শেষ বিচারের দিনে যাদের থেকে বিচ্ছুরিত হবে জ্যোতি, আর যাদের থাকবে না কোনো জ্যোতি

কুরআনের সূরা হাদিদ-এর ১২ থেকে ১৬তম আয়াতের উপর উস্তাদ নুমান আলী খানের দেওয়া খুতবা “How We Lose Our Iman”-এর বাংলা ভাবার্থ। খুতবাটি অনেক দীর্ঘ হওয়ায় এটি তিনটি পৃথক খন্ডে “আমার স্পন্দন”-এ প্রকাশ করা হচ্ছে, যার প্রথম খন্ড হলো এটি। — সম্পাদক

Lights on highway at night

কুরআনুল কারিমের বিভিন্ন সূরাতে আল্লাহ্‌ শেষ বিচারের দিনের বর্ণনা দিয়েছেন। কখনো বিস্তারিত আকারে, কখনো সংক্ষেপে, আবার কখনো রূপকের মাধ্যমে। বিশ্বাসীরা জান্নাতের দিকে ধাবমান এবং অবিশ্বাসীরা জাহান্নামের দিকে অগ্রসর হচ্ছে — অধিকাংশ বর্ণনায় এমন একটি চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু, সূরা হাদিদ- এর মাঝামাঝি অংশে তুলে ধরা হয়েছে একটি ব্যতিক্রমধর্মী চিত্র: 

57:12

57:13

“যেদিন আপনি দেখবেন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে, তাদের সম্মুখভাগে ও ডানপার্শ্বে তাদের জ্যোতি ছুটোছুটি করবে। বলা হবে: আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই মহাসাফল্য।

যেদিন কপট বিশ্বাসী পুরুষ ও কপট বিশ্বাসিনী নারীরা মুমিনদেরকে বলবে: তোমরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা কর, আমরাও কিছু আলো নেব তোমাদের জ্যোতি থেকে। বলা হবে: তোমরা পিছনে ফিরে যাও ও আলোর খোঁজ কর। অতঃপর উভয় দলের মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর, যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আযাব।” [সূরা আল হাদিদ :১২-১৩]

আল্লাহ্‌ এখানে বিশ্বাসী ও মুনাফিকদের ভেতর তুলনা করেছেন। মুনাফিক তারা যারা মনে করে যে তারা মুসলিম এবং চলনে-বলনে সঠিক পথেই আছে, যদিও তাদের অন্তর কলুষিত। তারা মনে করে তারা ঈমান এনেছে অথবা ভান করে তারা মুসলিম, কিন্তু তাদের এই ‘ঈমান’ বিচার দিবসে কোনো কাজেই আসবে না, কারণ একমাত্র আল্লাহ তাআলাই মানুষের অন্তরের খবর রাখেন।

সূরা হাদিদের এই আলোচ্য অংশটি আমাদের জানা খুবই জরুরী, বিশেষ করে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। আল্লাহ্‌ পরম দয়ালু এবং অসীম করুণাময় বিধায় বিচার দিনের এই চিত্রটি আমাদের জন্য তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি চান আমরা যেন সময় থাকতেই সতর্ক হই, যেন আমরা কেউই মুনাফিকদের মতো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন না হই।

যাদের থেকে বিচ্ছুরিত হবে জ্যোতি:    

দৃশ্যটির বর্ণনা শুরু হয়েছে এভাবে: “(হে নবী!) যেদিন আপনি দেখবেন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে, তাদের সম্মুখভাগে ও ডানপার্শ্বে তাদের জ্যোতি ছুটোছুটি করবে।” [৫৭:১২] কেয়ামতের প্রান্তরে ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদের থেকে বিচ্ছুরিত হবে জ্যোতি।

