সন্ত্রাসের সাথে জিহাদের সম্পর্ক আর বিয়ের সাথে পরকীয়ার সম্পর্ক একই (অনুবাদ)

Abu Aaliyah – Surkheel Sharif-এর “Terrorism is to Jihad as Adultery is to Marriage” লেখাটি থেকে অনুদিত। অনুবাদের সময়ে সামান্য পরিমার্জন করা হয়েছে আমাদের পার্সপেক্টিভের সাথে মিল রাখার জন্য। অনুবাদের অনুমতি নেয়া হয়েছে।

Peshawar school attack

জিহাদ, সন্ত্রাসবাদ আর মানবজীবনের মর্যাদা সম্বন্ধে ইসলামের পজিশন কী তা আজকের এই লেখার বিষয়। এই লেখার ভিত্তি কুরআন, সুন্নাহ, স্কলারদের ঐক্যমত (ইজমা) এবং মূলধারার স্কলারদের চিন্তাভাবনা। সরকার বা নীতিনির্ধারকদের খুশি করার জন্য এটা লেখা হচ্ছে না। ইসলামকে যুগের সাথে তাল মিলায়ে ‘আধুনিক’ করার ইচ্ছা থেকেও লেখা হচ্ছে না। যা লেখা হচ্ছে তা হলো এই বিষয়ে ইসলামের মূলনীতির সারাংশ। 

১। মানুষের জীবনের পবিত্রতা (হুরমাহ) নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে শুরু করা যাক। ইসলাম মানুষকে দেখে স্রষ্টার এক পবিত্র সৃষ্টি হিসেবে। এমনই পবিত্র যে: “যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩২) এই হলো মানুষকে দেয়া আল্লাহ্‌র সুউচ্চ মর্যাদা। তাই যেসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নারী, শিশু এবং অন্য বেসামরিক লোকদের ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করে মারা হয় সেগুলোকে ইসলাম সরাসরি এবং খোলাখুলিভাবে অস্বীকার (disavow) করে।

২। জিহাদ শব্দের গোড়ায় রয়েছে জাহাদা, যার অর্থ: কঠোর চেষ্টা করা, নিজের সামর্থকে প্রয়োগ করা, অসামান্য কষ্ট স্বীকার করা। ধর্মীয়ভাবে জিহাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইমাম আল-রাগিব আল-ইস্পাহানী (মৃত্যু ৪২৫ হিজরি/ ১০৩৪ খ্রী:) বলেন: ‘নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে শত্রুর প্রতিরোধ করা; এটি তিন ধরণের: বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে, শয়তানের বিরুদ্ধে এবং নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে। তিন ধরণের উল্লেখই আল্লাহ্‌র কালামে পাওয়া যায়: “তোমরা আল্লাহ্‌র জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা কর, যেমনটি করা উচিৎ।” (সূরা হাজ্জ: ৭৮) “তোমাদের ধনসম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহ্‌র পথে জিহাদ কর।” (সূরা আত-তাওবাহ: ৪১) “যারা বিশ্বাস করেছে, ঘরবাড়ি ছেড়ে এসেছে এবং আল্লাহ্‌র পথে তাদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে।” (সূরা আনফাল: ৭২)’[১]

৩। ইসলামে যুদ্ধ বা শান্তির সিদ্ধান্ত কোনো স্কলার, সেনাপতি বা অন্য কারো উপর ছেড়ে দেয়া হয়নি। এই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপ্রধানের, যার হাতে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। এটি ইসলামের যুদ্ধবিগ্রহের একদম গোড়ার মূলনীতি। ইবন কুদামাহ আল-মাকদিসী (মৃত্যু ৬২০ হিজরি/ ১২৩৩ খ্রী:) এই মূলনীতিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে: ‘যুদ্ধ ঘোষণা করা (বা না করা) রাষ্ট্রপ্রধান ও তার সিদ্ধান্তের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে (আমর আল-জিহাদ মাওকুলুন ইলা’ল-ইমাম ওয়া ইজতিহাদিহি)। নাগরিকদের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রপ্রধানের এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পালন করা।’[২] আল-বুহুতি (মৃত্যু ১০৫১ হিজরি/ ১৬৪১ খ্রী:) একই মূলনীতির কথা বলেন: ‘জিহাদ ঘোষণা করা (বা না করা) রাষ্ট্রপ্রধান ও তার সিদ্ধান্তের উপর ন্যস্ত, কারণ তিনিই মুসলমানদের ও তাদের শত্রুদের অবস্থা সব থেকে ভাল জানেন।’[৩]

