সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করতে চাইলে যে তিনটি বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা দরকার

Men walking

দ্বন্দ্ব, বিবাদ ও মনোমালিন্য আমাদের সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। না চাইলেও অনেক সময়ই অনাকাঙ্খিত এসব পরিস্থিতির মুখোমুখি আমাদেরকে হতে হয়। তবে, কয়েকটি বিষয়ে একটু সতর্ক থাকতে পারলে সামাজিক জীবনের এসব অশান্তি ও বিদ্বেষ অনেকখানিই কমিয়ে আনা সম্ভব। এরকম তিনটি বিষয় নিয়ে আমাদের আজকের এই আলোচনা।

১. উভয় পক্ষের বক্তব্য না শুনে কোনো বিবাদে পক্ষ অবলম্বন করা যাবে না:

পরিবারে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, অফিসে, আড্ডার বৈঠকে, অনলাইনে, পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় এবং আরও অনেক জায়গায় আমরা প্রতিনিয়ত এমন অনেক ঘটনার মুখোমুখী হই যেখানে বিবদমান দুটি পক্ষের মধ্যে একটি পক্ষের বক্তব্য আমাদের কাছে পৌঁছে। অন্য পক্ষের বক্তব্য হয় আমাদের জানার সুযোগ হয় না অথবা আমরা বস্তুনিষ্ঠভাবে তা জানার আগ্রহ দেখাই না। মাত্র একটি পক্ষের পক্ষপাতদুষ্ট বক্তব্যের ভিত্তিতে আমরা প্রায়ই পক্ষ অবলম্বন করে ফেলি এবং অভিযুক্ত পক্ষের প্রতি এক রকম বিরাগ ও বিতৃষ্ণা নিজেদের অজান্তেই আমাদের মধ্যে চলে আসে।

একইসাথে নবী ও বাদশাহ দাউদ (আ.)-কে এরকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে আল্লাহ পরীক্ষা করেছিলেন। কুরআনে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে (মর্মার্থ):

“তোমার কাছে কি সেই মোকদ্দমাকারীদের সংবাদ পৌঁছেছে, যখন তারা প্রাচীর ডিঙিয়ে ইবাদতখানায় প্রবেশ করেছিল? যখন তারা দাউদের কাছে পৌঁছল, সে তাদের দেখে ঘাবড়ে গেল। তারা বলল, ভয় পাবেন না। আমরা বিবদমান দুটি পক্ষ। আমাদের একে অন্যের প্রতি যুলুম করেছে। সুতরাং আপনি আমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করে দিন। অবিচার করবেন না এবং আমাদেরকে সঠিক পথনির্দেশ করুন। এ আমার ভাই। তার নিরানব্বইটি দুম্বা আছে। আর আমার আছে একটি মাত্র দুম্বা। সে বলছে, এটিও আমাকে দিয়ে দাও এবং সে কথার জোরে আমাকে দুর্বল করে দিয়েছে। দাউদ বলল, সে তার দুম্বাদের সাথে মেলানোর জন্য তোমার দুম্বাটিকে দাবী করে তোমার প্রতি অবিচার করেছে। শরীকদের অনেকেই একে অপরের প্রতি যুলুম করে থাকে। ব্যতিক্রম কেবল তারা যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে। অবশ্য এমন লোকের সংখ্যা অল্প। তখন দাউদ উপলব্ধি করল যে, মূলত আমি তাকে পরীক্ষা করেছি। কাজেই সে তার প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল, সিজদায় লুটিয়ে পড়ল এবং আল্লাহর অভিমুখী হলো। অনন্তর আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম। প্রকৃতপক্ষে আমার কাছে রয়েছে তার বিশেষ নৈকট্য ও উত্তম ঠিকানা। হে দাউদ, আমি পৃথিবীতে তোমাকে প্রতিনিধি করেছি। সুতরাং তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার কর এবং খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয়ো না। অন্যথায় তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। নিশ্চিতভাবে জেনে রেখ, যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয় তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি, এ কারণে যে, তারা হিসাব দিবসকে বিস্মৃত হয়েছিল।” [কুরআন ৩৮:২১-২৬]

এখানে, এক পক্ষের বক্তব্য শুনেই নবী দাউদ (আ.) একটি মন্তব্য করে ফেলেছিলেন। কিন্তু, পরক্ষণেই তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, উভয় পক্ষের বক্তব্য না শুনে কোনো মন্তব্য করা তাঁর পক্ষে শোভনীয় হয়নি।

এই বিষয়টিতে আমাদের সবারই সতর্ক থাকা উচিৎ। উভয় পক্ষের বক্তব্য ভালোমতো না শুনে কোনো বিবাদে পক্ষ অবলম্বন করা উচিৎ নয়।