সেদিন আমাদের কাছে দুইটি আলো থাকবে: একটি হৃদয়ে (যেখানে ঈমান ও বিশ্বাসের অবস্থান) এবং একটি হাতে (যা দিয়ে কাজ করেছি)। শেষ বিচারের দিনটি হবে নিকষ কালো একটি দিন। আঁধারে ঢাকা বিস্তীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের জান্নাতে পৌঁছাতে হবে। এবং সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সবার আলোর প্রয়োজন হবে। যদি আপনার-আমার ঈমান অকৃত্রিম ও বিশ্বাস দৃঢ় হয় তাহলে নিশ্চিতভাবে অন্তরে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে এবং সর্ব অবস্থায় ব্যক্তির কর্মকে তা প্রভাবিত করবে। এই বিশ্বাস ও কর্ম সেদিন জ্যোতিতে রূপান্তরিত হয়ে দীপ্তি ছড়াবে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিছু কিছু ব্যক্তির আলো হবে অনেক প্রখর। সেই আলো এক শহর থেকে আরেক শহর পর্যন্ত বিচ্ছুরিত হবে। আবার কারো কারো আলো হবে অত্যন্ত অনুজ্বল। সেই টিমটিমে আলোতে নিজ পা কোথায় ফেলছে কোনোমতে শুধু সেটিই দেখতে পাবে।

বিভিন্ন মাত্রার আলো নিয়ে যখন বান্দারা জেগে উঠবে এবং জান্নাতের পথে যাত্রা শুরু করবে তখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানানো হবে। কারণ, অন্ততপক্ষে নিজস্ব আলো (যত সামান্যই হোক) নিয়ে এই সকল বান্দা জেগে উঠেছে এবং জান্নাতের পথে যাত্রা শুরু করেছে। “বলা হবে: আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই মহাসাফল্য।” [৫৭:১২]

যাদের থাকবে না কোনো জ্যোতি:

পরবর্তী আয়াতে আরেক শ্রেণীর লোকেদের কথা বলা হয়েছে। এরা হলো তারা যারা পৃথিবীতে থাকতে নিজেদেরকে ঈমানদার বলেই দাবী করতো এবং নিশ্চিত ছিল যে, জ্যোতি নিয়েই তারা জেগে উঠবে। তারা সেই তমসাচ্ছন্ন ধুধু প্রান্তরে জেগে উঠবে এবং গভীর বিস্ময়ে আবিস্কার করবে পথ চলার জন্য তাদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। বহু দূরে তারা দেখবে কিছু মানুষ (যদিও তাদের চেহারা পরিস্কার দেখা যাবে না, শুধু আলো দেখা যাবে) আলো নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু মুনাফিক নারী-পুরুষদের কাছে কোনো আলো থাকবে না, তাই দূরের মানুষদের আলো দেখে তারা দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে, তাদের থেকে আলো ধার নেয়ার চেষ্টা করবে। “যেদিন কপট বিশ্বাসী পুরুষ ও কপট বিশ্বাসিনী নারীরা মুমিনদেরকে বলবে: তোমরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা কর, আমরাও কিছু আলো নেব তোমাদের জ্যোতি থেকে।” [৫৭:১৩]

কুরআনুল কারিমের বিভিন্ন সূরা থেকে আমরা জেনেছি যে, হাশরের ময়দান হচ্ছে ভয়াবহ একটি জায়গা, যেখানে জন্মদাত্রী মা নিজ সন্তানকে পর্যন্ত অগ্রাহ্য করবে। ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, প্রাণের বন্ধু — এসব পার্থিব সম্পর্কগুলো সেদিন ছিন্ন হবে। প্রতিটি মানুষ শুধুমাত্র নিজেকে বাঁচাতে উদ্বিগ্ন থাকবে। তাই, স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাসীরা তখন মুনাফিকদের বলবে, “বলা হবে: তোমরা পিছনে ফিরে যাও এবং আলোর খোঁজ কর।” [৫৭:১৩]

‘পিছনে ফিরে যাও’ — এটি একপ্রকার ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য। মুনাফিকদেরকে বিশ্বাসীরা তখন আবার দুনিয়াতে ফিরে গিয়ে আলোর সন্ধান করতে বলবে, কারণ কেউ যদি দুনিয়াতে তার ঈমান ও কর্ম দিয়ে ‘আলো’ সংগ্রহ না করে থাকে তাহলে সেদিন তার নিজস্ব কোনো আলোই থাকবে না, এবং কোনো ‘ধার করা আলো’ সেদিন তার কাজে লাগবে না। একথা শুনেও মুনাফিকরা মরিয়া হয়ে মুমিনদের কাছে পোঁছানোর জন্য, পিছন থেকে ধরে ফেলার জন্য, ছুটে যাবে।