৪। বেসামরিক লোকদের হত্যা না করার যে মতবাদ ক্ল্যাসিকাল ইসলামে পাওয়া যায় তার উৎপত্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা থেকে: ‘আল্লাহ্‌র নামে অগ্রসর হও, তাঁর উপর ভরসা রাখ এবং তাঁর ধর্মকে আঁকড়ে ধরে রাখ। বৃদ্ধ পুরুষ, শিশু, কিশোর বা মহিলাদের হত্যা করো না।’[৪] আবার, ইবন-উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ‘মহিলা ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।’[৫]

৫। শেষের হাদিসটি উল্লেখ করে ইমাম আল-নাওয়াওয়ী (মৃত্যু ৬৭৬ হিজরি/ ১২৭৭ খ্রী:) এ ব্যাপারে স্কলারদের মতৈক্য ঘোষণা করে বলেন: ‘স্কলাররা এই হাদীসের বাস্তবায়নের ব্যাপারে একমত হয়ে মহিলা ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেন, এই শর্তে যে তারা যুদ্ধে অংশ নিবে না। কিন্তু যদি তারা যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ  স্কলারদের (জামাহির আল-‘উলেমা) মত হলো যে, তাদের সাথে যুদ্ধ করা যাবে।’[৬] মহিলা, শিশু, ধর্মযাজক বা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার ঐক্যমতের যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে ইবন কুদামাহ বলেন যে, এদের সবাইই ‘অসামরিক (লাইসা মিন আহলি আল-কিতাল)।’[৭] তিনি আরো বলেন: ‘শত্রুপক্ষের শিশু, পাগল, মহিলা, ধর্মযাজক, বৃদ্ধ পুরুষ, দুর্বল রোগীদের হত্যা করা যাবে না — যদি না তারা যুদ্ধ করে।’[৮]

৬। সুতরাং আমরা দেখলাম যে, ইচ্ছাকৃতভাবে অসামরিক লোকদের টার্গেট করে হত্যা করা (যা নিতান্তই প্রান্তিক সংখ্যালঘু কিছু লোক আসল জিহাদ বলে দাবী করে) আদতে এ ব্যাপারে স্কলারদের ক্লাসিক্যাল ঐক্যমতের বিরোধী এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষার নিরেট বিকৃতি। বেসামরিক লোকদের জান ও মালের উপর যে অবাধ আক্রমণ ও হত্যালীলা চলছে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাকে বিকৃত করে, আমাদেরকে অবিরাম এর প্রতিবাদ করতে হবে, সমালোচনা করতে হবে, প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং তাদের যুক্তির অসারতা টেক্সচুয়ালি দেখিয়ে দিতে হবে। সন্ত্রাসবাদের (হিরাবা) মুখোশ খুলতে গিয়ে সমকালীন একজন স্কলার যথার্থই বলেছেন: ‘সন্ত্রাসের সাথে জিহাদের সম্পর্ক আর বিয়ের সাথে পরকীয়ার সম্পর্ক একই।’[৯] কুরআনে আছে: ‘আপনি একটি নিষ্পাপ প্রাণ হত্যা করলেন সে কাউকে হত্যা না করা সত্ত্বেও? নিশ্চয়ই আপনি বিরাট এক অন্যায় কাজ করলেন।’ (সূরা কাহাফ: ৭৪)