২. সূত্রের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে কোনো কথা বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকতে হবে:

সামাজিক গণমাধ্যম এবং মূলধারার গণমাধ্যমের মাধ্যমে যেসব তথ্য প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে আসছে তার উৎসের বস্তুনিষ্ঠতা সম্পর্কে আমাদের সবার সচেতন থাকা দরকার। হতে পারে যে, ঘটনাটিকে যেভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে তাতে সত্যের সাথে মিথ্যা ও কল্পনার মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খবরটি পুরোপুরি বানোয়াট হওয়াও অসম্ভব নয়। এ বিষয়ে আমাদেরকে সাবধান করে দিয়ে আল্লাহ বলেন:

49:6

“হে মুমিনগণ, কোনো পাপাচারী যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে তবে ভালোভাবে যাচাই করে দেখবে, যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।” [কুরআন ৪৯:৬]

খবর ও তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতার ব্যাপারে সদা সতর্ক না থাকলে নিজেদের অজান্তেই কোনো কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সম্প্রদায়, মতবাদ, ঘটনা ইত্যাদির সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কলুষিত হয়ে পড়তে পারে এবং ফলশ্রুতিতে নিজেদের অজান্তেই আমরা অন্য মানুষের ক্ষতির কারণ হয়ে বসতে পারি।

৩. নিছক অনুমানের ভিত্তিতে কারও সম্পর্কে বাজে ধারণা পোষণ করা যাবে না:

অনেক সময় ভাসা ভাসা তথ্যের ভিত্তিতে অন্য মানুষ সম্পর্কে আমরা অনুমাননির্ভর অনেক উপসংহারে পৌঁছে থাকি। অমুককে তমুকের সাথে কথা বলতে দেখা গেছে … মানে, তাদের মধ্যে ‘কিছু একটা’ আছে। অমুকে তমুকের দিকে কেমন করে তাকিয়েছে … মানে, তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা চলছে। অমুকে আমাকে দেখলেই সালাম দেয় … মানে, আমার কাছে তার কোনো স্বার্থ আছে। এভাবে, পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত স্রেফ অনুমানের উপর ভর করে আমরা অন্য মানুষের সম্পর্কে ভালোমন্দ অনেক ধারণা করে বসি এবং অনুমাননির্ভর এসব ধারণার ভিত্তিতে তাদের সাথে আমরা ভালো বা খারাপ আচরণ করি এবং হয় তাদের পছন্দ করি বা অপছন্দ করি। আমাদের মনের মধ্যেকার এসব ধারণা যেহেতু অন্য মানুষের সাথে আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করে তাই ভুল ধারণার ভিত্তিতে কারও সাথে খারাপ আচরণ করলে বা কারও সম্পর্কে বাজে ধারণা পোষণ করলে নিজেদের অজান্তেই তা আমাদের জন্য অনেক বড় পাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নেহায়েতই ধারণানির্ভর এসব অনুমান থেকে আমাদেরকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন:

49:12

“হে মুমিনগণ, অনেক রকম অনুমান থেকে বেঁচে থাক। কোনো কোনো অনুমান গোনাহ। তোমরা কারও গোপন ত্রুটির অনুসন্ধানে পড়বে না এবং একে অন্যের গীবত করবে না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? এটাকে তো তোমরা ঘৃণা করে থাক। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।” [কুরআন ৪৯:১২]

ব্যক্তিগত জীবনে এবং লোকচক্ষুর আড়ালে কে কী করছে তা অনুসন্ধান করে বেড়াতে এখানে নিষেধ করা হয়েছে। এছাড়াও, কোনো মানুষের অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কোনো কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে যা শুনলে সে মনে কষ্ট পাবে। পরনিন্দামূলক গর্হিত এই কাজটিকে গীবত বলে। যার ব্যাপারে গীবত করা হচ্ছে তার মধ্যে সেই দোষটি যদি বাস্তবে থেকেও থাকে তবুও তার অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে সেই কথাটি বলা যাবে না। কারও সম্পর্কে গীবত করাকে এখানে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো রুচিবিবর্জিত কাজের সাথে তুলনা করা হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি গীবত করে থাকি এবং একে অন্যায় কিছু বলে মনে করি না। নিন্দনীয় এই অভ্যাসটি থেকে আমাদের সবার বেঁচে থাকা দরকার। অন্যথায়, অন্যের সম্পর্কে হাল্কাভাবে বলা কিছু কথার কারণে শেষ বিচারের দিনে আমাদেরকে চড়া মূল্য চুকাতে হতে পারে।

***

আরও পড়ুন:

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s