ঠিক এমন একটি মুহূর্তে ঈমানদার ও মুনাফিক — এই দুই দলের মাঝে একটি বৃহদায়তন ও প্রকাণ্ড দেয়াল নেমে আসবে এবং দুই দলকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলবে। “অতঃপর উভয় দলের মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর, যার একটি দরজা থাকবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আযাব।” [৫৭:১৩]

এই দেয়ালের একদিকে (ঈমানদারদের দিকে) থাকবে আল্লাহ্‌র করুণা, দয়া এবং মমতা। আর অপরদিকে (মুনাফিকদের দিকে) থাকবে কঠোর শাস্তি এবং অন্ধকার। তখন দেয়ালের ওই পাশ থেকে প্রবল হতাশা নিয়ে মরিয়া হয়ে মুনাফিকরা বলবে, “তারা মুমিনদেরকে ডেকে বলবে: আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না?” [৫৭:১৩]

লক্ষ্য করুন, মুনাফিকরা মুমিনদেরকে বলছে, “আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না?”

এক শ্রেণীর মানুষ, যারা পৃথিবীতে নিজেদেরকে ঈমানদার বলেই জানতো, দাবী করতো এবং জান্নাত প্রাপ্তির ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত ছিল, তারা যখন বিচার দিবসে দেয়ালের অপর প্রান্তে আটকা পড়ে যাবে তখনো তারা ঠিক বিশ্বাস করতে পারবে না যে ঘটনাটা কী হচ্ছে। তাই তখন তারা হতবুদ্ধি হয়ে জানতে চাইবে: আমরা তো একইসাথে ছিলাম। একসাথে সালাত আদায় করেছি, ঈদের সালাতের পর কোলাকুলি করেছি, একসাথে কুরবানি দিয়েছি, একইসাথে ইফতার পার্টিতে ইফতার খেয়েছি, ব্যবসায়িক লেনদেন করেছি, ইসলাম ধর্মে জিপিএ ৫ নিয়ে পাশ করেছি, আমরা তোমাদের প্রাণের বন্ধু/ একই দলের-মাযহাবের-মসজিদের লোক/ পরিবারের সদস্য/ কাজিন-নেফিউ-নিস/ খালা-ফুপু-চাচা-মামা/ প্রতিবেশী ছিলাম। আজকে কেন আমাদেরকে পৃথক করা হলো? কেন এই দেয়াল? কেন তোমরা আলো ধার দিচ্ছ না? কেন দরজা খুলে দিচ্ছ না?

দেয়ালের আরেক পাশ থেকে মু’মিন ও জান্নাতের দিকে অগ্রসরমান ব্যক্তিরা তখন তাদের (মুনাফিকদের) প্রশ্নের উত্তর দেবে। দেয়াল নেমে আসার আগে মু’মিনরা মুনাফিকদের বলেছিল, “তোমরা পিছনে ফিরে যাও এবং আলোর খোঁজ কর।” [৫৭:১৩] দেয়াল নেমে আসার পর এই মু’মিন ব্যক্তিরাই মুনাফিকদেরকে ব্যাখ্যা দেবে কেন তারা আজ দেয়ালের ওই পাশে আটকা পড়েছে।

একসময় তাদের (মুনাফিকদের) ভেতরেও আলো ছিল, তাদের ভেতরে ঈমান ছিল। কীভাবে সময়ের পরিক্রমার আস্তে আস্তে সেই আলো নিভে গেছে? কী কারণে তারা শেষ বিচারের দিনে সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে হাজির হয়েছে?

সেই প্রশ্নের উত্তর থাকছে তিন পর্বের এই ধারাবাহিক আলোচনার আগামী পর্বে, ইনশাআল্লাহ।

মূল লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখিকার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে

আরও পড়ুন:

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s