৭। নিজেদের দুষ্কর্মের একটা হাস্যকর কারণ এসব চরমপন্থীরা দেয় — গণতান্ত্রিক দেশের সাধারণ নাগরিকেরা নাকি নিরপরাধ না! তাদের যুক্তি হলো: গণতন্ত্রে সরকার আসলে জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ীই কাজ করে; আর তাই সাধারণ নাগরিকেরা তাদের সরকারের বিদেশ নীতির জন্য সমানভাবে দায়ী। কাজেই তারা যুদ্ধের ন্যায্য টার্গেট! এই অভিযোগ যেমন মিথ্যা তেমনি সত্যের বিকৃতি। এই আংশিকতাবাদী (reductionist) ‘গণতন্ত্রে বাসকারী সবাই দোষী’ যুক্তিটি এই সহজ বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে যে, গণতান্ত্রিক দেশের এক বিরাট সংখ্যক মানুষ তাদের দেশের বিদেশ নীতি সমর্থন করে না। এক বিশাল সংখ্যক লোকতো ক্ষমতাসীনদের ভোটই দেয়নি ক্ষমতায় আসার জন্য! এই লোকগুলাকে কেমন করে তাদের সরকারের কুকর্মের জন্য দায়ী করা যায়? পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী সমাবেশে, ইরাক যুদ্ধের প্রতিবাদে লাখো লোকের উপস্থিতি এবং সরব প্রতিবাদই যথেষ্ট এই যুক্তির অসারতা প্রমাণের জন্য। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে শারিয়ার সংজ্ঞায় গণতান্ত্রিক দেশের সাধারণ নাগরিকদের মিন আহল আল-কিতাল বা actual combatant (সরাসরি যুদ্ধরত যোদ্ধা) হিসেবে ধরা হয় না। এ নিয়ে আলোচনা সামনে আসছে।

৮। আরো দ্ব্যর্থহীনভাবে এই বিকৃত যুক্তির খন্ডন করার জন্য কী প্রসঙ্গে আল্লাহ্‌র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধে মহিলা, শিশু এবং অন্যান্য সাধারণ জনগণকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন সেটা দেখতে হবে। নিষেধাজ্ঞাটা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন দিয়েছিলেন যখন মুসলমানরা মক্কার পৌত্তলিকদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, যাদের উদ্দেশ্য মুসলমানদের ধ্বংস করে দেয়ার থেকে কম কিছু ছিল না। মক্কার মুশরিক সমাজ ছিল ভীষণভাবে ঐক্যবদ্ধ কিছু গোত্রের সমষ্টি। তাদের মুরব্বিরা একসাথে বসে সব সিদ্ধান্ত নিত। সেই সমাজের যেকোনো সাধারণ লোকের জন্য তাদের গোত্রপতিদের কাছে যাওয়া বা তাদের কাছে নিজের মতামত জানানোটা বর্তমানকালে পশ্চিমা গনতন্ত্রে বসবাসকারী যেকোনো সাধারণ নাগরিকের সুযোগ থেকে অনেক বেশী ছিল। গোত্রপতিদের নেয়া সিদ্ধান্তে সাধারণের প্রভাবও ছিল অনেক বেশী। এমন ঘটনা মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না যে, মহিলারা (প্রভাবশালী পরিবারের মহিলা, বা গোত্রের নেতার স্ত্রী বা মেয়ে) তাদের বাবা, ভাই বা স্বামীদের উপর চাপ প্রয়োগ করে, মিষ্টি কথা বলে এমনকি হুমকিধামকি দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উৎসাহিত করছে। পরিবারের বেইজ্জতি আর বংশের অপমান ছিল দুটি বহুল ব্যবহৃত ছুতা। উহুদের যুদ্ধে হিন্দের নেতৃত্বে মহিলারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল যোদ্ধাদের নৈতিক সমর্থন জানানোর জন্য, যুদ্ধে উৎসাহ দেয়ার জন্য। এগুলো জেনেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জোর দিয়েছিলেন: ‘বৃদ্ধ পুরুষ, অল্পবয়সী বাচ্চা এবং মহিলাদের হত্যা করবে না।’[১০] একবার তিনি একজন নিহত মহিলার লাশ দেখে বলেছিলেন: ‘এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কথা ছিল না।’[১১]

