মাধ্যমে আমরা তিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উপকার পেতে পারি। প্রথমত, ঈমানের মাধুর্য ও আনন্দ অনুভব করতে পারি, যা আল্লাহ্‌র আদেশ মেনে যে নিষিদ্ধ জিনিস থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া হয়েছিল তার থেকে অনেক বেশী মধুর ও আনন্দময়। বাস্তবে আল্লাহ্‌র জন্য কেউ যা কিছু ত্যাগ করে আল্লাহ্‌ তার থেকে ভালো কিছু দিয়ে এর বদলা দিবেন।[১৭] আত্মা সুন্দর জিনিসের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়। চোখ আত্মার গুপ্তচরের কাজ করে, যাকে আত্মা পাঠায় বাইরের জগতে কী আছে তা দেখার জন্য। যদি চোখ আত্মাকে সুন্দর ও আকর্ষণীয় কোনো কিছুর খবর দেয়, আত্মা তাকে পেতে চায়। … যারাই তাদের চোখকে বাধাহীনভাবে ঘুরতে ফিরতে দিবে, তারাই পরিণামে আফসোস করবে, করতেই থাকবে। কারণ চাউনি থেকে ভালোবাসার জন্ম হয়, যার শুরু হয় হৃদয়ের আকর্ষণ (‘আলাকা) থেকে। যখন এই আকর্ষণ আরো বাড়ে, তখন তা পরিণত হয় তীব্র আকাঙ্ক্ষায় (সাবাবাহ); হৃদয় এখন আকাঙ্ক্ষায় মগ্ন। আরো বেড়ে আকাঙ্ক্ষা পরিণত হয় মোহে (গারাম); এই মোহ হৃদয়ের সাথে আঠার মতো লেগে থাকে, যেমন লেগে থাকে পাওনাদার (গারিম) দেনাদারের (গারিমাহ) সাথে। আরো বেড়ে মোহ পরিণত হয় প্রগাঢ় ও ঐকান্তিক ভালোবাসায় (‘ইশক)। এর পরের স্তর উন্মত্ত ভালোবাসার (শাগাফ); এই স্তরে ভালোবাসা হৃদয়ের একেবারে ভিতরে চলে যায়। আরো প্রবল হয়ে উন্মত্ত ভালোবাসা এরপর পরিণত হয় পূজনীয় ভালোবাসায় (তাতায়্যুম) … হৃদয় এমন জিনিসের দাসত্ব শুরু করে যার দাসত্ব করার কথা তার ছিল না। আর এই সবের শুরু নিষিদ্ধ দৃষ্টিতে।’[১৮]

এখানে আবার আরেক বিতর্ক আছে: কোনটা বেশী জরুরি — মেয়েদের শালীন পোশাক পরা, নাকি ছেলেদের দৃষ্টি সংযত রাখা? কোনো সন্দেহ নেই যে, আজকের যুগে ছেলেদের দৃষ্টি নামিয়ে রেখে নিষিদ্ধ জিনিস থেকে নিরাপদ থাকা বেশী দরকার। শাইখ জালীল আখুন কিছুদিন আগে বলেছেন যে, পাপ মানুষের হৃদয়ে কালো দাগ রেখে যায় যা অনুশোচনা ও তাওবাহ-র মাধ্যমে পরিষ্কার করে ফেলা যায়। কিন্তু, হৃদয় যদি তার ভালোবাসার বন্দী হয়ে যায়, বা দাসে পরিণত হয়, তাহলে এই অবস্থা ‘সাধারণ’ পাপের থেকে বেশী গুরুতর। কারণ, এক্ষেত্রে হৃদয় যে শুধু দাগ পড়ে কালো হয় তা নয়, বরং হৃদয় বিপর্যস্ত হয়ে যায়। এই কথার মধ্যে ইবন আল-কাইয়িমের কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়, যখন তিনি বলেন: ‘প্রগাঢ় ভালোবাসায় আচ্ছন্ন বহু লোক এটা স্বীকার করবে যে, তার হৃদয়ে তার ভালোবাসার জিনিস ছাড়া অন্য কিছুর জায়গা নেই। বরং তারা তাদের ভালোবাসাকে তাদের অন্তরের পূর্ণ দখল দিয়ে দেয় এবং নিজেরা পরিণত হয় ব্যগ্র উপাসকে … এই ভয়ানক জিনিসের ক্ষতির সাথে এমনকি ব্যভিচারেরও (ফাহিশা) কোনো তুলনা হয় না। ব্যভিচার যে করে তার জন্য এটি একটি বড় গুনাহ, সত্য। কিন্তু ‘ইশক-এর অমঙ্গল আরো অনেক বড়, পৌত্তলিকতার (শিরক) সমান। …’[১৯]

যখনই হৃদয় যেদিকে তাকানোর না সেদিকে চোখ দেয় তখনি দৃষ্টি আটকায়ে দিতে হবে, সরিয়ে নিতে হবে। এ ব্যাপারে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করা যাবে না। নতুবা এই নিষিদ্ধ চাহনি তার বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে আত্মার অপূরণীয় ক্ষতি করে ফেলবে। এই হলো শেইখ জালীল আখুন-এর প্রেসক্রিপশন।

***

এই ব্লগ আলোচনার দ্বিতীয় (ও শেষ) পর্বে বাকি তিনটি ফিতনাহ, অর্থাৎ ভুল পথের আহ্বায়ক, গভর্নমেন্ট দ্বারা ইসলাম ও মুসলিম স্কলারদের পোষ মানানোর চেষ্টা এবং ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যার সক্রিয় প্রচার ও অর্থায়ন — এগুলো নিয়ে কথা বলব, ইনশাআল্লাহ।

