প্রসঙ্গ তারাবীহ নামাযের রাকাত সংখ্যা

Solat

বিষয়টা এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। মানুষ যেখানে ইসলামের ফরয ইবাদাতের ধার ধারছে না সেখানে তারাবীহ নামাযের রাকাত সংখ্যা নিয়ে আলোচনার পিছনে বাড়তি সময় দেওয়া কতুটুকু যৌক্তিক সেটা একটা প্রশ্ন বটে। তবে এখন এটা এমন একটা ঝগড়ায় পরিণত হয়েছে যে, আমি আমার ভাই ও বন্ধুদের সাথে এ নিয়ে কিছু কথা বলা উচিত বলে মনে করি। বিশেষ করে যারা আমার কথায় আস্থা রাখেন। আর আপনারা জানেন যে, যখন মতপার্থক্যমূলক কোনো বিষয়ে কথা বলি তখন উভয় পক্ষের মতগুলোকে ঘাটিয়ে দেখা ছাড়া কথা বলা ঠিক মনে করি না। তবুও ভুল হবে না এমন দাবী করছি না। আল্লাহ সাহায্য করুন।

তারাবীহ নামাযের সূচনা হলো যেভাবে:

রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে সাহাবীদেরকে নিয়ে কয়েকদিন তারাবীহ নামায পড়েছেন।

আবূ যার (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে রামাযান মাসের সওম পালন করতাম। তিনি এ মাসে (প্রথম দিকের দিনে) আমাদেরকে নিয়ে (তারাবীহ) সালাত আদায় করেননি। অতঃপর রমাযানের সাত দিন বাকী থাকতে তিনি আমাদেরকে নিয়ে সলাত আদায় করলেন রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত। তিনি পরবর্তী রাতে আমাদেরকে নিয়ে (মাসজিদে) সলাত আদায় করলেন না। অতঃপর পঞ্চম রাতে (অর্থাৎ, রামাযানের পাঁচ দিন বাকী থাকতে) তিনি আমাদেরকে নিয়ে সলাতে দাঁড়িয়ে অর্ধেক রাত অতিবাহিত করেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! যদি আপনি এ পুরো রাতটি আমাদেরকে নিয়ে সলাতে দাঁড়িয়ে থাকতেন! বর্ণনাকারী বলেন, তিনি (সা.) বললেন: কোনো ব্যক্তি ইমামের সাথে সালাত আদায় করে প্রত্যাবর্তন করলে তাকে পুরো রাতের সলাত আদায়কারী হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি বলেন, অতঃপর পরবর্তী চতুর্থ রাতে তিনি (মাসজিদে) সলাত আদায় করেননি। যখন তৃতীয় রাত এল (অর্থাৎ, রামাযানের আর তিন দিন রইল তখন) তিনি তাঁর পরিবার-পরিজন, স্ত্রী ও অন্য লোকদের একত্র করলেন এবং আমাদেরকে নিয়ে এত দীর্ঘক্ষণ সালাত আদায় করলেন যে, আমরা ‘ফালাহ’ ছুটে যাওয়ার আশংকা করলাম। জুবাইর ইবনু নুফাইর বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ফালাহ’ কী? তিনি বললেন, সাহারী খাওয়া। অতঃপর তিনি এ মাসের অবশিষ্ট রাতে আমাদেরকে নিয়ে সালাত আদায়ের জন্য দাঁড়াননি। (আবূ দাউদ, ১৩৭৫; নাসাঈ, ১৩৬৩; ইবনু মাজাহ, ১৩২৭; তিরমিযী, ৮০৬, সহীহ)

তবে, রাসূল (সা.) থেকে সহীহ সনদে ওই রাতগুলোর তারাবীহ-এর রাকাত সংখ্যা নিয়ে কোনো হাদিস বর্ণিত নেই। মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা ও অন্যান্য হাদিস গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে ‘রাসূল (সা.) বিশ রাকাত পড়েছেন’ মর্মে যে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে তা সর্বাক্যমতে দুর্বল, কারণ ওই হাদিসের সনদে আবু শায়বা ইবরাহীম ইবনে উসমান নামে একজন বর্ণনাকারী আছেন যাকে ইমাম আহমাদ, বুখারী, আবু দাউদ সহ সকল মুহাদ্দিস দুর্বল কিংবা মাতরুক (পরিত্যক্ত) বলেছেন। [আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যার (রহ.)]

তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ কি একই নামায?