৯। চরমপন্থী জঙ্গীরা সাধারণ নাগরিকদের হত্যার পক্ষে আরেকটা যুক্তি দেয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীস টেনে আনে। একবার রাতের বেলা কিছু মুশরিকদের বাড়িঘর আক্রমণ করা হয়েছিল, যার ফলে কয়েকজন নারী ও শিশুও মারা যায়। এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিগ্যেস করা হলে তিনি বলেন: ‘তারা তাদের অন্তর্ভুক্ত (হুম মিনহুম)।’[১২] দুটি কারণে এই হাদিসকে এক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না: প্রথমত, বেশ কিছু স্কলার মনে করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সরাসরি নির্দেশ ‘যুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের হত্যা করো না’-এর মাধ্যমে এই হাদীস বাতিল হয়ে গেছে।[১৩] দ্বিতীয়ত, যেসব স্কলার রাতের আক্রমণকে অনুমতি দেন (যেসব আক্রমণে নারী ও শিশুদের প্রাণহানির সম্ভাবনা থাকে) তারাও পরিষ্কার শর্ত জুড়ে দেন: ‘শর্ত হচ্ছে তাদের (নারী, শিশু ও অন্যান্য অযোদ্ধাদের) ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করা যাবে না।’[১৪] আরো গুরুত্বপূর্ণ কথা এই যে, এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী এবং ইসলামের প্রথম যুগের একজন স্কলার ইমাম আল-যুহরি যখনই হাদীসটি বর্ণনা করতেন সাথে সাথেই অন্য হাদীসটিও বলতেন যেটাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণ জনগণকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। ‘যখনই আল-যুহরি এই হাদিসটি বর্ণনা করতেন, তিনি বলতেন: “কা’ব বিন মালিকের ছেলে আমার কাছে তার চাচা থেকে বর্ণনা করেছেন… যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারী ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।”’[১৫]

এর সাথে উপরের ৩ নম্বর পয়েন্টটা মিলিয়ে পড়তে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যক্তি হিসেবে এই সিদ্ধান্তগুলো নেননি, নিয়েছেন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে।

১০। এই বিষয়ের সাথে শারিয়ার আরেকটি বিষয় সম্পর্কিত যা চরমপন্থিদের বিকৃত পুনঃপাঠের স্বীকার হয়েছে। সেটা হলো ‘আকদ আল-আমান — “নিরাপত্তার অঙ্গিকারনামা”-র ধারণা। এর মানে হলো যেসব মুসলিম অমুসলিম দেশে বাস করে — জন্মসূত্রে, নাগরিকত্ব পাওয়ার সুবাদে বা আইনগতভাবে — তারা একটা সুস্পষ্ট চুক্তি বা অঙ্গিকারনামার আওতায় বাস করে, যে চুক্তির মাধ্যমে সকল অমুসলমানের জীবন, ধনসম্পদ এবং মর্যাদাকে অলঙ্ঘনীয় স্থান দেয়া হয়। এর মানে হলো অমুসলিম দেশের মুসলিম নাগরিকরা তাদের দেশ বা দেশের মানুষের বিরুদ্ধে কোনো অগ্রাসী কাজ করতে পারবে না। ইবন কুদামাহ বলেন: ‘তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। কারণ তারা তাকে নিরাপত্তা দিয়েছে এই শর্তে যে, সে তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না এবং তার হাত থেকে তারা নিরাপদ থাকবে। এটা স্পষ্টভাবে বলা নাও থাকলে উহ্য থাকে … এ কারনে তাদের বিশ্বাসের অপমান করা আমাদের জন্য নিষিদ্ধ, কারণ এটা বিশ্বাসঘাতকতা, আর বিশ্বাসঘাতকতার কোনো জায়গা আমাদের ধর্মে নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “মুসলিমরা তাদের চুক্তির বাস্তবায়ন করে।”[১৬]’[১৭]

১১। চুক্তি ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নকে বা সম্মান করাকে ইসলাম যে কতখানি গুরুত্ব দেয় তা বলে শেষ করা যাবে না। অথবা এটাও বলে শেষ করা যাবে না যে, একটা দেশে বাস করা মুসলিম অধিবাসীদের জন্য সেই দেশের বা দেশের লোকদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করাটা কতখানি নিষিদ্ধ। যেটা বুঝতে হবে, appreciate করতে হবে তা হলো: আমেরিকা ও ব্রিটেন মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসী যুদ্ধে লিপ্ত, কোনো মুসলমান এটা বিশ্বাস করা মানে এই না যে, এর সাথে উপরের ১০ টি পয়েন্টের কোনো একটিও সাংঘর্ষিক। সব কথার বড় কথা হলো, যেসব মুসলমান নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় আছে তারা তাদের নিজের দেশকে আক্রমণ করতে পারবে না, দেশের সৈন্যদের উপর হামলা করতে পারবে না, দেশের কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে আক্রমণ করতে পারবে না। একটা হাদীসে এরকম অপমানকর ও কলঙ্কজনক পরিণতির ভয় দেখানো হয়েছে: ‘চুক্তি ভঙ্গকারী প্রত্যেক ব্যক্তির পিছনে কিয়ামতের দিন একটি পতাকা থাকবে। পতাকাটি তার বিশ্বাসভঙ্গের পরিমাণ অনুযায়ী উপরে উঠানো হবে।’[১৮]

