রমাদান: আত্মশুদ্ধি অর্জন ও কুরআনের মাস

Quran on prayer mat

রমাদান মাস এবং সিয়াম নিয়ে খুবই সংক্ষিপ্ত কিছু কথা পড়ার আগে আসুন আমরা পিছনের বছরের ইতিহাসটা একটু দেখি। একজন মুসলিম হিসেবে গত রমাদান থেকে এই রমাদান — কতটুকু আগালাম, কতটুকু পিছালাম? কতটুকু অর্জন, কতটুকু বর্জন? অতঃপর … একটা সহজ সিদ্ধান্তে আসি যে, আগামী বছরটাও কি আমি এমনই চাই? নাকি, ভিন্ন কিছু?

এই বিষয়টি মাথায় রেখে চলুন মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।

১. রমাদান হলো কুরআনের মাস:

মহান আল্লাহ রমাদান মাসকে উল্লেখ করেছেন এভাবে:

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ ۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ

“রমাদান মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ, আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে এ মাসটি পাবে সে এ মাসের রোযা রাখবে। …” [সূরা বাক্বারা: ১৮৫]

মহান আল্লাহ রমাদান মাসের বিশেষত্ব বর্ণনার সময়ে প্রথমে কুরআনের কথা উল্লেখ করেছেন; তার পরিচয় ও উপকারের কথা বর্ণনা করেছেন। এরপর তাকে সেলিব্রেট করার জন্য সিয়ামের কথা বলেছেন। সুতরাং মাসটা কেবল সিয়ামের না, বরং কুরআনেরও — এটা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।

২. এটি হলো পাপাচার থেকে বাঁচার মাস:

রমাদান মাসের আরেকটা বিশেষত্ব হলো এই মাসে শয়তান ও দুষ্ট জিনদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখা হয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, “রমাদানের প্রথম রাত্রিতে শয়তান ও দুষ্ট জিনদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। জাহান্নামের কপাটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়; তার একটি দরজাও খোলা হয় না। উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় জান্নাতের দরজাগুলো; বন্ধ করা হয় না তার একটিও। একজন আহ্বানকারী আহ্বান জানিয়ে বলেন: হে কল্যাণের প্রত্যাশী! অগ্রসর হও। আর যে অকল্যাণের প্রত্যাশী, বিরত হও। আল্লাহ জাহান্নাম হতে অনেককে মুক্তি দেবেন, এবং তা প্রতি রাতেই।” [তিরমিযি/৬৮২ (হাসান)]

এখান থেকে অনেকেই ধারণা করেন যে, যেহেতু এই মাসে শয়তান আবদ্ধ থাকে তাই আমরা সবাই অটোমেটিক ভালো হয়ে যাব। কিন্তু, বাস্তবতা ভিন্ন পরিলক্ষিত হওয়ায় এই হাদিসের উপর আমাদের ঈমানই চলে যাওয়ার উপক্রম হয়। মূল বিষয় হলো মানুষকে পাপাচারে উদ্বুদ্ধ করে তিনটি সত্তা: (১) শয়তান (অর্থাৎ, দুষ্ট জিন); (২) দুষ্ট মানুষ; এবং (৩) মানুষের নাফসুল আম্মারা (অর্থাৎ, মন্দ কাজ প্রবন আত্মা)।

সুতরাং, শুধু শয়তানের শৃঙ্খল নিয়ে ভাবলে হবে না। দুষ্ট মানুষের সংশ্রব ছাড়তে হবে এবং নাফসুল আম্মারাকে টাইট করার ব্যবস্থা করতে হবে। পাপাচার থেকে বাঁচতে আল্টিমেটলি আত্মশুদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

৩. এটি হলো তাকওয়া অর্জনের মাস:

রমাদানের উদ্দেশ্যকে বুঝতে না পারা এই মাসে ব্যর্থতার একটা বড় কারণ। রমাদানের মৌলিক উদ্দেশ্য কী? মহান আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” [সূরা বাক্বারা: ১৮৩]