***

রেফারেন্স:

১। Bowering (ed.), The Princeton Encyclopedia of Islamic Political Thought (Princeton: Princeton University Press, 2013), 100. Raghib, Mufradat Alfaz al-Qur’an  (Damascus: Dar al-Qalam, 2002), 623, said: asl al-fitan idkhal al-dhahab an-nar li tazhara jawdatuhu min rada’atihi. তিনি আরো অগ্রসর হয়ে দেখান যে শব্দটির অর্থ শাস্তি, পরীক্ষা, দুর্দশা, মতভেদ এবং কষ্ট ও হতে পারে। আরো দেখুনঃ ইবন আল-কাইয়িম, যাদ আল-মা’আদ (বৈরুতঃ মু’আসসাসাহ আল-রিসালাহ, ১৯৯৮), ৩ঃ১৫১-২

২। আল-তিরমিযী, নং- ২১৯৭। আল-আলবানী এটিকে হাসান বলেছেন, সিলসিলাত আল-আহাদীস আল-সাহীহাহ (রিয়াদঃ মাক্তাবাহ আল মা’আরিফ), নং-৮১০

৩। আল-তিরমিযী, নং- ২৩৩৬। তিনি বলেছেনঃ ‘এই হাদীস হাসান সাহীহ গারীব।’

৪। আল-বুখারী, নং-২৮৮৭

৫। মাজমু’ ফাতাওয়া (রিয়াদঃ দার ‘আলাম আল- কুতুব,১৯৯১), ১০ঃ৬৬৩

৬। ইবন মাজাহ, নং-৩৯৬১; আল তিরমিযী, নং-২২০৪। তিনি বলেছেন হাদীসটি হাসান। আদমের দুই ছেলের মধ্যে উত্তম বলতে Abel-কে বুঝানো হয়েছে যাকে তার বড় ভাই Cain হত্যা করেছিল।

৭। আল-বুখারী, নং-৪৮; মুসলিম, নং-৬৪

৮। আল-বুখারী, নং-৩১; মুসলিম, নং-২৮৮৮

৯। ইবন-হিব্বান, সাহীহ, নং-২৮২। ইবন কাসীর বলেনঃ ‘এই হাদীসের সনদ চমৎকার (যাইয়িদ)।’ দেখুনঃ তাফসীর কুর’আন আল-‘আযীম (বৈরুতঃ দাঁড় আল-মা’রিফাহ, ১৯৮৭), ২:২৭৬

১০। ইবন- মাজাহ, সুনান, নং-৩৯৫৯, আহমাদ, মুসনাদ, নং- ১৯৫০৯। আল-আলবানী এটিকে সাহিহ বলেছেন, সিলসিলাত আল-আহাদীস আল-সাহিহাহ (রিয়াদঃ মাকতাবাহ আল-মা’আরিফ, ১৯৮৮), নং-১৬৮২

১১। ই’লাম আল-মুওয়াক্কি’ইন ‘আন রাব্ব আল-‘আলামিন (রিয়াদঃ দার ইবন আল-জাওযি, ২০০৩), ৪:৩৩৮-৯

১২। আল-বুখারী, নং-৫০৯৬; মুসলিম, নং-৩৭৪০-৪১

১৩। মুসলিম, নং-২৭৪২

১৪। আল-বাজ্জার, নং-২০৬১; আল-তিরমিযী, নং-১১৭৩; তিনি বলেছেন এটি হাসান গারিব।

১৫। Cf. Lane, Arabic-English Lexicon (Cambridge Islamic Texts Society, 2003), 2:2193094

১৬। আল-বুখারী, আল-আদাব আল-মুফরাদ, নং-১৩১৩; আল-হাকিম, মুসতাদরাক, ১:২২; তিনি বলেছেনঃ ‘দুই শাইখের (বুখারী ও মুসলিম) মানদন্ড অনুসারে এটি সাহীহ।’

১৭। সম্ভবত এই হাদীস থেকে ভাবানুবাদ করা হয়েছেঃ ‘নিশ্চয়ই তোমরা আল্লাহ্‌র জন্য এমন কিছু ত্যাগ করবে না যার বদলে আল্লাহ্‌ তার থেকে ভাল কিছু দিবেন।’ আহমাদ, নং-২২৫৬৫, এর সনদ সহীহ। দেখুনঃ আল-আলবানী, সিলসিলাত আল-আহাদীস আল-দায়ি’ফাহ (রিয়াদঃ মাকতাবাহ আল-মা’আরিফ, ১৯৯২), ১:৬২; নং-৫

১৮। ইগাসাত আল-লাহফান ফি মাসায়িদ আল-শায়তান (মাক্কাহঃ দার ‘আলাম আল-ফাওয়া’ইদ,২০১১), ৭৫। অন্য যে দুটো উপকারের কথা তিনি বলেছেন তা হলোঃ দ্বিতীয়তঃ হৃদয় আলোকিত হবে এবং স্বচ্ছ ও সূক্ষ দৃষ্টি লাভ করবে; এবং তৃতীয়তঃ আত্মাকে শক্তি, সাহস, দৃঢ়তা ও সম্মান দান করা হবে।

১৯। আল-দা’ ওয়া’ল-দাওয়া’ (সৌদি আরবঃ ইমাম দার আল- হিজরাহ, ২০১৪), ৫১৪-৫।

***

আরও পড়ুন:

Advertisements

One thought on “এ সময়ের ফিতনাহ: ভোগ, চারিত্রিক স্খলন এবং চরমপন্থার হাতছানি (অনুবাদ)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s