উপসংহারে বলতে হয়: সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্কলারদের প্রতিবাদ চলতে থাকতে হবে — উচ্চস্বরে এবং গুরুত্বের সাথে। দেশের অভ্যন্তরীন বা বৈদেশিক নীতির সাথে আমাদের ভিন্নমত থাকলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় জানাতে হবে।

ভালো দিক হচ্ছে, নিজেদের মধ্যে আকিদা এবং ফিকহের অনেক বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আমাদের সময়ের মুসলিম স্কলাররা সর্বসম্মতভাবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাদের কাছে আমাদের চাওয়া এই যে, তারা বিপথগামী মতাদর্শের তাত্ত্বিক অসারতা যুক্তি দিয়ে তুলে ধরবেন এবং এর সমূলে উৎপাটন করবেন। আমাদের সরকারকেও বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে, ক্ষেত্র করে দিতে হবে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দেরও দায়িত্ব আছে প্রচুর। মুসলিম চরমপন্থীদের ক্ষোভের কারণ এমন অনেক ইস্যুর ন্যায্য সমাধানের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ কমানো যেতে পারে: ফিলিস্তিন সমস্যার ন্যায্য সমাধান, গুয়ান্তানামো বে জেলখানা বন্ধ করে দেয়া, ন্যায্য বিদেশ নীতি বাস্তবায়ন করা ইত্যাদি। কিন্তু, চরমপন্থীদের বিকৃত ফিকহ ও আকিদাকে ঘায়েল করে ধ্বংস করার দায়িত্ব কিন্তু মুসলিম স্কলারদের ঘাড়েই।

***

রেফারেন্স:

১। মুফরাদাত আলফায আল-কুর’আন (দামেস্ক: দার আল-কালাম, ২০০২), ২০৮

২। আল-মুগনি (সৌদি আরব: দার আল-‘আলাম আল-কুতাব, ১৯৯৯), ১৩:১১

৩। কাশ্যাফ আল-কিনা’ (রিয়াদ: মাক্তাবাহ আল-নাসর আল-হাদিসাহ), ৩:৪১

৪। আবু দাউদ, সুনান, নং-২৬১৪

৫। আল-বুখারী, নং-৩০১৫; মুসলিম, নং-১৭৪৪

৬। শারহ সাহীহ মুসলিম (বৈরুত: দার আল-কুতুব আল-‘ইলমিয়্যাহ, ১৯৯৫) ১২:৪৩

৭। আল মুগনি, ১৩:১৭৮

৮। ‘উমদাত আল-ফিকহ (রিয়াদ: দার আল-মাইমান, ২০০৯), ২২০

৯। আব্দাল হাকিম মুরাদ, Contentions, ৫/৭, http://www.masud.co.uk

১০। আবু দাউদ, সুনান, নং-২৬১৪

১১। আবু দাউদ, সুনান, নং-২৬৬৯; ইবন মাজাহ, নং-২৮৪২

১২। আল-বুখারী, নং-৩০১২

১৩। দেখুন: ইবন হাজার আল-‘আসকালানি, ফাতহ আল-বারি শারহ সাহীহ আল বুখারী (বৈরুতঃ দার আল-কুতুব আল ‘ইলমিয়্যাহ, ১৯৮৯), ৬:১৮২

১৪। ক্ল্যাসিকাল হাম্বালী আইনজ্ঞ, আল-বুহুতি, কাশ্যাফ আল-কিনা’, ৩:৪৭-৪৮

১৫। ফাতহ আল-বারি, ৬:১৮২ তে উদ্ধৃত। মূল লেখক আবু আলীয়া সুরখিল শারিফ এখানে মুহাম্মাদ নিজামীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এই বিবরণ দেখিয়ে দেয়ার জন্য।

১৬। আল-তিরমিযী, নং ১৩৫২

১৭। আল-মুগনি, ১৩:১৫২

১৮। মুসলিম, নং ১৭৩৮

***

আরও পড়ুন:

Advertisements