“হাসান, পরপারে দেখা হবে …”: যুদ্ধে সব হারানো এক সিরিয় শিক্ষকের বিদায়ী উক্তি

হাসান মিসরে পড়ালেখা করতে যাওয়া একজন পাকিস্তানী ছাত্র। তিনি তাঁর বন্ধু উস্তাদ নু’মান আলি খানকে এই চিঠিটি লিখেছিলেন, যেটি নু’মান আলি খান তাঁর সূরা বাকারা-র তাফসিরে ২৭৩ নাম্বার আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পড়ে শুনিয়েছেন। ভিডিওটি দেখতে হলে bayyinah.tv-র সাবস্ক্রিপশন লাগবে। মূল বক্তব্য ঠিক রেখে কিছু সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে।

Old man in devastated house

হাসান লিখছেন … 

আমি একটা আরব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলাম। আমার পড়ার বিষয় ছিল একটু ব্যতিক্রমী এবং কঠিন। তাই ঠিক করলাম যে, গ্রীষ্মের ছুটিতেও পড়ব। প্রথম ক্লাসেই বুঝলাম আমি ছাড়া আর কেউ ক্লাসের জন্য এনরোল করেনি।

ক্লাসে বসে আছি। ৫৫-৬০ বছরের একজন বৃদ্ধ ঢুকলেন। হাতে তার আলি তানতাওয়ির বই। বললেন, তুমি একা? আমি বললাম হ্যাঁ। তিনি বই খুলে পড়ানো শুরু করলেন। ৩ ঘণ্টা পড়ালেন। ক্লান্ত হয়ে গিয়ে বললেন বাকিটা আগামীকাল পড়ব।

আমি উনাকে আগে কখনো দেখিনি। তাই জিগ্যেস করলাম: প্রফেসর, আপনি কি এখানে নতুন? তিনি বললেন মাত্র কয়েক দিন হলো এখানে এসেছি। জিগ্যেস করলাম আপনি থাকছেন কোথায়? কাছেই, তিনি বললেন। আমি বললাম যে, আমি তার কাছে সন্ধ্যায় পড়তে চাই। তিনি রাজি হলেন।

সন্ধ্যায় তার দেয়া ঠিকানায় গেলাম। একটা দোকানের উপরে ছোট্ট একটা ঘরে থাকেন তিনি! সরাসরি পড়ানো শুরু করলেন। আমি ভাবছিলাম এরকম একজন জ্ঞানী লোক ক্যামনে এমন জায়গায় থাকেন! আমি বলেই ফেললাম: এখানে কেমন করে থাকেন? এটা তো আপনার থাকার উপযুক্ত জায়গা না। আমার বাসায় একটা খালি রুম আছে। চলেন, আপনি এখন থেকে আমার সাথে থাকবেন। তিনি রাজি হলেন না। আমি একরকম জোর করে তার মালপত্র আমার বাসায় নিয়ে চলে আসলাম। অগত্যা তাকেও আসতে হলো।

আমার ধারণা ছিল আমার বাসায় এসে তিনি খুশি হবেন, কারণ বাসাটা ছিল বেশ বড় ও খোলামেলা। আমি তাকে তার ঘর দেখিয়ে দিলাম। জিগ্যেস করলাম: আপনার পছন্দ হয়েছে? তিনি বসলেন। জবাব দিলেন: ঘর তো অনেক বড়, কিন্তু জানো, আমার ঘোড়ার আস্তাবলও এর থেকে বড় ছিল। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না কী শুনছিলাম! কী বলেন তিনি! আমি তাকে বললাম নিজের সম্বন্ধে কিছু বলতে, যাতে তার সম্বন্ধে আরো জানতে পারি। তিনি বলা শুরু করলেন…

আমার বাড়ি সিরিয়ায়। সারাটা জীবন আমার ওখানেই কেটেছে। আমার পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলেন। একরের পর একর জমি ছিল আমার। ফল-ফুলের বাগান ছিল। আমি সাহিত্যের অনুরাগী ছিলাম। টাকার কোনো চিন্তা ছিল না। পড়াশুনা করে আর ছাত্রদের পড়িয়েই আমার সময় কাটত। ব্যবসা ভাল চলছিল। তাই আমার পুরা সময়ই আমি জ্ঞানচর্চায় ব্যবহার করতাম।