বিতরসহ ১১ রাকাতের যে হাদিস আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, বা বিতরসহ ৯ বা ১৩ রাকাতের যেসব বর্ণনা এসেছে — রাসূল (সা.) সেগুলো কি তারাবীহ-এর পরে তাহাজ্জুদ হিসেবে পড়েছেন নাকি রমাদানে আলাদা তাহাজ্জুদ না পড়ে ওগুলোই তারাবীহ হিসেবে পড়েছেন সেটা এক বাক্যে বলে দেওয়া মুশকিল।

সম্ভাবনা ১: তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ ভিন্ন দুটি নামায

প্রথমে আমরা দেখি এই দুই নামায ভিন্ন হওয়ার সম্ভাব্যতা সম্পর্কে।

১) চার মাযহাবের ইমামদের কেউই আট রাকাত তারাবীহ-এর কথা বলেননি। ইমাম আবু হানিফা (র.), ইমাম শাফেঈ (র.) এবং ইমাম আহমাদ (র.)-এর মতে তারাবীহ হলো বিশ রাকাত। আর ইমাম মালিক (র.)-এর মত হলো ৩৬ রাকাত। আয়েশা (রা.)-এর হাদিস অনুযায়ী যদি তারাবীহ-এর রাকাত সংখ্যা আটই হবে তাহলে তাঁদের কেউ এটা ধরতে পারলেন না! এটা একদমই অস্বাভাবিক।

২) খলিফা ওমর (রা.)-এর সময়ে যখন মসজিদে জামাতে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়া হতো তখন কিন্তু সাহাবী ও তাবেঈরা তা মেনে নিয়েছেন। তৎকালীন মক্কা ও মদিনাবাসীর আ’মাল থেকে এই আমল ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। এমনকি আয়েশা (রা.)-ও তখন জীবিত ছিলেন, আর তিনি এ নিয়ে আপত্তি করেছেন বলে শোনা যায় না। যদি তারাবীহ-এর রাকাত সংখ্যা আটই রাসূল (সা.)-এর সুন্নাত দ্বারা স্থির হতো তাহলে তো তাঁদের তা মেনে নেওয়ার কথা ছিল না।

সম্ভাবনা ২: তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ একই নামাযের ভিন্ন দুটি নাম

এবার আসি এই দুই নামায এক হওয়ার সম্ভাব্যতায়।

১) ইমাম বুখারি (র.) আয়েশা (রা.)-এর হাদিসটিকে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ উভয় অধ্যায়েই এনেছেন।

২) নবী (সা.) যে ১১ রাকাত সালাত আদায় করতেন তা এত দীর্ঘ করতেন যে, এতে পুরো রাতই লেগে যেত। এমনও ঘটেছে এক রাতে নবী (সা.) তাঁর সাহাবীদেরকে নিয়ে তারাবীহ-এর সালাত আদায় করতে করতে ফজর হওয়ার অল্প কিছুক্ষণ আগে শেষ করেছিলেন। এমনকি সাহাবীগণ সেহেরী খেতে না পারার আশঙ্কা করেছিলেন। এক্ষেত্রে প্রশ্ন থাকে যে, ওই রাতে বিতর পড়েই তো শেষ করে দিলেন। তাহাজ্জুদ কখন পড়লেন?

৩) আয়েশা (রা.)-এর হাদিসে বর্ণিত রসুলুল্লাহ (সা.)-এর আট রাকাত তাহাজ্জুদ এত দীর্ঘ পড়তেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাতে এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে এর পূর্বে আবার কোন সময় ২০ রাকাত তারাবীহ পড়ার সময় হয়!

৪) রাতের নামাযের ব্যাপারে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “রাতের সালাত দু’রাকাত, দু’রাকাত; যখন তোমাদের কেউ ফজর হওয়ার আশংকা করবে, সে এক রাকাত সালাত আদায় করবে, যা তার পূর্বের সালাতগুলো বেজোড় করে দিবে।” এখানেও আমরা দেখি যে, দুই-দুই রাকাত করে যখন নামায পড়তে বলা হলো সেখানে ফজরের আশঙ্কা করলে তাহাজ্জুদের কোনো সুযোগ থাকে না।

সুতরাং ভাইয়েরা, রমাদানে তারাবীহ আর তাহাজ্জুদ একই, নাকি আলাদা — এটা একটা বড় প্রশ্ন হিসেবেই থেকে যায়। অন্তত আমার কাছে।

আমাদের করণীয়:

যারা তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ — এই দুই নামাযকে এক বলে ধরে নিচ্ছেন তারা তো আয়েশা (রা.)-এর হাদিস অনুযায়ী আট রাকাতকেই বেশি আমলযোগ্য বলে মনে করবেন। আর যারা এই দুই নামাযকে ভিন্ন বলে ধরে নেবেন তারা উমার (রা.) সহ অন্য অনেক সাহাবী ও তাবেঈ এবং মুজতাহিদ ইমামগনের ইজমাকে অনুসরণ করে বিশ রাকাতই পড়বেন।

আমাদের প্রকৃত সমস্যা আট আর বিশ-এ নয়। আমাদের সমস্যা হলো গুণগত মান বাদ দিয়ে নামাযের রাকাত সংখ্যা নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়া।

***

মূল লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখকের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে। ব্লগ পোস্ট হিসেবে রূপান্তরের সময়ে লেখাটিতে ছোটখাটো কিছু পরিমার্জন আনা হয়েছে।

Photo credit: Flickr

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s