“এইইতো দুনিয়ার জীবন, এর থেকে সাবধান হও!”: ঈসা (আ.) ও এক ব্যক্তির চমকপ্রদ কাহিনী

শাইখ Joe Bradford-এর Detachment from Worldly Life খুতবাহ থেকে রূপান্তরিত। ইন্টারনেটে এই গল্প আরও অনেক ব্লগ/লেকচারে available আছে।

Spider web

ইমাম আবু বাকর ইবন আবি আল-দুনিয়া (মৃত্যু ২৮১ হিজরি, ৮৯৪ খ্রি:) তাঁর asceticism নিয়ে লিখা বইয়ে নবী ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর একটা ঘটনা উল্লেখ করেছেন।

একদিন ঈসা (আলাইহিস সালাম) এক লোকের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। লোকটি তাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। সে তাঁর পিছন পিছন হাঁটতে লাগল; সাহস সঞ্চয় করে ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে বলল: আমি আপনার শিষ্য হতে চাই, আমাকে আপনার হাওয়ারী করে নিন। ঈসা (আলাইহিস সালাম) উত্তরে বললেন, আমার সাথে হাঁটতে থাক।

বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর নবী ঈসা (আলাইহিস সালাম) লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার খিদে পেয়েছে? আমরা তো এক ঘন্টার বেশি সময় ধরে হাঁটছি। লোকটি বলল, হ্যাঁ ক্ষুধা লেগেছে। ঈসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমার ব্যাগে কিছু রুটি আছে। চলো, আমরা কোথাও বসে রুটি দিয়ে খাওয়া সেরে নিই। তারা বসলেন। ঈসা (আলাইহিস সালাম) ব্যাগ খুলে তিন টুকরা রুটি বের করলেন। বললেন, একটা তোমার, একটা আমার, আর অন্যটা থাকুক। খাওয়া শেষে ঈসা (আলাইহিস সালাম) বলেন, আমার পেট ভরে গেছে। এখন আমি নদী থেকে পানি খাব।

[বুখারি শরীফে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, ঈসা (আলাইহিস সালাম) খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তাঁর একটা পেয়ালা ছিল। কিন্তু যখন দেখতেন যে হাতের আঁজলা ভরেই পানি পান করতে পারেন, তিনি পেয়ালা দান করে দিতেন। চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতেন। কিন্তু যখন দেখতেন আঁচড়ানোর কাজ হাতের আঙ্গুল দিয়েই করা সম্ভব, তিনি চিরুনি দান করে দিতেন।]

ঈসা (আলাইহিস সালাম) নদীতে নেমে আঁজলা ভরে পানি খেতে লাগলেন। যখন তিনি লোকটির দিকে পিছন ফিরে পানি খাচ্ছেন, লোকটার চোখ পড়ল রুটির তিন নম্বর টুকরার উপর। ঈসা (আলাইহিস সালাম) ফিরে দেখলেন রুটির টুকরা আর নেই।

তিনি লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, তৃতীয় রুটিটি কে খেল? লোকটি উত্তর দিল, লা আদ্রি, আমি জানি না। ঈসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, ঠিক আছে। আমার সাথে হাঁটতে থাক।

তারা হাঁটতে লাগলেন। বেশ কয়েক ঘণ্টা হাঁটার পর তারা একটি ছোট জঙ্গলের পাশে পৌঁছালেন। ঈসা (আলাইহিস সালাম) লোকটিকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি আবার ক্ষুধা লেগেছে? লোকটি বলল, হ্যাঁ। ঈসা (আলাইহিস সালাম) তখন বনের পশুদের ডাকলেন। একটা ছোট হরিণ তাঁর চোখে পড়ল। তিনি হরিণটিকে ডাকলেন। আল্লাহ্‌র অনুমতিতে হরিণটি তাঁর ডাক শুনে কাছে এল। তিনি হরিণটিকে নিজ হাতে জবাই করলেন। মাংস আগুনে ঝলসে দুইজনের সামনে রাখলেন। দুজনই পেট ভরে খেলেন। এরপর ঈসা (আলাইহিস সালাম) লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, পেট ভরেছে? সে বলল, হ্যাঁ। ঈসা (আলাইহিস সালাম) এবার হরিণের না খাওয়া অংশ এবং হাড়গোড় একত্র করলেন এবং সেগুলকে ছুঁয়ে বললেন, আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় বেঁচে উঠ। হরিণ জীবন ফিরে পেল এবং লাফ দিয়ে বনের ভিতর চলে গেল। একদম আগে যেমন ছিল তেমন।

ঈসা (আলাইহিস সালাম) লোকটির দিকে তাকালেন। বললেন, সেই সত্ত্বা যিনি এই হরিণকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন তাঁর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, তৃতীয় রুটিটি কে খেয়েছিল? লোকটি উত্তর দিল, লা আদ্রি, আমি জানি না। ঈসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, ঠিক আছে। আমার সাথে হাঁটতে থাক।