বিরাট এক আলিশান বাড়ি ছিল আমার। লাইব্রেরিতে ছিল হাজার হাজার বই। আমার ঘোড়ার শখ ছিল। কয়েক ডজন ঘোড়া ছিল আমার। আমার বাড়িতে লেইক ছিল, ছিল অনেক চাকর বাকর।

সিরিয়ার অবস্থা যখন খারাপ হতে লাগল, আমি ছাত্রদের পড়ানোর সময় কমায়ে দিলাম। একদিন আমি যখন পড়াচ্ছি, আমার বন্ধু ফোন করে বলল, বাড়িতে ফিরো না। ওরা তোমার বাগান পুড়িয়ে দিয়েছে, ঘরবাড়ি লুটপাট করেছে, লাইব্রেরি পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার হাজার হাজার বইয়ের লাইব্রেরি! বন্ধু বলল যে, সে আমার পরিবারকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়েছে। বলল সেখানে গিয়ে তাদের সাথে দেখা করতে। আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল!

আমি তড়িঘড়ি করে আমার বউ-বাচ্চার কাছে গেলাম, যেখানে তাদের লুকিয়ে রাখা হয়েছিল সেখানে। আমার বন্ধু বলল, যুদ্ধ লেগে গেছে। তুমি তোমার পরিবার নিয়ে এখনি পালিয়ে যাও। কোথায় যাব! বন্ধু আমার হাতে কিছু টাকা দিল আর তার গাড়ি দিল। বলল টার্কি বর্ডারের দিকে যাও। গাড়িতে বাচ্চাকাচ্চা দেখলে সীমান্তরক্ষীরা তোমাদের ঢুকতে দিবে। তাই করলাম। রক্ষীরাও ঢুকতে দিল। আমাদের স্থান হলো শরণার্থী শিবিরে। জীবনে প্রথম তাঁবুতে অমন একটি রাত কাটালাম। কিছুদিনে অভ্যস্তও হয়ে গেলাম!

ভাবছিলাম কী করি এখন! চাকরি খুঁজা শুরু করলাম। এখানে পেয়েও গেলাম। ক্যাম্পে বউ বাচ্চা রেখে এখানে চলে আসলাম। কিছু টাকা জমলেই ওখানে গিয়ে ওদেরকে ভাড়া বাড়িতে তুলে দিয়ে আসব। এজন্যই এখানে আসা।

তিনি কথা বলছিলেন। তার ঠোঁট কাঁপছিল। চোখের পানিতে সাদা দাড়ি ভিজে যাচ্ছিল। তিনি বলছিলেন: বড় ঘর আর ছোট ঘরে এখন আর কিছু যায় আসে না। তবে তুমি দয়া করে নিয়ে এসেছ, খুব খুশি হয়েছি।

আমার সাথে তিনি বেশ কয়েক মাস ছিলেন। অনেক মায়া আর দরদ দিয়ে পড়াতেন আমাকে।

একদিন আমি শহরের বাইরে ছিলাম। তিনি ফোন করলেন। বললেন আমাকে এক্ষুনি চলে যেতে হবে। ক্যাম্পে আমার মেয়েটা মারা গেছে। শেষ যে কথাগুলো তিনি বলেছিলেন তা আজও আমার কানে বাজে- হাসান, পরপারে দেখা হবে।

এর কিছুদিন পর আমি পাকিস্তান ফেরত আসলাম। একদিন এক স্কলারদের মজলিসে বসে আছি। খোশগল্প হচ্ছে। একজন বলছে- বাহ, সিরিয়ায় শিয়ারা সেইরকম মাইর খাইতেসে। আরেকজন বলল- খবিসগুলা এখন টের পাবে কত ধানে কত চাল! উপযুক্ত শিক্ষা হচ্ছে। আরেকজন বলল- কিন্তু সুন্নিরাওতো ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হচ্ছে। আরেকজনের জ্ঞানী মন্তব্য- কিছু মূল্য তো দিতেই হবে!

থম মেরে শুনছিলাম এই বালখিল্য আলাপ। ভাবছিলাম, কাউকে না কাউকে তো দাম দিতেই হবে, তবে দামটা অন্যে দিলে গল্প করতে সুবিধা হয়।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s