এই আয়াতে সিয়াম ফরয হওয়ার সাথে সাথে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কেও বলা হয়েছে, আর তা হলো তাকওয়া অর্জন। সুতরাং শুধুমাত্র দিনের বেলায় পানাহার বর্জন করার উদ্দেশ্যেই সিয়াম নয়, বরং তার উদ্দেশ্য হলো পানাহার বর্জন করার সাথে সাথে সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সব রকম পাপাচার, অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রেখে আত্মশুদ্ধি অর্জনের প্রচেষ্টার মাধ্যমে মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা।

মূলত কেবল সিয়াম নয়, বরং অন্যান্য প্রতিটি ইবাদাতের অর্জনও হলো তাকওয়া। মহান আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

“মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রভুর ইবাদত কর, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” [সূরা বাক্বারা: ২১]

আমাদের ইবাদাতগুলো আমাদেরকে গুনাহ থেকে বাঁচায় না এর বড় একটা কারণ হলো এর থেকে তাকওয়া অর্জন হয় না। এই বিষয়টা মনে রাখা খুবই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

৪. যেসব কারণে এই মাস থেকে আমাদের অর্জন শূন্য হতে পারে:

সিয়ামের ফযিলত নিয়ে কিছু বলছি না কারণ অফিসের বস থেকে শুরু করে মসজিদের হুজুর সকলেই আপনাকে এগুলো শুনিয়ে থাকেন। বরং দুইটা হাদিস উল্লেখ করব যাতে ফযিলতটা আমাদের হাতছাড়া না হয়:

১) “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মুর্খতা পরিত্যাগ করতে পারল না, তার রোযা রেখে শুধুমাত্র পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” [বুখারী / ১৯০৩]

২) “এমন অনেক রোযাদার আছে যার রোযা থেকে প্রাপ্তি হচ্ছে শুধুমাত্র ক্ষুধা ও তৃষ্ণা। তেমনি কিছু নামাযী আছে যাদের নামায কোনো নামাযই হচ্ছে না, শুধু যেন রাত জাগছে।” [আহমাদ/৮৮৪৩]

সুতরাং ভাইয়েরা, খুব খেয়াল করে চলতে হবে। আপনার ঈদ পালনের অবস্থা দেখলেই আপনি বুঝতে পারবেন যে, এই মাস থেকে কী পরিমাণ অর্জন আপনার হয়েছে। আল্লাহ আমাদের মাফ করুন।

এই মাসের সিয়াম এবং কুরআন যেন হয় আমাদের জন্য সুপারিশকারী:

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, “সিয়াম ও কুরআন কিয়ামাতের দিন মানুষের জন্য এভাবে সুপারিশ করবে যে: সিয়াম বলবে হে আমার রব, আমি দিনের বেলায় তাকে (এ সিয়াম পালনকারীকে) পানাহার ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবুল কর। অনুরূপভাবে কুরআন বলবে হে আমার রব, আমাকে অধ্যয়নরত থাকায় রাতের ঘুম থেকে আমি তাকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবূল কর।” রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবূল করা হবে।” [আহমাদ/ ২/১৭৪]

মহান আল্লাহ আমাদের রমাদানকে কুরআন ও সিয়াম দ্বারা পূর্ণ করে দিন। এমনভাবে এর হক আদায় করার তৌফিক তিনি আমাদেরকে দিন যাতে তারা উভয়ে সেই দিনে আমাদের জন্য সুপারিশ করতে পারে যখন তাদের সুপারিশ খুবই জরুরী হয়ে পড়বে।

***

মূল লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখকের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে। ব্লগ পোস্ট হিসেবে রূপান্তরের সময়ে লেখাটিতে ছোটখাটো কিছু পরিমার্জন আনা হয়েছে।

আরও পড়ুন:

Photo credit: Zaid Al Balushi

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s