যাত্রা আবার শুরু হলো। এক নদীর তীরে এসে তারা আটকে গেলেন। নদীর উপর দিয়ে যাওয়ার কোনো রাস্তা বা খেয়া ছিল না। ঈসা (আলাইহিস সালাম) লোকটিকে বললেন, আমার হাত ধর। সে বলল, কেন আপনার হাত ধরতে যাব? কোনো খেয়া তো নেই যে নদী পার হতে পারব। ঈসা (আলাইহিস সালাম) আবার বললেন, আমার হাত ধর। এরপর বিসমিল্লাহ্‌ বলে পানির উপর দিয়ে হাঁটা শুরু করলেন। লোকটিও তাঁর পিছন পিছন পানির উপর দিয়ে হাঁটতে লাগল।

নদীর অন্য পাড়ে গিয়ে ঈসা (আলাইহিস সালাম) লোকটিকে বললেন, সেই সত্ত্বা যিনি একমাত্র তাঁর শক্তিতে আমাদেরকে পানির উপর দিয়ে হাঁটালেন তাঁর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, তৃতীয় রুটিটি কে খেয়েছিল? লোকটি উত্তর দিল, লা আদ্রি, আমি জানি না। নবী ঈসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, ঠিক আছে। আমার সাথে হাঁটতে থাক।

হাঁটতে হাঁটতে তারা মরুভূমির কিনারে ধূলিধূসর এক জায়গায় এসে পৌঁছালেন। ঈসা (আলাইহিস সালাম) লোকটিকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি আবার ক্ষুধা লেগেছে? লোকটি বলল, হ্যাঁ। ঈসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, এইবার আমি অন্যরকম কিছু একটা করব। নিচু হয়ে বসে তিনি তিনটি বালুর স্তুপ বানালেন। স্তুপগুলোর উপর হাত রেখে তিনি বললেন, আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় সোনা হয়ে যাও! সাথে সাথে বালির ঢিপি তিনটি সোনা হয়ে গেল। ঈসা (আলাইহিস সালাম) লোকটিকে বললেন, একটা তোমার, একটা আমার, আর অন্যটা তার জন্য যে রুটির তৃতীয় টুকরাটি খেয়েছিল। লোকটি তখন বলতে লাগল, ওইটাতো আমি খেয়েছিলাম, আমি খেয়েছিলাম। ঈসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, সব সোনা নিয়ে যাও। আর তুমি এখন থেকে আমার সাথে থাকতে পারবে না।

লোকটি তিন তাল সোনা একটা ব্যাগের মধ্যে ভরে মরুভূমির মধ্য দিয়ে চলতে লাগল। কিছুদূর গিয়ে সে একটা গাছের নিচে দুইজন লোকের দেখা পেল। এরা কোনো ভালো মানুষ ছিল না, ছিল ডাকাত। লোকটির ব্যাগ দেখে তারা জিজ্ঞেস করল, ব্যাগের মধ্যে কী? লোকটি বলল, তেমন কিছু না। সামান্য জিনিস, একজন আমাকে দিয়েছে। তারা বলল, ব্যাগ খোল। টাকা দাও, নয়ত জীবন যাবে।

লোকটি ব্যাগ খুলে সোনা দেখালো। ডাকাত দুইটা বলল, চল একে মেরে এর সোনা আমরা ভাগাভাগি করে নিই। লোকটি তখন বলল, হায়হায়, আমাকে মেরো না। একটা আপসে আসি, চলো। সোনাগুলো তিন ভাগে ভাগ করি। তারপর আমি আমার ভাগ নিয়ে পাশের শহরে গিয়ে খাবার কিনে নিয়ে আসি। আমরা সবাইইতো ক্ষুধার্ত। খেয়েদেয়ে যার যার পথে চলে যাব। ডাকাত দুজন রাজি হলো।

লোকটি শহরে গেল খাবার কিনতে। ডাকাত দুইজনের একজন তখন অন্যজনকে বলল, লোকটা খাবার নিয়ে ফেরত আসলে আমরা যা আগে করতে চেয়েছিলাম তা-ই করব, ওকে মেরে ফেলে খাবার এবং সোনা দুইটাই নিয়ে নেব।

অন্যদিকে লোকটি যখন খাবার কিনতে শহরে যাচ্ছে, সে মনে মনে ভাবছিল: কী দুঃখে এই লোক দুইটার সাথে আমার সোনা আমি ভাগ করব! এগুলোতো আমার। আমাকে এইটা দেয়া হয়েছিল। সে খাবার কিনল। সাথে কিছু বিষও কিনল। খাবারের মধ্যে বিষ মেশালো।

ফেরার পর সে খাবারগুলো ডাকাতদের দিল। লোকগুলো খাওয়ার আগেই তাকে মেরে ফেলল। তারপর বিষ মেশানো খাবার খেয়ে তারাও মরে গেল।

না খাওয়া খাবার এবং খোলা সোনার ব্যাগের পাশে তিনটি লাশ পড়ে থাকল।

ঈসা (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর ১২ শিষ্য সেই পথ ধরে যাচ্ছিলেন। তাঁরা যখন এই পচা গলা লাশের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, ঈসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর সঙ্গীদের বললেন:

এইইতো দুনিয়ার জীবন! এর থেকে সাবধান থাক।

***

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখকের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s